প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-৪

কুমার আবার মধুখালির পাঁচমোহনী হয়ে বর্তমান ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। অনেক সময় গড়াই ও কুমারকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। কুমার প্রাচীন নদী এবং এর প্রবাহ ব্যাপক। অনুমান করা যায় ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চল, যশোরের উত্তরাঞ্চল এবং কুষ্টিয়া স্মতট পদ্মাবতী বিষয়। সেই হিসেবে রাজবাড়ি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত। অন্যদিকে কুমার তালক বা কুমারের তল বা নিম্নভূমি নিয়ে পদ্মাবতীর যে মন্ডল তা কুমার তালক মন্ডল। সেই হিসেবে গড়াই আর কুমার যদি অভিন্ন হয় তাহলে অবশ্যই বর্তমান রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডল ছিল। কুমার তালক মন্ডলের সীমানা নির্ধারণ দুরুহ। ইতিপূর্বে কুমারখালির কথা বলা হয়েছে। প্রতীয়মান হয় কুমার থেকেই কুমারখালি এসেছে এবং গড়াইকে একসময় কুমার বলা হতো। গড়াই এর আলোচনা থেকে বলা যায় গড়াইয়ের উৎস মুখ কখনো খনন করা হয়ে থাকবে বলে উৎস মুখে তা গৌড়ী এবং খননের পরে তা হয়েছে গড়াই। এ হিসেবে রাজবাড়ির বেশির ভাগ অঞ্চল বিশেষ করে পূর্বাংশে সামান্য বাদ দিয়ে এটা কুমার তালক মন্ডল আর বিষয় হিসেবে স্মতট পদ্মাবতী। *নিবন্ধটি নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির আদি ইতিহাস প্রথম খন্ডের অনুসরণে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার এর ইতিহাস পর্যালোচনায় অত্র অঞ্চলে গঙ্গারিডি জাতি বলে এক পরাক্রমশালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গ্রীক লেখকগণের বর্ণনায় তা আরো স্পষ্ট হয়।

দিওদোরসের লেখনীতে গঙ্গারিডি জাতির বিপুল সেনাবাহিনী ও ৬ হাজার রণহস্তীর উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১ম ও ২য় শতকে পেরিপ্লাস গ্রন্থে টলেমীর বিবরণ হতে জানা যায় এই সময়ে স্বাধীন গঙ্গারিডি রাষ্ট্র বেশ প্রবল ছিল। গঙ্গা রাষ্ট্রের বাইরে সমসাময়িক বাংলায় আর যে সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাদের সঙ্গে গঙ্গার রাষ্ট্রের কি সম্বন্ধ তা জানার উপায় নাই। তবে মহাভারত ও সিংহলী পুরানের কাহিনী থেকে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র বিন্যাসের একটি আভাস পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২য় শতকে মহাস্থানের শিলাখন্ড লিপিটি থেকে। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে মৌর্যশাসনের কেন্দ্র ছিল নুডনগল বা পুন্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার ৫ মাইল দুরে। মহাস্থান গড়ে। টলেমির বর্ণনায় দেখা যায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল গঙ্গাবন্দর। এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল তাম্রলিপ্তি বন্দরের আরো দক্ষিণপূর্বে ক্যামবেরীখন নদী (Kamberikhon) বা কুমার নদীর মোহনায়। কুমার নদীর তল ধরেই কুমার তালক মন্ডল। গঙ্গা বন্দরে অতি সূক্ষ্ণ কার্পাস বস্ত্র উৎপন্ন হত এবং নিকটে কোথাও সোনার খনি ছিল বলে নীহাররঞ্জনের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে ক্যালটিস নামক এক প্রকার সুবর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ৬ষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণ বীথির উল্লেখ আছে। ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম, মুন্সিগঞ্জের সোনারঙ্গ, রাজবাড়ির সোনাপুর, সোনাকান্দা বাংলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী একথা স্মরণ করে দেয়। রাজবাড়ি অঞ্চলে সোনার টাকা ভরা গুপ্ত ধনের গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। সোনাপুর রাজবাড়ির গ্রাম হিসেবে অতি পুরাতন। সোনাপুর এটা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। নলিয়া, আড়কান্দি, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, অত্র অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উঁচু ভুমি। এর উত্থান এবং প্রাচীন বসতি অনেক পূর্ব থেকে। অত্র অঞ্চল সন্ধান করলে গুপ্তধন না হোক খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা নদী প্রাচীনকালে কুমার তালক মন্ডলে। এর মোহনা থাকা স্বাভাবিক। সে মোহনায় গঙ্গা বন্দর প্রাচীন কুমার তালক মন্ডল হতে পারে। রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডলের বীথি হতে পারে। এ সবই প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্রের অঙ্গ বা এলাকা হতে পারে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণী সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা-৩৬ এ যে প্রাচীন বাংলার মানচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাতে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অবস্থান বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোর দেখা যায় মানচিত্রটি সন্নিবেশিত হল।

Additional information