জেলা পরিচিতি - পৃষ্ঠা নং-১৩

নদীর পাড় আড়কান্দি থেকে বালিয়াকান্দির দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণনা থেকে----‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি ষ্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল।’ ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়করা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণিজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই, গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরী হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির অদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে।

রাজবাড়ি জেলার কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই হড়াই, চন্দনা, চত্রা, সিরাজপুরের হাওড় নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ির এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকলেপর সহায়ক বিষয়।

গ্রামের নামকরণ

ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই অভিমত মানুষ প্রথমে নগর জীবনে অভ্যস্থ হয় এবং পরে গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক নগর বলতে যা বোঝায় সে নগর তেমন ছিল না। প্রাকৃতির নানা বৈপরিত্যের কারণে মানুষেরা দল বেঁধে নানা প্রাকৃতিক সস্পদে সম্মৃদ্ধ নিরাপদ স্থানে বসবাস করত। আমরা নীল, রাইন, পীত, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, ভলগা, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন নগর সভ্যতার কথা জানি। পানির সহজ প্রাপ্যতা এবং উর্বর ভূমির কারণেই এ সকল অঞ্চলে নাগরিক জীবন শুরু হয়েছিল। মিশরীয় ও সুমেরীয় , মহেঞ্জোদারো, চীনের প্রাচীন নগর সভ্যতার বিকাশ তা প্রমাণ করে। নাগরিক জীবন বিকাশের ফলে ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে তারা নগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী বাস গড়ে তোলে। ফলে গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে। বঙ্গে এ বিষয়টি আলাদা বলে মনে করার অনেক কারণ আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতীয়মান হয় গঙ্গার ভাটি অঞ্চলের সমতটীয় বঙ্গের আদিভিত্তি গ্রাম। নগর জীবন গড়ে উঠেছে অনেক পরে। প্রাচীন বঙ্গ, উপবঙ্গ সাগর তথা নদনদীর উত্থিত দ্বীপ ও চর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। অসংখ্যা নদ নদীর প্রবাহ, বিল বাওড়, হাওড় জেলা এর প্রমাণ বহন করে। ইউয়ান চোয়াং ষষ্ট শতকে বঙ্গে ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে বঙ্গে গ্রাম জীবনের ভিত্তির সংবাদ জানা যায়। তখনকার গ্রাম বর্তমান গ্রামের মতো ছিল না। উত্থিত দ্বীপ বা চরে জীবন জীবিকার অন্বেষণে মানুষ একসাথে বসবাস করত যা বর্তমান গঞ্জের মতো ছিল। ক্রমে ক্রমে নদী সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমষ্টিরুপ ধারণ করে। একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ বা প্রান্তরে রুপান্তরিত হয়। সে সব স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে।

Additional information