প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২

ঢাকার আশ্রাফপুর, শরিয়তপুরের ইদিলপুর, নব্যকাশিকা বা কোটালীপাড়া, বারক মন্ডল, পদ্মা স্মতট কুমার তালক মন্ডলে জনপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যীকরণ আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। আর্যীকরণের প্রক্রিয়ায় অষ্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, নিগ্রোবটু আদিম গোষ্ঠীর মানুষ ধীরে ধীরে নব উত্থিত বঙ্গের দিকে সরে আসে এবং ইতর জীবন যাপন করে। এরা বিভিন্ন কৌমভূক্ত জাতি। মহাভারতে বাংলার বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতিকে মেলেচ্ছ বলা হয়েছে। বোধায়নে পুন্ড্র (উত্তর বঙ্গ) প্রভৃতি কৌমদের অবস্থিতি নির্দেশ করা হয়েছে। আর্যবহির্ভুত প্রান্তসীমায় বৌদ্ধ আর্যমুঞ্জুলিকা গ্রন্থে গৌড়, সমতট ও হরিকেলের ভাষাকে অসুর ভাষা বলা হয়েছে। আর্যরা এদের দস্যু, পাপ, মেলেচ্ছ প্রভৃতি উন্নাষিকতায় চিহ্নিত করেছে। প্রাচীন বাংলার এ অঞ্চলে আদি অষ্ট্রালয়েড, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বসবাস খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হতে পারে। পুন্ড্রের উত্থান অপেক্ষকৃত বঙ্গের সমতটীয় অঞ্চলের অনেক পূর্বে হওয়ায় তাদের আগমন ঐ অঞ্চলে পূর্বে শুরু হয়। রাজবাড়ি অঞ্চল সমতটীয় অঞ্চল হলেও ভৌগোলিক কারণেই এর উত্থান দক্ষিণাঞ্চলের পূর্বে। যে কারণে এ অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর কৌম সমাজের বিস্তার ঘটতে পারে। আর্যীকরণের পর বর্ণভেদের উদ্ভব হয় আর বর্ণাশ্রমের বাইরে তৎকালীন কৌম সমাজের মানুষের পরিচয় হয় চন্ডাল, চাঁড়াল, বাউরি, ঘট্রজীবী, ঢোলবাহি, মালো, হাড্ডি, বাগদি। প্রাচীন নিগ্রোবটু ও অষ্টিকজাতির সমকালে কিছু দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে এবং সভ্যতায় উন্নত বলে অষ্ট্রিকজাতিকে গ্রাস করে। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণে বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে অধিবাসীদের প্রায় ৯৮% শূদ্র পর্যায়ের। এদের শরীরের রং তামাটে পীতবর্ণ। আচার আচরণে হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণ থেকে আলাদা। এদের মুখন্ডল প্রশস্ত হলেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নাক কিছুটা দাবা। রাজবাড়ির সার্বিক জনপ্রবাহে প্রশ্ন আসে তাদের সংখ্যা এখানে এত বেশি কেন? অনেকের ধারণা পালশাসনের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহে যে বিপুল সংখ্যাক কৈবর্ত এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এরা তাদেরই একটি অংশ। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন নিগ্রোবটু ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, সোনাইকুড়ী, আড়কান্দি, বাগদুল অঞ্চলের শুদ্রদের থেকে এরা আলাদা। রাজবাড়ি জেলার কালুখালির উত্তরে বর্তমানে পদ্মার পাড় এলাকায় প্রকীর্থ বলে একটি গ্রাম আছে। উক্ত গ্রামে ২০/২৫টি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করে। এদের চেহারা সম্পূর্ণ পীতবর্ণ এবং আচরণ সাঁওতাল জাতীয়। ধারণা করা যায় এরা আদি অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর লোক।

দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায় এদের মধ্যে পুর, উর, দিয়া, দির ব্যবহার ছিল। পুর, পুরপাল বা নগরপাল। যে সমস্ত গ্রামের শেষে পুর রয়েছে তা অপেক্ষাকৃত পুরাতন জনের বাসস্থান। রাজবাড়ির পুর দিয়ে গ্রাম বিনোদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, সজ্জনকান্দা, বেড়াডাঙ্গা থেকে বেশি পুরাতন। রাজবাড়ি জেলার সোনাপুর, বহরপুর, চন্ডিপুর, মধুপুর, নিশ্চিন্তপুর, তারাপুর, মদাপুর, কালিকাপুর এরুপ অসংখ্য পুরের গ্রাম। এ পুরের বেশির ভাগ গ্রামই অনেক পুরাতন। ধারণা করা যায় এক সময় এ অঞ্চলে প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ব্যবহৃত পুর থেকে েএত পুরের ব্যবহার এসেছে। তা ছাড়া পদমদি, রতনদিয়া দি, দিয়া দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ। রাজবাড়ি জেলার পশ্চিমে বাগদিপাড়া ছিল। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে বাগদি, ডোলবাহী, মুচি, চন্ডাল চাড়ালের আধিক্য রয়েছে। প্রকৃত অর্থেই এরা আদি কোমজনের উত্তরসুরী এবং আদি গোষ্ঠীর জন। রাজবাড়ি অঞ্চলে কৌম কথাটি বহুল প্রচলিত। প্রাচীন কৌম জনা বা বিভিন্ন কৌমভুক্ত মানুষের প্রাচীন ব্যবহৃত এ কথাটি এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন লিপি ও পট্রলী থেকে পাওয়া সংবাদে এ অঞ্চলে সপ্তম, অষ্টম শতকের জনপ্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব পট্রলী বাংলায় পাওয়া গেছে ঐগুলির দু’ একটি থেকেও রাজবাড়ি জেলার জনসংবাদ পাওয়া যেতে পারে। খ্রিস্টোত্তর পঞ্চম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত পট্রলীগুলি ভূমিদান বিক্রয়রীতির বিষয়।

Additional information