প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-১২

মোগল বাদশাগণের সময়ে বাদশাহের প্রতিনিধি স্বরুপ মুসলমান নবাব দ্বারা বঙ্গদেশ শাসিত হত। তবে দেশ রক্ষা ও সাধারণ প্রজাদের রক্ষাণাবেক্ষণের ভার দেশীয় জমিদারগণের উপরই নির্ভর করত। এ কারণে প্রত্যেক জমিদারের অধীনেই পদাতিক, অশ্বরোহী, নৌযান, সদা প্রস্তত থাকত। আইনী আকবর গ্রন্থ থেকে জানা যায় বাদশা আকবরের রাজত্বকালে স্বদেশীয় জমিদাররা ২৩৩৩০ জন অশ্বারোহী, ৮০১১,৫০ জন পদাতিক ১৭০টি হস্তী, ৪২৬০টি কামান এবং ৪৪০০ নৌকা সম্রাটের জন্য সদা প্রস্তত রাখতেন। আকবরের রাজত্বকালে অনেক জমিদারই তাঁর আজ্ঞা শিরোধার্য বলে বিবেচনা করত। কিন্তু দ্বাদশ ভৌমিক তার বিরুদ্ধাচরণ কেন করল সে প্রশ্নে ইতিহাসবিদদের অভিমত বাদশাহের কর্মচারীদের সাথে তাদের বনিবনাও হত না। এছাড়া পরাজিত পাঠানদের অনেকই তাদেরকে উত্তেজিত করত। উররোরণ্ড টোডর মলের অন্যায় বন্দোবস্ত ভূ্ম্যাধিকারীদের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভূষণার মুকুন্দরাম এমনি একজন সাধারণ জমিদার মুকুন্দরামের পূর্ব পুরুষের বিষয়ে আনন্দনাথ এর অভিমত চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের পূর্ব পুরুষ যে সময় বিক্রমপুর আগমন করেন সে সময়ই মুকুন্দ রামের পূর্ব পুরুষেরা ফতেহাবাদ আগমন করেন। বিক্রমপুরের রায়রাজগণ, চন্দ্রদ্বীপের রাজরাজাগণ, ফাতেহাবাদের রাজরাজাগণ সকলেই উপাধিধারী কায়স্থ ছিলেন। বখতিয়ার খলজি যখন বাংলাদেশ আক্রমণ করেন অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন সেই সময় বাকলা চন্দ্রদ্বীপের ধনুজমর্দন রায়ের বংশাবলীর অনেকে পূর্বে বঙ্গের অনেক স্থানে জমিদারী সৃষ্টি করলে তারা নানা সম্প্রদায়ের বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে ‘ভূষণা পট্রি বলয়া’ একটা সাধারণ সমাজের সৃষ্টি হয়। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ মধ্যে ‘ভূষণা পট্রি বলায়’ এক সম্প্রদায়ের বর্তমান দেখা যায়। এই রাজবংশের উৎসাহে ভূষণার বিবিধ প্রকারে শিল্পকর্মের উৎকর্ষ সংগঠিত হয়। ভূষণা বর্তমান মধুখালির অন্তর্গত। ভূষণা বিভাগের বিশেষ করে বালিয়াকান্দি অঞ্চলের উৎপাদিত কার্পাস, পাট, ইউরোপে রপ্তানি হত। ফাতেহাবাদের স্থপতিরা এক সময় যাবতীয় নির্মাণ কাজ করত।ভূষণার কাঁসা পিতল বিখ্যাত ছিল। এ অঞ্চলে রেশম, মসলা, পান সুপারি, খয়ের, তিল, তিসি কার্পাস, জাফরান ইত্যাদি ব্যবসা জমজমাট ছিল। এই স্থানেই মুকুন্দরাম জমিদারী গড়ে তোলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফাতেহাবাদ আক্রমণ করলে মুকুন্দ রায় মোগলদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এতে মানসিংহ সন্তুষ্ট হয়ে মুসলমানদের অন্য কোনো শাসনকর্তা নিয়োগ না করে মুকুন্দ রায়কে রাজোপাধি অর্পণ করে তাঁকে ফাতেহাবাদের শাসনভার অর্পণ করেন।

মোরাদ খানের মৃত্যুর পর মুকুন্দরাম মোরাদের পুত্রগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সমগ্র ফতেহাবাদের রাজা হন। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী টোডরমল মুকুন্দরামকেই ভূষণার জমিদার বলে স্বীকার করেন (১৫৮২)। মুকুন্দরাম মাঝেমধ্যে নামে মাত্র পেশকাম পাঠিয়ে দিল্লী সম্রাটের অধীনতার ভান করতেন। কিন্তু কার্যত তিনি ছিলেন স্বাধীন। আকবরের রাজত্বকালের শেষে বার ভূঁইয়াদের বিদ্রোহকালে বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন। প্রতাপাদিত্য ও কেদার রায়ের রাজ্য উৎসন্নে গেলেও মুকুন্দরাম দমিত হন নাই। জাহাঙ্গীরের সময় ইসলাম খাঁ (১৬০৮) বঙ্গের শাসনকর্তা হয়ে আসলে তিনি মুকুন্দরামের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং তার অধীনে একদল সৈন্য পাঠিয়ে কোষহাজো (আসামের কামরুপ) অধিকার করেন। মুকুন্দরাম তখন গৌরহাটি ও পুণ্ড্রর থানাদার নিযুক্ত হন। পরে তিনি তার পুত্র ছত্রাজিতকে রেখে ভূষণায় ফিরে আসেন। এসময় তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে নামমাত্র পেশকামও বন্ধ করে দেন। মানসিংহের সময়ে সৈয়দ খাঁ যখন বঙ্গের শাসনকর্তা তখন সৈয়দ খাঁর সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতে মুকুন্দরাম নিহত হন। এরপর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগল বশ্যতা স্বীকার করেন।

Additional information