প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-১৯

রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়ুয়া বলে একটি ইউনিয়ন আছে যার পূর্ব পরিচিতি ছিল নাওয়াড়া। বর্তমানে তা নাড়ুয়া। নাড়ুয়া স্থানটি গড়াই নদীর তীরে। নদী সংলগ্ন এ সকল স্থানে মগ ও পুর্তগীজদের উপদ্রব ছিল।

সংগ্রাম সাহ রাজবাড়ি শহরের অদূরে বাণীবহ গ্রামবাসী শক্তি মাধব বংশীয় সদাশীব সেনের কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সদাশীবের পুত্র গোপীরমণ সেন এবং তাঁর পুত্র মাধব রায় ও জগানন্দ রায়। ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত কেয়ারপুর (বর্তমানে কোমরপুর) মাধবের বংশ এবং বাণীবহ গ্রামে জগানন্দের বংশ বাস করেন। সংগ্রাম বাণীবহ নিবাসী শক্তিমাধব বংশীয় সদাশীব সেনের কন্যা বিবাহ করেন। সদাশীব সম্বন্ধে কবি কণ্ঠকারে আছে -----‘কন্যামেকাং ব্যুবাহ চ সালঙ্কারণ স্মৃতি সংগ্রাম সাহ ভূপতি।’। (যশোর-খুলনার ইতিহাস, সতিশ চন্দ্র মিত্র, পৃষ্ঠা-৩৩৯) তার পুত্র রাধাকান্ত আদিত্য বংশীয় কাশিনাথ সেনের কন্যাকে বিবাহ করেন। এছাড়া সংগ্রাম শাহর আরো ৬টি কন্যার কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য আনন্দনাথ রায় তার ফরিদপুরের ইতিহাসের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন ‘রাদাগঞ্জের ভরাটস্থান এখন রাধাগঞ্জের অথবা পেঁইজ ঘাটার বিল নামে প্রসিদ্ধ।

যাহা হউক, নাওযাড়া চৌধুরীগণ নানা উপদ্রবের আশঙ্কায় পাঁচথুবী পরিত্যাগ করিয়া প্রায় দুইশত বছর পূর্বে (বর্তমানে ৩০০ প্রায়) বাণীবহে আগমন করেন। বাণীবহ গ্রাম উত্তর দক্ষিণে সাড়ে তিন মাইল পূর্ব-পশ্চিমে তিন মাইল হইবে। এই গ্রামে রাঢ়ী ও বরেন্দ্র প্রায় সাত-আটশত ঘর, বৈদ্য প্রায় দুইশত ঘর, কায়স্থ ও অন্যান্য জাতি প্রায় আড়াইশত ঘর বলে জানা যায়। এই গ্রাম এত জনতাপূর্ণ ছিল যে, কাহারও বহিরাঙ্গন ছিল না। স্ব-স্ব গৃহের বারান্দায় বৈঠকখানা ছিল। এরুপ জনতা নিবন্ধন ১২৩৩ বাং সালে তথায় ভীষণ মহামারী উপস্থিত হয় এবং উহাতে বহুলোক মারা যায় এবং বহুলোক স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। বিদ্যাবাগীস পাড়া, সরখেল পাড়া, ভট্রাচার্য পাড়া সেনহাটিপাড়া, বসু পাড়া, নুঁনে পাড়া, পচাপাড়া প্রভৃতি জনহীন পাড়া আজও বিদ্যামান রয়েছে। সংগ্রাম সাহর বংশধর যদুনাথ তালপাত্র এই বংশেরই আদি পুরুষ। তাহার বংশধর দ্বারা এই গ্রামে যে পুস্করণী খনন করা হয় তা তলাপত্র দিঘি নামে আজও পরিচিত। (বাণীবহে তালপাত্রের দিঘি এখনো বিদ্যামান)। নাওয়াড়া চৌধুরীদের বাড়ি স্বদেশীয়দের নিকট রাজবাড়ি নামে অবহিত হত। সাধারণ্যে তারা মহাশয় নামে খ্যাত। তারা দুই ভাগে বিভক্ত। তম্মধ্যে সদাশিবের পৌত্র মাধবানন্দ রায় সম্পত্তির নয় আনা ও জগানন্দ রায় সাত না অংশ ভাগ করিয়া লন। পাঁচথুবীর উত্তরে রাধাগঞ্জের বড় একটি বন্দর ছিল। পদ্মার প্রবাহ হড়াইয়ে এই বন্দর দক্ষিণে রামাপুর পাঁচথুবী পূর্বদিক দিয়া এক বিস্তীর্ণ বর্ত্য বিদ্যামান ছিল। তাকে সাধারণ লোকে পল্টুনের রাস্তা বলত। মোগলদের সময় সৈনিকদের যাতায়াতের জন্য এই রাস্তা ব্যবহৃত হত। ভূষণা চাকলার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থানে তাহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি অধুনা ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত কোড়কদি ও মধুখালি স্থানদ্বয়ের সন্নিকট অবস্থিত। কোড়কদি ও মধুখালি (বিগত ১৫ বছর পূর্বে রাজবাড়ি জেলার অন্তভুক্ত ছিল) কোড়কদি মাননীয় ভট্রাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাঁহার গুরু ছিলেন। অদ্যপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূবৃত্তির লিখন উক্ত ভট্রাচার্য মহাশয়ের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজও একটা প্রকাণ্ড মঠ দৃষ্ট হয়। যাহাকে সাধারণ্যে সংগ্রামের দেউল বলিয়া থাকে।’

সংগ্রাম সাহর সভায় শ্রীকান্ত বেদাচার্য নামে এক জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি গণনা করিয়া পর দিবস সংগ্রামের মৃত্যু হবে এই কথা প্রকাশ করায় তার সম্পত্তি খাস করা হয়। কেহ কেহ অনুমান করেন ১৬৪২ খ্রি. সংগ্রামের মৃত্যু হয়। সংগ্রাম সাহ বিষয়ে সতিশ চন্দ্র মিত্র লিখিত যশোর খুলনার ইতিহাসের ৩৩৫ পৃষ্ঠায় দেখা যায়। ‘পূর্বে সংগ্রাম সাহ নৃপতি প্রভৃতিতে পালিতা।

Additional information