প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২৪

এরপর রাজবাড়ি উপজেলার দক্ষিণাংশ ও পশ্চিমাংশ এবং বালিয়াকান্দি ও পাংশা উপজেলার নসিব শাহী, নশরত শাহী, মহিম শাহী, ও বেলগাছি পরগনা ছিল। এ ছাড়া সংগ্রাম শাহের বংশধরদের অধীনে নাওয়াড়া মহলও রাজবাড়ির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সকল পরগনার অধিকার নিয়ে দৌলত খার পুত্রগণের মধ্যে বিবাদ চলছিল। শায়েস্তা খাঁর আদেশে তা দমনের ভার পড়েছিল সীতারামের ওপর। মোগলদের জ্ঞাতসারে তিনি পরগনার পর পরগনা তার রাজ্যের আয়ত্বাধীন করেন। নসিব শাহী, ও বেলগাছি পরগনা জয় করার জন্য তিনি পদ্মার কুলে উপনীত হয়ে কয়েক স্থানে দুর্গ স্থাপন করেন। ক্রমাগত যুদ্ধ চলতে থাকে। বর্তমান পাংশার রেল স্টেশনের ৩ মাইল দক্ষিণে মালঞ্চী গ্রামের একটি উপঞ্চলকে ৫০ বছর পূর্বেও মানুষ তাকে সীতারামের গড় বলত। পাংশার পূর্বদিকে কালিকাপুরীতেও তার একটি দুর্গ ছিল। ঐ দুর্গের সন্নিকটে পাঠানদের সাথে বড় যুদ্ধ হয়েছিল। কালিকাপুরিতে এখন মেলা বসে। আখরজানি গ্রামের মসজিদটিকে মানুষ এখন ছুটি মণ্ডলের মসজিদ বলে। পূর্বে ঐ মসজিদটির স্থানে সীতারামের দুর্গ গড়ে তোলে বলে জানা যায়। বেলগাছির একটি পুকুরকে এখনো লোকে সীতারামের পুকুর বলে। এদিকে বাণীবহের সংগ্রাম সাহর নাওয়াড়া মহলও তার অধীন হয়।ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন এসব ঘটনা ১৭০২ থেকে ১৭০৪ এরমধ্যে সংগঠিত হয়। তাঁর রাজ্য ক্ষুদ্র হলেও ঐ রাজ্যের বিস্তার ছিল পদ্মার ওপাড় পাবনা এবং পদ্মার এপাড় রাজবাড়ি থেকে বোয়ালমারী, মাগুরা নড়াইল, গোপালগঞ্জের অংশবিশেষ, যশোরের অংশবিশেষ এবং খুলনার সুন্দরবন পর্যন্ত।

সীতারাম আদর্শ হিন্দু নৃপতি বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। তিনি ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে হিন্দু রাজত্বের আদর্শ সম্মুখে রেখে প্রজাপালনের চেষ্টা করেছিলেন। প্রজার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করার কার্পণ্য তার মধ্যে ছিল না। রাজধানী মুহম্মদপুরের মনোরম রাজ্যের সংস্থাপন করে একটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল।

সে সময় নলকূপ ছিল না। নদীকূল দূরবর্তী লোকেরা নিদারুণ জলকষ্টে ভুগতো। তাঁর রাজ্য মধ্যে যাতে জলকষ্ট না থাকে এ জন্য তিনি ২২০০ লোক দ্বারা বেলদার সৈন্য গঠন করেন। তাদের কাজই ছিল নিত্য নতুন পুকুর খনন করা। সর্বত্রই জলাধার প্রতিষ্ঠা দ্বারা তিনি প্রজাদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রবাদ আছে তিনি প্রতিদিন নতুন পুস্কুরিণীর জলে স্নান করতেন এবং প্রতিদিন নবনির্মিত পুকুরের জল রাজধানীতে আনা হত। তিনি রাজধানী পাশে রামনগর, সুখনগর, কৃষ্ণনগর, প্রভৃতি বৃহৎ দিঘি খনন করেন। এসব দিঘি এখনো তার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে।

জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার জন্যও মহম্মদপুর খ্যাত ছিল। তিনি বহু অধ্যাপককে বৃত্তিদানে পোষণ করতেন। তার সময় থেকে রাজবাড়ির নলিয়া, কোড়কদি, বানা, নহাটা, বাণীবহ, খালকুলা, পশ্চাত্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বহু অধ্যাপক দ্বারা তিনি মুহম্মদপুরে চতুস্পাটি খুলেছিলেন। সে সকল টোলে বাক্য, ব্যাকরণ, স্মৃতি, দর্শন প্রভৃতি শাস্ত্র শিক্ষা দেওয়া হত। সেখানে জ্যোতিষ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পাঠদান করা হত। রাজবাড়ির খালকুলা বহুদিন যাবৎ জ্যোতিষ চর্চা করতো এবং এখান থেকে পঞ্জিকা প্রকাশ করা হত।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতক থেকে পূর্ববাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রথম প্রসার শুরু হয়। পাঠান, মোগলশাসকসহ পীর, আওলিয়া, দরবেশ, ফকীর, ব্যবসায়ীর প্রভাবে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সীতারাম মুসলমানদেরও শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানদের জন্য তিনি অনক মক্তব স্থাপন করেন। মৌলবীরা সেখানে শিক্ষা দিতেন। বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য পাঠশালা ছিল। হিন্দু মুসলমান সকলেই সেখানে শিক্ষক হতেন।

Additional information