প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২২

 সীতারামের শাসন

সীতারামের পিতামহ হরিশচন্দ্র যখন ঢাকায় আসেন তখন ভূষণা বারভূঁইয়াদের অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম ভূষণার শাসনকর্তা। চাকলা ভেঙ্গে ভূষণা তখন প্র্রশস্ত জমিদারীতে পরিণত হয়েছে। এ জমিদারী বর্তমান রাজবাড়ি জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মুকন্দ রামের পর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগলের অধীনে সামান্ত রাজা ছিলেন। তিনি নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় মোগল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। অতঃপর সংগ্রাম সাহ নামক এক মোগল কর্মচারী জায়গীরপ্রাপ্ত হন। সংগ্রাম সাহ সম্মন্ধে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। সংগ্রাম ও পুত্রের ও তাঁর পুত্রের মৃত্যু হলে এই জায়গীর খাশ হয় এবং মোগল ফৌজদার আবু তোরাপের হস্তে অর্পিত হয়। এই ফৌজদারের সময় রাজা সীতারামের উত্থান ঘটে।

 ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তি নাম-----রাজা সীতারাম যার শাসন স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস। ১৬৯৯ অব্দ হতে রাজা সীতারাম স্বাধীন রাজার মত রাজত্ব আরম্ভ করেন। ষোড়ষ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা মানসিংহ যখন রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করেন তখন সীতারামের পূর্ব পুরুষ শ্রীরাম দাস তাঁর নিকট থেকে রাজা উপাধি লাভ করেন। তিনি সুবাদারের খাশ সেরেস্তায় হিসাব বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। তাঁর পুত্র হরিশচন্দ্র অল্প বয়সে পিতার সঙ্গে রাজ সরকারে কাজ আরম্ভ করেন। রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় কর্মক্ষমতার গুণে তিনি রায় উপাধিপ্রাপ্ত হন। তার পুত্র উদায়নারায়ণ ভূষণার ফৌজদারদের অধীন সাজোয়াল বা তহশীলদার হয়ে আসেন।

উদয়নারায়ণ যখন রাজমহলে নবাব সরকারে চাকরি করতেন তখন তিনি বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত মহিতাতপুর গ্রামে এক কুলীন ঘোষকন্যা বিবাহ করেন। তার নাম দয়াময়ী। দয়াময়ীর গর্ভে ১৬৫৮ সালে উদয়নারায়ণের যে প্রথম সন্তান জন্ম লাভ করেন তিনিই সুপ্রসিদ্ধ সীতারাম। উদয় নারায়ণ ঢাকা আসার কয়েক বছর পর তহশীলদারের কার্যে ভূষণায় আসেন।

তিনি পরিবারবর্গ আনেন নাই। প্রথমে ভূষণার নিকটবর্তী গোপালপুরে তার বাসাবাটি ছিল। কিছুদিন পর তিনি একটি ক্ষুদ্র তালুক এবং বর্তমান মুহম্মদপুরের পার্শ্ববর্তী শ্যামনগরে একটি জোত বন্দোবস্ত নেন। তিনি মধুমতির অপর পাড়ে হরিহর নগরে নিজের বাসস্থান নির্মাণ করেন এবং পরিবারবর্গকে নিয়ে আসেন। হরিহর নগরে এখনো উদয়নারায়নের বংশধর আছে। সীতারামের বাল্যজীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না তবে তহশীলদার পুত্রের কপালে রাজটিকা ছিল তা হয়তো কেউ অনুমানও করেননি। তখনকার দিনে রাজভাষা ছিল আরবি ও ফারসি। রাজদরবারে কার্যসিদ্ধি করতে হলে আরবি, ফারসি ও উর্দু জানতে হত।

যতদূর জানা যায় সীতারাম ভালো ফারসি ও উর্দু জানতেন। তার বাল্যজীবন কাটোয়ায় কাটে। ভূষণায় এসে তিনি মুসলমানদের সাথে মিশে ফারসি ও উর্দুতে দক্ষতা অর্জন করেন। সে সময় মোগলদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পাঠানেরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত। এ ছাড়া চোর, ডাকাত এবং দস্যুদের উপদ্রবে ভূষণা অঞ্চল অশান্ত হয়ে ওঠে। সঁ-তৈর পরগনার করিম খান নামক একজন পাঠান বিদ্রোহী হয়। এ সময় শায়েস্তা খান নানা প্রসঙ্গে সীতারামের অস্ত্র পরিচালনা ও সাহসিকতার পরিচয় পান। সীতারাম নবাবের প্রস্তাবে সাহসিকতার সাথে পাঠান বিদ্রোহী করিম খাঁকে পরাস্ত করেন। করিম খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। যুদ্ধ বিজয়ী সীতারাম ঢাকায় গেলে শায়েস্তা খান সন্তুষ্ট হয়ে ভূষণার অন্তর্গত নলদী পরগনার জায়গীর দিলেন।

Additional information