প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-২৮

নাটোর রাজবংশ ও রাজবাড়ি

সুলতান, মোগল ইংরেজ শাসনকালে কত শত জমিদারের উত্থান পতন ঘটেছে তার ইয়াত্তা নাই। তৎকালীন যে সব বৃহৎ জমিদার আত্মপ্রকাশ করে তারমধ্যে নাটোর রাজবংশের রাজা রামজীবন , রাজা রামকান্ত, রানী ভবানী, মহারাজ রামকৃষ্ণ, রাজা বিশ্বনাথ, নাটোর রাজবংশের বিখ্যাত রাজ জমিদার। সীতারাম কারাগারে থাকার সময়েই তার জমিদার প্রত্যর্পিত হবে এরুপ কথা ওঠার প্রেক্ষিতে জানা যায় কোনোক্রমে দুইলক্ষ টাকা সংগ্রহ করে সীতারামের ভ্রাতা লক্ষীনারায়ণ পুত্র শ্যামসুন্দর মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে অর্থ ব্যয় হলেও কী কারণে জমিদারী পাওয়া যায় না তা জানা যায় না। লক্ষীনারায়ণ ও শ্যামসুন্দর মুর্শিদাবাদে থাকার সময়েই সীতারামের মৃত্রু হয় এবং জমিদারী খারিজ হয়ে যায়। এ বিষয়ে সতিশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন, ‘সুবে বাংলার অন্তর্গত ভূষণার জমিদারী তফসীল জমা ও পেসকম প্রদান স্বীকারে রামজীবনকে প্রদত্ত হইতে এই মর্মে ফররুখ শিয়রের সনন্দে দেখতে পাই। রামজীবনই নাটোর রাজ্যের অধিশ্বর হন।’ এখন রামজীবন ও নাটোর রাজবংশের পরিচয় জানা যাক।

নাটোর রাজবংশের আদিপুরুষ কামদো লস্করপুর পরগনার বারাইহাটি মৌজার তহশীলদার ছিলেন। কামদোরের তিন পুত্র রামজীবন, রঘুনন্দন ও বিষ্ণুরাম। তাদের মধ্যে রঘুসন্দন মেধাবী ও অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে রাজ সরকারের উকিলরুপে ঢাকায় ও মুর্শিদাবাদে অবস্থান করেন। সীতারামের সম্পত্তি পাওয়ার জন্য তিনি উঠে-পড়ে লাগেন। এ ছাড়া তিনি নানা কৌশলে অনেকের জমিদারী নিজ জেষ্ঠ ভ্রাতা রামজীবনের নামে লিখে নেন। রঘুনন্দন ১৭২৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। রামজীবনের একমাত্র পুত্র কালিকাপ্রসাদ মারা যান। এদিকে রামজীবন একমাত্র দত্তক রামকান্তকে রেখে ১৭৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭৩৪ সালে রামকান্ত বয়োপ্রাপ্ত হলে সমস্ত সম্পত্তি তার হস্তগত হয়। এই রামকান্তের স্ত্রীই স্বনামধ্যা রানী ভবানী।

১৭৪৪ সালে রাজা রামকান্তের আকস্মিক মৃত্যু হলে রানী ভবানী বিপুল রাজ্যের অধীশ্বর হন। এক কন্যা সন্তান ছাড়া তার সন্তানাদি ছিল না। দেওয়ান দয়ারামের দ্বারা রাজকার্য পরিচালিত হত। অবশেষে রামকৃষ্ণকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। বাদশা শাহ আলম রামকৃষ্ণকে, ‘মহাধিরাজ পৃথ্বিপতি রায়বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেন। তবে তিনি নামমাত্র রাজাধিরাজ। বাস্তবত তিনি ছিলেন সাধক। পূজা অর্চনা নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকতেন। সংসার তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। প্রকৃত রাজকার্য পরিচালনা করতেন রানী ভবানী। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্না, দানশীল, ধর্মপরায়ন। দান পূণ্যে তিনি অতি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তখন ইংরেজ রাজত্ব চলছিল। রামকৃষ্ণ বিশাল সাম্রাজ্য সংসার তুচ্ছ ভেবে উপেক্ষায় উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। রানী ভবানী কেবল বারানসীসহ কিছু জমিদারী ঠিক রেখে চলছিলেন। এদিকে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। নতুন আইন অনুসারে নির্দিষ্ট দিনে লাটের কিস্তি দিতে না পারলে জমিদারী নিলামে খণ্ডে খণ্ডে বিক্রি হয়ে যেতে লাগল। আমলা কর্মচারী এমন কি ভৃত্যগণও অর্থ সঞ্চয় করে জমিদারী ক্রয় করতে থাকল। তাদের মধ্যে নড়াইলের আমত্য কর্মচারী কালিশংকরকে নাকি একটি গানের জন্য মহারাজ রামকৃষ্ণ কাটিহাট পরগনা কালীশংকরকে দিয়ে দেন এবং ভূষণার অবশিষ্ট অংশ ইজারা দেন। অবশ্য কালীশংকর প্রজাপীড়ন আরম্ভ করলে রামকৃষ্ণ নাবালক জ্যৈষ্ঠপুত্র বিশ্বনাথকে হেবানামা করে দেন। বিশ্বনাথ নাবালক বলে ভূষানার সমস্ত সম্পত্তি কোর্ট অব জাস্টিস হস্তে অর্পণ করা হয়। দেখা যায় ১৭৮৬ সালে যশোহর জেলা গঠিত হলে ভূষান তার অন্তর্ভুক্ত হয় নাই।

Additional information