জেলা পরিচিতি - পৃষ্ঠা নং-৬

আগে শীতের পাখি যেমন সারস, হরিয়াল, পানিভোলা, পাতিহাঁস, বেলেহাঁস বিল বাওড় পদ্মার কোলে দেখা যেত। এসব ভীনদেশী পাখি আর তেমন দেখা যায় না। মাছে ভাতে বাঙালি কথাটা বাংলার সর্বত্র ব্যবহৃত হলেও রাজবাড়ি জেলার জন্য মাছের আধিক্য ও ঐতিহ্য একটু বেশি ছিল, বর্তমানে তেমনটি নেই। রাজবাড়িতে এখন মাছের আকাল।

অভিবাসন

১৮২১ সালে প্রথম ফরিদপুর জেলায় আদমশুমারী হয়। এ সময় ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫,৫০৩৩৭। গোয়ালন্দ মহকুমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৯.৯%। ১৯২১ থেকে ১৯৩১ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গোয়ালন্দ মহকুমায় ৯.৯% থেকে ২.৯% তে হ্রাস পায়। নদ-নদী শুষ্কতা, ভুমির উর্বরতা হ্রাস, ম্যালেরিয়া, কলেরার মতো ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব উক্ত জনসংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারন ছিল। বালিয়াকান্দি থানায় ম্যালেরিয়া, কলেরার প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃত কম হারে হ্রাস পায়। এ ছাড়া কালুখালি, ভাটিয়াপাড়া রেল স্থাপনের কাচ প্রচুর শ্রমিকের আগমন ঘটায় বালিয়াকান্দি থানার লোকসংখ্যার হ্রাসের হার কম। ১৯২১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে পাবনা থেকে প্রচুর লোকের আগমন ঘটে। এরা শহর ও শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এসময় অত্র অঞ্চলে বিশেষ করে রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। ১৯৩০ সালে পাট ব্যবসার মন্দার কারণে গোয়ালন্দ ঘাট কুলির সংখ্যা হ্রাস পায়। গোয়ালন্দ মহকুমার দক্ষিণাঞ্চলের শুষ্কতা, ম্যালেরিয়া, কলেরার কারণে জনসংখ্যার এরুপ হ্রাস ঘটে। এ সময় বাণীবহ, বহরপুর, সোনাপুর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। ১৯৩১ সালে বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫% কিন্তু ১৯৪১ সালে হঠাৎ ২২.৪% দাঁড়ায়। এ সময় জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ফরিদপুর জেলার গেজেটিয়ার ১৯৭৭ এর ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এ সময় হিন্দু সম্প্রদায় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ও তা অনুসরণ করে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারীতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ৩.৩% দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪২ সালে বার্মার পতন, ১৯৪৩ সালে ইস্ফলের পতন, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, ম্যালেরিয়া, স্মলপক্স, কলেরা মহামারীর কারণে জীবনহানি জনসংখ্যার ব্যাপক হ্রাস ঘটায়। এ ছাড়া এসময়ে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কারণ এলাকার বেশির ভাগ হিন্দু পশ্চিম-বাংলায় গমন করে এবং ভারত থেকে অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক মুসলমানদের এখানে আগমন ঘটে। ১৯৪৭ এরপর রেলের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান ভারত থেকে আগমন করে। এদের মধ্যে যারা বাঙালি তারা মোহাজের এবং অবাঙালিরা বিহারী বলে পরিচিত হয়। মোহাজেরগণ ভারতের বিশেষ করে পশ্চিম-বাংলা ও ত্রিপুরা থেকে আগমন করে। যারা পশ্চিম-বাংলা থেকে আসে তারা ছোট খাট চাকরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। ত্রিপুরা এবং আসাম থেকে আসা (খুব সামান্য) মহাজের কৃষিকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। এ সমস্ত লোকেরা জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে রাজবাড়ি সদর থানা সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চল এবং বালিয়াকান্দি থানার উত্তর অঞ্চলে বহরপুর, সোনাপুর এলাকায় বসতি স্থাপন করে। সাধারণ্যে এরা ত্রিপুরে বলে পরিচিত। বিহারীরা অকৃষিজীবী হওয়ায় শহর এলাকায় কর্ম খুঁজে নেয়। এ সমস্ত বিহারী শহরভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল, বিস্কুট উৎপাদন, রেলের খালাশি, ড্রাইভার হিসেবে কাজে নিয়োজিত হয়। এ সমস্ত বিহারীরা শহরের উপকন্ঠে বিহারী কলোনী গড়ে তোলে। তারা নন বেঙ্গলী মাইনরিটি হিসেবে নিজেদের মধ্যে একতা গড়ে তোলে এবং শহরে প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করে। এ সকল বিহারী মু্ক্তিযুদ্ধকালে পাকসেনাদের পক্ষ অবলম্বন করে এবং রাজবাড়িতে ব্যাপক গণহত্যা চালায়।

ভূ-উত্থান

বর্তমান সীমানায় রাজবাড়ি জেলা তথ্য অত্র এলাকায় অতীত অস্তত্বের স্বরুপ নির্ণয় দুরুহ। জনবহুল, বর্ধিষ্ণু রাজবাড়ি জেলার ভূ-উত্থান অতীতের কোনো এক সময় ঘটেছিল। বাংলাদেশ গাঙ্গেয় বদ্বীপ তবে এ বদ্বীপ একদিনের ভূ-আলোড়নের ফল নয়। এটা ধীরে ধীরে সাগরবক্ষে নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত অসংখ্য দ্বীপসমূহের ভূমিতল।

Additional information