প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২১

খণ্ডিত যে অংশটি পেয়েছিলাম তাতে সংগ্রাম সাহর অংশটুকু ছিল না। এছাড়া যশোর-খুলনার ইতিহাস (সতীশ চন্দ্র মিত্র) গ্রন্থটির পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারি নাই। এক্ষণে আনন্দনাথ রায়ের ১০০ বছর পূর্বে লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থটি ঢাকা থেকে পুনমুদ্রন (‘ম্যাগনাম ওপাস এবং ড. তপন বাগচী সম্পাদিত----শত বছরের শুদ্ধাঞ্জলি----আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, আহমদ কাউছার, বইপত্র, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত) হয়েছে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোন---যোগেন্দ্র নাথ রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এল এন মিশ্রের ‘বাংলায় রেল ভ্রমণ’ গ্রন্থগলি আমার হাতে থাকায়, এক্ষণে দেউলটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

প্রথমেই দেউল সম্পর্কে বলা যাক----দেউল বলতে বোঝায় দেবালয়। দেবকুল শব্দ থেকে দেউল শব্দের উৎপত্তি। দেবকুলিকা শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা মন্দির। গবেষক অধ্যাপক কিলহর্ন দেবকুলিকাকে ক্ষুদ্র দেবমন্দির বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার এ বাক্যটি হয়ত অনেকেরেই জানা ‘আছিল দেউল এক পর্ব্বত সমান। কাজেই দেউল বলতে বৃহদাকার দেব মন্দিরও বোঝায়। দেউল বা দেবমন্দির নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। সেন রাজত্বকালে তান্ত্রীক মন্ত্রে দিক্ষিত সেনেরা স্থানে স্থানে দেবদেবী পূজায় দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল নির্মিত হয়েছিল (বিক্রমপুরের ইতিহাস----যোগেন্দ্রনাথ)। ইতিপূর্বে মথুরাপুরের দেউল বিষয়ে যা বলেছিলাম তাতে দেউলের আকার আয়তনে দৃষ্ট হয় এটি ছিল বড় আকারের দেব মন্দির-দেবালয় বা দেউল। মথুরা পুরের দেউল বিষেয়ে আনন্দ নাথের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৮২ পৃষ্ঠায় ‘১৬৫৩ হইতে ১৬৮৪ পর্যন্ত প্রায় একত্রিংশ বৎসর পর্যন্ত এইরুপে আমরা বঙ্গদেশ ও রাজপুতনায় সংগ্রামকে দেখতে পাই। আবার এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঔরঙ্গজেব বাদশাই দিল্লীর সিংহাসনে রাজত্বকারী ছিলেন। মোগল রাজবংশ মধ্যে আওরঙ্গজেব যত দীর্ঘকাল শাসনদণ্ড পরিচালনা করেন সেরুপ আর কেহ পারেন নাই।

এই সম্রাটের অধীন থাকিয়া যে একই সংগ্রাম বিভিন্ন স্থানে নানা কার্যসম্পাদন করিয়াছিলেন এদ্বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্রাট ম্যধবাঙলার ভূষণা, মাহমুদপুর প্রভৃতি স্থান তাকে জায়গীর অর্পণ করেন এবং কালিয়াতেও একটি জায়গির ছিল যাকে আজও নাওয়াড়া বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ভূষণা পরগনার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থানে তাঁহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি ফরিদপুর জেলার কোড়কদি ও মধুখালির স্থানদ্বয়ের সন্নিকটে অবস্থিত। কোড়কদির মাননীয় ভট্রাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাহার গুরু ছিলেন। অদ্যাপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূ-বৃত্তির লিখন উক্ত মহাশয়দিগের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজও প্রকাণ্ড মঠ দৃষ্ট হয় যাকে সাধারণ্যে সংগ্রামের দেউল বলে।’

এদিকে শ্রদ্ধেয় সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসের ৩৩৬ পৃষ্ঠায়----‘ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের প্রখ্যাত ভট্রাচার্যগণ সংগ্রামের গুরুপদে বারিত হইতে বাধ্য হন। এখনো তাহাদের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমি বৃত্তির সনদ আছে। যশোহর কালেক্টরিতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রহ্মোত্তর তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্য কীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত দেউল বা মন্দির বর্তমান আছে। গল্প আছে তিনি একটি বিগ্রহ পরিচালনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলিয়া সে সঙ্কল্প পরিত্যক্ত হইয়াছিল।’সংগ্রাম সাহর বিশদ আলোচনার পর এ বিষয়ে আর সন্দেহ থাতার কথা নয় যে মথুরাপুরের দেউল অন্যকারো কীর্তি নয়। নিঃসন্দেহ দেউলটি সংগ্রাম সাহর-ই কীর্তি। বর্তমানে দেউলটি ভগ্ন প্রায়। রাজবাড়ি তথা এতদ্বঅঞ্চলে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত এ দেউলটি সংস্কার করতঃ ঐতিহ্যটি রক্ষা করা প্রয়োজন।

Additional information