প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-১৮

এই কার্যের পুরস্কারস্বরুপ সত্রাজীতের মৃত্যুদণ্ডের পরে তিনি ভূষণা জায়গীরপ্রাপ্ত হন। জায়গীর প্রাপ্তির পর সংগ্রাম নিজ দেশে ফিরিয়া যাইবার কল্পনা ত্যাগ করে ভূষণার সন্নিকট মথুরাপুর নামক স্থানে বাসস্থান স্থাপন করেন। তিনি রাজার মতো রাজত্ব করিতেন। তাই মুসলমানি রীতিতে উপাধি হইয়াছিল শাহ। উহারই অপভ্রংশে সাহ হইয়া গিয়াছে। সংগ্রাম এদেশে কাজ করিবার ফলে এতদ্দেশীয় সমাজে প্রবেশ লাভ করেন।

এদেশে যখন কাম করতেই হইবে তখন সমাজের কোনো উচ্চ শ্রেণীতে প্রবেশ না করিলে চলে না। তিনি ক্ষত্রিয় ছিলেন, প্রবাদ আছে সংগ্রাম মথুরাপুরে আসিয়া স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করেন, এদেশে ব্রাহ্মণের নীচে কোনো জাতি? তার উত্তরে তাঁকে বলা হয় বৈদ্যই ব্রাহ্মণের পর শ্রেষ্ঠ জাতি। তখন তিনি বললেন ‘হাম বৈদ্য’ অর্থাৎ তবে আমি বৈদ্য। এরপর তিনি বৈদ্য সমাজের সাথে বৈবাহিক সূত্র স্থাপন করেন। সংগ্রাম সাহ পরে সালাস্কায়ন গোত্রসম্ভূত পরিচয় দিতেন। ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের ভট্রাচার্যগণ সংগ্রামের গুরুপদে জড়িত হতে বাধ্য হন। এখনো তাহাদিগের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমিবৃত্তির সনদ আছে। যশোহর কালেক্টরীতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রহ্মোত্তরের তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্যকীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত একটি উচ্চ দেউল বা মন্দির আছে। গল্প আছে, তিনি একটি বিগ্রহ নির্মাণের জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিন্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যু মুখে পতিত হয় বলিয়া সে পরিকল্পনা পরিত্যাগ হইয়াছিল।’

সতীশ চন্দ্র মিত্র আরো উল্লেখ করেছেন, ‘১৬৫০ এর বহুপূর্বে অর্থাৎ শাহজাহানের রাজত্বকালে সংগ্রাম সাহ ভূষণার জায়গীর পেয়েছিলেন। সংগ্রামের মৃত্যুর পর তার পুত্র কিছুকাল জায়গীর ভোগ করেন। এরপর ভূষণা অঞ্চল ফাকা হয় এবং অব্যাবহিত পরে সীতারামের পিতা উদয় নারায়ণ ভূষানার সাঁজোল বা তহশিলদার হইয়া আসেন।’

কলিকাতা রিভিউ’র ৫৩ ভল্যুমের ৭৩ পৃষ্ঠায় চট্রগ্রামের ফিরিঙ্গী শীর্ষক প্রস্তাবে এই দুর্গ ও সংগ্রাম সাহর প্রতিষ্ঠিত আরো দুটি দুর্গের পরিচয় প্রদত্ত হয়েছে। এরমধ্যে এল, এন মিশ্র প্রণীত বাংলায় রেল ভ্রমণ পুস্তকে দেখা যায় বর্তমানে রাজবাড়ি শহরের অনতিদূরে পদ্মা নদীর নিকটবর্তী লালগোলা নামক একটি গ্রাম রয়েছে। উক্ত লালগোলা নামকরণ হয়েছে সংগ্রাম সাহর গোলাবারুদের নামানুসারে। সেখানে একটি দুর্গ ছিল তাকে সংগ্রাম সাহর দুর্গ বলে জানা যায়। বাখরগঞ্জ জেলার ঝালকাঠি থানার অধীন রামনগর, গাবখান প্রভৃতি স্থানের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম নীলের খাল বলে একটি দোনের পরিচয়ও পাওয়া যায়। সম্ভবত এটি সংগ্রাম সাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। দস্যু দমনের জন্য সংগ্রাম সাহ নানা স্থানে সৈন্য সামন্তের সামাবেশ ও নিরাপত্তার জন্য এরুপ দোন ও দুর্গ নির্মাণ করেন। পরে তিনি মগ ও পর্তুগীজ দমন পূর্বক তাদের বঙ্গদেশ থেকে বিতাড়িত করেন। শত্রুদমনের কথা সম্রাট  আওরঙ্গজেবের নিকট পৌঁছালে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে সংগ্রামকে পুরস্কারস্বরুপ  ভূষণা ও মহাম্মদপুরের জমিদারী প্রদান করেন। ইতিপূর্বে মানসিংহকর্তৃক বার ভূঁইয়া দমন হলে বিদ্রোহী রাজাগণের রাজ্যের কতক অংশ সরকারের খাস রাখা হয়। খাস বা বাজেয়াপ্ত মহল থেকে জলযুদ্ধ বা নৌপথের ব্যয় নির্বাহের জন্য নাওয়াড়া মহল বলে তা গণ্য হল। ভূষণা ও মাহমুদপুর মহলের অন্তর্ভূক্ত হল। আওরঙ্গজেব এই খাস নাওয়াড়া ভূষণা, মাহমুদপুর সংগ্রামকে প্রদান করেন। রাজবাড়ি জেলায় অনুরুপ অনেক খাসভূমি যা নাওয়াড়া বলে পুরাতন রেকর্ড পর্চায় দৃষ্ট হয়।

Additional information