প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-১৩

অধ্যাপক যদুনাথ সরকার কর্তৃক আবিস্কৃত আব্দুর লতিফের ভ্রমণ কাহিনী বিষয়ক গ্রন্থ থেকে জানা যায় ইসলাম খাঁ ঢাকার যাবার পথে ভূষণার রাজা ছত্রাজিতকে কয়েকটি হাতি উপহার দিয়ে নবাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নবাব পুনরায় কোষহাজো অধিকার করার জন্য যে সৈন্য প্রেরণ করেন তার সাথে ছত্রাজিত ছিলেন। ছত্রাজিত কোষহাজোর রাজ ভ্রাতা বলদেবের সাথে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে মোগলদের গতিবিধি জানানোর কারণে বন্দি হয়ে ঢাকায় আনিত হন এবং নিহত হন (১৬৩৬)।

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি

বঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ধারায় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় পাল ও সেন রাজাদের শাসনের পর বঙ্গ ধীরে ধীরে মুসলিম শাসনাধীন হয়। ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় থেকে শুরু হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাবই সিরাজ-উদ-দৌলার পতন পর্যন্ত বঙ্গে মুসলিম শাসনকাল স্থায়ী হলেও সমগ্র বঙ্গে  মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা। গৌড় অধিকার করেই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হয় নাই, বঙ্গ অধিকার করতে তাদের অনেকদিন লেগেছিল। খিলজীর পরবর্তী পাঠান রাজারা দেশীয় জমিদার ও প্রজার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এ ছাড়াও তারা দিল্লীর সম্রাটদের সন্তুষ্ট রাখতে ব্যাস্ত থাকত। দিল্লীতে সুলতান মইজুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বংধরগণ বাংলাদেশ শাসন করেন। তাদের মধ্যে প্রথম সুলতান বুঘরা খান ১২৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১২৮৭ পর্যন্ত ছয় বছর ধরে লক্ষ্ণৌতে দিল্লীর শাসনকর্তা হিসেবে শাসন করেন। কিন্তু সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সুচনা। এ যুগেই মুসলমান রাজাদের ইতিহাস বাংলার ইতিহাসের অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সময় সমগ্র বাংলাদেশ চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয় যথা লক্ষ্ণৌতি, সাতগাঁও সোনারগাঁ, চাটিগাঁও (চট্রগ্রাম)। এ সময় শক্তি, সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সোনারগাঁ লক্ষ্ণৌতিকে অতিক্রম করে। তবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি ১৪০ বছর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করলেও সমগ্র বাংলা তাদের করায়ত্ব হয় নাই। খণ্ডিতভাবে সুলতানদের দ্বারা বাংলা শাসিত হত। শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১৩২২) কেবল পূর্ববঙ্গ অধিকার করতে সমর্থ হন।

এরপর ১৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ পূর্ববঙ্গে এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পশ্চিমবঙ্গে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে ইলিয়াস শাহ সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন নৃপতি হন। এই সময় থেকেই সমগ্র বাংলাদেশ ‘বাঙলা সবে’ বা ‘সুবে বাঙলা’ নামে আখ্যায়িথ হয়। ১৩৫৮ সালে তাঁর মুত্যুর পর নানা অরাজকতা শুরু হয়। বস্তুত বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলে বিশেষ করে মোগল সম্রাট আকবরের বঙ্গ বিজয়ের (১৫৭৬) পূর্ব পর্যন্ত পাঠান, আফগান সুর করবানী বংশীয় শাসনকালে স্থানীয় জমিদার, প্রভাবশালী বীর সেনানায়কদের দ্বারা সুলতানগণ প্রায়শঃই প্রতিবাদের সম্মুখীন হতেন। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে দাউদ খান করবানীর পরাজয় ও হত্যার ফলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। কিন্তু বিশ বছর যাবৎ মোগলদের রাজ্য শাসন এদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলায় একজন মোগল সুবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়টি সেনানিবাস স্থাপিত হয়েছিল। কেবলমাত্র রাজধানী ও সেনানিবাসের জনপদগুলো মোগল মেনে চলত, অন্যত্র ব্যাপক অরাজকতা ও বিশৃংখলা চরমে পৌছেছিল। আফগান সৈন্যরা লুটতরাজ করত এবং মোগল সেনারাও এভাবে অর্থ উপার্জন করত। বাংলার বড় বড় জমিদারগণ করবানী রাজত্বের অবসানের পর নিজেদের জমিদারীতে স্বাধীনতা অবলম্বন করেন।

Additional information