জেলা পরিচিতি - পৃষ্ঠা নং-৭

প্রায় দশলক্ষ বছর পূর্বে হিমালয়ের শেষ পর্বে উত্থান হয়েছিল বলে ভূতাত্ত্বিকগণ মনে করেন। মায়োসিন যুগে এই উত্থানের ফলে বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল উত্থিত হয়েছিল। হিমালয়ের দ্বিতীয় বার উত্থানের ফলে আসাম উপসাগরের তলানী তরঙ্গায়িত ভাজে পরিণত  হয়ে গঠিত হয় বর্তমান আসামের প্রাকৃতিক আকার। এরুপে মায়োসিন যুগের শেষে আসাম উপসাগরের পশ্চিমাংশে ময়মনসিংহ ও ঢাকার উত্তরাঞ্চল সৃষ্টি হয়।

এ সময় চট্রগ্রাম ও সিলেট জেলার কতকাংশ সমন্বয়ে হ্রদের আকার ধারন করে। ভারত মহাসাগর ও হ্রদের মাঝখানে বিরাজ করত এক বিরাট বাঁধ। প্লায়েসটোসিন যুগে এই হ্রদ ও এর মধ্যবর্তী অংশটি অপসারিত হয়ে যায়। সমুদ্র তখন গঙ্গা নদীর গতিপথ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। গঙ্গা নদী ভারতীয় উপদ্বীপ ও মধ্য ভারতের এক গভীর খাতের মধ্যো দিয়ে প্রবাহিত হত। গঙ্গানদী তখন সপ্ত ধারায় প্রবাহিত। সুচক্ষু সীতা ও সিন্ধু পশ্চিমগামী ধারা, নলিনী, হলদিনী, পাবনী ছিল পূর্বগামী ধারা। মধ্যভাগে ছিল ভাগীরথী বা গঙ্গার মূল ধারা। পূর্বগামী এ সব ধারা পূর্বগামী স্রোতের সঙ্গমস্থল সুগন্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। পূর্বগামী শাখাসহ আসাম উপসাগর থেকে ভেসে আসা নদ-নদীর পলি দ্বারা গঠিত হয় অসংখ্য দ্বীপ। সাগর তখন এ অঞ্চলের কাছাকাছি। ধীরে ধীরে ভূ-উত্থানের ফলে সাগর দক্ষিণে সরে গেছে। ফরিদপুরের পূর্বে ঢোলে সাগর আজও সে চিহ্ন বহন করছে। যে সব দ্বীপ নিয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপের সৃষ্টি হয় তাহল নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, চক্রদ্বীপ, অন্ত্রদ্বীপ, প্রবালদ্বীপ, এড়োদ্বীপ, জয়দ্বীপ, সূর্যদ্বীপ, রুদ্রদ্বীপ, চন্দ্রদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপ, বউসদ্বীপ স্ত্রীকরদ্বীপ। এসব দ্বীপের বর্তমান অবস্থান ----নবদ্বীপ-মধ্য সীমান্ত, রুদ্র যাহা মধ্যশান্তিপুর (পশ্চিমবঙ্গ), চক্রদ্বীপ-চাকদাহ, বউস-সাতক্ষীরা খুলনার উত্তরাংশ, কুশদ্বীপ-কুশাদা ফরিদপুর, অন্ত্রদ্বীপ-ঝিকরগাছা, বেনাপোল, সূর্যদ্বীপ-যশোর জেলার পশ্চিমাংশ, জয়দ্বীপ-খুলনার পূর্বভাগ, চন্দ্রদ্বীপ-বাকলা (বরিশাল), স্ত্রীকরদ্বীপ-পটুয়াখালি।

রাজবাড়ি এভাবেই প্রাচীন দ্বীপের উত্থিত অঞ্চল। এরমধ্যে কুশিদ্বীপ নিয়ে গঠিত হয় কুশাদা ফরিদপুর, সূর্যদ্বীপ নিয়ে গঠিত হয় যশোর। এসব দ্বীপের উত্থিত ভুমি রাজবাড়ির মধ্যভাগ। তবে এর বেশির ভাগ অঞ্চল পদ্মা, হড়াই, গড়াই, চন্দনার নব উত্থিত চর। এসব নব্য চরদ্বীপের উত্থান এক থেকে দেড় হাজার বৎসরের মধ্যে। এল,এন মিশ্র রচিত বাংলার রেলভ্রমন পুস্তকে পাবনা সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন। পাবনা নামটি গঙ্গার স্রোতধারা ‘পাবনী’ থেকে এসেছে। ড. নীহাররঞ্জন, রাখালদাস বন্দ্যেপাধ্যায়, কপিল ভট্রাচার্য প্রভূতি প্রথিতযশা ঐতিহাসিকগণ এবং ফ্যানডেক ব্রক, রেনেলের নকশা অনুসরণে দেখা যায় নদ-নদীর প্রবাহ অনেক কাল পরে। শুধু গঙ্গার প্রাচীনত্ব খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম দ্বিতীয় শতকের খবরে পাওয়া যায়। টলেমীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দে গঙ্গা নদী ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হত। গঙ্গা ও তার শাখা প্রশাখা এ অঞ্চলে যে চর দ্বীপের সৃষ্টি করে তা থেকেই এ অঞ্চলের ভূ-উত্থান। রাঢ়, পুন্ড্র ও প্রাচীন বঙ্গের উত্থান আর্যপূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ) সংগঠিত হয়ে থাকবে আবার অনেকের ধারনা প্রায় ১০/১২ হাজার বৎসর পূর্বে প্রাচীন বঙ্গের উত্থান। ত্রায়োদশ চতুর্দশ শতাব্দী থেকে গঙ্গার ধারা পদ্মা ও তার শাখা কুমার, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী ও উত্তর হতে প্রবাহিত করতোয়ার প্রত্যক্ষ পলিতে সৃষ্টি উর্বর পললভূমি অত্র অঞ্চল। পানির ভূ-গর্ভ স্তরের উপর ভিত্তি করে টিউবওয়েলের নলপোতার অভিজ্ঞতায় যে বিভিন্নতা দেখা যায় তা থেকে রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশের ভূ-উত্থান ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে গাঙ্গেয় বদ্বীপের উত্তর অঞ্চল থেকে দক্ষিণ অঞ্চল পরে উত্থিত হয়েছে। সে হিসেবে উত্তরে প্রাচীন পুন্ড্র, বরেন্দ্র থেকে দক্ষিণের বঙ্গ পরে উত্থিত।

Additional information