প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-৫

প্রাচীন জনপদ : রাজবাড়ির অবস্থান

প্রাচীন কৌম সমাজে বঙ্গ বা বঙ্গাজনার উল্লেখ রয়েছে। ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে মহাভারতে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায় বঙ্গ একটি প্রাচীন দেশ। এদেশটি গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার ভাটির দেশ যাদের বঙ্গাল বলা হয়। ‘ভাটি হতে আইল বঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি।’ মহাভারতে সমুদ্র তীরবাসী বঙ্গদের ম্লেচ্ছ বলা হয়েছে। বাঙ্গালা বা বাঙলা সাধারণভাবে সমস্ত বাংলার নাম। মোগল আমলে এই দেশ সুবা বাঙলা নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বাঙলা বা বাঙ্গালা নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বঙ্গা শব্দের অর্থ আল। শুধু আইল নয়, ছোট বড় বাঁধ যুক্ত হয়ে বঙ্গাল নামের উৎপত্তি। প্রাচীন বাংলায় বঙ্গ বঙ্গাল বলতে যে দেশ খন্ড বুঝাতো তা বর্তমান বাংলার সমর্থক নয়। প্রাচীন বাংলাদেশ যে সব জনপদে বিভক্ত ছিল বর্তমান বঙ্গ তার একটি বিভাগ মাত্র যা বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ বঙ্গকে বোঝায়। প্রাচীন বাংলায় বঙ্গা, রাঢ়া, পুন্ড্রো গৌড়া, কৌম জনের (Tribe) বাসস্থান থেকে বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ড্র জনপদের সৃষ্টি হয়। আনুমানিক ষোড়শ সপ্তদশ শতকে দিগ্বিজয় প্রকাশ নামক গ্রন্থে উপবঙ্গের উল্লেখ আছে।

উপবঙ্গ যশোর ও তৎসংলগ্ন এলাকা ছিল উপবঙ্গের যশোরাদ্যাঃ। প্রবঙ্গ নামেও একটি জনপদের উল্লেখ আছে। সমাচার দেবের ঘঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবীথির উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবীথি নব্যকাশিকার অন্তর্ভূক্ত ছিল। সুবর্ণবীথির অন্তর্ভুক্ত ছিল বারক মন্ডল, ধ্রুবিলাটি। বারক মন্ডল ছিল প্রায় সমুদ্রশ্রয়ী। ফরিদপুরের ধ্রুবিলাটি রাজবাড়ি হতে পূর্বে এবং ফরিদপুর হতে পশ্চিমে ফরিদপুর শহরের কাছাকাছি ধুলট যা বর্তমানে ধুলদি গেট।

বর্তমান রাজবাড়ি অতীত ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত। ৬ষ্ঠ ৭ম শতকে এ অঞ্চল বারক মন্ডল এবং ৯ম ১০ম শতকে কুমার তালক মন্ডল। এ অঞ্চলের মানুষ আদি বঙ্গজনা বঙ্গালজাতি। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের কাছে ফরিদপুরের মানুষ বাঙ্গাল বলে পরিচিত। কথায় বলে, ফরিদপুরের বাঙ্গাল। তবে রাজবাড়ির পশ্চিমাংশ এবং গড়াইয়ের তীরবর্তী এলাকা যশোরের প্রভাবিত ছিল। সে হিসেবে উপবঙ্গের যশোরদ্যাঃ এর প্রভাব রয়েছে। অনেকে এ অঞ্চলকে সমুদ্র তটাশ্রয়ী বলে সমতটীয় মনে করেন। আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই। সমুদ্র গুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে (চতুর্থ শতক) সমতট নামে একটি জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। যার অবস্থান কামরুপের দক্ষিণে। ইউয়াং চোয়াং এর বিবরণী থেকেও পন্ডিতগণ মনে করেন মধ্য বাংলার কিছু অংশ ছিল সমতট। তবে এ সমতট বলতে কুমিল্লা ত্রিপুরাকে বুঝিয়েছেন। চতুর্থ শতকের শেষে ইৎসিং সমতটে রাজভট নামে এক রাজার উল্লেখ করেছেন। সপ্তম শতকে আশ্রাফপুর পট্রলীতেও তা পাওয়া যায়। রাজভটের অন্যতম রাজধানী ছিল ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলার বড়কামতা। তবে প্রাচীনতম ঐতিহাসিক কাল হতে খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ ৭ম পর্যন্ত বাংলাদেশ পুন্ড্র বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, সুম্ম, তাম্রলিপ্ত, সমতট প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত ছিল।

শশাঙ্কের পর ৮ম শতক থেকে বাংলাদেশ পুন্ড্র বা পুন্ড্রবর্ধন, গৌড় ও বঙ্গ এ তিনটি জনপদেই সমগ্র বাংলার রুপ নেয় এবং নতুন করে বিভাগীয় নামের উদ্ভব হয়। যেমন----পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা অঞ্চলে বঙ্গাল ও হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, সমতট। উত্তরবঙ্গে বরেন্দ্রী। তাম্রলিপ্তি অঞ্চলে দন্ডভুক্তি। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, সমতট। চন্দ্রদ্বীপ বরিশাল অঞ্চল।

Additional information