প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃ্ষ্ঠা নং-৩

এরমধ্যে পাহাড়পুর পট্রলী, গুনাইঘর পট্রলী, আশ্রাফপুর পট্রলী, ইদিলপুর পট্রলী, ধনাইদহ পট্রলী, দামোদর পট্রলী, বিক্রমপুর পট্রলী, নব্যকাশিকা পট্রলী, ব্রাহ্মণকে বা দেবতার উদ্দেশ্যে ভুমিদানরীতি তাম্র পাট্রাস বা ফলকে লেখা। ভূমিদানের বিষয়ে অত্র অঞ্চলে পট্রলী চালু ছিল তা বোঝা যায় এসব পট্রলীতে ব্যবহৃত ভুমির মাপ, প্রকারভেদ, ভুমির মূল্য নিরুপন থেকে। ভূমির পরিমাপ ব্যাবহারের ক্ষেত্রে নল ব্যবহার হত। নল আজও রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। বাস্তভিটায় এবং কর্ষণযোগ্য ভূমি নাল, খিল এখনো ব্যবহৃত হয়। এছাড়া জোলা, জোলক, তালক, পাঠক, খাল, বিল, এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর ব্যবহৃত দ্রাবিড় শব্দ। নীহাররঞ্জন এর কথায়-----পদ্মার খাঁড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মন্ড হারবারের সাগর সঙ্গম পর্যন্ত বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চব্বিশ পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখন গভীর অরণ্য, কখনো নদীগর্ভে বিলীন আবার কখনো খাঁড়ি খাঁড়িকা অন্তর্নিহিত হইয়া নতুন স্থল ভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ট শতকের তাম্র পট্রলীতে নব্যকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। ষষ্ট শতকে নব্যকাশিকা (কোটালীপাড়া) সমৃদ্ধ জনপদ এবং এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কোটালীপাড়া সমুদ্রতটীয় আর এ অঞ্চলকে সমতটীয় অঞ্চল বলা হইয়াছে। ‘ইউয়াং চোয়াং সপ্তম শতকে সমতটে এসেছিলেন। তার বর্ণনায় সমতট সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। ইউয়াং চোয়াং এর সমতট বর্তমানে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, যশোর ও খুলনার পূর্ব অঞ্চল। সমতটের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে রাজবাড়ি সাগর থেকে অনেক উত্তরে গঙ্গার মুখে থাকায় এ অঞ্চলে দ্বীপ বা ভূ-উত্থান অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যাকে পুরাতন সমতটীয় অঞ্চল বলা যেতে পারে। এ পুরাতন সমতটীয় অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস শুরু হয়ে থাকবে যা নবম দশম শতকে পূর্ণরুপ গ্রহণ করেছে।

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাসে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বীথি ও গ্রামের উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্টীয় বিভাগের নাম ভুক্তি যা কয়েকটি বিষয় নিয়ে গঠিত হত। বিষয় গঠিত হত কয়েকটি মন্ডল নিয়ে এবং মন্ডল গঠিত হত কয়েকটি বীথি আর বীথি গঠিত হত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে। এতে বোঝা যায় বিষয়ের আয়তন প্রদেশ প্রায় এভং মন্ডল জেলা প্রায়। নবম দশম শতকে এ অঞ্চলটি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি বা পট্রলীতে। দশম শতকের শেষে চন্দ্র বংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব দক্ষিণ অংশ জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর লিপি (বর্তমানে শরীয়তপুর) দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষেয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমিদান করা হত। স্মতট পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বোঝায় তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে বোঝা যায় এ অঞ্চল তখন পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। কুমার তালক মন্ডলের উল্লেখ আরো লক্ষণীয়। ‘কুমার তালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি দুই-ই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান কুমার বা কুমারখালি পদ্মা উৎসারিত মাথা ভাঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে বর্তমানে গড়াইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মূলতঃ মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গীর উৎপত্তির প্রায় ১০ মাইল পূর্ব দিকে পদ্মা হতে বের হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্রায় ৫ মাইল পশ্চিমে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কুমার নামে শাখাটি পূর্বমুখে গিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের কিছুটা উত্তরে রেল লাইনের নিচে দিয়ে নদীয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। কুমারের পূর্বগামী আর একটি শাখা শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা হয়ে গড়াইয়ে মিলেছে।

Additional information