প্রাচীন জনপ্রবাহ

দ্বিতীয় অধ্যায়

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন

রাজবাড়ি অঞ্চলে কবে? কোথায় প্রথম জনবসতি গড়ে উঠেছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে বঙ্গে জনপ্রবাহের আলোকে রাজবাড়িতে জন প্রবাহের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১০ লক্ষাধিক লোকের বাস। এই জনপ্রবাহের পূর্বপুরুষরা কখনো এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে থাকবে। মানুষের ইতিহাস বহু বছর পর্যন্ত প্রাঙনরের (Hominids) ইতিহাস। চীন, জাভায়, টাঙ্গানিকায়, পূর্ব জার্মানীতে এদের করোটি ও নানাবিধ চিহ্ন পাওয়া গেলেও বাংলায় এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন প্রস্তর থেকে নব্য প্রস্তর তা থেকে ক্রমে ব্রঞ্জ ও ইস্পাতের যুগ এসেছে। এর অতিক্রমণ কাল প্রায় ২ লাক বছর। ভারতে প্রাচীন বা নব্য প্রস্তর যুগের তেমন নির্দশন পাওয়া যায় না। তবে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে ১৯৬৩-৬৪ সালে পান্ড্র রাজার ঢিবি আবিস্কৃত হয়। যেখানে নব্য প্রস্তর যুগের সন্ধান মেলে। এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের তাম্র সভ্যতার যুগ।

বাংলার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে পন্ডিতগণ বাংলায় যে সমস্ত জাতিকে বর্তমান বাঙালিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন তার নিগ্রোবটু, আদি অষ্ট্রালয়েড, আদি নরডিক, আদি ভোটচীন গোষ্ঠীর মানুষ। নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং আদিম অধিবাসী যাদের মধ্যে জনের প্রভাব বেশি নৃতত্ত্ববিদগণ তাদের আদি অষ্ট্রালয়েড বলে নামকরণ করেছেন। পন্ডিতগণ মনে করেন এই জন এক সময় মধ্যভারত হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া আলপেনীয় নিগ্রোবটু, ভোটচীন, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষও প্রাচীন বাংলার আদিবাসী। আদিমতম স্তরে আদি অস্ট্রেলিয় তারপর দীর্ঘমুন্ডু ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, গোলমুন্ড আলপেনীয়, দীনারীয় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষ উত্তর ভারতের আদি নরডিক বা আর্যজাতীয় ধারার মিলনে গাঙ্গেয় প্রদেশের এই বাংলায় খ্রিস্টপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ থেকে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে ভারতে আর্য আগমন ঘটলেও আদি অস্ট্রেলিয়, নিগ্রোবটু, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর কৌম সমাজের মানুষেরা বসবাস করত এরও পূর্বে।

প্রাচীন বাংলার জনপ্রবাহের তেমন কোনো নিদর্শন নাই। তবে জনপ্রবাহের কিছু সংবাদ পাওয়া যায় বেদপুরাণ, মহাভারত গ্রন্থ, আলেকজান্ডার, টলেমির বর্ণনা এবং বিভিন্ন লিপি ও পট্রলী সংবাদ থেকে। ঐতরিয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধায়ন ধর্মসূত্রে বঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পুরানে দেশ সমূহের তালিকায় অঙ্গ, বিদেহ, পুন্ড্র ইত্যাদির সঙ্গে বঙ্গ যোগ করা হয়েছে। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গ কথাটি অনেকের মতে বঙ্গা থেকে এসেছে। বঙ্গাকৌম অর্থে বঙ্গাজনা। এভাবে বঙ্গা, রাঢ়, গৌড়, অর্থাৎ বঙ্গাজনা, রাঢ়াজনা, গৌড়াজনা। উপরোক্ত সূত্রগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। মহাভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বা ভূভাগের নাম দেওয়া আছে তা থেকে মনে হয় বঙ্গ একটি পূর্বাঞ্চলীয় দেশ যার অবস্থিতি ছিল অঙ্গ, সুম্ম, তাম্রলিপ্তি, মগধ এবং পুন্ড্রের কাছাকাছি। কালিদাসের রঘুবংশের রঘুর দিগ্বিজয়ের কথায়---- গঙ্গাস্রোত হন্তারেষু। তার ব্যাখ্যায় সকলে স্বীকার করেন যে, এর অর্থ গঙ্গাস্রোত অন্তর্বর্তী ভূভাগ অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বে এবং পদ্মার দক্ষিণে ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, নদিয়া অঞ্চল নিয়েই প্রাচীন বঙ্গ। আলেকজান্ডার ও খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতীয় শতকে টলেমির বর্ণনায় যে গঙ্গারিডি জাতি ও রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এই গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলকেই বোঝায়। এ জাতির ছিল ৬ হাজার রণহস্তী এবং জাতিটি ছিল পরাক্রমশালী। বিভিন্ন লিপি, পট্রলী প্রত্মতাত্ত্বিক আবিস্কার ও ঐতিহাসিক যুক্তি প্রমাণে বারক মন্ডল, কুমার তালক মন্ডল ও নব্য কাশিকার সভ্যতার স্পষ্ট প্রমাণাদি পঞ্চম শতক থেকে আরম্ভ হয়েছে।

Additional information