প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-৬

হরিকেল (নোয়াখালি ও কুমিল্লা অংশ বিশেষ) বাদ দিলে দক্ষিণ বাংলার ফরিদপুর যশোর বঙ্গালদেশের মধ্যে পড়ে। প্রাচীন সমতটের নাম বদলে যায়। ৮ম ৯ম শতকের পর এ অঞ্চল সাগরতটীয় বলে সমতটীয় নামকরণ হলেও এ অঞ্চল মূলত বঙ্গ, বঙ্গাল, বাঙলা। অন্যদিকে বাংলা বিভিন্ন নামে উপবিভক্ত হলেও তিনটি জনপদ বঙ্গ, গৌড়, পুণ্ডের প্রধান অস্থিত্ব বজায় থাকে। যার মধ্যে গৌড়ের প্রভাব বেশি। পাল ও সেনরাজাদের লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল গৌড়েশ্বর হিসেবে পরিচিত হওয়া। লক্ষণসেন যে মুহুর্তে গৌড় অধিকার করলেন তখন তিনি গৌড়েশ্বর। আওরঙ্গজেবের আমলে সুবা বাংলার যে অংশ নবাব শায়েস্তাখানের শাসনাধীন ছিল তাকে বলা হতো গৌড় মণ্ডল। তবে সমগ্র বাংলাকে গৌড়ীয় করার প্রচেষ্টা সার্থক হয় নাই। আসলে তা শেষে বঙ্গ নামই গ্রহণ করেছে।

সুলতানি আমলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করলেও সম্রাট আকবরের আমলে সমগ্র বাংলাদেশ পূর্ববাংলার পরিচিতি পায়। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দেও দেখা যায় বাংলার অধিপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। বৃটিশ আমলে বাংলার নাম পূর্ণ পরিচিতি পায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগ সবই বাংলার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব প্রমাণ করে। দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলা পূর্বপাকিস্তান আর ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তা স্বাধীন বাংলাদেশ। যা আজও প্রাচীন বঙ্গ, বাঙ্গালা, বাংলার নামে।

প্রাচীন শাসন

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীনবঙ্গের জনপদ। পদ্মার প্রবাহের দক্ষিণের ভাগিরথী ও প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী অঞ্চলের ব-দ্বীপের প্রাচীন পরিচিতি বঙ্গ। সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব কালে (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দে) কবি কালিদাসের রঘু বংশের বঙ্গ পরিচিতিতে দেখা যায় গঙ্গার মুখের শাখা প্রশাখা দ্বীপ পুঞ্জই বঙ্গ যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল স্তরে এমন কি যুদ্ধ ও সমুদ্র ব্যবহারে নৌকা ব্যবহার করত। বঙ্গের শাসনকালের প্রাথমিক ধাপে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩৮০-৫১২) পরিচয় পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত ও সমুদ্র গুপ্তের স্বর্ণ মুদ্রার আবিস্কারের পর থেকে জানা যায় এ অঞ্চল তাদের অধিন ছিল। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ফোর্টের সন্নিকটে পাওখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরীতে স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কৃত হয়।

চন্দ্র গুপ্তের ও স্কন্ধ গুপ্তের শাসন বলতে দক্ষিণ বঙ্গের ফরিদপুর, বরিশাল, যশোরের কিয়দংশকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এখানে তাম্র পট্রলি পাওয়া যায় যাকে ই-ই পার্জিটার বিশ্লেশণ করে মতামত দেন ষষ্ঠ শতকে এখানে আর এটি রাজ্যের উত্থান ঘটে। ৫৩১ এবং ৫৬৭ সালের তাম্র পট্রলির ব্যাখ্যা দিয়ে পার্জিটার ধর্মাদিত্য ও গোপ চন্দ্রের রাজত্বকাল নির্ধারণ করেন। ধর্মাদিত্য ছিলেন অতি ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক রাজা। গোপচন্দ্র গোপীচন্দ্র বলে পরিচিত ছিলেন। কোটালীপাড়া ফোর্টের পশ্চিমাঞ্চলে ঘাঘর নদীর পিনহারির নিকট ঘুঘরাহাটিতে আর একটি তাম্র পট্রলি আবিস্কৃত হয়। এতে রাজা সমাচার দেবের নাম দেখা যায়। পার্জিটারের মতে ৬১৫-৬২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমাচার দেব অত্র অঞ্চল রাজত্ব করেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর এ দেশের অঞ্চল সামাচার দেবের রাজত্বকাল ছিল। সমাচার দেবের রাজত্ব কালের আরো নিদর্শন পাওয়া যায় মুহাম্মদপুরের নিকটবর্তী আমুখালি নদীর তীরে আরো দুটি স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কারের মধ্য দিয়ে। নালিনীকান্ত ভট্রশালী এ মতামত স্বীকার করেন এবং বলেন সমাচার দেব ছিলেন রাজা (Monarch) তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারী নন। তিনি শশাঙ্কের পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

Additional information