প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২৬

রাজা বলে আল্লা হরি নহে দুইজন

ভজন পুজন যেমন ইচ্ছা করগে তেমন।

মিলে মিশে থাকা সুখ তাহে, বাড়ে বল

ডরেতে পালায় মগ ফিরিঙ্গীর দল।

চুলে ধরে নারী লয়ে চড়তে নারে নায়

সীতারামের নাম শুনিয়া পালাইয়া যায়।

১৬৮৯ সালে শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ত্যাগ করার পর এবং মুর্শীদকুলি খাঁ সুবেদার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৪ বছর বাংলায় কোনো শাসন শৃঙ্খলা ছিল না। ও সময়েই সীতারামের উত্থান। বাদশা আওরঙ্গজেব তার পৌত্র আজিমুশ্বানকে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার বা নাযিম ‍নিযুক্ত করেন। এরপর ১৭০১ সালে মুর্শীদকুলি খাঁ ঢাকায় দেওয়ান হয়ে আসেন। কিছুদিনের মধ্যে আজিমুশ্বানের সাথে মুর্শীদকুলি খাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। ১৭০৩ সালে ঢাকায় মুর্শীদকুলি খাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হলে তিনি দেওয়ানী সেরেস্তা মকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। মকসুদাবাদ পরে মুর্শীদদাবাদ হয়। ঐ সময় নায়েবে নাযিম পদের সৃষ্টি হয় এবং মুর্শীদকুলি খাঁ দেওয়ানী লাভের সাথে নাযেবে নাযিম হন। উভয় পদের বলে তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। ঢাকায় থেকে আজিমুশ্বান কিছুতেই কিছু করতে পারছিলেন না। এরপর আজিমুশ্বান বাদশার আদেশে বিহারে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হলে জ্যেষ্ঠ পুত্র বাহাদুর শাহ সম্রাট হন। তিনি আজিমুশ্বানের পিতা হওয়ায় পাঁচ বছর বিহার উড়িষ্যার শাসনকর্তা ছিলেন। কিন্তু এতে মুর্শীদকুলি খাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস পায় না কারণ তিনি প্রজার থেকে অধিক হারে রাজস্ব সংগ্রহ করে দিল্লীতে পাঠাতেন। মুর্শীদকুলি খাঁ কর সংগ্রহে নিদারুণ কঠোরতা পালন করতেন। রাজস্ব বাকি থাকলে জমিদারদের ধরে এনে সাধারণ লোকের মতো কারাগারে নিক্ষেপ করা হত। এমন কি খাদ্য ও পানীয় তাদের দেওয়া হত না। জমিদারী খাস হত এবং চড়া দামে অন্যের বন্দোবস্ত দেওয়া হত। তিনি কর সংগ্রহের জন্য যে সব কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন তাদের মধ্যে নাজির আহম্মেদ ও সৈয়দ রেজা খান আরও বেশি অত্যাচারী হয়ে ওঠেন।

জানা যায় নাজির আহম্মেদ জমিদারদের ধরে এনে কখনো পা ঝুলিয়ে বেধে নির্যাতন করতেন। মুরশিদ কুলি খাঁ বাদশার দরবারে ন্যায় নিষ্ঠা ও সুনামধারী থাকলেও দেশময় তার রাজস্ব আদায়ের কলঙ্ক ছড়েয়ে পড়ে। বহু জমিদার তার বিরুদ্ধচারী হয়ে ওঠেন। এরমধ্যে রাজা সীতারাম এবং রাজশাহীর ব্রাহ্মণ উদয়নারায়ণ বিদ্রোহী হন।

এদিকে আজিমুশ্বান যখন বাংলার শাসনকর্তা তখন তার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আবু তোরাপকে ভূষণার ফৌজদার করে পাঠান। পরাক্রান্ত জমিদার সীতারামের প্রতি দৃষ্টি রাখাই ছিল তার প্রধান কাজ। আবু তোরাপ আজিমুশ্বানের আত্মীয় হওয়ায় খুব গর্বিত ছিলেন এবং কারো নিকট বশ্যতা স্বীকার করত না। তিনি মুর্শীদ কুলিকেও শত্রুর মতো মনে করতেন। এ ছাড়া মুর্শীদকুলি খাঁ প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন পরে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় আবু তোরাপ তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। অন্যদিকে সীতারাম পাঠানদের দমনের কারণে মুর্শীদকুলি খাঁর সুনজরে ছিলেন। এদিকে ফৌজদার আবু তোরাপ কেবল কর দিলেই চলবে এ অনুরোধও সীতারাম মেনে নেন না। আবু তোরাপ তর্জ্জন গর্জ্জন করে পত্র লিখলেন।

Additional information