জেলা পরিচিতি - পৃষ্ঠা নং-৯

২য় শতকে টলেমীর নকশা, সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং এর বর্ণনা, ষোড়শ শতকে ডি ব্যরসের নকশা, বিখ্যাত সেচ ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম উইলকক্স, নীহাররঞ্জন ও কপিল ভট্রাচার্যের নদীর গতিপথ বর্ণনাসহ আনুষঙ্গিক উপাদানের সাহায্যে পদ্মার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা যাবে, যা থেকে অতীত ও বর্তমান পদ্মা সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। রাজমহলের সোজা উত্তর-পশ্চিমে তেলিয়াগড় ও সিক্রিগলির গিরিবর্তা গঙ্গার বাংলায় প্রবেশ পথ। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার ধারা ভাগীরথী ও পদ্মা এই দুই ধারায় প্রবাহিত। ড. নীহাররঞ্জন ভাগীরথীকে মূলধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন ষোড়শ শতক থেকে পদ্মার পূর্বযাত্রা বা সূত্রপাত। রেনেল ও ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় দেখা যায় ষোড়শ শতকে পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিশ (১৬৬৬), মির্যা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমে ইছামতির উল্লেখ করেছে। ইছামতির তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর পশ্চিমে ডাকচড়া (মানিকগঞ্জ) এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলন প্রবাহের সমুদ্র যাত্রা। ড. নীহাররঞ্জন বলেন, ‘তখন গঙ্গার এ প্রবাহে পদ্মার নামকরণ দেখছি না। ‘আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন (১৫৯৬-৯৭), ‘কাজীর হাটের কাছে পদ্মা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটি শাখা পূর্বগামিনী পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্রগ্রামের নিকট সমুদ্রে মিশেছে।’ মির্যা নাথানের বর্ণনায় করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে পড়েছে।

এই বড় নদীটির নাম পদ্মাবতী। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মাণিক্য ১৫৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরা হতে ঢাকায় এসে ইছামতি বেয়ে যাত্রাপুর এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। এ হিসেবে তখনকার পদ্মা বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫/২০ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হত এবং তা রেনেলের নকশা এবং টেলরের বর্ণনার সাথে মিলে যায়। ষোড়শ শতকে পদ্মা ও ইছামতি প্রসিদ্ধ নদী। ষোড়শ শতকের ব্যারস এবং সপ্তদশ শতকের ব্রকের নকশায়ও তা পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথে চট্রগ্রাম নেমেছিলেন। তিনি চট্রগ্রামের হিন্দু তীর্থস্থান গঙ্গা নদী ও যমুনা নদীর সঙ্গমস্থল বলেছেন। তাতে বোঝা যায় চতুর্দশ শতকে গঙ্গার মধ্যবর্তী প্রবাহ পদ্মা চট্রগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তটভূমি প্রসারের সাথে সাথে চট্রগ্রাম এখন অনেক পূর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছে। ঢাকাও এখন পদ্মার উপর অবস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে। ঢাকা একন পুরাতন গঙ্গা পদ্মার খাত বুড়িগঙ্গার উপর অবস্থিত আর পদ্মা ব্রহ্মপুত্রের (যমুনা) সঙ্গম গোয়ালন্দের অদূরে। পদ্মা তার খাত বারবার পরিবর্তন করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণাদি এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দশম শতকের শেষে এবং একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্রবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকটা জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্রলীদ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলের জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেছিলেন। পট্রলীও সমসাময়িক সাহিত্য গ্রন্থেও পদ্মা নদীর উল্লেখ আছে। ‘বাজলার পাঁড়ী, পঁ-উ-আ খালে বাঁহিউ’ অর্থাৎ পদ্মাখালে বজরা নৌকা পাড়ি দিতেছে। এতে অনুমান করা যাচ্ছে নবম দশম শতকেও পদ্মার অস্তিত্ব ছিল তবে তা ছিল ক্ষীণতোয়া অপ্রশস্ত খাল বিশেষ। ব্রহ্মপুত্র বর্তমান যমুনার খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করার আগে পদ্মা ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা অকস্মাৎ তার পূর্ব যাত্রা পরিত্যাগ করে এবং তার বিপুল বন্যার বারিরাশি ব্রহ্মপুত্রের বন্যার পানির সঙ্গে মিশে যমুনার খাতে বইতে শুরু করে দেয় গোয়ালন্দের পাড়ে। প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের মন্দির প্রাসাদ ধবংস করে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম ধারণ করে।

Additional information