প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-১৭

আমি আনন্দনাথের উক্ত উপকরণগুলি, তৎসহ সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস, এল এন মিশ্রের বাংলার রেলভ্রমণ, যগেন্দ্রনাথ মিত্রের বিক্রমপুরের ইতিহাস এবং স্থানীয় কিছু প্রাচীন দলিলপত্র এবং বাণীবহে সরেজমিনে তথ্য নিয়ে সংগ্রাম সাহর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করছি। মোগল রাজত্বের প্রারম্ভে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গ মগ, পর্তুগীজ ও ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের দ্বারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের একদল আরাকানবাসী মগ আর অপরদল ইউরোপের পর্তুগীজ জলদস্যু। তারা সন্দীপ থেকে পূর্বে মেঘনা ও পদ্মা নদীর তীর ধরে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তর করেছিল। কথিত আছে তাদের নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের নামানুসারে গোয়ালন্দের নামকরণ হয়। গঞ্জালেস গোয়ালন্দে আস্তানা গড়ে তোলে। পর্তুগীজ জলদস্যুরা এতই ভয়ানক ছিল যে, তারা মানুষ ধরে ইউরোপে চালান দিত এবং ধৃত মানুষের হাত ছিদ্র করে এক সাথে বেঁধে নৌকার খোলের মধ্যে মাছের সারির মতো রেখে দিত। বাদশা আকবর শাহবাজ খাঁ নামক একজন সুদক্ষ সেনাপতিকে দস্যু দমনের জন্য বাংলায় প্রেরণ করেন। সাহবাজ খাঁ মেঘনা নদীর মোহনায় সেনানিবাস গড়ে ঐ স্থানের নাম রাখেন শাহাবাজপুর। অতঃপর বাদশা জাহাঙ্গীর এর সাথে বাংলায় বারভূঁইয়াদের মনোমালিন্য ঘটে। এই সুযোগ আবার পর্তুগীজ, মগ জলদস্যুরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এরপর থেকে বাদশাহী সৈন্য মেঘনা নদীর মোহনায় নিয়ত অবস্থান করে মগ পর্তুগীজদের উৎপত্তি নিবারণ করত। উল্লেখ্য আওরঙ্গজেব বাংলায় একচ্ছত্র অধিপতি বলে পরিচিতি হন। বাদশা আওরঙ্গজেবের দস্যু দমনের ভার সেনাপতি সংগ্রাম সাহর উপর অর্পণ করেন। সংগ্রাম শাহ বাদশা কর্তৃক প্রেরিত হয়ে শাহাবাজপুর আগমন করেন। শাহাবাজপুরে তখন কোনো দুর্গ ছিল না, যাতে নিরাপদে সৈন্য রক্ষা করা যায়। এই জন্য সংগ্রাম সাহ সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন।

‘প্রায় দেড়শত বছর পূর্বেও মানুষ তাকে সংগ্রাম সাহর কেল্লা বলত। দস্যুদলের অপসারণ করিবার জন্য সংগ্রাম সাহ নানা স্থানে গড়বন্দি করিয়া সৈন্য রক্ষায় উপায় করিয়া লইলেন। পরে মগ ও পর্তুগীজদের প্রতিকূলে সৈন্য পরিচালনাপূর্বক তিনি তাহাদিগকে পরাস্ত করিয়া বঙ্গদেশ হইতে দূরিভূত করিয়া দেন। এই সময় চাঁদকরম নামে বৈদ্যবংশীয় অপর এক মহাত্মা সংগ্রামের প্রধান সহকারী ছিলেন। সংগ্রাম সাহ তাহার দ্বারা নানা বিষয়ে সহায়তাপ্রাপ্ত হন। সে যাহা হউক এই সকল কথা অচীরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট পৌঁছালে তিনি সন্তু হইয়া সংগ্রাম সাহকে পুরস্কারস্বরুপ ভূষণা, মাহমুদপুর ও চাঁদ রায়কে সাহাবাজপুরের পরগনার জমিদারী প্রদান করেন।’ (আনন্দনাথ রায়, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৭৯) সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস ৩৩৫ পৃষ্ঠায়---‘জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তৎপুত্র শাহজাহান বাদশা হইল। তিনি স্বীয় প্রিয় পাত্র কাশিম খাঁকে বাংলার নবাব করিয়া পাঠান (১৬২৮)। হুগলী প্রভৃতি স্থানের পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমন করাই তাহার শাসনের প্রধান কাজ। সম্ভবত এই সময়ে বা কিছু পূর্বে সংগ্রাম সিংহ নামক একজন মসনবদার বঙ্গে আসিয়াছিলেন এবং বঙ্গীয় নাওয়াড়া বিভাগে অধ্যাক্ষ হন। কীরুপে কাশিম খাঁর নাওয়াড়া ও অংসক্য স্থল সৈন্য সাড়ে তিনমাসকাল হুগলী অবরোধ করিয়া পর্তুগীজদিগকে পর্যুদস্ত ও উৎসন্ন করে, তা বঙ্গের ইতিহাসের একটি প্রধান ঘটনা। এই ঘটনার পর কাশিম খাঁর মৃত্যু হইলে সংগ্রাম সানাওয়াড়া মহলের অধ্যক্ষ হইয়া পূর্ববঙ্গে স্থাপিত হল। সংগ্রাম পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে অধিষ্ঠান করিয়া মগ ও ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের হস্ত হইতে ঢাকা অঞ্চল রক্ষা করিতেন। এই সময়ে তিনি নাওয়াড়ার প্রধান আড্ডা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গম স্থলে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। তার নাম হয় সংগ্রামগড়। তখন যমুনা নদী ছিল না। গঙ্গার প্রবাহ ছিল বর্তমান পদ্মা থেকে আরো উত্তরে। (এই নাওয়াড়া মহল তৎকালীন মানিকগঞ্জের দক্ষিণ এবং রাজাবাড়ি উত্তর অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়) যা হউক কাশিম খাঁর সময় হতে প্রায় ৩০ বছর কাল সংগ্রাম সিংহ পূর্ববঙ্গের নাওয়াড়া মহলের কর্তৃত্বে থাকিয়া মগ ফিরিঙ্গী প্রভৃতি দস্যু দমন করিয়াছিলেন।

Additional information