প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-৭

ইউয়াং চোয়াং -এর বর্ণনা মতে বঙ্গ যথাসম্ভব ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট হর্ষবর্ধনের আয়ত্বাধীন হয়। উল্লেখ্য, চৌনিক পরিব্রাজক ইউয়াং চোয়াং (৬৩০-৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন।

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর তা সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং বাংলায় স্বাধীন রাজত্বের উদ্ভব হয়। ঢাকার অদূরে আশ্রাফপুর পট্রলিপিতে এর প্রমাণ মেলে। এ সময় স্কন্ধ রাজবংশের উদ্ভব হয়। স্কন্ধ রাজবংশীয়রা ছিলেন বুদ্ধিষ্ট এবং রাজধানী ছিল কুমিল্লার সন্নিকটে বড়কামতা। 

নবম এবং দশম শতকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজত্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। শরিয়তপুর জেলার ইদিলপুর তাম্র পট্রলী থেকে জানা যায়। এ বংশের শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্রলী দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখণ্ড ভূমি দান করেন। স্মতট পদ্মাবতী বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য ৮ম শতকের পুণ্ড্রভূমি (মহাস্থানগর বর্তমান বগুড়া) পাল শাসনের স্থাপত্য রয়েছে। পাল শাসনের নিদর্শন বঙ্গে তেমন না থাকলেও রাজবাড়ি পুণ্ড্রভূমির দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বলে এ অঞ্চলে পাল শাসনের অধীন হয়। কালুখালির হারোয়াতে মদন মোহন জিউর বলে যে মূর্তিটি রয়েছে, অনেকে তা পাল মাসনের স্মৃতি বলে মনে করেন। ২০০৩ সালে রাজবাড়ির তেঘারিতে একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পর বিক্রমপুরে বর্ম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ম রাজবংশের বজ্রবর্মা, হরিবর্মা, সমলা বর্মা, ভোজ বর্মা এবং চন্দ্রবর্মা ১০৮০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কোটালীপাড়া চন্দ্রবর্মা ফোর্ট এ অঞ্চলে তাদের রাজত্বের নিদর্শন বহন করে।

পরবর্তীতে ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেনবংশের রাজত্বকাল। সেনবংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন। তিনি সম্ভবত বার’শ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে বাংলার দক্ষিণপূর্ব থেকে পালদের বিতাড়িত করেন। বল্লাল সেন বিজয় সেনের উত্তরাধিকারী এবং তিনি ছিলেন পণ্ডিত। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন উভয়েই শিবের পূজারী ছিলেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়র খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পরাজিত হন এবং পলায়ন করে বিক্রমপুর আসেন। পরবর্তীতে লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বেশ কিছুকাল বঙ্গে রাজত্ব করেন। এ বংশের বিশ্বরুপ সেনের শাসন ব্যবস্থার নির্দশন কোটালীপাড়ার দক্ষিণ পশ্চিমে পিঞ্জরীর নিকটপ্রাপ্ত তাম্র পট্রলী থেকে পাওয়া যায়। এ বংশ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বঙ্গ শাসন করেন।

সেন বংশের শাসনের অবসান কালে বঙ্গের একক শাসন শক্তি লোপ পায়। এ সময় দেব বংশের দশরথ দেব দক্ষিণপূর্ববাংলা (কুমিল্ল নোয়াখালি অঞ্চল) শাসন করেন। তার রাজ্য পরবর্তীতে ফরিদপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। দেব বংশের সমাচার দেবের রাজত্ব সম্বেন্ধে ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে পাওয়া যায়। সমাচার দেবের ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবিথীর উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবিথী নব্যকাশিকার (কোটালীপাড়া) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুবর্ণবিথীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বারব মণ্ডল, ধ্রুলিাটি।

ধ্রুবিলাটি বর্তমানে ধুলদি গেট (ফরিদপুর)। দেব বংশের রাজা দনুজমর্দন দেব সোনারগাঁকে রাজধানী করে স্বাধীনভাবে বঙ্গ শাসন করেন। তার রাজত্বকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তুঘরল খান দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।

Additional information