প্রাচীন জনপ্রবাহ - পৃষ্ঠা নং-৮

বরনীর বিবরণ থেকে জানা যায় তুঘরিল খান লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দেন। তিনি দনুজমর্দন দেবের শক্তি সোনারগাঁ দখল করার জন্য সোনারগাঁ রাজ্যের অদূরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বরণী এ কিল্লাকে নরকিল্লা বা নারকিল্লা বলেছেন। ফরিদপুরের ইতিহাস লেখক আনম আব্দুস সোবহান নারকিল্লাকে রাজবাড়ির দক্ষিণপূর্বে ১০ মাইল অদূরে মনে করেন। এটা বর্তমানের নলিয়া হতে পারে। দনুজমর্দন দেবের সময় শাসন কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টারের Statistical Account of the Dacca District ১১৯ পৃষ্ঠায় Professor Blochman এর দক্ষিণ বাংলার শাসন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান দ্বারা বিজিত হলেও দক্ষিণ বাংলা শতাব্দীকালেরও উর্ধে্ব বল্লাল সেনের বংশধর ও অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৩৩০ সালে মুহম্মদ তুঘলক পূর্ববাংলা দখল করেন এবং লক্ষ্ণৌতি সাতগাঁ ও সোনারগাঁ তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেন (ঢাকাসহ)। সোনারগাঁয়ের গভর্ণর ছিলেন তাতার বাহরাম খান। ১৩৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর ফকরউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং মুবারক শাহ নাম ধারণ করে প্রায় দশ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। সোনারগাঁ পূর্ববাংলার শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফকরউদ্দিন মবারক শাহ এবং তার বংশধরদের রাজত্বকালে বাংলা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অতঃপর ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লক্ষ্ণৌতিকে একত্র করে একচ্ছত্র স্বাধীন সুলতান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সময়েই বাংলা একক স্বাধীন বাংলায় পরিণত হয় যা ইতিহাসে ‘সুবে বাংলা’ বলে পরিচিত । ১৩৫২ সালে সেনারগাঁ টাকশাল থেকে তার নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ শাসন করেন। তার বংশধরগণের শাসনকালে শাসন কেন্দ্র সোনারগাঁ দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনারগাঁ শাসন করে। সিকান্দর শাহের পুত্র আযম শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কবি হাফিজকে সোনারগাঁয়ে আমন্ত্রণ করেন। আযম শাহের পর সোনারগাঁ সিংহাসন রাজা কানস এর দ্বারা অধিকৃত হয়। কিন্তু ১৪৪৫ সালের মধ্যে বাংলা পুনরায় মাহমুদ শাহের অধীনে একত্রিত হয়। এ সময় ইলিয়াস শাহের বংশধরগণের দ্বারা ১৪৮৭ ‍খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ শাসিত হয়। এদের মধ্যে জালাল উদ্দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলার পূর্বাঞ্চল মেঘনা থেকে সিলেট পর্যন্ত মোয়াজ্জামাবাদ প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্তু ঢাকার অঞ্চল বিশেষ করে ফরিদপুর এবং বাকেরগঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় জালালাবাদ ও ফতেহাবাদ প্রদেশ। ফতেহাবাদ যে ফরিদপুর তা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যদিও চট্রগ্রামের ৮ মাইল উত্তরে অন্য একটি ফতেহাবাদের উল্লেখ রয়েছে। ফতেহাবাদ সম্বন্ধে ড. আব্দুল করিম বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল পুস্তকের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘জালালউদ্দিন ফতেহাবাদ ও রোতসপুর হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। ফতেহাবাদ ও আধুনিক ফরিদপুর অভিন্ন।’ ইতিপূর্বে ফরিদপুর এলাকা মুসলমানদের অধীনে ছিল না। সেই অঞ্চলে এতদিন ছোট ছোট হিন্দু রাজারা রাজত্ব করতেন। সুতরাং ফতেহাবাদ হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ হওয়ায় আমরা বলতে পারি যে, জালাউদ্দিন ফরিদপুর জয় করেন এবং দক্ষিণ বঙ্গের দিকে রাজ্য বিস্তার করেন। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত ১৪৯৪-৯৫ সালের মধ্যে মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্য রচনা করেন।

কবি তার আত্মপরিচয়ে বলেন----

মুল্লুক ফতেহাবাদ বঙ্গজোড়া ইকলিম,

পশ্চিমে ঘাঘরা নদী পূর্বে ঘন্টেশ্বর।

Additional information