প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২০

ভূষণা সীতারামের পশ্চাদদনু সবতি। রামকান্তেন চোঢ়া সা চেদাং সপত্মীক কর যুগলতা। বিরুপা কেষাং বা নানুগাছো নচ ভবতি কথং কেন বা নামুদর্শ।’ সংগ্রামের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য রাজা সীতারামের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সীতারামের পতনের পর সীতারামের রাজ্য তথা রাজবাড়ির অনেকাংশ নাটোর রাজ রানী ভবানীর জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত হয়। রানীভবানী নাটোর রাজ রামকান্তের সহধর্মিনী ছিলেন। রামকান্ত ভূষণাধিপতি ছিলেন। তদন্তরে তা রানী ভবানীর হস্তগত হয়। এই জন্য কবি ভূষণাকে স্বপত্মিক করযুগলতা বলে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য তৎকালীন রাজবাড়ি জেলার পরগনা নসিবসাহী, মহীমসাহী বেলগাছি নসরৎ সাহী পরগনা ভূষণা চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল

মথুরাপুরের দেউলবর্তমান মধুখালি পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমা এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন  ছিল। সাম্প্রতিকালে মধুখালি ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। মধুখালির সন্নিকটে মথুরাপুরে মন্দির সদৃশ্য প্রায় ৭০ ফুট উঁচু, ১২টি কোণ অলঙ্কৃত দেওয়াল এবং ফাঁকে ফাঁকে ইটের কার্ণিশ বিশিষ্ট দেওয়াল। বিভিন্ন থাকের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ করে নিচের দিকে পোড়া মাটির চিত্রফলক বসানো।

এগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র আছে। সর্ব সাধারণ্যে এটি ‘মথুরাপুরের দেউল’ বলে পরিচিত। দেউলটির ইতিহাস এবং নির্মাণকাল নিয়ে যেমন উৎসুক্য আছে তেমনি আছে নানা মতভেদ। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস এবং যশোর-খুলনার ইতিহাসে উক্ত দেউলকে সংগ্রাম সাহর দেউল বলা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন মানসিংহের সাথে যশোরের ভূমিরাজ প্রতাপাদিত্যের যে যুদ্ধ হয় তাতে প্রতাপ হেরে যান। বিজয় স্তম্ভ হিসেবে মানসিংহ তা নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য মানসিংহ আগমন করেন ১৫৯৫ সালে এবং প্রস্থান করেন ১৬০৪ সালে। তিনি বাংলায় বার-ভূইয়া দমনের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছিলেন। তখন প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের রাজা আর মুকুন্দরাম ছিলেন ভূষণার রাজা। ১৬০৩ সালে ধুমঘাটে প্রতাপাদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হলে মানসিংহের সাথে তার সন্ধি হয়। এরপর প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। প্রতাপাদিত্র ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ ইসলাম খাঁর হাতে বন্ধি হন। তার পূর্বেই ১৯০৪ এর মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান। এদিকে ভূষণার রাজা মুকুন্দরামের সাথে মানসিংহের কোনো যুদ্ধই হয় নাই। তাই ভূষণার অন্তর্গত মথুরাপুরে মানসিংহ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন কেন? আনম আব্দুস সোবহান লিখিত ‘ফরিদপুরের ইতিহাস----বৃহত্তর ফরিদপুর’ গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ‘সীতারামের পতনের পর ভূষণার নিকটবর্তী মথুরাপুর গ্রামে একটি বিজয় স্তম্ভ নির্মিত হয়। সীতারাম নবাব মুর্শীদকুলি খাঁর নিকট পরাজিত হন।’

মুর্শীদকুলি খাঁর দ্বারা তা নির্মিত হলে মুসলিম স্থাপত্য বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্তম্ভটিতে রয়েছে হিন্দু স্থাপত্যসহ রামায়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু কোনো সৈনিক বা রাজা তা নির্মাণ করেন। ইতিপূর্বে আমি রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে স্তম্ভটিকে সীতারামের দেউল বলে উল্লেখ করেছি। বস্তুত প্রাচীন ইতিহাস লিখন ব্যাপক গবেষণা নির্ভর। সে সময় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনায় অতি নির্ভর আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি কোথাও খুঁজে পাই নাই।

Additional information