প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২৩

সীতারামের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, একজন মুনিরাম অন্যজন রঘুরাম বা রামরুপ। রামরুপ শিশুকাল থেকে নানা স্থানে পাহলোয়ানের নিকট কুস্তি, লাঠি খেলা উত্তমরুপে শিখেছিলেন। তার দীর্ঘকায় বপু, মস্তক, লম্বা হাত দেখে লোকে চমকিত হত। তিনি সীতারামের সৈন্যবিভাগে প্রবেশ করেন। তাকে হাতি বা ক্ষুদ্রকায় হাতি বলা হত। সীতারাম অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে রুদ্রমূর্তিতে দস্যুদমন ও চোর ডাকাতদের উৎপাত থেকে মুক্ত করে ভূষণা অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মগদুস্যু, জলদস্যু, চোর ডাকাত দেশ থেকে মুক্ত করে সীতারাম বাদশা, প্রজা সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ, সতীশচন্দ্র মিত্রসহ অনেক ঐতিহাসিক তার বীরত্বের ও সুকর্মের প্রশংসা করে গেছেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তার লেখায় সীতারামের উল্লেখ করেছেন। তার আমলে ভূষণা অঞ্চলে প্রজাবর্গ খুশি হল। গ্রাম্য কবিরা গান রচনা করলেন।

ধন্য রাজা সীতারাম বাংলা বাহাদুর

যার বলেতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেল দুল।

বাঘ মানুষে একই ঘাটে মুখে জল খাবে

রামী শ্যামি পোটলা বেঁধে গঙ্গাস্থানে যাবে।

এইভাবে শান্তি সুখ দেখে নলদী পরগনার প্রজাগণ সীতারামের প্রতি আসক্ত হল। পরগনার আয় বহু পরিমাণে বৃদ্ধি পেল। সীতারাম রীতিমত জমিদারে পরিণত হলেন। সাঁ-তৈর পরগনার কতকাংশ তালুক বন্দোবস্ত লইলেন। সূর্যকুণ্ডু গ্রামে অট্রালিকাসম আকাশবাতি নির্মাণ করলেন। সীতারামের পিতৃকুল শাকমন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। সীতারাম বৈষ্ণব দীক্ষা লন। এতে তার শাকবিদ্বেষ ছিল না। রাজধানী স্থাপন করে তিনি সর্বাগ্রে দশভূজার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। আসলে তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। এ সময় সীতারাম জমিদার মাত্র। তখনও তিনি রাজা হন নাই।

সীতারাম যখন প্রতিপত্তিশালী জমিদার তখন তার পিতা মাতা পরলোক গমন করেন। কথিত আছে তিনি পিতা মাতার মৃত্যুর পর লক্ষীনারায়ণের উপর জমিদারির ভার দিয়ে তিনি গয়ায় পিণ্ডদানের পর বহুবিধ উপহার নিয়ে রাজধানী দিল্লীতে উপস্থিত হন। নবাব শায়েস্তা খাঁ তার সুকর্মের কথা দিল্লীতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তার প্রার্থনা মতে আওরঙ্গজেবের ভারপ্রাপ্ত রাজকর্মচারী রাজা উপাধির পাঞ্জাসহ ফরমান এবং দক্ষিণেশ্বর আবাদি সনদপ্রাপ্ত হলেন। এই জাতীয় সনদ পেলে রাজাকে কিছুকাল খাজনা দিতে হত না। রাজা হওয়ার পর তিনি মুহম্মদপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। এরপর সীতারাম রাজ্য বিস্তারে ব্রতী হয়ে ওঠেন। প্রথমে পশ্চিম দিকে তার নজর পড়ে। ভূষাণা চাকলার অন্তর্গত রুপপার, পোকতালী, রোকনপুর কয়েকটি ক্ষুদ্র পরগনা দখল করেন। এসব পরগনার মালিক ছিলেন ছত্রাজিতের পুত্র কালিনারায়ণ। এরপর ছত্রাজিতপুরের পশ্চিমে মাহমুদশাহী পরগনা তার হস্তগত হয়। এরপর তিনি সফর দেন উত্তর দিকে। তখন মুহম্মদপুরের উত্তর দিকে পদ্মা পর্যন্ত পাঠানদের এবং রাজা সংগ্রাম সাহের বংশধরদের দখলে ছিল। সাঁতৈরের উত্তরে দৌলত খাঁ এক পাঠান পশ্চিমে গড়াই থেকে পদ্মা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ স্থানের মালিক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তৎপুত্র নাসির ও নশরত খাঁর নামানুসারে এই প্রদেশ নসীবশাহী ও নশরতশাহী নামক দুই পরগনায় বিভক্ত হয় এবং মহিমশাহী ও বেলগাছি নামক আরো দুটি পরগনা বের হয়। রাজবাড়ি জেলার পুরাতন পরগনার ভিত্তি হল পূর্বে মুরাদনগর নশরতশাহী কাসিমনগর, নসিবনগর যা বর্তমানে গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলার পূর্বাংশ ও উত্তরাংশ।

Additional information