জেলা পরিচিতি

প্রথম অধ্যায়

বাংলাদেশের বৃহৎ নদী পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ। বৃটিশ শাসনামলে ‘গেটওয়ে অব বেঙ্গল’ বা বাংলার দ্বারপথ বলে পরিচিত গোয়ালন্দ মহকুমা। ১৯৮৪ সালে ১লা মার্চ রাজবাড়ি জেলা ঘোষনা করা হয়। ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে ঢাকা-জালালপুর ভেঙ্গে ফরিদপুর জেলা গঠন হলে বর্তমান রাজবাড়ি জেলার চন্দনা নদীর পূর্ব ও দক্ষিণাংশ ফরিদপুর জেলার সাথে সংযুক্ত থাকে। বাকি অংশ যশোর কালেক্টরেট ও নদীয়ার সাথে সংযু্ক্ত হয়। ১৮৭১ সালে চন্দনা নদীর দক্ষিণ পূর্বাংশ এবং দক্ষিণ পশ্চিমাংশ বর্তমান রাজবাড়ি জেলার মোট অংশ নিয়ে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠন করা হয়। রাজবাড়ি জেলার আয়তন ১১১৮.৮ বর্গ কিলোমিটার বা ৪৩১.১৭ বর্গ মাইল। লোকসংখ্যা ৮৩৫১৭৩, উপজেলা-৫, ইউনিয়ন-৪২, মৌজা-৮২০, গ্রাম-১০৫৬, মহল্লা-১০৭, পৌরসভা-৩ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৮%। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১১ লাক। জেলাটি বাংলাদেশের মোট আয়তনের ০.৭৬ অংশ

 

অধিকার করে আছে। ঢাকা বিভাগে অবস্থিত জেলাটি আয়তনের দিক থেকে বিভাগের জেলাসমূহের ১৫ তম এবং দেশের সকল জেলার মধ্যে ৫৬ তম। ২২৪০ এবং ২৩৫০ উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৯১৯ এবং ৯০৪০ দ্রাঘিমাংশে জেলাটি অবস্থিত। উত্তরে বহমান প্রমত্তা পদ্মা। পদ্মার ওপাড়ে পাবনা ও মানিকগঞ্জ জেলা। দক্ষিণে গড়াই নদী। গড়াই পাড়ে মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলা। পশ্চিমে কুষ্টিয়া ও পূর্বে ফরিদপুর জেলা। জাতীয় মাছ রুপালি ইলিশ, চমচম ও নানা জাতের মিষ্টান্ন সারাদেশে বিখ্যাত। পাল, সেন, সুলতান, পাঠান, মোগল, ইংরেজ শাসন স্মৃতি ও ঐতিহ্যের ভূমি রাজবাড়ি। রাজা সীতারাম, মোরাদ খাঁ, মুকুন্দ রাম, সংগ্রাম সাহ, প্রতাপাদিত্য, রাজা রামজীবন, রানীভবাণী, রাজা সূর্যকুমার, নবাব মীর মোহাম্মদ আলী, আলীমুজ্জামান চৌধুরী, সিআইই, গিরীজাশংকর মজুমদার প্রমুখ ভূপতিদের শাসন ও স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে আছে জেলাটি। উত্তাল পদ্মার ঢেউয়ের মতো উথাল পাথাল এদের জীবন। ফলে শোষণ বঞ্চনায় মুক্তিকামী মানুষের রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। নীলবিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফকীর সন্ন্যাস আন্দোলন, অনুশীলন, যুগান্তর, স্বদেশী, স্বরাজ, খেলাফত-অসহযোগ, ফরায়েজী, প্রজামুক্তি, আজাদ হিন্দ, কমিউনিষ্ট, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ভাষা-আন্দোলন, রেলশ্রমিক আন্দোলন, ৬দফা আন্দোলন, ‘৬৯ সালে গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা দেখা যায় এ জেলার মানুষের। পদ্মা আর গড়াইয়ের তল সমতলে শ্রীখন্ডরুপ উর্বর ভূমিতল সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের পীঠস্থান এই সমতল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিচরণভূমি। বাংলা সাহিত্যে প্রথম আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবী ভররামদিয়ার মানুষ। বাংলা সাহিত্যের অমর ট্রাজেডি ‘বিষাদ-সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন পদমাদিতে। কল্লোল যুগের শক্তিশালী লেখক জগদীশ গুপ্তের জন্মস্থান মেঘচামী। শ্বশুরালয় রাজবাড়ি। জাতীয় জীবনে নব জাগরণের শিক্ষাগুরু, গণিতজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক, উপমাহদেশের একসময়ের শ্রেষ্ঠ দাবারু, কাজী নজরুল ইসলামের অকৃত্রিম বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের পৈতিক বাড়ি পাংশার বাগমারা গ্রামে। সাহিত্যসেবী ও নজরুল সাহায্য সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা কাজী আব্দুল ওদুদ এবং সব্যসাচী লেখক এয়াকুব আলী চৌধুরী রাজবাড়ির সন্তান। বিশ্ববিখ্যাত এবং উপমহাদেশের একমাত্র ট্রাপিষ্ট্রী শিল্পী রশিদ চৌধুরী এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন। পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী আবুল কাশেম পারকুলার আলো বাতাসে বেড়ে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী মনসুর-উল-করিম, অস্কার বিজয়ী নাফিজ বিন জাফর রাজবাড়ির মানুষ। উপমহাদেশখ্যাত জলতরঙ্গ বাদক বামনদাস গুহরায় রাজবাড়িতে জন্ম নিয়ে কালযাপন করেন। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাসের ভূমিপট গোয়ালন্দ। অলিম্পিক কন্যা ডলি আক্তার (সাতারু), পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন (দৌড়) শহীদুন্নবী আলম রাজবাড়ির গৌরব।


বৃটিশ ভারতের বহুল পরিচিত রাজনীতিবিদ, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পীকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট তমিজউদ্দিন খান, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, বহুল আলোচিত সিরাজ শিকদারের জন্ম রাজবাড়িতে। সুলতান ও মোগল শাসনকাল থেকে এখানে আগমন ঘটেছে পীর, আউলিয়অ ও দরবেশগণের। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসে আর ফিরে যাননি আপন দেশে। সাহ পাহালোয়ানের মাজার, শাহ জুঁইয়ের মাজার, পীরজঙ্গী মাজার, রুপসা ও সিঙ্গার গায়েবী মসজিদ সে স্মৃতি বহন করছে। সনাতন ধর্ম প্রচার প্রসার সংরক্ষণে-তৈলাঙ্গ স্বামী, স্বামী সমাধি প্রকাশারণ্য(সমাধিনগর), নলীয়া জোড়বাংলা মন্দির, বেলগাছিতে সানমঞ্চ-দোলমঞ্চ, খানখানাপুর অন্নপুণ্যার মন্দির, রাজবাড়ি হরিসভা স্মৃতি বহনকারী প্রতিষ্ঠান। নানা প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের উপাদান নিয়ে এই রাজবাড়ি জেলা।

উত্তরে পদ্মা, দক্ষিণে গড়াই

মাঝে বহে ক্ষীণস্রোতা

চন্দনা আর হড়াই

বহমান স্মৃতি বুকে এই রাজবাড়ি

সুধাময় মধুমাখা আমাদের বাড়ি

উপজেলা পরিচিতি

রাজবাড়ি সদর

রাজবাড়ি জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম সদর উপজেলা রাজবাড়ি। ১৮৮৮ সালে রাজবাড়ি থানা প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ১৯৮২ সালে উপজেলা নামকরণ হয়। উপজেলার আয়তন ৩১৩ বর্গ কিলোমিটার। রাজবাড়ি পৌরসভাসহ রয়েছে ১৪টি ইউনিয়ন। মৌজা সংখ্যা-২০৩, মহল্লা-৩১, গ্রাম-২১২। ২৩৩৫’ - ২৩৩৯’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯৩৫’ - ৮৯৪৫’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে এর অবস্থান। উত্তরে পদ্মা এবং পাবনা জেলার বেড়া ও সুজানগর উপজেলা, পূর্বে গোয়ালন্দ উপজেলা, দক্ষিণে ফরিদপুর সদর এবং মধুখালী, পশ্চিমে পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলা। মোট জনসংখ্যা ২৯৫৩৭০(২০০১ সেনসাস)। পুরুষ -১৫০৫৬৭, মহিলা-১৪৪৮০৩

পাংশা

রাজবাড়ি জেলার বৃহত্তম উপজেলা পাংশা। আয়তন ২৫৬.৯৫ বর্গ কিলোমিটার। হান্টারের বর্ণনামতে ১৮৬৩ সালে পাংশা থানা গঠিত হয়। ২২-২২ ৫৫’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯১৯’ - ৮৯৩৬’ পূর্ব-দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। উত্তরে পাবনার সুজানগর এবং পাবনা সদর। পূর্বে রাজবাড়ি সদর এবং বালিয়াকান্দি। দক্ষিণে বালিয়াকান্দি ও মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা। পশ্চিমে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা ও কুমারখালি এবং ঝিনাইদহ ও শৈলকুপা উপজেলা। পাংশার পশ্চিম-সীমান্ত গফুগ্রাম থেকে অদূরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি শিলাইদহ। পাংশার নামকরণ বিষয়ে যতটা জানা যায় তাতে পাঁচজন আউলিয়া এ অঞ্চলে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন। তারা সাহ নামে পরিচিত হতেন। পাঁচ সা থেকে পাংশা নামের উৎপত্তি। পৌরসভাসহ ইউনিয়ন সংখ্যা-১০


বালিয়াকান্দি

১৮৮১ সালে বালিয়াকান্দি থানা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। উপজেলার আয়তন ২৪২.৫৩ বর্গ কিলোমিটার। ইউনিয়ন সংখ্যা-৭, মৌজা-১৪৮, গ্রাম ২৫৮। ২৩৩৩’ - ২৩৪৪’  উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০২৬’ - ৯০৪০’ পূর্ব - দ্রাঘিমাংশে উপজেলাটি অবস্থিত। উত্তর পাংশা উপজেলা, পূর্বে রাজবাড়ি সদর, দক্ষিণে মধুখালি এবং পশ্চিমে মাগুরা শ্রীপুর উপজেলা। চন্দনা নদীর বালিয়ারীতে গড়ে ওঠা বালিয়াকান্দির নামকরণে বালিয়ারীর বালি আর চন্দনার কান্দা (নদীর তীর) দিয়ে বালিয়াকান্দি বা বালিয়াকান্দি নামকরণ। মোট জনসংখ্যা ১৮৬৫৬২। পুরুষ ৯৬১২১, মহিলা-৯০৪৪১। (২০০১ এর সেনসাস)।

কালুখালি

বর্তমান কালুখালি থেকে কয়েক কি.মি. উত্তরে পদ্মার তীর ঘেঁষে বহরকালুখালি। ১৮৭১ সালে বহরকালুখালি হয়ে রেলপথ স্থাপিত হয়। পদ্মা তখন ছিল আরো উত্তরে। ১৯৩২ সালে কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেল স্থাপনকালে বর্তমান কালুখালিতে জংশন ষ্টেশন স্থাপিত হয়। চন্দনা নদীর তীরে বাণিজ্যিক স্থান এবং রেল যোগাযোগ ও জংশন হিসেবে কালুখালির গুরুত্ব বেড়ে যায়। পাশে রতনদিয়া প্রাচীন প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। নানা কারণে কালুখালি দেশ দেশান্তরে পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রায় এক দশক ধরে কালুখালিবাসী ও অত্র এলাকার কয়েক ইউনিয়নের মানুষ পৃথক একটি উপজেলা দাবি করে আসছিল। বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিবেচনাধীন কালুখালি উপজেলা সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে ২০১০ সালে কাজ শুরু করে। ইউনিয়নসমূহ হল-রতনদিয়া, বোয়ালিয়া, কালিকাপুর, মাজবাড়ি, মদাপুর, মৃগী ও সাওরাইল। এ সাতটি ইউনিয়ন পাংশা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। মোট আয়তন ১৫৭.২৯ বর্গ কিলোমিটার।

গোয়ালন্দ

গোয়ালন্দ ক্ষুদ্রতম উপজেলা। গোয়ালন্দের উত্থান, নামকরণ, থানা যথাস্থানে আলোচনা করা হয়েছে। তবে নানা পরিবর্তনের ধারায় ১৯২৪ সালে স্থায়ীভাবে গোয়ালন্দ থানা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর আয়তন ১৪৯০৩ বর্গ কিলোমিটার। ২৩৪১’ - ২৩৫০’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯৪১’ - ৮৯৫১’ পূর্ব-দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। উত্তরে পদ্মার ওপারে মানিকগঞ্জের সিবালয়, পাবনার বেড়া উপজেলা। পূর্বে শিবালয়, দক্ষিণে ফরিদপুর সদর উপজেলা এবং পশ্চিমে রাজবাড়ি সদর উপজেলা। গোয়ালন্দ পৌরসভা এবং ইউনিয়ন সংখ্যা ৪, ওয়ার্ড-৯, মৌজা-৬৫ মহল্লা-৪১ এবং গ্রাম-১৬৯। মোট জনসংখ্যা ১১৭৩১৩। পুরুষ-৬০৪৪৭, মহিলা- ৫৬৮১৬(২০০১এর সেনসাস)।

প্রাকৃতিক পরিবেশ

পদ্মা, হড়াই, গড়াই, চন্দনা, কুমার আর চিত্রা পলিবাহিত রাজবাড়ি জেলা উর্বর পলল মাটির সমতল ভূমি। এই জেলার অধিকাংশ মাটি দো-আঁশ ও বেলে প্রকৃতির। বিল অঞ্চলে এঁটেল মাটি। এখানে শীত ও গরম উভয়ই ঢাকার তুলনায় সামান্য বেশি। শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই জেলার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৩৮৬.২৫ মি.মি.। বাতাসের আর্দ্রতা গড়ে শতকরা ৭৫ ভাগ। জেলার উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল অপেক্ষাকৃত উঁচু। চন্দনা নদী জেলাকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করেছে। পাট, ধান, আখ, পিঁয়াজ, পিঁয়াজবীজ, রসুন, শাকসবজি, সরিষা, তিল, এ অঞ্চলের প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য।


পাট ও আখ উৎপাদনে এ অঞ্চল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক সময় গোয়ালন্দের তরমুজ বিখ্যাত ছিল। রাজবাড়ি জেলার উর্বর মাটি বর্তমানে মেহগনি, শিশু, কড়াই, জাম, আম, কাঁঠাল গাছ উৎপাদনে উপযোগী বিধায় এলাকার মানুষ বিপুল উদ্যোগে বৃক্ষরোপন ও ব্যক্তিগত বনায়ন সৃষ্টি করে জেলাটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। এক সময় জেলার বহরপুর, সোনাপুর, বাগদুল অঞ্চলে বন্য শূকুর ও বাঘের বসবাস ছিল। তেঢালা, গজারিয়া, পাকুরিয়া, কাছমিয়া এ জেলার বিখ্যাত বিল। গড়াই আর পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চল নিয়ে রাজবাড়ি জেলা। মাঝে এককালের খরস্রোতা নদী হড়াই ও চন্দনা মৃত প্রায়। অন্যান্য ছোট নদীর মধ্যে রয়েছে চিত্রা, কাজলী, সুতা নদী, ফুরসুলা নদী। সিরাজপুরের হাওড় জেলার অন্যতম হাওড় বলে পরিচিত এবং কল্যাণদিঘি বিখ্যাত। এ সমস্ত নদ-নদী উত্থিত দ্বীপ আর নব্য চর নিয়েই বর্তমান রাজবাড়ি। নদীবেষ্টিত হওয়ায় এলাকায় বন্যা, প্লাবন প্রায়শই দেখা দিত। ১৭৮৭, ১৮৪২,১৮৩৮, ১৮৭০-৭১, ১৯০৭, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬৮, ১৯৭১, ১৯৭৩, ১৯৮৭, ১৯৮৮ সালে জেলাটি ভয়াবহ বন্যা কবলিত হয়। এরমধ্যে ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যায় জেলার অধিকাংশ বাড়িঘর পানির নিচে ডুবে যায়। এ সময় রাজবাড়ি শহরের ৯৯% ঘরের মধ্যে বন্যার পানি প্রবেশ করে। লেখকের বেডরুমে বন্যার পানির উচ্চতা ছিল ৩ ফুট। ইটের এর উপর ইট দিয়ে খাট উঁচু করে বাস করতে হত। ১৯৮৭ সালের বন্যা থেকে ১৯৮৮ সালের বন্যার পানির উচ্চতা বেশি ছিল। ১৯৮৯-৯০ সালে গোয়ালন্দ থেকে পাংশা পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেওয়ার পর থেকে এলাকায় আর বন্যা হয় নাই। তবে চরাঞ্চল প্রায়শঃই বন্যাকবলিত হয়। জেলাটিতে পূর্বে প্রায়শই কালবৈশাখী ছোবল হানত। আবহাওয়ার পরিবর্তনে এখন আর তেমন কালবৈশাখী ঝড় হয় না। ১৯৬১ সালে গোয়ালন্দ থেকে ২ মাইল দূরে উজানচর গ্রামে ভয়াবহ টর্ণেডো আঘাত হানে। এর ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৩মাইল। এ টর্ণেডোতে ২ জন মারা যায় এবং ১৪৩ জন আহত হয়। ৩৮০টি কাঁচাঘর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৭৫ সালের ৮ মে রাজবাড়ি শহরের ওপর দিয়ে সকাল ৮ ঘটিকায় প্রবল সাইক্লোন আঘাত হানে। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৮৫ সালে দুপুরে একটি টর্ণেডো রাজবাড়ি ষ্টেশন রোড ধরে চরাঞ্চলে আঘাত হানে।

উদ্ভিদ ও জীবকুল

মানব জাতির বিকাশ ঘটেছে উদ্ভিদ ও জীবকে আশ্রয় করে। বৃক্ষ বা জীবকুল ব্যতীত কোনো মরু বা দ্বীপে মানবসভ্যতার অগ্রগামীতার কোনো ইতিহাস নেই। বাংলাদেশ সাগর উপকুলে নদীমাতৃক পলল মাটির উর্বর ভুমিতে অতি সহজেই শস্য দানা, লতা, বৃক্ষ শস্য সবল সতেজ হয়ে ওঠে। নানা প্রজাতির প্রাণীর আধার এই লতা, বৃক্ষ আচ্ছাদিত ফসলের মাঠ, সাগর ও নদ নদী। রাজবাড়ি জেলা পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনার পলি বাহিত উর্বর ভূমিতে নানা জাতের বৃক্ষ, ফসল জন্মে। খাল-বিল নদী নালায় আছে নানা প্রাণী।

ফলজ বৃক্ষ

এমন কিছু বৃক্ষ আছে যা থেকে সু-স্বাদু ও পুষ্টিকর ফল পাওয়া যায় আবার সে সব বৃক্ষের কাঠ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। এরমধ্যে আছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল, তাল, তেঁতুল, বড়ই, খেজুর, কামরাঙ্গা, পান, শুপারী, কদবেল ইত্যাদি জন্মে। পেয়ারা, পেঁপে ব্যবসায়িকভিত্তিতে চাষ করা হয়।

বনজ বৃক্ষ

রাজবাড়ি অঞ্চলে একসময় ঘরবাড়ি আসবাবপত্র তৈরিতে শাল, সুন্দরী, সেগুন, খড়, বাঁশ, বেত ব্যবহৃত হত। শাল, সেগুন, সুন্দরী কাঠ আসত সুন্দরবন থেকে আর খয়ের, পুঁয়ো, নিম, গাব, কদম, জারুল, শিশু, কড়াই, গজারি, কদম, শিমুল, স্থানীয়ভাবে জন্মাত। এখনো সোনাপুর অঞ্চলে খয়ের গাছ দেখা যায় এবং খয়ের তৈরি খারখানা রয়েছে। স্থান বিশেষে বট ও পাকুড় গাছ দেখা যায়। তখন মেহগনি কাঠের ব্যবহার ছিল না। বর্তমানে মেহগনি কাঠের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।


এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেহগনি কাঠের বাগান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কাঠও উন্নত এবং পাতা, ফল, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকে শিশু কাঠের বাগান করলেও আগামরা রোগে শিশু বাগান মরে গেছে। স্থানীয়ভাবে অনেক নার্সারী গড়ে উঠেছে।

ফসল, তরকারি, মশলা

জেলার প্রধান উৎপাদিত ফসল ধান, পাট, গম, যব, আখ, তিল, তিসি, মশুর, কলাই, ছোলা, মুগ, মটর, রাই, চিনা বাদাম, সজিনা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনে, হলুদ, আদা, মরিচ। এক সময় কার্পাস ও জাফরানের চাষ হত। এখন রেশমের চাষ হয়। স্থান বিশেষে ভুট্রা ও সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। তরকারির মধ্যে আলু, পটল, শিম, বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি, লাউ, ঢেড়স, ঝিঙ্গা, উস্তে, লালশাক, ডাঁটা, পালং শাক, পুঁইশাক, জন্মে। এক সময় গোয়ালন্দের তরমুজ বিখ্যাত ছিল। একমণ/ দেড়মণি তরমুজ কলিকাতা, দিল্লি রপ্তানি হত।

ঔষধি উদ্ভিদ

নিম, আমলকি, হরতকী, বহেড়া, অর্জুন, বাবলা, শিউলী, বকুল, করমচা, বেলীফুল, অশোক, বাসক, তুলসী, বিলাই আঁচড়া, কালোমেঘ, ঘৃতকুমারী, মহাভৃঙ্গরাজ, কেশুরাজ, চন্দন, তেলাকুচু, লজ্জাবতী, বানরলাঠি বা মোন্দাল, গন্ধবাধাল, জার্মানীলতা, অনন্তমূল, ভুঁইকুমড়া, নিশিন্দা, জগডুমুর, ছাতিম, ধুতরা, চিরতা, শতমূল, আকন্দ, শিমুল, আঁষ্টেল, কাঁটানটে, মানকচু, আদা, মেহেদি, দূর্বাঘাস, ইত্যাদি জন্মে।

ফুল

রাজবাড়ি জেলায় বিল বাঁওরে একসময় প্রচুর পদ্ম ও শাপলা ফুল দেখা যেত। এসব ফুল কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ফুলের মধ্যে গাঁদা, যুঁই, বকুল, বেলি, মালতি, গোলাপ, চাঁপা, গন্ধরাজ, দোপাটি, কামিনী, রজনীগন্ধা, জবা, আকন্দ, শিমুল, পলাশ, সূর্যমুখী, বনফুল, কচুরী ফুল, হিজল, লজ্জাবতী, কদম ইত্যাদি।

জীবজন্ত

রাজবাড়ি জেলা চন্দনা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল একসময় ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল। এসব জঙ্গলে বাঘ, ভালুক, শুয়োর ইত্যাদি হিংস্রপ্রাণী বসবাস করত। এছাড়া হরিণ, বনবিড়াল, বাগডাশা, শেয়াল, বনমোরগের বাস ছিল। মীর মশাররফ হোসেনের জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায় তিনি নিজ পিতৃভূমি পদমদি থেকে কুষ্টিয়া সাঁওতায় নৌকা বাহনে চন্দনা নদী দিয়ে যাতায়াত করতেন। যাতায়াতের সময় চন্দনা নদীর পাড়ে কয়েকবার বাঘের দেখা পান এবং বাঘের গর্জন শুনতে পেতেন---‘এই বাঁকের আগে নারায়নপুর গ্রাম। তাহার আশপাশ পাংশা, মাধবপুর, মালঞ্চি প্রভৃতি গ্রামে বাঘের উপদ্রব কিছু বেশি হইয়াছিল। হঠাৎ ডাঙ্গার দিকে নজর পড়তেই দেখি প্রবীন এক বাঘ জানু পাতিয়া বসিয়া এক দৃষ্টে খরার প্রতি চাহিয়া রহিয়াছে। আমাদের এ অঞ্চলে বাঘ মারতে বাঁশপাতা ফাঁদ, খোঁয়ার, তীর ব্যবহার হয় (মশাররফ রচনা সম্ভার পৃষ্ঠা-৮৬,৮৭,৮৮,)। তাঁর পিতামহ মীর ইব্রাহীম বরাহ শিকার করে বেড়াতেন সেকথাও লিখেছেন। পঞ্চাশ বছর পূর্বেও জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্য শুকরের উপদ্রব ছিল। রাজবাড়ি শহরে সুইপার পাড়ায় অনেকেই শুকর পোষে। এলাকায় বিষধর সাপ গোখরার উপদ্রব আছে। অন্যন্য প্রজাতির সাপও দেখা যায়। শেয়ালের ডাক আগের মতো শোনা না গেলেও শেয়ালের বসবাস আছে। গুরু ছাগল ভেড়া, ঘোড়া, গৃহপালিত পশু রয়েছে। একসময় গুরু দিয়ে লাঙ্গল টেনে জমি চাষ করা হত। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়ছে। পদ্মা ও গড়াই নদীতে কুমীরের উপদ্রব ছিল। পাখিদের মধ্যে বক, কাক, কোকিল, বাবুই, চিল, বাজ, দাঁড়কাক, পেঁচা, হুতুম কাঠঠোকরা, কাকুন, ফিঙ্গে, দোয়েল, ময়না, টিয়া, ঘুঘু, শালিক, মাছরাঙা, বুলবুলি, তিতির, খঞ্জনা, পানকৌড়ি, ডাহুক, চাতক।


আগে শীতের পাখি যেমন সারস, হরিয়াল, পানিভোলা, পাতিহাঁস, বেলেহাঁস বিল বাওড় পদ্মার কোলে দেখা যেত। এসব ভীনদেশী পাখি আর তেমন দেখা যায় না। মাছে ভাতে বাঙালি কথাটা বাংলার সর্বত্র ব্যবহৃত হলেও রাজবাড়ি জেলার জন্য মাছের আধিক্য ও ঐতিহ্য একটু বেশি ছিল, বর্তমানে তেমনটি নেই। রাজবাড়িতে এখন মাছের আকাল।

অভিবাসন

১৮২১ সালে প্রথম ফরিদপুর জেলায় আদমশুমারী হয়। এ সময় ফরিদপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫,৫০৩৩৭। গোয়ালন্দ মহকুমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৯.৯%। ১৯২১ থেকে ১৯৩১ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গোয়ালন্দ মহকুমায় ৯.৯% থেকে ২.৯% তে হ্রাস পায়। নদ-নদী শুষ্কতা, ভুমির উর্বরতা হ্রাস, ম্যালেরিয়া, কলেরার মতো ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব উক্ত জনসংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারন ছিল। বালিয়াকান্দি থানায় ম্যালেরিয়া, কলেরার প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃত কম হারে হ্রাস পায়। এ ছাড়া কালুখালি, ভাটিয়াপাড়া রেল স্থাপনের কাচ প্রচুর শ্রমিকের আগমন ঘটায় বালিয়াকান্দি থানার লোকসংখ্যার হ্রাসের হার কম। ১৯২১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে পাবনা থেকে প্রচুর লোকের আগমন ঘটে। এরা শহর ও শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এসময় অত্র অঞ্চলে বিশেষ করে রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। ১৯৩০ সালে পাট ব্যবসার মন্দার কারণে গোয়ালন্দ ঘাট কুলির সংখ্যা হ্রাস পায়। গোয়ালন্দ মহকুমার দক্ষিণাঞ্চলের শুষ্কতা, ম্যালেরিয়া, কলেরার কারণে জনসংখ্যার এরুপ হ্রাস ঘটে। এ সময় বাণীবহ, বহরপুর, সোনাপুর বিরানভূমিতে পরিণত হয়। ১৯৩১ সালে বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫% কিন্তু ১৯৪১ সালে হঠাৎ ২২.৪% দাঁড়ায়। এ সময় জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ফরিদপুর জেলার গেজেটিয়ার ১৯৭৭ এর ৫৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, এ সময় হিন্দু সম্প্রদায় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ও তা অনুসরণ করে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারীতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ৩.৩% দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪২ সালে বার্মার পতন, ১৯৪৩ সালে ইস্ফলের পতন, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, ম্যালেরিয়া, স্মলপক্স, কলেরা মহামারীর কারণে জীবনহানি জনসংখ্যার ব্যাপক হ্রাস ঘটায়। এ ছাড়া এসময়ে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কারণ এলাকার বেশির ভাগ হিন্দু পশ্চিম-বাংলায় গমন করে এবং ভারত থেকে অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক মুসলমানদের এখানে আগমন ঘটে। ১৯৪৭ এরপর রেলের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমান ভারত থেকে আগমন করে। এদের মধ্যে যারা বাঙালি তারা মোহাজের এবং অবাঙালিরা বিহারী বলে পরিচিত হয়। মোহাজেরগণ ভারতের বিশেষ করে পশ্চিম-বাংলা ও ত্রিপুরা থেকে আগমন করে। যারা পশ্চিম-বাংলা থেকে আসে তারা ছোট খাট চাকরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। ত্রিপুরা এবং আসাম থেকে আসা (খুব সামান্য) মহাজের কৃষিকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। এ সমস্ত লোকেরা জেলার বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে রাজবাড়ি সদর থানা সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চল এবং বালিয়াকান্দি থানার উত্তর অঞ্চলে বহরপুর, সোনাপুর এলাকায় বসতি স্থাপন করে। সাধারণ্যে এরা ত্রিপুরে বলে পরিচিত। বিহারীরা অকৃষিজীবী হওয়ায় শহর এলাকায় কর্ম খুঁজে নেয়। এ সমস্ত বিহারী শহরভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল, বিস্কুট উৎপাদন, রেলের খালাশি, ড্রাইভার হিসেবে কাজে নিয়োজিত হয়। এ সমস্ত বিহারীরা শহরের উপকন্ঠে বিহারী কলোনী গড়ে তোলে। তারা নন বেঙ্গলী মাইনরিটি হিসেবে নিজেদের মধ্যে একতা গড়ে তোলে এবং শহরে প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি করে। এ সকল বিহারী মু্ক্তিযুদ্ধকালে পাকসেনাদের পক্ষ অবলম্বন করে এবং রাজবাড়িতে ব্যাপক গণহত্যা চালায়।

ভূ-উত্থান

বর্তমান সীমানায় রাজবাড়ি জেলা তথ্য অত্র এলাকায় অতীত অস্তত্বের স্বরুপ নির্ণয় দুরুহ। জনবহুল, বর্ধিষ্ণু রাজবাড়ি জেলার ভূ-উত্থান অতীতের কোনো এক সময় ঘটেছিল। বাংলাদেশ গাঙ্গেয় বদ্বীপ তবে এ বদ্বীপ একদিনের ভূ-আলোড়নের ফল নয়। এটা ধীরে ধীরে সাগরবক্ষে নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত অসংখ্য দ্বীপসমূহের ভূমিতল।


প্রায় দশলক্ষ বছর পূর্বে হিমালয়ের শেষ পর্বে উত্থান হয়েছিল বলে ভূতাত্ত্বিকগণ মনে করেন। মায়োসিন যুগে এই উত্থানের ফলে বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল উত্থিত হয়েছিল। হিমালয়ের দ্বিতীয় বার উত্থানের ফলে আসাম উপসাগরের তলানী তরঙ্গায়িত ভাজে পরিণত  হয়ে গঠিত হয় বর্তমান আসামের প্রাকৃতিক আকার। এরুপে মায়োসিন যুগের শেষে আসাম উপসাগরের পশ্চিমাংশে ময়মনসিংহ ও ঢাকার উত্তরাঞ্চল সৃষ্টি হয়।

এ সময় চট্রগ্রাম ও সিলেট জেলার কতকাংশ সমন্বয়ে হ্রদের আকার ধারন করে। ভারত মহাসাগর ও হ্রদের মাঝখানে বিরাজ করত এক বিরাট বাঁধ। প্লায়েসটোসিন যুগে এই হ্রদ ও এর মধ্যবর্তী অংশটি অপসারিত হয়ে যায়। সমুদ্র তখন গঙ্গা নদীর গতিপথ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। গঙ্গা নদী ভারতীয় উপদ্বীপ ও মধ্য ভারতের এক গভীর খাতের মধ্যো দিয়ে প্রবাহিত হত। গঙ্গানদী তখন সপ্ত ধারায় প্রবাহিত। সুচক্ষু সীতা ও সিন্ধু পশ্চিমগামী ধারা, নলিনী, হলদিনী, পাবনী ছিল পূর্বগামী ধারা। মধ্যভাগে ছিল ভাগীরথী বা গঙ্গার মূল ধারা। পূর্বগামী এ সব ধারা পূর্বগামী স্রোতের সঙ্গমস্থল সুগন্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। পূর্বগামী শাখাসহ আসাম উপসাগর থেকে ভেসে আসা নদ-নদীর পলি দ্বারা গঠিত হয় অসংখ্য দ্বীপ। সাগর তখন এ অঞ্চলের কাছাকাছি। ধীরে ধীরে ভূ-উত্থানের ফলে সাগর দক্ষিণে সরে গেছে। ফরিদপুরের পূর্বে ঢোলে সাগর আজও সে চিহ্ন বহন করছে। যে সব দ্বীপ নিয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপের সৃষ্টি হয় তাহল নবদ্বীপ, অগ্রদ্বীপ, চক্রদ্বীপ, অন্ত্রদ্বীপ, প্রবালদ্বীপ, এড়োদ্বীপ, জয়দ্বীপ, সূর্যদ্বীপ, রুদ্রদ্বীপ, চন্দ্রদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপ, বউসদ্বীপ স্ত্রীকরদ্বীপ। এসব দ্বীপের বর্তমান অবস্থান ----নবদ্বীপ-মধ্য সীমান্ত, রুদ্র যাহা মধ্যশান্তিপুর (পশ্চিমবঙ্গ), চক্রদ্বীপ-চাকদাহ, বউস-সাতক্ষীরা খুলনার উত্তরাংশ, কুশদ্বীপ-কুশাদা ফরিদপুর, অন্ত্রদ্বীপ-ঝিকরগাছা, বেনাপোল, সূর্যদ্বীপ-যশোর জেলার পশ্চিমাংশ, জয়দ্বীপ-খুলনার পূর্বভাগ, চন্দ্রদ্বীপ-বাকলা (বরিশাল), স্ত্রীকরদ্বীপ-পটুয়াখালি।

রাজবাড়ি এভাবেই প্রাচীন দ্বীপের উত্থিত অঞ্চল। এরমধ্যে কুশিদ্বীপ নিয়ে গঠিত হয় কুশাদা ফরিদপুর, সূর্যদ্বীপ নিয়ে গঠিত হয় যশোর। এসব দ্বীপের উত্থিত ভুমি রাজবাড়ির মধ্যভাগ। তবে এর বেশির ভাগ অঞ্চল পদ্মা, হড়াই, গড়াই, চন্দনার নব উত্থিত চর। এসব নব্য চরদ্বীপের উত্থান এক থেকে দেড় হাজার বৎসরের মধ্যে। এল,এন মিশ্র রচিত বাংলার রেলভ্রমন পুস্তকে পাবনা সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন। পাবনা নামটি গঙ্গার স্রোতধারা ‘পাবনী’ থেকে এসেছে। ড. নীহাররঞ্জন, রাখালদাস বন্দ্যেপাধ্যায়, কপিল ভট্রাচার্য প্রভূতি প্রথিতযশা ঐতিহাসিকগণ এবং ফ্যানডেক ব্রক, রেনেলের নকশা অনুসরণে দেখা যায় নদ-নদীর প্রবাহ অনেক কাল পরে। শুধু গঙ্গার প্রাচীনত্ব খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম দ্বিতীয় শতকের খবরে পাওয়া যায়। টলেমীর বর্ণনা থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দে গঙ্গা নদী ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হত। গঙ্গা ও তার শাখা প্রশাখা এ অঞ্চলে যে চর দ্বীপের সৃষ্টি করে তা থেকেই এ অঞ্চলের ভূ-উত্থান। রাঢ়, পুন্ড্র ও প্রাচীন বঙ্গের উত্থান আর্যপূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ) সংগঠিত হয়ে থাকবে আবার অনেকের ধারনা প্রায় ১০/১২ হাজার বৎসর পূর্বে প্রাচীন বঙ্গের উত্থান। ত্রায়োদশ চতুর্দশ শতাব্দী থেকে গঙ্গার ধারা পদ্মা ও তার শাখা কুমার, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী ও উত্তর হতে প্রবাহিত করতোয়ার প্রত্যক্ষ পলিতে সৃষ্টি উর্বর পললভূমি অত্র অঞ্চল। পানির ভূ-গর্ভ স্তরের উপর ভিত্তি করে টিউবওয়েলের নলপোতার অভিজ্ঞতায় যে বিভিন্নতা দেখা যায় তা থেকে রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশের ভূ-উত্থান ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে গাঙ্গেয় বদ্বীপের উত্তর অঞ্চল থেকে দক্ষিণ অঞ্চল পরে উত্থিত হয়েছে। সে হিসেবে উত্তরে প্রাচীন পুন্ড্র, বরেন্দ্র থেকে দক্ষিণের বঙ্গ পরে উত্থিত।


ভৌগোলিক অবস্থানে রাজবাড়ি বরেন্দ্র ও দক্ষিণ বঙ্গের মাঝামাঝি হওয়ায় বঙ্গের উত্থানের প্রাথমিক ধাপে রাজবাড়ির উত্থান ধারনা করা যায়। তবে রাজবাড়ির ভূ- উত্থানে পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনার প্রভাবে প্রচুর ভাঙ্গা গড়ার খেলা রয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরকে ভিত্তি ধরে বলা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ, খানখানাপুর, রাজবাড়ি, বেলগাছি, কালুখালি ও পাংশার উত্তরাঞ্চল চরদ্বীপ যা বহরপুর, বালিয়াকান্দি, পদমদি, সোনাপুর, বাগদুলি থেকে অপেক্ষাকৃত নবীন। সমাধীনগর, নাড়ুয়া, মৃগী, কসবামাজাইল, পদ্মার অন্য শাখা গড়াইয়ের প্রভাবে গঠিত অঞ্চল। চন্দনা নদী এক সময়ে খুবই প্রবল ছিল এবং এ নদীর তীরে আড়কান্দি, বালিয়াকান্দি, কান্দা অর্থাৎ কিনারে অবস্থিত বলেই কান্দি হয়েছে। টলেমি গঙ্গা নদীর যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় প্রাচীন গঙ্গা নদী প্রায় ২০০০ বৎসর পূর্বে বর্তমান গোয়ালন্দ থেকে অনেক উত্তরে ঢাকা ভাওয়ালের পাশে ‘এ্যান্টিবোল’ হয়ে প্রবাহিত হতো। তখন ঐ অঞ্চলকে ‘এ্যান্টিবোল সাগর’ বলে পরিচিতি রয়েছে (জেমস টেলর)। তৎকালীন সময়ে গঙ্গার উত্তর হেতে সরাসরি দক্ষিণে করতোয়ার দক্ষিণাংশ এ অঞ্চলের হড়াই নদী বলে পরিচিতি ছিল। এ নদী খুবই বেগবান ছিল। বর্তমানে এটি বাণীবহের দক্ষিণ দিয়ে প্রবাহিত মৃত নদী। রাজবাড়ি জেলার ভূ-ইত্থান উল্লেখিত বিশ্লেষণের আলোকে বলা যায় এর কিছু কিছু অঞ্চল অনেক পুরাতন উত্থিত দ্বীপসমূহ। এ অঞ্চলটি রাজবাড়ি জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চল বালিয়াকান্দি, জামালপুর, বহরপুর সোনাপুর হয়ে পাংশা পর্যন্ত। এর উত্তরাঞ্চল গঙ্গাবাহিত বর্তমান পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার এবং দক্ষিণাঞ্চল গড়াইয়ের ভাঙ্গা গড়ায় উত্থিত। এর প্রাচীন ভূমির উত্থান প্রায় ৫০০০ বৎসর পূর্বে ধারণা করা যায়।

নদ-নদী

পদ্মা, গড়াই, হড়াই, চন্দনা বাহিত পলি, কাঁকর দিয়ে সৃষ্টি রাজবাড়ি জেলা। রাজবাড়ির প্রধান ঐতিহ্য এককালের রুপালি ইলিশ। আজও রাজবাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবন পরিচালিত হচ্ছে এ সব নদনদীর প্রভাবে। সঙ্গত কারণেই এ সব নদনদীর অতীত স্রোতধারা, তার জন্মকাল জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে এর ভাঙ্গাগড়ার খেলা।

পদ্মা

নটিনী তটিনী আমি

নির্ঝরিণী নিঃসঙ্গ,

তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ভঙ্গিল দেহ

জন্ম নিলাম প্রমত্ত পদ্মা আমি

পদ্মা নদী দৌলতদিয়া ৫০০ বৎসর পূর্বে পদ্মা এমন ছিল না। তখন গঙ্গার প্রধান ধারা ভাগীরথী দিয়ে চলত। পলি পড়ে ভাগীরথীর নদীতল উঁচু হয়ে উঠলে ক্রমশঃ পূর্বে জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, কুমার গড়াই, হড়াই, চন্দনা দিয়ে গঙ্গার প্রধান প্রবাহ চলতে থাকে। গঙ্গা পরে তার পূর্বমুখী ধারা খুঁজে পায়। এ ক্ষেত্রে গঙ্গার প্রবাহ খুঁজতে গিয়ে মূলত গঙ্গার প্রাচীনত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন যা অতি জটিল অধ্যয়ন। মধ্যপুরাণ ও মহাভারতে গঙ্গার পূর্বগামী ৩টি ধারা হলদিনী, পাবনী ও নলিনীর, উল্লেখ রয়েছে। অনেকের ধারণা পাবনী থেকে পদ্মার নাম এসেছে যা পাবনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।


২য় শতকে টলেমীর নকশা, সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং এর বর্ণনা, ষোড়শ শতকে ডি ব্যরসের নকশা, বিখ্যাত সেচ ইঞ্জিনিয়ার উইলিয়াম উইলকক্স, নীহাররঞ্জন ও কপিল ভট্রাচার্যের নদীর গতিপথ বর্ণনাসহ আনুষঙ্গিক উপাদানের সাহায্যে পদ্মার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা যাবে, যা থেকে অতীত ও বর্তমান পদ্মা সম্বন্ধে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। রাজমহলের সোজা উত্তর-পশ্চিমে তেলিয়াগড় ও সিক্রিগলির গিরিবর্তা গঙ্গার বাংলায় প্রবেশ পথ। প্রাচীন গৌড়ের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার ধারা ভাগীরথী ও পদ্মা এই দুই ধারায় প্রবাহিত। ড. নীহাররঞ্জন ভাগীরথীকে মূলধারা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঐতিহাসিক রাধাকমল মুখোপাধ্যায় মনে করেন ষোড়শ শতক থেকে পদ্মার পূর্বযাত্রা বা সূত্রপাত। রেনেল ও ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় দেখা যায় ষোড়শ শতকে পদ্মা বেগবতী নদী। সিহাবুদ্দিন তালিশ (১৬৬৬), মির্যা নাথনের (১৬৬৪) বিবরণীতে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমে ইছামতির উল্লেখ করেছে। ইছামতির তীরে যাত্রাপুর এবং তিন মাইল উত্তর পশ্চিমে ডাকচড়া (মানিকগঞ্জ) এবং ঢাকার দক্ষিণে গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলন প্রবাহের সমুদ্র যাত্রা। ড. নীহাররঞ্জন বলেন, ‘তখন গঙ্গার এ প্রবাহে পদ্মার নামকরণ দেখছি না। ‘আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন (১৫৯৬-৯৭), ‘কাজীর হাটের কাছে পদ্মা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটি শাখা পূর্বগামিনী পদ্মাবতী নাম নিয়ে চট্রগ্রামের নিকট সমুদ্রে মিশেছে।’ মির্যা নাথানের বর্ণনায় করতোয়া বালিয়ার কাছে একটি বড় নদীতে পড়েছে।

এই বড় নদীটির নাম পদ্মাবতী। ত্রিপুরা রাজ বিজয় মাণিক্য ১৫৫৯ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপুরা হতে ঢাকায় এসে ইছামতি বেয়ে যাত্রাপুর এসে পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করেছিলেন। এ হিসেবে তখনকার পদ্মা বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫/২০ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হত এবং তা রেনেলের নকশা এবং টেলরের বর্ণনার সাথে মিলে যায়। ষোড়শ শতকে পদ্মা ও ইছামতি প্রসিদ্ধ নদী। ষোড়শ শতকের ব্যারস এবং সপ্তদশ শতকের ব্রকের নকশায়ও তা পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা (১৩৪৫-৪৬) চীন দেশে যাওয়ার পথে চট্রগ্রাম নেমেছিলেন। তিনি চট্রগ্রামের হিন্দু তীর্থস্থান গঙ্গা নদী ও যমুনা নদীর সঙ্গমস্থল বলেছেন। তাতে বোঝা যায় চতুর্দশ শতকে গঙ্গার মধ্যবর্তী প্রবাহ পদ্মা চট্রগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তটভূমি প্রসারের সাথে সাথে চট্রগ্রাম এখন অনেক পূর্ব দক্ষিণে সরে গিয়েছে। ঢাকাও এখন পদ্মার উপর অবস্থিত নয়। পদ্মা এখন অনেক দক্ষিণে নেমে এসেছে। ঢাকা একন পুরাতন গঙ্গা পদ্মার খাত বুড়িগঙ্গার উপর অবস্থিত আর পদ্মা ব্রহ্মপুত্রের (যমুনা) সঙ্গম গোয়ালন্দের অদূরে। পদ্মা তার খাত বারবার পরিবর্তন করেছে তার যথেষ্ট প্রমাণাদি এ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দশম শতকের শেষে এবং একাদশ শতকের গোড়ায় চন্দ্রবংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের অনেকটা জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্রলীদ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলের জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেছিলেন। পট্রলীও সমসাময়িক সাহিত্য গ্রন্থেও পদ্মা নদীর উল্লেখ আছে। ‘বাজলার পাঁড়ী, পঁ-উ-আ খালে বাঁহিউ’ অর্থাৎ পদ্মাখালে বজরা নৌকা পাড়ি দিতেছে। এতে অনুমান করা যাচ্ছে নবম দশম শতকেও পদ্মার অস্তিত্ব ছিল তবে তা ছিল ক্ষীণতোয়া অপ্রশস্ত খাল বিশেষ। ব্রহ্মপুত্র বর্তমান যমুনার খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করার আগে পদ্মা ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার খাতে প্রবাহিত হত। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তা অকস্মাৎ তার পূর্ব যাত্রা পরিত্যাগ করে এবং তার বিপুল বন্যার বারিরাশি ব্রহ্মপুত্রের বন্যার পানির সঙ্গে মিশে যমুনার খাতে বইতে শুরু করে দেয় গোয়ালন্দের পাড়ে। প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের মন্দির প্রাসাদ ধবংস করে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম ধারণ করে।


জেমস টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা ঢাকার শ্রীপুরের মফলৎগঞ্জ ও রাজনগরের কিছুটা উত্তর দিয়ে প্রবাহিত। এটাই গঙ্গার প্রধান শাখা যা প্রশস্ততা ছিল ২/৪ মাইল। রেনেলের মানচিত্রে টেলরের বর্ণনায় কীর্তিনাশা কার্তিকপুরের উত্তরে মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। গঙ্গার দ্বিতীয় শাখা টেলরের বর্ণনায় নয়াভাঙ্গনী নদী (আড়িয়াল খাঁ) ঢাকা জেলার কোল বেয়ে বাকেরগঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। মূলতঃ ৩০০/৪০০ বৎসর পূর্বে পদ্মার ধারা বর্তমান ধারা থেকে আরো উত্তরে বোয়ালিয়া (রাজশাহী শহর) পাবনার চলনবিল, ইছামতি (মানিকগঞ্জ) ধলেশ্বরী একাকারে ঢাকার দক্ষিণ দিয়ে শ্রীপুরের কীর্তিনাশা হয়ে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হত। ২০০ থেকে ২৫০ বছরের মধ্যে পদ্মা অনেক দক্ষিণে সরে এসে বর্তমান খাতে রাজবাড়ি জেলার কোল ঘেঁষে জেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কখনো উত্তরে ৫/৬ মাইল সরে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার উত্তরে হাবাশপুর, ধাওয়াপাড়া ঘাট সোজা এসে মিজানপুর থেকে বাঁক নিয়ে ৬/৭ মাইল উত্তরে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে গোয়ালন্দের ৩ কিলোমিটার উত্তরে দৌলতদিয়ার অদূরে যমুনার ধারা বুকে নিয়ে পূর্ব মুখে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ও পাংশা থানার উত্তরাংশ পদ্মার নব উত্থিত চর দ্বারা সৃষ্টি। এসব দ্বীপ গোয়ালন্দের পঞ্চাশ হাজারী সমন্বিত চর বলে খ্যাত।

হড়াই

সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

হড়াই নদী এ প্রবাদটি রাজবাড়ি জেলার বেলগাছি, কালূখালি মদাপুর, সূর্যনগর, রাজবাড়ি, বাণীবহতে বহুল প্রচলিত। প্রবাদটি নাকি উৎসারিত হয়েছিল চতুর্দশ শতকের মঙ্গল কাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগরের মায়ের মুখ থেকে।  কথা থেকে বোঝা যায় চাঁদ সওদাগরের মা তাকে সাবধান করেছিল বেগবান খরস্রোতা নদী থেকে তা সত্ত্বেও চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা নিমজ্জিত হয় বেলগাছির অদূরে হড়াইতে। সে স্থানটিকে আজও মানুষ চিহ্নিত করে রেখেছে অতি যত্নে। স্থানটিতে কয়েকটি উঁচু ঢিবি দেখা যায় যাকে এ অঞ্চলের মানুষ চাঁদ সওদাগরের ঢিবি বলে। এ কাহিনীর সত্যতার সাথে চাঁদ সওদাগরের বাহিনীর ঐতিহাসিক সত্যতা কতটুকু? চাঁদ সওদাগর ও ধনপতি সওদাগরের কাহিনী আজ ঐতিহাসিক সত্য বলে পরিচিতি লাভ করেছে। সকল মঙ্গল কাব্যেরই নায়ক সওদাগর। এ মধ্যে চাঁদ সওদাগর, ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত অন্যতম। চাঁদ সওদাগরের ছিল সপ্তডিঙ্গা আর ধনপতির চৌদ্দডিঙ্গা। তাদের প্রধান ডিঙ্গার নাম ছিল মধুকর। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্র যাত্রা করত। চাঁদ সওদাগরের বাড়ি বর্তমান বগুড়া। মঙ্গল কাব্যের বর্ণনায় যে কলিদহের কথা বলা হয়েছে তা এখন বগুড়ার করতোয়া নদীর খাতে কলিদহের সাগর বল পরিচিত। ধনপতি ছিলেন হুগলী অঞ্চলের । ড. নীহাররঞ্জন চাঁদ সওদাগরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে----‘চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী বাজখানি রামেশ্বর পার হইয়া সাগর মুখের দিকে অগ্রসর হইতেছে। পথে পড়িতেছে অজয় নদী, উজানী, শিবনদী, কাটোয়া, ইন্দ্রাণী নদী, কুলিয়া গুপ্তপাড়া, মির্জাপুর, সপ্তগ্রাম, কুমার হাট, নদীয়া, পূর্বে কাকীনাড়া, মূলজোরা, আড়িয়াসহ চিত্রাপুর।’

চাঁত নওতাহরের কাহিনী বর্তমান ইতিহাসের উপাদান তবে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা যে এখানে নিমজ্জিত হয় তার সত্যতা কী? হড়াই নদীর প্রবাহ বর্ণনায় হয়ত এ সত্যতা ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। বর্তমানে মৃত হড়াই নদীর পদ্মা উৎসারিত হয়ে বেলগাছির পশ্চিম দিক দিয়ে বাণীবহের দক্ষিণ দিয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পাঁচ মোহনীতে হড়াই, চন্দনা, গড়াই, কুমার একাকার।


পদ্মা নদীর প্রাচীনত্ব ও প্রবাহ বর্ণনায় যতদুর জানা গেছে পদ্মা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকে প্রবল হয়েছে। এর পূর্বে অর্থাৎ চতুর্দশ বা তৎপূর্বে এর প্রবাহ প্রবলতার ইতিহাস নাই। এদিকে গঙ্গার প্রাচীনত্ব অনেক পূর্বে যার প্রভাবে বাংলার সমতটীয় বদ্বীপের উত্থান। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে পদ্মার প্রবলতা না থাকায় গঙ্গার ধারা তখন কুমার, মাথাভাঙ্গা, জলঙ্গী, গড়াই, হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। কুমার, মাথাভাঙ্গা বহু পূর্বে যশোর খুলনা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সে সব অঞ্চলের বদ্বীপ বর্তমানে পরিণত ও ক্ষয়িষ্ণু বদ্বীপ। ঐ অঞ্চলের জলাধার ও বিল বাওড় এর প্রমাণ বহন করে।

গঙ্গার মুখে ত্রায়োদশ চতুর্দশ শতকে এবং তারও পূর্বে যে সমস্ত নদীপ্রবাহ দ্বারা গঙ্গার বিপুল জলরাশি বাহিত হত তা কুমার, গড়াই, চন্দনা, জলঙ্গী, মাথাভাঙ্গা, হড়াই। হড়াই প্রাচীন নদী। অন্যদিকে করতোয়া বাংলার উত্তর বঙ্গের মধ্য দিয়ে দক্ষিণগামী। করতোয়ার প্রবাহ-ই হড়াই দিয়ে প্রবাহিত হত। এ থেকে অনুমান করা যায় হড়াই তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলের বেগবান নদী ছিল। বর্তমান মাটিপাড়া পিঁজেঘাটা বলে পরিচিত স্থানে যে বিলের আকার দেখতে পাওয়া যায় তা হড়াইয়ের প্রাচীন প্রবাহ। ‘পিঁজেঘাটার ভাটিতে রাধাগঞ্জের বিল ছিল বন্দর’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়)। উল্লেখ্য নদী তার গতি বদলালে পরিত্যক্ত নদী প্রথমে কোল ও মৃত নদী পরে বিল বাওড়ে পরিণত হয়। দশম, একাদশ শতাব্দীতে বা তারও পরে হড়াই প্রমত্ত নদী হিসেবে প্রবাহিত ছিল যার প্রশস্ততা দুই/তিন মাইল। পরে তা দুটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। একটি পিঁজেঘাটা দিয়ে অন্যটি বর্তমান হড়াইয়ের প্রবাহ দিয়ে। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে ভূষণা (বর্তমান মধুখালির অদূরে) সমৃদ্ধ নগর ও বন্দর ছিল। এখানকার উন্নতমানের সূতিবস্ত্রের সুনাম দেশে বিদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

গৌড়ী-গড়াই

গড়াই জন্মস্থানে গৌড়ী বলে পরিচিত। গড়াইয়ের প্রথম জন্ম কুষ্টিয়ার আমলা সদরপুরের বিল হতে। গড়াই জয়নাবাদ লাহিন পাড়ার সাঁওতার পূর্বদিকে কুমারখালি, খোকসা, হিজলাবাদ, জালসুকা, লাঙ্গলবন্দ, আমলাসার, তারাউজল হয়ে ক্রমে দক্ষিণ দিকে নারুয়া সমাধিনগর কামারখালির দিকে প্রবাগহিত হয়ে শেষে মধুমতি, এলানজানি, বালেশ্বররূপে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। কুষ্ঠিয়ার কুড়িদহ, পাতিলাদাহ, চেঁচানেরদহ, ডাকদহ  এ কয়টি নামের সাথে গড়াই নদীর জন্রে পৌরানিক কাহিনী আছে। কথিত আছে কুষ্টিয়ার আমলা গ্রামরে বিলের পাশে ছিল এক ব্রাহ্মণ। এই ব্রাহ্মণের এক সেবাদাসী ছিল। নাম তার গৌড়া। ব্রাহ্মণ একদিন ৬  মাইল দূরে কুপদহে গঙ্গাস্নানে যাবেন। একথা জানতে পেরে গৌড়ি গঙ্গা মাকে নিবেদন দেবার জন্য একটি ফুল দেন। ব্রাহ্মণ যথাসময়ে গঙ্গাস্নান সেরে ফিরে আসতে মনে পড়ে গৌড়ির নিবেদন দিমে তিনি ভুলে গেছেন। ব্রাহ্মণ ফিরে যেতে চান গঙ্গায় এবং কিছুদূর যেতে গরুর খুরে গর্তের জমা পানি দেখে মনে করেন এখানেই নিবেদন দিয়ে যাই, কে আর দেখছে?সেখানে ফুলটি দিতেই মা গঙ্গা নিজে হাত বাড়িয়ে তা গ্রহন করেন। এতে বিস্মিত হয়ে ব্রাহ্মণ ভাবে গৌড়ি সাধারণ মেয়ে নয়। বাড়ি ফিরে তিনি গৌড়ির পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। তার স্ত্রী এর কারণ জিজ্ঞেস করার মুহুর্তেই গৌড়ি যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থাতেই নুড়ি ও পাতিল নিয়ে দূরে প্রস্থান করতে থাকে। ব্রাহ্মণ তাকে অনুসরণ করে হাঁটতে থাকলেও গৌড়ী সমান দূরত্ব রেখে চলতে এবং ব্রাহ্মণ লক্ষ্য করে বিলের পানি উপচিয়ে গৌড়ীর পিছনে ছুটছে। এভাবে গৌড়ীর পথে নদীর সৃষ্টি হয় এবং গৌড়ী হারিয়ে যায়। গৌড়ী যেখানে নুড়ি ফেলে সেখানে নুড়িদহ, যেখানে হাতের পাতিল ফেলে সেখানে পাতিলাদহ আবার ব্রাহ্মণ যেখানে তাকে পিছন থেকে ডাকেন সেখানে ডাকদহ এবং যেখানে চেঁচিয়ে ডাকেন সেখানে চেঁচানোরদহ বলা হয়। এটা নিছক লোকহাহিনী তবে কুষ্টিয়ার বর্তমান এসব দহগুলি স্মরণ করিয়ে দেয় গৌড়ী বা গড়াই নদী এসব স্থান দিয়ে একসময় প্রবাহিত হত। গড়াই একসময় অত্যন্ত বেগবান এবং অনেক প্রশস্ত নদী ছিল। ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতকে নদীটির প্রবাহ বর্তমান পথে ছিল না। এ নদীটি তখন বর্তমান প্রবাহ থেকে ৪/৫ মাইল উত্তর দিয়ে প্রবাহিত হত।


প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান সিরাজপুরের হওর (পাংশা থানার দক্ষিণে কসবা মাঝাইলের পাশ দিয়ে) প্রাচীন গড়াইয়ের পরিত্যক্ত কোল, যদিও তা গড়াই থেকে উঠে গড়াইতে মিশেছে। সিরাজপুরের হাওড় গড়াইয়ের পুরাতন ধারা। এ ছাড়া সিরাজপুরের হাওর থেকে উৎসারিত চত্রা নদীটি নাড়ুয়ার ঘাটে আবার গড়াইতে মিশেছে তা নদীটির পূর্বতন ক্ষীণ প্রবাহ। প্রাচীন গড়াই সিরাজপুরের হাওর থেকে সোজা বর্তমান প্রবাহের ২/৩ মাইল উত্তর দিয়ে ঘি কমলা চষাবিলা হয়ে পূর্ব মুখে তখন বালিয়াকান্দির পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত হত। নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে এর প্রাচীন প্রবাহ তেঢালা, পাকুরিয়া, কাছমিয়া বিলে পরিণত হয়েছে। বর্তমান এলাঙ্গী, তেকাটি হয়ে যে ভাটিখাল প্রবাহিত তা প্রাচীন গড়াই নদীর প্রবাহ। মদনডাঙ্গী, বাদশাডাঙ্গী মূলত গড়াইয়ের ডাঙ্গী বা চর। ১৫/২০ বছর পূর্বেও গড়াইয়ের প্রবাহ অতি প্রবল ছিল। প্রচুর ইলিশ মাছ এ নদীতে ধরা পড়ত এবং সে ইলিশের স্বাদই ছিল আলাদা। ৪০/৫০ বৎসর পূর্বে গড়াইয়ের নাড়ুয়া গাটে কুমিরের উপদ্রব ছিল। গড়াইয়ের পথে একসময় এ অঞ্চলের ব্যবসার প্রসার লাভ করে। বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, নাড়ুয়া, মৃগী, পাংশার পাট, পিঁয়াজ, রসুন, তিল ও অন্যান্য শস্য এ পথে কলিকাতা, খুলনা চালান দেওয়া হত।

চন্দনা

চন্দনা চলতে পারি মন্দ না

চলত যখন চাঁদ সওদাগর

করত সবাই বন্দনা।

পালের নায়ে ঘোমটা দিয়ে

আর চলে না রঞ্জনা,

শীর্ণ বুকে পা রাখে না খঞ্জনা

চন্দনা, চলছি দেখ মন্দনা।

চন্দনা নদী চন্দনা বর্তমান পদ্মার একটি শাখা যা পাংশার পাশ দিয়ে প্রবাহিত। কালুখালির দক্ষিণে সোনাপুরের রামদিয়ার মাঝ দিযে প্রবাহিত বালিয়াকান্দি হয়ে পাঁচমোহনীতে মিশেছে। এই পাঁচমোহনী চন্দনা, হড়াই, কুমার গড়াইয়ের মিলনস্থল।

ড. নীহাররঞ্জন যে চন্দার গতিপথের বর্ণনা দিয়েছেন তা চন্দনার সঠিক তথ্য বহন করে না। তিনি লিখেছেন চন্দনা পদ্মা গর্ভে ভাগিরথীতে প্রবাহিত। ফ্যানডেন ব্রকের নকশায় তা যশোরের পশ্চিম দিয়ে প্রবাহিত। প্রকৃত চন্দনা প্রাচীন নদী যা গঙ্গা হতে প্রবাহিত হয়ে কুমারের সাথে মিশতো। উল্লেখ্য কুমার অতি প্রাচীন নদী এবং বর্তমান চন্দনা পাঁচমোহনীতে কুমারের সাথে মিশেছে। চন্দনা প্রাচীনকালে অনেক প্রশস্ত নদী ছিল। তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায় বর্তমান বেলগাছি ও কালুখালির অদূরে চরলক্ষীপুর, চরচিলকা, চরপাড়া, চরবোয়ালিয়া, চরমদাপুর চন্দনা প্রবাহের চর। চন্দনার এ প্রবাহের দ্বারা প্রমাণিত হয় চন্দনা অনেক পূর্বে প্রশস্ত নদী। এছাড়া চন্দনা প্রবাহের দুই কান্দায় আড়কান্দি ও বেলেকান্দি। নদী এ সময়ে আড়কান্দি এসে বাঁক নিয়েছিল বলে আড়ে আড়কান্দি আর ডানে বেলেচরে বালিয়াকান্দি। আড়কান্দি আর বালিয়াকান্দীর দূরত্ব ২ মাইল প্রায়।


নদীর পাড় আড়কান্দি থেকে বালিয়াকান্দির দিকে সরে গিয়েছে। সপ্তদশ শতকে এ নদী যে অনেক বড় নদী ছিল তার আরো প্রমাণ মেলে বঙ্গে রেলভ্রমণ পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণনা থেকে----‘কালুখালি জংশন থেকে আড়কান্দি ষ্টেশন ১২ মাইল দূরে। ঐখানে চন্দনা তীরে বাণীবহ নাওয়াড়া চৌধুরীদের নৌকা নির্মাণের প্রধান কারখানা ছিল।’ ইবনে বতুতা রেহেলা গ্রন্থে তৎকালীন বঙ্গে জাহাজ শিল্পের ব্যাপক উন্নতির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। বার্থেমাও বিভিন্ন প্রকার নৌযান ও বৃহদাকার জাহাজ নির্মাণের কথা বলেছেন।

মঙ্গলকাব্যের নায়করা চাঁদ সওদাগর ধনপতি এ অঞ্চলে বাণিজ্য করত। আর সে বাণিজ্যের পথ ছিল (১৪০০ শতকে) এই চন্দনা, হড়াই, গড়াই। ধারণা করা যায় শুধু সপ্তদশ শতকে আড়কান্দিতে বাণীবহের নাওয়াড়াদেরই নৌকা তৈরী হত না এর ২০০ বৎসর পূর্বে সুলতানি আমলে সওদাগরদের জন্য ডিঙ্গা জাহাজ নির্মিত হত। বর্তমানে আড়কান্দির অদূরে তুলশী বরাট নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। তুলশী বরাটের নৌকা এই সেদিন পর্যন্ত এ অঞ্চলের উন্নতমানের নৌকা হিসেবে গৃহীত ছিল। এ গ্রামের অনেক মিস্ত্রির সাথে আলাপ করে জানা যায় এটা তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষের আদি পেশা। চন্দনা নদী এখন মৃত। মীর মশাররফ হোসেনের বর্ণনা থেকে দেখা যায় ১০০ শত বৎসর পূর্বে এটা যথেষ্ট নাব্য ছিল। হযরত সাহ পাহলোয়ান এই নদীর উত্তর তীরে ষোড়শ শতকে ধর্ম প্রচারের জন্য সেকাড়া গ্রামে আস্তানা গড়ে তোলেন। বর্তমানে এই নদীর মুখ কেটে এবং খনন করলে হাজার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আনা যাবে।

রাজবাড়ি জেলার কৃষি, মৎস্য, পর্যটন শিল্পে উন্নয়নের কথা ভাবতে হলে পদ্মা, গড়াই হড়াই, চন্দনা, চত্রা, সিরাজপুরের হাওড় নিয়ে ভাবতে হবে। রাজবাড়ির এই সম্পদ যেমন গর্ব তেমনি উন্নয়ন প্রকলেপর সহায়ক বিষয়।

গ্রামের নামকরণ

ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেরই অভিমত মানুষ প্রথমে নগর জীবনে অভ্যস্থ হয় এবং পরে গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটে। তবে আধুনিক নগর বলতে যা বোঝায় সে নগর তেমন ছিল না। প্রাকৃতির নানা বৈপরিত্যের কারণে মানুষেরা দল বেঁধে নানা প্রাকৃতিক সস্পদে সম্মৃদ্ধ নিরাপদ স্থানে বসবাস করত। আমরা নীল, রাইন, পীত, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, ভলগা, গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রাচীন নগর সভ্যতার কথা জানি। পানির সহজ প্রাপ্যতা এবং উর্বর ভূমির কারণেই এ সকল অঞ্চলে নাগরিক জীবন শুরু হয়েছিল। মিশরীয় ও সুমেরীয় , মহেঞ্জোদারো, চীনের প্রাচীন নগর সভ্যতার বিকাশ তা প্রমাণ করে। নাগরিক জীবন বিকাশের ফলে ফসল উৎপাদনের নিমিত্তে তারা নগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে স্থায়ী বাস গড়ে তোলে। ফলে গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে। বঙ্গে এ বিষয়টি আলাদা বলে মনে করার অনেক কারণ আছে। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতীয়মান হয় গঙ্গার ভাটি অঞ্চলের সমতটীয় বঙ্গের আদিভিত্তি গ্রাম। নগর জীবন গড়ে উঠেছে অনেক পরে। প্রাচীন বঙ্গ, উপবঙ্গ সাগর তথা নদনদীর উত্থিত দ্বীপ ও চর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। অসংখ্যা নদ নদীর প্রবাহ, বিল বাওড়, হাওড় জেলা এর প্রমাণ বহন করে। ইউয়ান চোয়াং ষষ্ট শতকে বঙ্গে ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনা থেকে বঙ্গে গ্রাম জীবনের ভিত্তির সংবাদ জানা যায়। তখনকার গ্রাম বর্তমান গ্রামের মতো ছিল না। উত্থিত দ্বীপ বা চরে জীবন জীবিকার অন্বেষণে মানুষ একসাথে বসবাস করত যা বর্তমান গঞ্জের মতো ছিল। ক্রমে ক্রমে নদী সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমষ্টিরুপ ধারণ করে। একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ সমতল মাঠ বা প্রান্তরে রুপান্তরিত হয়। সে সব স্থানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ জীবনের বিকাশ ঘটে।


বাংলার প্রায় প্রতিটি গ্রামের পূর্বে বা পরে পরিচয়াত্মক শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। যেমন পুর, ডাঙ্গা, খাল, খালি, দহ চর, চক, দি, দিয়া, হাট, ঘাট, পাড়া ইত্যাদি। এরমধ্যে পুর অর্থ জনসমাবেশ এবং তা নগর অর্থে ব্যবহৃত হয়। পুর থেকেই পৌর বা নগর বিকাশের ক্ষেত্রে এ পরিচয়াত্মক শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। উর, পুর, দি, দিয়া, দিয়াড়া; বিল, নালা এগুলি বাংলায় আদি খাঁটি শব্দ যা অনার্যরা ব্যবহার করত। বঙ্গে আর্য ব্রাহ্মণদের আগমন ঘটে অনেক পরে। তার পূর্বে অনার্য অধিবাসীরাই ছিল বঙ্গের অধিবাসী। তবে পুরের পরিচয়ে সকল গ্রামের নাম আদি দ্রাবিড় বা ভোটচীন গোষ্ঠির দেওয়া নাম নয়। গ্রাম জীবনের বিকাশ ঘটেছে শত শত বছর ধরে। এরমধ্যে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন তুর্কী, পাঠান, সুলতান, মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানি শাসন চলেছে। সব কালেই নতুন নতুন গ্রামের উৎপত্তি ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে প্রাচীন ব্যবহৃত পুর শব্দটির ব্যবহারের সাথে যোগ হয়েছে খাল, চর, দহ, দি, দিয়া, গাঁড়া, সারা, গ্রাম, বাড়ি, হাট, বাজার, গঞ্জ, তালক, নালা, তলা, এলি, আদ, বাদ, জানি, কান্দা, কান্দি, ডাঙ্গা, লিয়া, ইল, বিল, লাট, লাটি, লি, দা, বাত, বাতান, কন্দ জনা, ডোরা, ঝোপ, জঙ্গল, বন, ঝুপি, থুপি, তুরি, শিয়া, নগর, রাট ইত্যাদি। আবার গাছের নামে, মাছের নামে, পাখির নামেও গ্রামের নাম রয়েছে।

গ্রামসমূহের উৎপত্তির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সপ্তম অষ্টম শতক থেকে শাসনতান্ত্রীক কাঠামোর মধ্যে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বিথী ও গ্রামের উল্লেখ আছে। আজকে যেমন অনেকগুলি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ইউনিয়ন, তখন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হত বিথী। কয়েকটি বিথী নিয়ে বিষয়, কয়েকটি বিষয় নিয়ে মন্ডল, কয়েকটি মন্ডল নিয়ে গঠিত হত ভূক্তি। অত্র এলাকায় স্মতট পদ্মাবতী বিষয়, বারক মন্ডল, কুমার তালক মন্ডল ইত্যাদির সংবাদ পাওয়া যায়। রাজবাড়ি জেলার গ্রামগুলির উৎপত্তিকাল ঠিক কখন থেকে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ইউয়ান চোয়াং বাংলায় যে ৩০টি বৌদ্ধ সংঘারামের কথা বলেছেন তার মধ্যে একটির অবস্থান নির্ণীত হয়েছে পাংশায় (পুরাত্ত্ববিদ পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়)। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশকাল খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৫০০ খ্রিষ্টীয় শতক পূর্ব থেকে ৭ম/৮ম শতকের পাল শাসন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় এক হাজার বছর। ইউয়ান চোয়াং যে বৌদ্ধ সংঘারামের কথা বলেছিলেন সে সব বৌদ্ধ সংঘারাম নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। সে কারণে বলা যায় পাংশায় যে বৌদ্ধসংঘারম ছিল তা হয়তো ১ম/২য় শতক হতে বা তার পূর্বে বা পরেও হতে পারে। তবে নিশ্চয়ই ষষ্ঠ শতকের অনেক পূর্বে । তাই রাজবাড়ি জেলার গ্রামের ভিত্তি খ্রিস্টীয় ১ম শতক বা তার পূর্ব থেকেই বিকাশ লাভ করে। আরো একটি নিদর্শন রাজবাড়ি জেলার গ্রামবসতির প্রাচীনত্বের স্বাক্ষর বহন করে। ২০০১ সালে বালিয়াকান্দি থানার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেঘারী গ্রামে পুকুর খনন কালে কষ্টিপাথরের তৈরী একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে আছে। উল্লেখ্য গুপ্তরাজগণ হিন্দুতান্ত্রীক এবং কেহ পরম বৈষ্ণব ছিলেন। বালাদিত্য বৌদ্ধ ছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়ে বিষ্ণুমূর্তি পূজাপদ্ধতি বিশেষভাবে প্রচলিত হয়। স্কন্ধগুপ্তের সময় ধর্মের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। আমাদের দেশে যে সকল সুন্দর চতুর্ভুজ বাসুদেব প্রকৃতি বিষ্ণুমূর্তি দৃষ্ট হয় তার কতকগুলি গুপ্ত যুগে এবং কতগুলি সেন যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়। পদ্মাবতি বিষয়, বারক মন্ডল, কুমার তালক মন্ডল, পাংশায় বৌদ্ধ সংঘারাম, তেঘারির বিষ্ণুমূর্তি এবং ১০৫৬ টি গ্রামে এরমধ্যে প্রায় ২০০টি পুর, দি, দিয়া, হওয়ায় বলা যায় গুপ্ত যুগ থেকেই এ অঞ্চলে জনপদ গড়ে ওঠে। তবে সুলতানি, মোগল শাসনামল থেকেই ব্যাপকভাবে গ্রামসমূহের বিকাশ ঘটে।

রাজবাড়ি জেলার গ্রাম সকলের পূর্বে বা পরে পরিচায়কত্মক শব্দ হিসেবে পুর, দি, দিয়া, ধিয়া, লিয়া, গাতি, কান্দা, কান্দি, বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, পাড়া, নগর, খাল, খালিয়া, কালিয়া, কোলা, বিল, ইল, হাওড়, কোল, দোহা, দহ, কোল, কোলা, লেঙ্গা, লেঙ্গী, রেন্দা, উরি, কুড়ি, উলি, লুন্দি, কাউল, কাচু, দিলা, গিলা, মংলায়, বাঙলট, ত্রিচট, পেটট, মাছের নাম, গাছের নাম, ফলের নাম, ফসলের নাম, ডাঙ্গা, ডাঙ্গী, বুনিয়া, হাট, গঞ্জ, চক, কশবা, চর, ভর, দহ, এলা, তলী, ইত্যাদি রয়েছে। নামের পূর্বে বা পরে এমন পরিচয়াত্মক শব্দের আলোকে রাজবাড়ির গ্রামসমূহের উৎপত্তির ধারাবাহিকতা জানা যাবে।


রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন যশোর খুলনা সংলগ্ন হওয়ায় তা উপবঙ্গের অংশ বিশেষ। উপবঙ্গ গঙ্গার ভাটির অঞ্চলের উত্থিত দ্বীপসমূহের সমষ্টি। গঙ্গা তার বিভিন্ন শাখা উপশাখায় প্রবাহিত হওয়ায় ভাটিতে উত্থিত হয় ঐ সকল দ্বীপ। দ্বীপসমূহে জনবসতি গড়ে ওঠার কারণে জনপদের সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ি জেলা গঙ্গা মুখের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি থাকায় বঙ্গের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে জনবসতি তুলনামূলক আগে হওয়াই স্বাভাবিক। তবে জেলাটির বিশেষত্ব এমনই যে এর উত্তর দিকে পদ্মা ও দক্ষিণের গড়াই এবং মধ্য প্রবাহিত হড়াই, চন্দনাসহ আরো অনেক নদী। প্রবাহিত নদনদীর বাঁকে বাঁকে বিচ্ছিন্নভাবে দ্বীপের সৃষ্টি হতে থাকে। বর্তমান পদ্মা ও গড়াই সংলগ্ন অনেক গ্রামের আগে বা পরে পরিচয়াত্মক শব্দ চর থাকলেও প্রাচীনকালের উত্থিত চরাঞ্চল জনপদ চরের পরিচয়ে পরিচিত হত না। নদী মরে গেলে নাল, খাল, বিলে পরিনত হয়। এ কারণে অনেক গ্রামের নামের পরিচয়ে নাল, খাল, বিল, ঝিল, হাওড়, বাওর দেখা যায়। অনেক নামের পরে বা পূর্বে মাছের নাম, পাখির নাম, পশুর নামও দেখা যায়। তবে জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচায়ত্মক বিশেষত্ব হল অনেক বেশি গ্রামের নামের পরিচয়ে পুরের ব্যাবহার। তুলনামূলক যশোর খুলনাতে খালি, কাটি, কাটা, দহ, চর, চক, তলা, তলী, গাছা, গাছি বেশি দেখা যায়।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে রাজবাড়ি জেলার পুর দিয়ে গ্রামের নাম বেশি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিম্নরুপ হওয়ায় বিষয় যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়। প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠার বিষয়ে বলা যেতে পারে রাজবাড়ি জেলার প্রাচীন উত্থিত এবং দ্বীপসমূহ রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি, আড়কান্দি, নলিয়া, জামালপুর, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদি, রামদিয়া, রাজধারপুর, বসন্তপুর, সুলতানপুর, পাংশা, নারায়নপুর অঞ্চলসমূহ।

এসব প্রাচীন জনপদের পদ্মা, হড়াই, গড়াই, চন্দনা, কুমার, কাজলী, সুতা, ফুরসুলা নদীর বাঁকে উত্থিত দ্বীপের ও চরের অঞ্চলে প্রাচীন বসতি গড়ে ওঠে। এ সব অঞ্চলে জনপদ গড়ে ওঠার ফলে ধীরে ধীরে প্রাচীন গ্রাম প্রাচীন ব্যবহৃত পুর, কান্দি, দি, দিয়া, দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ যোগ হয়েছে।

পুর পরিচিতি

পূর্বেই বলা হয়েছে পুর শব্দের অর্থ জননিবেশ। পুর পরিচয়ে বেশিরভাগ গ্রাম অপেক্ষাকৃত পুরাতন বসতির গ্রাম। জেলার এসব খ্রিস্টীয় ২/৩য় শতক থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয়।

রাজবাড়ি সদর

বিনোদপুর, চকৃকেষ্টপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, ভবানীপুর, ইন্দ্রনারায়ণপুর, কালীচরণপুর, কল্যাণপুর, শিবরামপুর, রাধাকান্তপুর, বসন্তপুর, লক্ষীপুর, রাজাপুর, চাঁদপুর, কৃষ্ণপুর, রামচন্দ্রপুর, জয়রামপুর, উদয়পুর, কমলাপুর, খানখানাপুর, দর্পনারায়ণপুর, গৌরীপুর, মধুপুর, রুপপুর, রামপুর, রামকান্তপুর, বাসুদেবপুর, মহাদেবপুর, গোপালপুর, ভবানীপুর জগৎপুর, রাজেন্দ্রপুর, আহলাদীপুর, আলীপুর, বারবাকপুর, রঘুনাথপুর, মোহাম্মদপুর, নিজাতপুর, কাসিমপুর, সুলতানপুর, নুরপুর ইত্যাদি।


পাংশা উপজেলা

নারায়নপুর, বলরামপুর, গোপীনাথপুর, জয়কৃষ্ণপুর, কল্যাণপুর, কেশবপুর, রঘুনাথপুর, রামচন্দ্রপুর, শ্রীকৃষ্ণপুর, তারাপুর, গৌরীপুর, তেজপুর, কোমরপুর, শ্যামসুন্দরপুর, কাঞ্চনপুর, মনিরামপুর, নিভাকৃষ্ণপুর, শ্যামপুর, কাশিমপুর, চাঁদপুর, গতমপুর, বাঘাবিষ্ণুপুর, গোপালপুর, রঘুনাথপুর, নিশ্চিন্তপুর, তির্তীপুর, লক্ষীপুর, রায়পুর, শিবসুন্দরপুর, বাহাদুরপুর, বকশিপুর, শাহমতিপুর, জাফরপুর, নিয়ামতপুর ইত্যাদি।

বালিয়াকান্দি উপজেলা

নিশ্চিন্তপুর, আজীনারায়ণপুর, রায়পুর, শ্যামসুন্দরপুর, সোনাপুর, করমচাঁদপুর, নারানপুর, রাজধরপুর, দুর্গাপুর, বহরপুর, নবাবপুর, গোবিন্দপুর, জামালপুর, শাশাপুর, গঙ্গারামপুর, সদাশিবপুর, ত্রিলোচনপুর ইত্যাদি।

 গোয়ালন্দ উপজেলা

বিষ্ণুপুর, গোপীনাথপুর, দুর্গাপুর, লক্ষীমানপুর, জয়পুর, শ্যামপুর, শীতলপুর, দেবীপুর, সাইদুরপুর, কাজিমপুর ইত্যাদি। পার্শ্ববতী জেলাসমূহ বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহ থেকে রাজবাড়ি জেলার গ্রামসমূহের নামের পরিচয়ে পুরের আধিক্য রয়েছে। আবার এসব গ্রামগুলোর নাম মানুষের নামে এবং তাদের ধমীয় পরিচয় হিন্দু। এলাকাটি প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু প্রধান হওয়ায় মোগল শাসনের পূর্ব কালেই ঐ সব গ্রামের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তুলনামূলক মুসলমান পরিচয়ে পুরের গ্রাম কম হওয়ায় ধারণা করা যায় ঐ সকল গ্রামের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীতে।

দি, দিয়া, রিয়া, বাড়িয়া - সহ গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

ভবদিয়া, মধুরদিয়া, পাকুরিয়া, চৌবাড়িয়া, গোপীনাথদিয়া, জালদিয়া, নয়নদিয়া, আড়াবাড়িয়া, বাঘিয়া, দৌলতদিয়া, হামুরিয়া, কান্তাদিয়া, নয়নদিয়া, কুলটিয়া, গজারিয়া, আমবাড়িয়া, বোয়ালিয়া, মাসুমদিয়া, পাকাশিয়া, ভেল্লাবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, নাদুরিয়া, ডামকদিয়া, সূর্যদিয়া, ভারকুদিয়া, কলকলিয়া, পিপুল বাড়িয়া, মুকুন্দিয়া, ঘরঘরিয়া, কুলটিয়া, পাটুরিয়া, বেড়াদি, পদমদি, তেঘারিয়া, আলোকদিয়া, ভেকুলিয়া, রামদিয়া, পদমদি, লক্ষণদিয়া, পাঁচবাড়িয়া, কোলাবাড়িয়া, খালিয়া, ভারকুলিয়া, গঙ্গাসিন্দদিয়া, ধুবাড়িয়া, তেলিগাতি, কলকলিয়া, পাঁচুরিয়া, মধুরদিয়া, মাসুমদিয়া, মালিয়াট, আলোকদিয়া, হাড়োয়া, রতনদিয়া, আন্দুলিয়া, প্রেমাটিয়া, দেলুয়া, ইন্দুরদি, ভান্ডারিয়া, তেলাই, কান্তদিয়া, দৌলতাদিয়া ইত্যাদি।

দ্বীপ ও নদী সংলগ্ন এলাকাকে দি বা দিয়ারা বলা হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ফরিদপুর জেলার নদী সংলগ্ন এলাকায় নতুন ভূমি রাজস্ব আদায়ের আওতাভূক্ত করে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। ১৮৮১ সালে দিয়ারা সার্ভেতে মোট ২৮৭৮৮ একর জমি দিয়ারা হিসেবে খাজনার আওতায় আনয়ন করা হয়। এই দিয়ারা থেকে অনেক গ্রামের নামের পরিচতি দিয়া বা দি এবং অপভ্রংশে রিয়া, লিয়া, ইত্যাদি হয়। জেলার বেশির ভাগ অঞ্চল নদীবেষ্টিত হওয়ায় নদী সংলগ্ন জেগে ওঠা ঐ সমস্ত চরদ্বীপের পরিচিতি হিসেবে ‘দি’ দিয়া, রিয়া, ইত্যাদি নামের গ্রামের উৎপত্তি ষোড়শ শপ্তদশ শতকে গড়ে ওঠে।


কান্দা, কান্দি দিয়ে গ্রামের নাম

প্রবাহমান নদীর কিনার, বাঁক এবং বিল হাওড়ের পার্শ্বস্থ এলাকাকে কান্দা, কান্দি, কিনার বলা হয়। জেলায় অনেক নদী প্রবাহমান ছিল। বিশেষ করে পদ্মা, হড়াই, গড়াই ও চন্দনার তীরবর্তী অঞ্চলে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তা কান্দ, কান্দি নামে পরিচিত হয়। উড়াকান্দা, সোনাকান্দর, আড়কান্দি, বালিয়াকান্দি, তেরাইকান্দি, কালিকান্দা, শ্যামপুরকান্দি, লিকান্দা। কান্দা পরিচিতিমূলক শব্দ হলেও আড়, পাইক বালি অর্থ যেমন পাইক অর্থ পাখি, আড় অর্থ নদীর বাঁক, বালি অর্থ বেলে চর বোঝায়।

বাড়ি, বাড়িয়া, নগর, গ্রাম, পাড়া দিয়ে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

গ্রামের তিত্তি গড়ে উঠলে তা বাড়ি, বাড়িয়া, গ্রাম, নগর এসব নামে পরিচিত হতে থাকে। টেংড়াপাড়া, আড়পাড়া, গোয়ালবাড়ি, বিষ্ণুবাড়ি, পাঁচবাড়ি, চরকান্দবাড়ি, দক্ষিণবাড়ি, দক্ষিণবাঘাবাড়ি, পশ্চিমবাঘাবাড়ি, পাটকিয়াবাড়ি, আমবাড়িয়া, পাঁচবাড়িয়া, দেবনগর, কালিনগর, ভেল্লাবাড়িয়া, রায়নগর, বনগ্রাম, দন্ডগ্রাম, চৌবাড়িয়া, জাগিয়ালপাড়া, পিপুলবাড়িয়া, দেওবাড়ি, কোলানগর, ছায়েদপাড়া, হাজরাপাড়া ইত্যাদি।

খাল, খালিয়া, কালিয়া, কোলা দিয়ে গ্রাম

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ যত নদী এখন আছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি নদী ছিল ৫০০ বা একহাজার বছর পূর্বে। নদীর বিশেষত্ব এমন যে, দীর্ঘকালে নদী ভরাট হয়ে মরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মরা নদী দীর্ঘকালে খালে পরিণত হয়। নদীতে অনেক সময় প্রয়োজনে খাল কাটা হয়। নদী বাঁক গ্রহণ করলে কোলে পরিণত হয়। খাল সংলগ্ন অনেক গ্রামের নাম খাল, খালিয়া, কোলের পাশের গ্রাম কো বা কালিয়া বা কোলা। হাজরাখালি, কান্তখালি, খালিয়া, বেজকোলা, সুরামখোলা, হিম্মতখালি ইত্যাদি।

বিল, ইল, ঝিল, হাওড়, দোহা, দহ পরিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

নদী মরে গেলে বিল হাওড়, দহ দোহাতে পরিণত হয়। বিলমালেঙ্গা, বিলশ্যামসুন্দরপুর, বিলসারিন্দা, বিলচৈত্রা, বিলকোনা, বিলগজারিয়া, বিলজেলা, বিলরঘুয়া, বিলছালুয়া, বিলধামু, বিলটাকাপুড়া, চষাবিলা, বিলকাউলী, বিলবড়া, ইলাতেল, লবরদোহা, বাউলদোহা, মুচিদহ, বিলচড়া, মরাবিলা ইত্যাদি। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণাঞ্চলে অনেক সংখ্যক বিস্তৃত বিলের অস্তিত্ব ছিল। তেঢালা, গজারিয়া, পাকুড়িয়া, কাছমিয়া ইত্যাদি বিস্তৃত বিলের অঞ্চল ভর অঞ্চল বলে পরিচিত। এসব বিলের শাপলা শালুক এক সময়ে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলাবৈচিত্র বহন করত।

মাছ, পাখি, পশু, ফল, বৃক্ষ, ফসলের পরিচিতিতে গ্রামের নাম ও উৎপত্তি

গ্রাম সমাজের বিকাশের ধারায় যখন মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে থাকে তখন তা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের পরিচিতিতে নামকরণ হতে থাকে। ঐসব বিষয়ের আধিক্যহেতু ঐ সকল নামে গ্রাম পরিচিতি হয়। মহিষ-মহিষবাথান, মহিষাখোলা, বেজি-বেজকোলা, গরুপালন-ঘোরপালান, হরিণধর-হরিণধারা, আখমাড়াই - আগমারাই, নিম- নিমতলা, কৈ-কৈজুরি, খলিশা-খালিশা, পাঙ্গাস-পাঙ্গাশিয়া, শোল-শৈালকাঠি, বোয়াল-বোয়ালিয়া, শিং-শিঙ্গা, ঘুঘু-ঘুঘুশালি, বাঘ-বাঘমারা, গজার-গজারিয়া, পাট-পাটবাড়িয়া, টেংড়া-টেংড়াপাড়া, আম-আমবাড়িয়া, ভেল্লা- ভেল্লাবাড়িয়া, বাঘ-বাঘাবিষ্ণুপুর, ধান- ধানুরিয়া, ঝাউগাছ-ঝাউগ্রাম, হলুদ-হলুদবাড়িয়া, মাছ-মাছপাড়া, বেত-বেতবাড়িয়া, বাওই-বাওইখোলা, আখ- আখরজানি, বড়ই-বরইচারা, সরিষা, সরিষা, শামুক-শামুকখোলা, হাতি-হাতিমোহন, বন-বনগ্রাম, ইন্দুর-ইন্দুরদি, মাগুর-মাগুরাডাঙ্গী ইত্যাদি।


গ্রামের নাম বাঘ, হরিণ, দিয়া, গ্রামের নামকরণের পেছনে এলাকার প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। সে সাথে একসময় বনজঙ্গলে ঘেরা রাজবাড়ি এলাকায় এসব পশুর বসবাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। বলা যায় সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ২০০০ শতকের মাঝামাঝিতে বন্য শুকরের বসবাস ছিল বিভিন্ন এলাকায়। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর ১২ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৮৬০ সালের দিকে যখন কুষ্টিয়া থেকে পদমদি যাতায়াত করতেন সে বর্ণনা তাঁর লেখা ‘আমার জীবনীগ্রন্থ’ এ পাই। আমার জীবনী গ্রন্থে তিনি চন্দনা নদীর তীরবর্তী বাঘের বসবাসের কথা লিখে গেছেন। যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের অঞ্চলে হরিণের বসবাস সকল স্থানেই দেখা যায়। তাই সে সময় হরিণও এলাকায় বসবাস করত। এ ছাড়া বন্য হাতি, মহিষও বসবাস করত। রাজবাড়ি জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চল বিশেষ করে চন্দনা নদী এলাকাই ছিল এদের বসবাসের আড্ডাখানা। কালক্রমে ওসব বন্য প্রাণী দক্ষিণে সরে গিয়ে বর্তমানে সুন্দরবনে স্থান করে নিয়েছে। পাঙ্গাস, ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, শিং, খলিশা এসব নামের গ্রাম মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের নিদর্শন। এসব নামের সাথে গ্রামের প্রাচীনত্ব নির্দেশ করে। এ সব গ্রামের সৃষ্টি ৫০০ বৎসরের বেশি বলে ধারণা করা যায়।

ডাঙ্গা অপেক্ষাকৃত উচু ভূমি। বিস্তৃত মাঠের দিকে তাকালে দেখা যাবে সকল স্থানের ভূমি একই সমতল নয়। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। পানির সমতল থেকে উঁচু ভূমিকে ডাঙ্গা আবার চাষযোগ্য অপেক্ষাকৃত উচু ভূমিকে ডাঙ্গী বলে। অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিতে যে সব গ্রাম উঠেছে তা ডাঙ্গা বা ডাঙ্গী দিয়ে গঠিত হোগলাডাঙ্গী বেড়াডাঙ্গা, মৃগিডাঙ্গা, বহলাডাঙ্গী ইত্যাদি গ্রামের নাম।

মাজেদ সরকার গ্যালারী

Additional information