জেলা পরিচিতি - পৃষ্ঠা নং-১১

পদ্মা নদীর প্রাচীনত্ব ও প্রবাহ বর্ণনায় যতদুর জানা গেছে পদ্মা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকে প্রবল হয়েছে। এর পূর্বে অর্থাৎ চতুর্দশ বা তৎপূর্বে এর প্রবাহ প্রবলতার ইতিহাস নাই। এদিকে গঙ্গার প্রাচীনত্ব অনেক পূর্বে যার প্রভাবে বাংলার সমতটীয় বদ্বীপের উত্থান। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে পদ্মার প্রবলতা না থাকায় গঙ্গার ধারা তখন কুমার, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, গড়াই, হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। কুমার, মাথাভাঙ্গা বহু পূর্বে যশোর খুলনা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সে সব অঞ্চলের বদ্বীপ বর্তমানে পরিণত ও ক্ষয়িষ্ণু বদ্বীপ। ঐ অঞ্চলের জলাধার ও বিল বাওড় এর প্রমাণ বহন করে।

গঙ্গার মুখে ত্রায়োদশ চতুর্দশ শতকে এবং তারও পূর্বে যে সমস্ত নদীপ্রবাহ দ্বারা গঙ্গার বিপুল জলরাশি বাহিত হত তা কুমার, গড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, হড়াই। হড়াই প্রাচীন নদী। অন্যদিকে করতোয়া বাংলার উত্তর বঙ্গের মধ্য দিয়ে দক্ষিণগামী। করতোয়ার প্রবাহ-ই হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। এ থেকে অনুমান করা যায় হড়াই তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলের বেগবান নদী ছিল। বর্তমান মাটিপাড়া পিঁজেঘাটা বলে পরিচিত স্থানে যে বিলের আকার দেখতে পাওয়া যায় তা হড়াইয়ের প্রাচীন প্রবাহ। ‘পিঁজেঘাটার ভাটিতে রাধাগঞ্জের বিল ছিল বন্দর’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়)। উল্লেখ্য নদী তার গতি বদলালে পরিত্যক্ত নদী প্রথমে কোল ও মৃত নদী পরে বিল বাওড়ে পরিণত হয়। দশম, একাদশ শতাব্দীতে বা তারও পরে হড়াই প্রমত্ত নদী হিসেবে প্রবাহিত ছিল যার প্রশস্ততা দুই/তিন মাইল। পরে তা দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটি পিঁজেঘাটা দিয়ে অন্যটি বর্তমান হড়াইয়ের প্রবাহ দিয়ে। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে ভূষণা (বর্তমান মধুখালির অদূরে) সমৃদ্ধ নগর ও বন্দর ছিল। এখানকার উন্নতমানের সূতিবস্ত্রের সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

গৌড়ী-গড়াই

গড়াই জন্মস্থানে গৌড়ী বলে পরিচিত। গড়াইয়ের প্রথম জন্ম কুষ্টিয়ার আমলা সদরপুরের বিল হতে। গড়াই জয়নাবাদ লাহিন পাড়ার সাঁওতার পূর্বদিকে কুমারখালি, খোকসা, হিজলাবাদ, জালসুকা, লাঙ্গলবন্দ, আমলাসার, তারাউজল হয়ে ক্রমে দক্ষিণ দিকে নারুয়া সমাধিনগর কামারখালির দিকে প্রবাগহিত হয়ে শেষে মধুমতি, এলানজানি, বালেশ্বররূপে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। কুষ্ঠিয়ার কুড়িদহ, পাতিলাদাহ, চেঁচানেরদহ, ডাকদহ  এ কয়টি নামের সাথে গড়াই নদীর জন্রে পৌরানিক কাহিনী আছে। কথিত আছে কুষ্টিয়ার আমলা গ্রামরে বিলের পাশে ছিল এক ব্রাহ্মণ। এই ব্রাহ্মণের এক সেবাদাসী ছিল। নাম তার গৌড়া। ব্রাহ্মণ একদিন ৬  মাইল দূরে কুপদহে গঙ্গাস্নানে যাবেন। একথা জানতে পেরে গৌড়ি গঙ্গা মাকে নিবেদন দেবার জন্য একটি ফুল দেন। ব্রাহ্মণ যথাসময়ে গঙ্গাস্নান সেরে ফিরে আসতে মনে পড়ে গৌড়ির নিবেদন দিমে তিনি ভুলে গেছেন। ব্রাহ্মণ ফিরে যেতে চান গঙ্গায় এবং কিছুদূর যেতে গরুর খুরে গর্তের জমা পানি দেখে মনে করেন এখানেই নিবেদন দিয়ে যাই, কে আর দেখছে?সেখানে ফুলটি দিতেই মা গঙ্গা নিজে হাত বাড়িয়ে তা গ্রহন করেন। এতে বিস্মিত হয়ে ব্রাহ্মণ ভাবে গৌড়ি সাধারণ মেয়ে নয়। বাড়ি ফিরে তিনি গৌড়ির পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। তার স্ত্রী এর কারণ জিজ্ঞেস করার মুহুর্তেই গৌড়ি যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থাতেই নুড়ি ও পাতিল নিয়ে দূরে প্রস্থান করতে থাকে। ব্রাহ্মণ তাকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকলেও গৌড়ী সমান দূরত্ব রেখে চলতে এবং ব্রাহ্মণ লক্ষ্য করে বিলের পানি উপচিয়ে গৌড়ীর পিছনে ছুটছে। এভাবে গৌড়ীর পথে নদীর সৃষ্টি হয় এবং গৌড়ী হারিয়ে যায়। গৌড়ী যেখানে নুড়ি ফেলে সেখানে নুড়িদহ, যেখানে হাতের পাতিল ফেলে সেখানে পাতিলাদহ আবার ব্রাহ্মণ যেখানে তাকে পিছন থেকে ডাকেন সেখানে ডাকদহ এবং যেখানে চেঁচিয়ে ডাকেন সেখানে চেঁচানোরদহ বলা হয়। এটা নিছক লোকহাহিনী তবে কুষ্টিয়ার বর্তমান এসব দহগুলি স্মরণ করিয়ে দেয় গৌড়ী বা গড়াই নদী এসব স্থান দিয়ে একসময় প্রবাহিত হত। গড়াই একসময় অত্যন্ত বেগবান এবং অনেক প্রশস্ত নদী ছিল। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে নদীটির প্রবাহ বর্তমান পথে ছিল না। এ নদীটি তখন বর্তমান প্রবাহ থেকে ৪/৫ মাইল উত্তর দিয়ে প্রবাহিত হত।

Additional information