প্রাচীন জনপ্রবাহ

দ্বিতীয় অধ্যায়

প্রাচীন জনপ্রবাহ, জনপদ ও শাসন

রাজবাড়ি অঞ্চলে কবে? কোথায় প্রথম জনবসতি গড়ে উঠেছে তা নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে বঙ্গে জনপ্রবাহের আলোকে রাজবাড়িতে জন প্রবাহের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব। বর্তমানে রাজবাড়িতে ১০ লক্ষাধিক লোকের বাস। এই জনপ্রবাহের পূর্বপুরুষরা কখনো এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে থাকবে। মানুষের ইতিহাস বহু বছর পর্যন্ত প্রাঙনরের (Hominids) ইতিহাস। চীন, জাভায়, টাঙ্গানিকায়, পূর্ব জার্মানীতে এদের করোটি ও নানাবিধ চিহ্ন পাওয়া গেলেও বাংলায় এর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন প্রস্তর থেকে নব্য প্রস্তর তা থেকে ক্রমে ব্রঞ্জ ও ইস্পাতের যুগ এসেছে। এর অতিক্রমণ কাল প্রায় ২ লাক বছর। ভারতে প্রাচীন বা নব্য প্রস্তর যুগের তেমন নির্দশন পাওয়া যায় না। তবে বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে ১৯৬৩-৬৪ সালে পান্ড্র রাজার ঢিবি আবিস্কৃত হয়। যেখানে নব্য প্রস্তর যুগের সন্ধান মেলে। এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের তাম্র সভ্যতার যুগ।

বাংলার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ করে পন্ডিতগণ বাংলায় যে সমস্ত জাতিকে বর্তমান বাঙালিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন তার নিগ্রোবটু, আদি অষ্ট্রালয়েড, আদি নরডিক, আদি ভোটচীন গোষ্ঠীর মানুষ। নিম্নবর্ণের বাঙালি এবং আদিম অধিবাসী যাদের মধ্যে জনের প্রভাব বেশি নৃতত্ত্ববিদগণ তাদের আদি অষ্ট্রালয়েড বলে নামকরণ করেছেন। পন্ডিতগণ মনে করেন এই জন এক সময় মধ্যভারত হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভারত ও সিংহল হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া আলপেনীয় নিগ্রোবটু, ভোটচীন, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মানুষও প্রাচীন বাংলার আদিবাসী। আদিমতম স্তরে আদি অস্ট্রেলিয় তারপর দীর্ঘমুন্ডু ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, গোলমুন্ড আলপেনীয়, দীনারীয় নরগোষ্ঠী এবং সর্বশেষ উত্তর ভারতের আদি নরডিক বা আর্যজাতীয় ধারার মিলনে গাঙ্গেয় প্রদেশের এই বাংলায় খ্রিস্টপূর্ব ৭ম ও ৬ষ্ঠ থেকে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে ভারতে আর্য আগমন ঘটলেও আদি অস্ট্রেলিয়, নিগ্রোবটু, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর কৌম সমাজের মানুষেরা বসবাস করত এরও পূর্বে।

প্রাচীন বাংলার জনপ্রবাহের তেমন কোনো নিদর্শন নাই। তবে জনপ্রবাহের কিছু সংবাদ পাওয়া যায় বেদপুরাণ, মহাভারত গ্রন্থ, আলেকজান্ডার, টলেমির বর্ণনা এবং বিভিন্ন লিপি ও পট্রলী সংবাদ থেকে। ঐতরিয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধায়ন ধর্মসূত্রে বঙ্গের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। পুরানে দেশ সমূহের তালিকায় অঙ্গ, বিদেহ, পুন্ড্র ইত্যাদির সঙ্গে বঙ্গ যোগ করা হয়েছে। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ আছে। বঙ্গ কথাটি অনেকের মতে বঙ্গা থেকে এসেছে। বঙ্গাকৌম অর্থে বঙ্গাজনা। এভাবে বঙ্গা, রাঢ়, গৌড়, অর্থাৎ বঙ্গাজনা, রাঢ়াজনা, গৌড়াজনা। উপরোক্ত সূত্রগুলিতে বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান সম্বন্ধে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায় না। মহাভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বা ভূভাগের নাম দেওয়া আছে তা থেকে মনে হয় বঙ্গ একটি পূর্বাঞ্চলীয় দেশ যার অবস্থিতি ছিল অঙ্গ, সুম্ম, তাম্রলিপ্তি, মগধ এবং পুন্ড্রের কাছাকাছি। কালিদাসের রঘুবংশের রঘুর দিগ্বিজয়ের কথায়---- গঙ্গাস্রোত হন্তারেষু। তার ব্যাখ্যায় সকলে স্বীকার করেন যে, এর অর্থ গঙ্গাস্রোত অন্তর্বর্তী ভূভাগ অর্থাৎ ভাগীরথীর পূর্বে এবং পদ্মার দক্ষিণে ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, নদিয়া অঞ্চল নিয়েই প্রাচীন বঙ্গ। আলেকজান্ডার ও খ্রিস্টীয় প্রথম/দ্বিতীয় শতকে টলেমির বর্ণনায় যে গঙ্গারিডি জাতি ও রাষ্ট্রের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এই গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলকেই বোঝায়। এ জাতির ছিল ৬ হাজার রণহস্তী এবং জাতিটি ছিল পরাক্রমশালী। বিভিন্ন লিপি, পট্রলী প্রত্মতাত্ত্বিক আবিস্কার ও ঐতিহাসিক যুক্তি প্রমাণে বারক মন্ডল, কুমার তালক মন্ডল ও নব্য কাশিকার সভ্যতার স্পষ্ট প্রমাণাদি পঞ্চম শতক থেকে আরম্ভ হয়েছে।


ঢাকার আশ্রাফপুর, শরিয়তপুরের ইদিলপুর, নব্যকাশিকা বা কোটালীপাড়া, বারক মন্ডল, পদ্মা স্মতট কুমার তালক মন্ডলে জনপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে ভারতে আর্যীকরণ আরম্ভ হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। আর্যীকরণের প্রক্রিয়ায় অষ্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, নিগ্রোবটু আদিম গোষ্ঠীর মানুষ ধীরে ধীরে নব উত্থিত বঙ্গের দিকে সরে আসে এবং ইতর জীবন যাপন করে। এরা বিভিন্ন কৌমভূক্ত জাতি। মহাভারতে বাংলার বিভিন্ন কৌমভুক্ত জাতিকে মেলেচ্ছ বলা হয়েছে। বোধায়নে পুন্ড্র (উত্তর বঙ্গ) প্রভৃতি কৌমদের অবস্থিতি নির্দেশ করা হয়েছে। আর্যবহির্ভুত প্রান্তসীমায় বৌদ্ধ আর্যমুঞ্জুলিকা গ্রন্থে গৌড়, সমতট ও হরিকেলের ভাষাকে অসুর ভাষা বলা হয়েছে। আর্যরা এদের দস্যু, পাপ, মেলেচ্ছ প্রভৃতি উন্নাষিকতায় চিহ্নিত করেছে। প্রাচীন বাংলার এ অঞ্চলে আদি অষ্ট্রালয়েড, দ্রাবিড় গোষ্ঠীর বসবাস খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু হতে পারে। পুন্ড্রের উত্থান অপেক্ষকৃত বঙ্গের সমতটীয় অঞ্চলের অনেক পূর্বে হওয়ায় তাদের আগমন ঐ অঞ্চলে পূর্বে শুরু হয়। রাজবাড়ি অঞ্চল সমতটীয় অঞ্চল হলেও ভৌগোলিক কারণেই এর উত্থান দক্ষিণাঞ্চলের পূর্বে। যে কারণে এ অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর কৌম সমাজের বিস্তার ঘটতে পারে। আর্যীকরণের পর বর্ণভেদের উদ্ভব হয় আর বর্ণাশ্রমের বাইরে তৎকালীন কৌম সমাজের মানুষের পরিচয় হয় চন্ডাল, চাঁড়াল, বাউরি, ঘট্রজীবী, ঢোলবাহি, মালো, হাড্ডি, বাগদি। প্রাচীন নিগ্রোবটু ও অষ্টিকজাতির সমকালে কিছু দ্রাবিড় জাতির আগমন ঘটে এবং সভ্যতায় উন্নত বলে অষ্ট্রিকজাতিকে গ্রাস করে। রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণে বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে অধিবাসীদের প্রায় ৯৮% শূদ্র পর্যায়ের। এদের শরীরের রং তামাটে পীতবর্ণ। আচার আচরণে হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণ থেকে আলাদা। এদের মুখন্ডল প্রশস্ত হলেও ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নাক কিছুটা দাবা। রাজবাড়ির সার্বিক জনপ্রবাহে প্রশ্ন আসে তাদের সংখ্যা এখানে এত বেশি কেন? অনেকের ধারণা পালশাসনের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহে যে বিপুল সংখ্যাক কৈবর্ত এ অঞ্চলে আগমন ঘটে এরা তাদেরই একটি অংশ। এরা প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন নিগ্রোবটু ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর লোক। সোনাপুর, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, সোনাইকুড়ী, আড়কান্দি, বাগদুল অঞ্চলের শুদ্রদের থেকে এরা আলাদা। রাজবাড়ি জেলার কালুখালির উত্তরে বর্তমানে পদ্মার পাড় এলাকায় প্রকীর্থ বলে একটি গ্রাম আছে। উক্ত গ্রামে ২০/২৫টি প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করে। এদের চেহারা সম্পূর্ণ পীতবর্ণ এবং আচরণ সাঁওতাল জাতীয়। ধারণা করা যায় এরা আদি অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর লোক।

দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা বিশ্লেষণে দেখা যায় এদের মধ্যে পুর, উর, দিয়া, দির ব্যবহার ছিল। পুর, পুরপাল বা নগরপাল। যে সমস্ত গ্রামের শেষে পুর রয়েছে তা অপেক্ষাকৃত পুরাতন জনের বাসস্থান। রাজবাড়ির পুর দিয়ে গ্রাম বিনোদপুর, ভবানীপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, সজ্জনকান্দা, বেড়াডাঙ্গা থেকে বেশি পুরাতন। রাজবাড়ি জেলার সোনাপুর, বহরপুর, চন্ডিপুর, মধুপুর, নিশ্চিন্তপুর, তারাপুর, মদাপুর, কালিকাপুর এরুপ অসংখ্য পুরের গ্রাম। এ পুরের বেশির ভাগ গ্রামই অনেক পুরাতন। ধারণা করা যায় এক সময় এ অঞ্চলে প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ব্যবহৃত পুর থেকে েএত পুরের ব্যবহার এসেছে। তা ছাড়া পদমদি, রতনদিয়া দি, দিয়া দ্রাবিড় ব্যবহৃত শব্দ। রাজবাড়ি জেলার পশ্চিমে বাগদিপাড়া ছিল। এ ছাড়া জেলার অন্যান্য স্থানে বাগদি, ডোলবাহী, মুচি, চন্ডাল চাড়ালের আধিক্য রয়েছে। প্রকৃত অর্থেই এরা আদি কোমজনের উত্তরসুরী এবং আদি গোষ্ঠীর জন। রাজবাড়ি অঞ্চলে কৌম কথাটি বহুল প্রচলিত। প্রাচীন কৌম জনা বা বিভিন্ন কৌমভুক্ত মানুষের প্রাচীন ব্যবহৃত এ কথাটি এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন লিপি ও পট্রলী থেকে পাওয়া সংবাদে এ অঞ্চলে সপ্তম, অষ্টম শতকের জনপ্রবাহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে ভূমি ব্যবস্থা সম্পর্কিত যেসব পট্রলী বাংলায় পাওয়া গেছে ঐগুলির দু’ একটি থেকেও রাজবাড়ি জেলার জনসংবাদ পাওয়া যেতে পারে। খ্রিস্টোত্তর পঞ্চম হতে অষ্টম শতক পর্যন্ত পট্রলীগুলি ভূমিদান বিক্রয়রীতির বিষয়।


এরমধ্যে পাহাড়পুর পট্রলী, গুনাইঘর পট্রলী, আশ্রাফপুর পট্রলী, ইদিলপুর পট্রলী, ধনাইদহ পট্রলী, দামোদর পট্রলী, বিক্রমপুর পট্রলী, নব্যকাশিকা পট্রলী, ব্রাহ্মণকে বা দেবতার উদ্দেশ্যে ভুমিদানরীতি তাম্র পাট্রাস বা ফলকে লেখা। ভূমিদানের বিষয়ে অত্র অঞ্চলে পট্রলী চালু ছিল তা বোঝা যায় এসব পট্রলীতে ব্যবহৃত ভুমির মাপ, প্রকারভেদ, ভুমির মূল্য নিরুপন থেকে। ভূমির পরিমাপ ব্যাবহারের ক্ষেত্রে নল ব্যবহার হত। নল আজও রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। বাস্তভিটায় এবং কর্ষণযোগ্য ভূমি নাল, খিল এখনো ব্যবহৃত হয়। এছাড়া জোলা, জোলক, তালক, পাঠক, খাল, বিল, এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর ব্যবহৃত দ্রাবিড় শব্দ। নীহাররঞ্জন এর কথায়-----পদ্মার খাঁড়িতে ফরিদপুর অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া ভাগীরথীর তীরে ডায়মন্ড হারবারের সাগর সঙ্গম পর্যন্ত বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চব্বিশ পরগনার নিম্নভূমি ঐতিহাসিক কালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখন গভীর অরণ্য, কখনো নদীগর্ভে বিলীন আবার কখনো খাঁড়ি খাঁড়িকা অন্তর্নিহিত হইয়া নতুন স্থল ভূমির সৃষ্টি। ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া অঞ্চল ষষ্ট শতকের তাম্র পট্রলীতে নব্যকাশিকা বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। ষষ্ট শতকে নব্যকাশিকা (কোটালীপাড়া) সমৃদ্ধ জনপদ এবং এ অঞ্চলে নৌবাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র। কোটালীপাড়া সমুদ্রতটীয় আর এ অঞ্চলকে সমতটীয় অঞ্চল বলা হইয়াছে। ‘ইউয়াং চোয়াং সপ্তম শতকে সমতটে এসেছিলেন। তার বর্ণনায় সমতট সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। ইউয়াং চোয়াং এর সমতট বর্তমানে রাজবাড়ি, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাগুরা, যশোর ও খুলনার পূর্ব অঞ্চল। সমতটের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে রাজবাড়ি সাগর থেকে অনেক উত্তরে গঙ্গার মুখে থাকায় এ অঞ্চলে দ্বীপ বা ভূ-উত্থান অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যাকে পুরাতন সমতটীয় অঞ্চল বলা যেতে পারে। এ পুরাতন সমতটীয় অঞ্চলে প্রাচীন গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস শুরু হয়ে থাকবে যা নবম দশম শতকে পূর্ণরুপ গ্রহণ করেছে।

প্রাচীন জনপদ

প্রাচীন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিন্যাসে ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, বীথি ও গ্রামের উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্টীয় বিভাগের নাম ভুক্তি যা কয়েকটি বিষয় নিয়ে গঠিত হত। বিষয় গঠিত হত কয়েকটি মন্ডল নিয়ে এবং মন্ডল গঠিত হত কয়েকটি বীথি আর বীথি গঠিত হত কয়েকটি গ্রাম নিয়ে। এতে বোঝা যায় বিষয়ের আয়তন প্রদেশ প্রায় এভং মন্ডল জেলা প্রায়। নবম দশম শতকে এ অঞ্চলটি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে কেশব সেনের ইদিলপুর লিপি বা পট্রলীতে। দশম শতকের শেষে চন্দ্র বংশীয় রাজারা বিক্রমপুর, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল অর্থাৎ পূর্ব দক্ষিণ অংশ জুড়ে রাজত্ব করতেন। এই বংশের মহারাজাধিরাজ শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর লিপি (বর্তমানে শরীয়তপুর) দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী বিষেয়ের অন্তর্গত কুমার তালক মন্ডলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখন্ড ভূমি দান করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণকে পুনর্বাসনের জন্য ভূমিদান করা হত। স্মতট পদ্মাবতী বিষয় পদ্মানদীর দুই তীরবর্তী প্রদেশকে বোঝায় তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে বোঝা যায় এ অঞ্চল তখন পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। কুমার তালক মন্ডলের উল্লেখ আরো লক্ষণীয়। ‘কুমার তালক এবং বর্তমান গড়াই নদীর অদূরে কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কুমারখালি দুই-ই কুমার নদীর ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান কুমার বা কুমারখালি পদ্মা উৎসারিত মাথা ভাঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে বর্তমানে গড়াইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

মূলতঃ মাথাভাঙ্গা নদীয়া জেলার উত্তরে জলাঙ্গীর উৎপত্তির প্রায় ১০ মাইল পূর্ব দিকে পদ্মা হতে বের হয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের প্রায় ৫ মাইল পশ্চিমে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। কুমার নামে শাখাটি পূর্বমুখে গিয়ে আলমডাঙ্গা স্টেশনের কিছুটা উত্তরে রেল লাইনের নিচে দিয়ে নদীয়া, যশোর ও খুলনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। কুমারের পূর্বগামী আর একটি শাখা শৈলকুপা, শ্রীপুর, মাগুরা হয়ে গড়াইয়ে মিলেছে।


কুমার আবার মধুখালির পাঁচমোহনী হয়ে বর্তমান ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত। অনেক সময় গড়াই ও কুমারকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। কুমার প্রাচীন নদী এবং এর প্রবাহ ব্যাপক। অনুমান করা যায় ফরিদপুরের পশ্চিমাঞ্চল, যশোরের উত্তরাঞ্চল এবং কুষ্টিয়া স্মতট পদ্মাবতী বিষয়। সেই হিসেবে রাজবাড়ি স্মাতট পদ্মাবতী বিষয়ের অন্তর্গত। অন্যদিকে কুমার তালক বা কুমারের তল বা নিম্নভূমি নিয়ে পদ্মাবতীর যে মন্ডল তা কুমার তালক মন্ডল। সেই হিসেবে গড়াই আর কুমার যদি অভিন্ন হয় তাহলে অবশ্যই বর্তমান রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডল ছিল। কুমার তালক মন্ডলের সীমানা নির্ধারণ দুরুহ। ইতিপূর্বে কুমারখালির কথা বলা হয়েছে। প্রতীয়মান হয় কুমার থেকেই কুমারখালি এসেছে এবং গড়াইকে একসময় কুমার বলা হতো। গড়াই এর আলোচনা থেকে বলা যায় গড়াইয়ের উৎস মুখ কখনো খনন করা হয়ে থাকবে বলে উৎস মুখে তা গৌড়ী এবং খননের পরে তা হয়েছে গড়াই। এ হিসেবে রাজবাড়ির বেশির ভাগ অঞ্চল বিশেষ করে পূর্বাংশে সামান্য বাদ দিয়ে এটা কুমার তালক মন্ডল আর বিষয় হিসেবে স্মতট পদ্মাবতী। *নিবন্ধটি নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির আদি ইতিহাস প্রথম খন্ডের অনুসরণে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার এর ইতিহাস পর্যালোচনায় অত্র অঞ্চলে গঙ্গারিডি জাতি বলে এক পরাক্রমশালী জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে গ্রীক লেখকগণের বর্ণনায় তা আরো স্পষ্ট হয়।

দিওদোরসের লেখনীতে গঙ্গারিডি জাতির বিপুল সেনাবাহিনী ও ৬ হাজার রণহস্তীর উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১ম ও ২য় শতকে পেরিপ্লাস গ্রন্থে টলেমীর বিবরণ হতে জানা যায় এই সময়ে স্বাধীন গঙ্গারিডি রাষ্ট্র বেশ প্রবল ছিল। গঙ্গা রাষ্ট্রের বাইরে সমসাময়িক বাংলায় আর যে সব রাজা ও রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল তাদের সঙ্গে গঙ্গার রাষ্ট্রের কি সম্বন্ধ তা জানার উপায় নাই। তবে মহাভারত ও সিংহলী পুরানের কাহিনী থেকে কিছু সংবাদ পাওয়া যায়। রাষ্ট্র বিন্যাসের একটি আভাস পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২য় শতকে মহাস্থানের শিলাখন্ড লিপিটি থেকে। মৌর্য আমলে উত্তরবঙ্গ মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে মৌর্যশাসনের কেন্দ্র ছিল নুডনগল বা পুন্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার ৫ মাইল দুরে। মহাস্থান গড়ে। টলেমির বর্ণনায় দেখা যায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল গঙ্গাবন্দর। এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল তাম্রলিপ্তি বন্দরের আরো দক্ষিণপূর্বে ক্যামবেরীখন নদী (Kamberikhon) বা কুমার নদীর মোহনায়। কুমার নদীর তল ধরেই কুমার তালক মন্ডল। গঙ্গা বন্দরে অতি সূক্ষ্ণ কার্পাস বস্ত্র উৎপন্ন হত এবং নিকটে কোথাও সোনার খনি ছিল বলে নীহাররঞ্জনের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে ক্যালটিস নামক এক প্রকার সুবর্ণ মুদ্রার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ৬ষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণ বীথির উল্লেখ আছে। ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম, মুন্সিগঞ্জের সোনারঙ্গ, রাজবাড়ির সোনাপুর, সোনাকান্দা বাংলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী একথা স্মরণ করে দেয়। রাজবাড়ি অঞ্চলে সোনার টাকা ভরা গুপ্ত ধনের গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। সোনাপুর রাজবাড়ির গ্রাম হিসেবে অতি পুরাতন। সোনাপুর এটা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। নলিয়া, আড়কান্দি, বহরপুর, বালিয়াকান্দি, অত্র অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উঁচু ভুমি। এর উত্থান এবং প্রাচীন বসতি অনেক পূর্ব থেকে। অত্র অঞ্চল সন্ধান করলে গুপ্তধন না হোক খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা নদী প্রাচীনকালে কুমার তালক মন্ডলে। এর মোহনা থাকা স্বাভাবিক। সে মোহনায় গঙ্গা বন্দর প্রাচীন কুমার তালক মন্ডল হতে পারে। রাজবাড়ি কুমার তালক মন্ডলের বীথি হতে পারে। এ সবই প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্রের অঙ্গ বা এলাকা হতে পারে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ঢাকা কর্তৃক ষষ্ঠ শ্রেণী সমাজ বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন যুগে বাংলাদেশ পরিচ্ছেদ পৃষ্ঠা-৩৬ এ যে প্রাচীন বাংলার মানচিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে তাতে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অবস্থান বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোর দেখা যায় মানচিত্রটি সন্নিবেশিত হল।


প্রাচীন জনপদ : রাজবাড়ির অবস্থান

প্রাচীন কৌম সমাজে বঙ্গ বা বঙ্গাজনার উল্লেখ রয়েছে। ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে মহাভারতে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায় বঙ্গ একটি প্রাচীন দেশ। এদেশটি গঙ্গার নিম্ন অববাহিকার ভাটির দেশ যাদের বঙ্গাল বলা হয়। ‘ভাটি হতে আইল বঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি।’ মহাভারতে সমুদ্র তীরবাসী বঙ্গদের ম্লেচ্ছ বলা হয়েছে। বাঙ্গালা বা বাঙলা সাধারণভাবে সমস্ত বাংলার নাম। মোগল আমলে এই দেশ সুবা বাঙলা নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বাঙলা বা বাঙ্গালা নামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বঙ্গা শব্দের অর্থ আল। শুধু আইল নয়, ছোট বড় বাঁধ যুক্ত হয়ে বঙ্গাল নামের উৎপত্তি। প্রাচীন বাংলায় বঙ্গ বঙ্গাল বলতে যে দেশ খন্ড বুঝাতো তা বর্তমান বাংলার সমর্থক নয়। প্রাচীন বাংলাদেশ যে সব জনপদে বিভক্ত ছিল বর্তমান বঙ্গ তার একটি বিভাগ মাত্র যা বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ বঙ্গকে বোঝায়। প্রাচীন বাংলায় বঙ্গা, রাঢ়া, পুন্ড্রো গৌড়া, কৌম জনের (Tribe) বাসস্থান থেকে বঙ্গ, রাঢ়, গৌড়, পুন্ড্র জনপদের সৃষ্টি হয়। আনুমানিক ষোড়শ সপ্তদশ শতকে দিগ্বিজয় প্রকাশ নামক গ্রন্থে উপবঙ্গের উল্লেখ আছে।

উপবঙ্গ যশোর ও তৎসংলগ্ন এলাকা ছিল উপবঙ্গের যশোরাদ্যাঃ। প্রবঙ্গ নামেও একটি জনপদের উল্লেখ আছে। সমাচার দেবের ঘঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবীথির উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবীথি নব্যকাশিকার অন্তর্ভূক্ত ছিল। সুবর্ণবীথির অন্তর্ভুক্ত ছিল বারক মন্ডল, ধ্রুবিলাটি। বারক মন্ডল ছিল প্রায় সমুদ্রশ্রয়ী। ফরিদপুরের ধ্রুবিলাটি রাজবাড়ি হতে পূর্বে এবং ফরিদপুর হতে পশ্চিমে ফরিদপুর শহরের কাছাকাছি ধুলট যা বর্তমানে ধুলদি গেট।

বর্তমান রাজবাড়ি অতীত ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত। ৬ষ্ঠ ৭ম শতকে এ অঞ্চল বারক মন্ডল এবং ৯ম ১০ম শতকে কুমার তালক মন্ডল। এ অঞ্চলের মানুষ আদি বঙ্গজনা বঙ্গালজাতি। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের কাছে ফরিদপুরের মানুষ বাঙ্গাল বলে পরিচিত। কথায় বলে, ফরিদপুরের বাঙ্গাল। তবে রাজবাড়ির পশ্চিমাংশ এবং গড়াইয়ের তীরবর্তী এলাকা যশোরের প্রভাবিত ছিল। সে হিসেবে উপবঙ্গের যশোরদ্যাঃ এর প্রভাব রয়েছে। অনেকে এ অঞ্চলকে সমুদ্র তটাশ্রয়ী বলে সমতটীয় মনে করেন। আসলে এর কোনো ভিত্তি নেই। সমুদ্র গুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে (চতুর্থ শতক) সমতট নামে একটি জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। যার অবস্থান কামরুপের দক্ষিণে। ইউয়াং চোয়াং এর বিবরণী থেকেও পন্ডিতগণ মনে করেন মধ্য বাংলার কিছু অংশ ছিল সমতট। তবে এ সমতট বলতে কুমিল্লা ত্রিপুরাকে বুঝিয়েছেন। চতুর্থ শতকের শেষে ইৎসিং সমতটে রাজভট নামে এক রাজার উল্লেখ করেছেন। সপ্তম শতকে আশ্রাফপুর পট্রলীতেও তা পাওয়া যায়। রাজভটের অন্যতম রাজধানী ছিল ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলার বড়কামতা। তবে প্রাচীনতম ঐতিহাসিক কাল হতে খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ ৭ম পর্যন্ত বাংলাদেশ পুন্ড্র বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, সুম্ম, তাম্রলিপ্ত, সমতট প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত ছিল।

শশাঙ্কের পর ৮ম শতক থেকে বাংলাদেশ পুন্ড্র বা পুন্ড্রবর্ধন, গৌড় ও বঙ্গ এ তিনটি জনপদেই সমগ্র বাংলার রুপ নেয় এবং নতুন করে বিভাগীয় নামের উদ্ভব হয়। যেমন----পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা অঞ্চলে বঙ্গাল ও হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, সমতট। উত্তরবঙ্গে বরেন্দ্রী। তাম্রলিপ্তি অঞ্চলে দন্ডভুক্তি। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, সমতট। চন্দ্রদ্বীপ বরিশাল অঞ্চল।


হরিকেল (নোয়াখালি ও কুমিল্লা অংশ বিশেষ) বাদ দিলে দক্ষিণ বাংলার ফরিদপুর যশোর বঙ্গালদেশের মধ্যে পড়ে। প্রাচীন সমতটের নাম বদলে যায়। ৮ম ৯ম শতকের পর এ অঞ্চল সাগরতটীয় বলে সমতটীয় নামকরণ হলেও এ অঞ্চল মূলত বঙ্গ, বঙ্গাল, বাঙলা। অন্যদিকে বাংলা বিভিন্ন নামে উপবিভক্ত হলেও তিনটি জনপদ বঙ্গ, গৌড়, পুণ্ডের প্রধান অস্থিত্ব বজায় থাকে। যার মধ্যে গৌড়ের প্রভাব বেশি। পাল ও সেনরাজাদের লক্ষ্য ও আদর্শ ছিল গৌড়েশ্বর হিসেবে পরিচিত হওয়া। লক্ষণসেন যে মুহুর্তে গৌড় অধিকার করলেন তখন তিনি গৌড়েশ্বর। আওরঙ্গজেবের আমলে সুবা বাংলার যে অংশ নবাব শায়েস্তাখানের শাসনাধীন ছিল তাকে বলা হতো গৌড় মণ্ডল। তবে সমগ্র বাংলাকে গৌড়ীয় করার প্রচেষ্টা সার্থক হয় নাই। আসলে তা শেষে বঙ্গ নামই গ্রহণ করেছে।

সুলতানি আমলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করলেও সম্রাট আকবরের আমলে সমগ্র বাংলাদেশ পূর্ববাংলার পরিচিতি পায়। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দেও দেখা যায় বাংলার অধিপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। বৃটিশ আমলে বাংলার নাম পূর্ণ পরিচিতি পায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগ সবই বাংলার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব প্রমাণ করে। দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলা পূর্বপাকিস্তান আর ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর তা স্বাধীন বাংলাদেশ। যা আজও প্রাচীন বঙ্গ, বাঙ্গালা, বাংলার নামে।

প্রাচীন শাসন

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীনবঙ্গের জনপদ। পদ্মার প্রবাহের দক্ষিণের ভাগিরথী ও প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী অঞ্চলের ব-দ্বীপের প্রাচীন পরিচিতি বঙ্গ। সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব কালে (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দে) কবি কালিদাসের রঘু বংশের বঙ্গ পরিচিতিতে দেখা যায় গঙ্গার মুখের শাখা প্রশাখা দ্বীপ পুঞ্জই বঙ্গ যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল স্তরে এমন কি যুদ্ধ ও সমুদ্র ব্যবহারে নৌকা ব্যবহার করত। বঙ্গের শাসনকালের প্রাথমিক ধাপে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩৮০-৫১২) পরিচয় পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত ও সমুদ্র গুপ্তের স্বর্ণ মুদ্রার আবিস্কারের পর থেকে জানা যায় এ অঞ্চল তাদের অধিন ছিল। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ফোর্টের সন্নিকটে পাওখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরীতে স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কৃত হয়।

চন্দ্র গুপ্তের ও স্কন্ধ গুপ্তের শাসন বলতে দক্ষিণ বঙ্গের ফরিদপুর, বরিশাল, যশোরের কিয়দংশকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে এখানে তাম্র পট্রলি পাওয়া যায় যাকে ই-ই পার্জিটার বিশ্লেশণ করে মতামত দেন ষষ্ঠ শতকে এখানে আর এটি রাজ্যের উত্থান ঘটে। ৫৩১ এবং ৫৬৭ সালের তাম্র পট্রলির ব্যাখ্যা দিয়ে পার্জিটার ধর্মাদিত্য ও গোপ চন্দ্রের রাজত্বকাল নির্ধারণ করেন। ধর্মাদিত্য ছিলেন অতি ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক রাজা। গোপচন্দ্র গোপীচন্দ্র বলে পরিচিত ছিলেন। কোটালীপাড়া ফোর্টের পশ্চিমাঞ্চলে ঘাঘর নদীর পিনহারির নিকট ঘুঘরাহাটিতে আর একটি তাম্র পট্রলি আবিস্কৃত হয়। এতে রাজা সমাচার দেবের নাম দেখা যায়। পার্জিটারের মতে ৬১৫-৬২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমাচার দেব অত্র অঞ্চল রাজত্ব করেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পর এ দেশের অঞ্চল সামাচার দেবের রাজত্বকাল ছিল। সমাচার দেবের রাজত্ব কালের আরো নিদর্শন পাওয়া যায় মুহাম্মদপুরের নিকটবর্তী আমুখালি নদীর তীরে আরো দুটি স্বর্ণ মুদ্রা আবিস্কারের মধ্য দিয়ে। নালিনীকান্ত ভট্রশালী এ মতামত স্বীকার করেন এবং বলেন সমাচার দেব ছিলেন রাজা (Monarch) তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধিকারী নন। তিনি শশাঙ্কের পূর্ব পর্যন্ত রাজত্ব করেন।


ইউয়াং চোয়াং -এর বর্ণনা মতে বঙ্গ যথাসম্ভব ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সম্রাট হর্ষবর্ধনের আয়ত্বাধীন হয়। উল্লেখ্য, চৌনিক পরিব্রাজক ইউয়াং চোয়াং (৬৩০-৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন।

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর তা সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায় এবং বাংলায় স্বাধীন রাজত্বের উদ্ভব হয়। ঢাকার অদূরে আশ্রাফপুর পট্রলিপিতে এর প্রমাণ মেলে। এ সময় স্কন্ধ রাজবংশের উদ্ভব হয়। স্কন্ধ রাজবংশীয়রা ছিলেন বুদ্ধিষ্ট এবং রাজধানী ছিল কুমিল্লার সন্নিকটে বড়কামতা। 

নবম এবং দশম শতকে চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজত্ব বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রবংশীয় রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে। শরিয়তপুর জেলার ইদিলপুর তাম্র পট্রলী থেকে জানা যায়। এ বংশের শ্রীচন্দ্র তার ইদিলপুর পট্রলী দ্বারা স্মতট পদ্মাবতী অঞ্চলে জনৈক ব্রাহ্মণকে একখণ্ড ভূমি দান করেন। স্মতট পদ্মাবতী বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য ৮ম শতকের পুণ্ড্রভূমি (মহাস্থানগর বর্তমান বগুড়া) পাল শাসনের স্থাপত্য রয়েছে। পাল শাসনের নিদর্শন বঙ্গে তেমন না থাকলেও রাজবাড়ি পুণ্ড্রভূমির দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি বলে এ অঞ্চলে পাল শাসনের অধীন হয়। কালুখালির হারোয়াতে মদন মোহন জিউর বলে যে মূর্তিটি রয়েছে, অনেকে তা পাল মাসনের স্মৃতি বলে মনে করেন। ২০০৩ সালে রাজবাড়ির তেঘারিতে একটি বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমান ঢাকা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। চন্দ্রবংশীয় রাজাদের পর বিক্রমপুরে বর্ম রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্ম রাজবংশের বজ্রবর্মা, হরিবর্মা, সমলা বর্মা, ভোজ বর্মা এবং চন্দ্রবর্মা ১০৮০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। কোটালীপাড়া চন্দ্রবর্মা ফোর্ট এ অঞ্চলে তাদের রাজত্বের নিদর্শন বহন করে।

পরবর্তীতে ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেনবংশের রাজত্বকাল। সেনবংশের প্রথম রাজা বিজয় সেন। তিনি সম্ভবত বার’শ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে বাংলার দক্ষিণপূর্ব থেকে পালদের বিতাড়িত করেন। বল্লাল সেন বিজয় সেনের উত্তরাধিকারী এবং তিনি ছিলেন পণ্ডিত। বিজয় সেন এবং বল্লাল সেন উভয়েই শিবের পূজারী ছিলেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেন। বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়র খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পরাজিত হন এবং পলায়ন করে বিক্রমপুর আসেন। পরবর্তীতে লক্ষণ সেনের বংশধরগণ বেশ কিছুকাল বঙ্গে রাজত্ব করেন। এ বংশের বিশ্বরুপ সেনের শাসন ব্যবস্থার নির্দশন কোটালীপাড়ার দক্ষিণ পশ্চিমে পিঞ্জরীর নিকটপ্রাপ্ত তাম্র পট্রলী থেকে পাওয়া যায়। এ বংশ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত নির্বিঘ্নে বঙ্গ শাসন করেন।

সেন বংশের শাসনের অবসান কালে বঙ্গের একক শাসন শক্তি লোপ পায়। এ সময় দেব বংশের দশরথ দেব দক্ষিণপূর্ববাংলা (কুমিল্ল নোয়াখালি অঞ্চল) শাসন করেন। তার রাজ্য পরবর্তীতে ফরিদপুর অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। দেব বংশের সমাচার দেবের রাজত্ব সম্বেন্ধে ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে পাওয়া যায়। সমাচার দেবের ঘুঘ্রাঘাটি লিপিতে সুবর্ণবিথীর উল্লেখ আছে। এই সুবর্ণবিথী নব্যকাশিকার (কোটালীপাড়া) অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুবর্ণবিথীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বারব মণ্ডল, ধ্রুলিাটি।

ধ্রুবিলাটি বর্তমানে ধুলদি গেট (ফরিদপুর)। দেব বংশের রাজা দনুজমর্দন দেব সোনারগাঁকে রাজধানী করে স্বাধীনভাবে বঙ্গ শাসন করেন। তার রাজত্বকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তুঘরল খান দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।


বরনীর বিবরণ থেকে জানা যায় তুঘরিল খান লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধির জন্য মনোযোগ দেন। তিনি দনুজমর্দন দেবের শক্তি সোনারগাঁ দখল করার জন্য সোনারগাঁ রাজ্যের অদূরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। বরণী এ কিল্লাকে নরকিল্লা বা নারকিল্লা বলেছেন। ফরিদপুরের ইতিহাস লেখক আনম আব্দুস সোবহান নারকিল্লাকে রাজবাড়ির দক্ষিণপূর্বে ১০ মাইল অদূরে মনে করেন। এটা বর্তমানের নলিয়া হতে পারে। দনুজমর্দন দেবের সময় শাসন কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তা মুসলিম শাসনভুক্ত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টারের Statistical Account of the Dacca District ১১৯ পৃষ্ঠায় Professor Blochman এর দক্ষিণ বাংলার শাসন সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান দ্বারা বিজিত হলেও দক্ষিণ বাংলা শতাব্দীকালেরও উর্ধে্ব বল্লাল সেনের বংশধর ও অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। ১৩৩০ সালে মুহম্মদ তুঘলক পূর্ববাংলা দখল করেন এবং লক্ষ্ণৌতি সাতগাঁ ও সোনারগাঁ তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেন (ঢাকাসহ)। সোনারগাঁয়ের গভর্ণর ছিলেন তাতার বাহরাম খান। ১৩৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর ফকরউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসন দখল করেন এবং মুবারক শাহ নাম ধারণ করে প্রায় দশ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। সোনারগাঁ পূর্ববাংলার শাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফকরউদ্দিন মবারক শাহ এবং তার বংশধরদের রাজত্বকালে বাংলা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অতঃপর ১৩৫১ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ সোনারগাঁ, সাতগাঁ ও লক্ষ্ণৌতিকে একত্র করে একচ্ছত্র স্বাধীন সুলতান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সময়েই বাংলা একক স্বাধীন বাংলায় পরিণত হয় যা ইতিহাসে ‘সুবে বাংলা’ বলে পরিচিত । ১৩৫২ সালে সেনারগাঁ টাকশাল থেকে তার নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ হয়। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ সোনারগাঁ শাসন করেন। তার বংশধরগণের শাসনকালে শাসন কেন্দ্র সোনারগাঁ দিল্লীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং স্বাধীন সুলতান হিসেবে সোনারগাঁ শাসন করে। সিকান্দর শাহের পুত্র আযম শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং কবি হাফিজকে সোনারগাঁয়ে আমন্ত্রণ করেন। আযম শাহের পর সোনারগাঁ সিংহাসন রাজা কানস এর দ্বারা অধিকৃত হয়। কিন্তু ১৪৪৫ সালের মধ্যে বাংলা পুনরায় মাহমুদ শাহের অধীনে একত্রিত হয়। এ সময় ইলিয়াস শাহের বংশধরগণের দ্বারা ১৪৮৭ ‍খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ শাসিত হয়। এদের মধ্যে জালাল উদ্দিন ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে বাংলার পূর্বাঞ্চল মেঘনা থেকে সিলেট পর্যন্ত মোয়াজ্জামাবাদ প্রদেশ গঠিত হয়। কিন্তু ঢাকার অঞ্চল বিশেষ করে ফরিদপুর এবং বাকেরগঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় জালালাবাদ ও ফতেহাবাদ প্রদেশ। ফতেহাবাদ যে ফরিদপুর তা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যদিও চট্রগ্রামের ৮ মাইল উত্তরে অন্য একটি ফতেহাবাদের উল্লেখ রয়েছে। ফতেহাবাদ সম্বন্ধে ড. আব্দুল করিম বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল পুস্তকের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ‘জালালউদ্দিন ফতেহাবাদ ও রোতসপুর হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন। ফতেহাবাদ ও আধুনিক ফরিদপুর অভিন্ন।’ ইতিপূর্বে ফরিদপুর এলাকা মুসলমানদের অধীনে ছিল না। সেই অঞ্চলে এতদিন ছোট ছোট হিন্দু রাজারা রাজত্ব করতেন। সুতরাং ফতেহাবাদ হতে মুদ্রা উৎকীর্ণ হওয়ায় আমরা বলতে পারি যে, জালাউদ্দিন ফরিদপুর জয় করেন এবং দক্ষিণ বঙ্গের দিকে রাজ্য বিস্তার করেন। মধ্যযুগের কবি বিজয় গুপ্ত ১৪৯৪-৯৫ সালের মধ্যে মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ কাব্য রচনা করেন।

কবি তার আত্মপরিচয়ে বলেন----

মুল্লুক ফতেহাবাদ বঙ্গজোড়া ইকলিম,

পশ্চিমে ঘাঘরা নদী পূর্বে ঘন্টেশ্বর।


ফতেহাবাদ মুল্লুকে ঘাঘড়া ও ঘন্টেশ্বরী নদীর মধ্যবর্তীস্থান ফুল্লেশ্রী গ্রামে কবির জন্ম। ফুল্লেশ্রী বর্তমান বরিশালের গৈলাগ্রামের একটি পল্লী। ফতেহাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ির কিছু অংশ। সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালের মুদ্রা ভাগলপুর, সাতগাঁও বাগেরহাট হতে উৎকীর্ণ হয়েছে এবং তার শাসনামলের শিলালিপি পাওয়া গেছে। ১৪৫৯ সালে তিনি যশোহর, খুলনা পুনরুদ্ধারের জন্য খান জাহান আলী নামে এক সেনাপতিকে পাঠান। তিনি এ অঞ্চল জয় করে খলিফাতাবাদ শহর এবং প্রশাসনিক বিভাগ ইকলিম হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। রাজবাড়ি জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের বিশেষত্ব এই যে বর্তমান জেলাটি পুরাতন ফরিদপুর ও যশোর জেলার সংলগ্ন। আবার উত্তরে পাবনার সাথেও এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে রাজবাড়ি জেলার অংশবিশেষ বেশির ভাগ সময় ফরিদপুর ও যশোর জোলার সাথে সংযুক্ত দেখা যায়। ১৭৯৩ সালে জেলাটির কিছু অংশ ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত ছিল। কাজেই রাজবাড়ি তৎকালীন সময়ে ফতেহবাদ ও খলিফাতাবাদের সাথে সংযুক্ত থাকাই স্বাভাবিক এবং রাজবাড়ির পূর্বাংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশ খলিফাতাবাদ প্রশাসনিক অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল।

১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজত্বকাল। Mr. Vincent Smith এর মতে হুসেন শাহ ছিলেন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম শাসক। Professor Blochman বলেন, Hussain shah first obtained power in the district of Faridpur, Fathahabad where his earliest coins were struck. হুসেন শাহের সময় রাজবাড়ি তার অধিকারভুক্ত হয়। রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী পরগনা, নশরতশাহী পরগনা, মাহমুদশাহী পরগনা, ইউসুফশাহী পরগনার নামকরণ হুসেনশাহের ভ্রাতা ইউসুফ শাহ এবং ইউসুফ শাহের সন্তান নশরত শাহ এবং মাহমুদ শাহের নামকরণে এসব পরগনার নামকরণ হয়। উল্লেখ্য পাংশা, বালিয়াকান্দি, গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলা নশরতশাহী, মাহমুদশাহী, নসিবশাহী, ইউসুফশাহী পরগনার নামে প্রাচীন পরিচিতি রয়েছে। এ সময় ফতেহাবাদ ছিল হুসেন শাহের প্রধান শাসন কেন্দ্র যা বর্তমান ফরিদপুর শহর। আইন-ই আকবরী গ্রন্থে দেখা যায় জালালুদ্দিন ফতেহ শাহ লক্ষ্ণৌতির শাসনকর্তা ছিলেন। (১৪৮১-১৪৮৭)। তিনি কতকগুলি সরকারে বিভক্ত করেন। এই সরকারে ফরিদপুরের অংশবিশেষ, ঢাকার অংশবিশেষ, বাকেরগঞ্জ নিয়ে জালালবাদ সরকার এবং ফরিদপুরের পশ্চিম অঞ্চল, যশোর এবঙ কুষ্টিয়অসহ মাহমুদাবাদ সরকার গঠিত হয়। বর্তমান রাজবাড়ি স্বাধীন সুলতানি আমলে ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ রাজ্য হিসেবে শাসিত। মোগল শাসনকালে আকবর নামায় দেখা যায় ১৫৭৪ ‍খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণপূর্ববাংলা জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহাবাদ জয় করেন এবং বাকলা ও তার অধিকারভুক্ত হয়। মোরাদ খান এখানেই থেকে যান এবং সাত বৎসর পর মৃত্যুবরণ করেন। আকবর নামায় দেখা যায় ফরিদপুরের উত্থান ইতিহাস খ্যাত। তাদের দমনের জন্য সম্রাট আকবর মানসিংহসহ একের পর এক সেনাপতি পাঠান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৬-১৬২৭) ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩) বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন তিনি সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ইসলাম খানের পর ১৭৫৭ পর্যন্ত ২১ জন সুবেদার বাংলা শাসন করেন। শেষের দিকে বাংলার সুবেদারগণ স্বাধীন নবাব হিসেবে বাংলায় রাজত্ব করতেন। খলিফাতাবাদ যশোর খুলনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যশোরের পরগনাসমূহের মধ্যে মাহমুদশাহী, মহিমশাহী, ইউসুফশাহী, নসিবশাহী, নশরতশাহী পরগণার মধ্যে রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি নসিবশাহী, পাংশা কালুখালির মহিমশাহী নশরতশাহী বিদ্যামান।


মোরাদ খান

সুলতানি শাসনামল থেকে দক্ষিণ বাংলায় ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ ও মাহমুদাবাদ রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এসব রাজ্যের রাজা দিল্লী সম্রাটের নামমাত্র বশ্যতা স্বীকার করে স্বাধীনভাবে রাজ্যশাসন করতেন। ফতেহাবাদকে এখন ফরিদপুর বলে। সম্ভবত বঙ্গেরশ্বর ফতেশাহের রাজত্বকালে ১৪৮২-৮৭ তে ফতেহবাদ নামের উৎপত্তি হয়। ফতেহ শাহ হতে হোসেন শাহ, নশরত শাহ প্রভৃতি বহু নৃপতির নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া যায়। (Catalouge of coins in Indian Museum voll-11 part 11:Nos 153-54 168, 169-70 and 202- Ain-e-Akbari, Bloch Ann P-374)। ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহমুদাবাদ পরবর্তীতে চাকলা ও সরকারের বিভক্ত হয়। বর্তমান ফরিদপুর, রাজবাড়ি ও গোপালগঞ্জ ফতেহাবাদ, খলিফাতাবাদ মাহমুদাবাদ জেলার অংশবিশেষ এ সকল সরকারের কিছু অংশ চাকলা ভূষণা ও চাকলা জাহাঙ্গীর নগরের অঙ্গীভূত থাকে।

সে সময় দাউদ নামে এক পাঠান রাজা ছিলেন ভূষণাধিপতি। সম্ভবত তিনি ১৫৬৫ সালে ভূষণার অধিপতি হন এবং তার উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী ছিল বর্তশান রাজবাড়িতে। (রিজা-উস-সালাতিন পৃষ্ঠা-৪২)। কেহ কেহ অনুমান করেন রাজবাড়িতে কোনো বিদ্রোহী রাজার রাজধানী ছিল। এর অনেকটাই সত্যতা মেলে যখন দেখি আকবর সেনাপতি মোরাদ খান দাউদকে পরাজিত করে রাজবাড়ির অনতিদূরে খানখানাপুরে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। দাউদ খান বিদ্রোহী হলে ১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর, বিদ্রোহ দমনে সেনাপতি মুনেম খাকে পাঠান। এ প্রসঙ্গে সতিশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসে ২২ পৃষ্ঠায়। ‘ সেনাপতি মুনেম খাঁ যখন (১৫৭৪) সসৈন্যে বঙ্গে আসেন তখন মোরাদ খাঁ নামক একজন সেনানী তাহার সহচর ছিলেন। তিনি ফতেহবাদ সরকারে বিদ্রোহ দমন করেন। ভূষণাই এই সরকারের জমিদারী ছিল। দাউদের সহিত মুনেম খাঁর সন্ধি হলে মোরাদ জলেশ্বরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। মুনেমের মৃত্যুর পর দাউদ পুনরায় বিদ্রোহী হইয়া ভদ্রকের শাসনকর্তা নজর বাহদুরকে হত্যা করেন। তখন মোরাদ পুনরায় ফতেহাবাদে প্রেরিত হন এবং তথায় তাহার মুত্যু হয়।’ আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাসে ৭১ পৃষ্ঠায়, ‘হিজরী ৯৮৮ সালে সম্রাট আকবরের বঙ্গাধিকারের সময়কালে মোরাদ খাঁ পাঠান সুবেদার দাউদের অধীন থাকিয়া ফতেহবাদ শাসন করিতেন। পরে মেদিনীপুর ও জলেশ্বরের মধ্যবর্তী মোগলমারী (তুকারো) নামক স্থানে মোগল পাঠানে যে যুদ্ধ হয় তাহাতে পাঠানেরা পরাস্থ হইয়া প্রস্থান করিলে পর হিজলীর (উড়িষ্যা) সামার খাঁ, ফতেহবাদের মোরাদ খাঁ এবং সাতগাঁর মিরজানবাদ মোগল বশ্যতা স্বীকার করে।’ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ তমিজউদ্দিন খান এর ‘The Test of time---my life and days' গ্রন্থে ২ পৃষ্ঠায়---- The great Moghul Akbar had dispatched a big army in 1574 for the subjugation of Bengal. A separate force was dispatched from the army under the command of the general Murad Khan Khankhanapur for the conquest of south-East Bengal. According to the Akbarnama (Akbar memories) Murad Khan conquered Fatahabad which was become Faridpur as well as Bakergong. He did not return to Delhi of completing his task. But settled along with a number of his men in the Fatehabad. According to some historians, he took up residence in at village he honourd by conferring on it in the name of Khnkhanapur is the largest village of the Goalanda sub-division of the districts of Faridpur.


আসকার ইবনে শাইখ রচিত বাংলার শাসনকর্তা গ্রন্থের ৩৩ পৃষ্ঠায়----‘১৫৭৪ সালে সম্রাট আকবর মোরাদ খাঁকে বাংলা অধিকারে পূর্ববঙ্গে পাঠান। আকবরনামায় দেখা যায় তিনি ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) বা সরকার বাকলা বা বাকেরগঞ্জকে আকবরের রাজ্যভুক্ত করেন। সুবেদারগণ ফরিদপুর শহরের ১৩ মাইল উত্তর পশ্চিম বর্তমান রাজবাড়ি সদর থানার অন্তর্গত খানখানাপুর গ্রামে বসবাস করতেন। মাত্র ৬ বছর রাজত্বের পর তিনি পরলোকগমন করেন।

সতীশ চন্দ্র মিত্র, আনন্দনাথ, তমিজউদ্দিন খান, আসকার ইবনে শাইফ এর উদ্ধৃতি থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় মোরাদ খাঁ ফতেহাবাদ শাসন করতেন। আকবর নামায় মুকুন্দরাম জমিদার অংশে দেখা যায় ‘১৫৭৪ সালে দক্ষিণবঙ্গ জয় করার জন্য সেনাপতি মোরাদ খানকে পাঠান হয়। সেনাপতি মোরাদ খান ফতেহাবাদ জয় করেন এবং বাকলা (বাখরগঞ্জ) তার অধিকারভুক্ত হয়। ফরিদপুরের পশ্চিমে খানখানপুরে তাঁর বাসস্থান ছিল। তিনি ফতেহাবাদ থেকে যান এবং ৭৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মোরাদ সম্ভবত খানখানাপুরে অবস্থান করতেন।’ মোগল শাসনকালে আমীর খানকেও এ অঞ্চলে শাসনকর্তা করে পাঠানো হয়। তার নামে আমিরাবাদ বলে একটি পরগনা ছিল।

মোগল সেনাপতি হোসেন কুলি খাঁর মৃত্যু হলে পাঠান কোতল খাঁ পুনরায় বাঙ্গলা আক্রমন করেন। কোতল খাঁ প্রথমত সাতগর শাসকর্তা মিরজাদাদ খাঁকে আক্রমণ করেন। মিরজাদাদ পলায়নপূর্বক সেলিমাবাদ প্রস্থান করেন। এদিকে কোতল খাঁর আক্রমণের এই সময় ভূষণায় মুকুন্দরাম নামে এক সামান্য জমিদার ছিলেন। মোরাদ খাঁর সাথে তার বিশেষ সখ্যতা ছিল। মোরাদ চার পুত্রকে নিয়ে মুকুন্দকে কোতল খাঁর বিরুদ্ধে সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর হলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফতেহবাদ আক্রমণ করল। এ সময় মোরাদ খাঁ অস্থায়ী নিবাস খানখানাপুরে বাস করেন। মুকুন্দ ও মোরাদের সৈন্যদল কতোল খাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হলেন। এদিকে মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহের দল বল নিয়ে বাঙ্গলায় আবির্ভূত হলেন। তিনিও কোতল খাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হলেন। উপায়ন্তর না দেখে পাঠান কোতল খাঁ উড়িষ্যার পলায়ন করেন। এর অব্যবহিত পরই ৭৪ বছর বয়সে মোরাদ খাঁ খানখানাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। এর পরবর্তী ঘটনায় তাঁর চার ছেলেকে কৌশলে হত্যা করে ভূষণাধিপতি মুকুন্দরাম সমগ্র ফতেহাবাদ অধিকার করেন।

Murad Khan died a natural death. Mukundu the land lord of that part of the country invited his sons as his guests and pur them to death and laid hold of his estate (Akbarnama Beveridge vol-111 p-469)

মোরাদ খানের সাথে এভাবেই জড়িয়ে আছে রাজ্য ফতেহবাদ, চাকলা ভূষণা তথা রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস।

মুকুন্দরাম রায় (ভুঁইয়া)

ভুষণা উত্থান পতনের সাথে জড়িয়ে আছে বর্তমান রাজবাড়ি জেলার অতীত ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে অনকগুলি জমিদার এক হয়ে দিল্লিশ্বরের অধীনতা থেকে তাদের মুক্ত করতে প্রয়াসী হন। তারা বার ভূঁইয়া নামে পরিচিতি। ভূঁইয়াদের সংখ্যা ১২ কি আট সে বিতর্কে না যেয়ে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য, চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্প রায়, বিক্রম পুরের কেদার রায়, চাঁদ রায়, ভুলুয়ার লক্ষণ মানিক্য, ভূষণার মুকুন্দ রায়, ভাওয়ালের ফজল গাজী, খিজিরের ঈশা খাঁ, পাবনার বিনোদ রায় ইতিহাসের পাতায় প্রসিদ্ধ।


মোগল বাদশাগণের সময়ে বাদশাহের প্রতিনিধি স্বরুপ মুসলমান নবাব দ্বারা বঙ্গদেশ শাসিত হত। তবে দেশ রক্ষা ও সাধারণ প্রজাদের রক্ষাণাবেক্ষণের ভার দেশীয় জমিদারগণের উপরই নির্ভর করত। এ কারণে প্রত্যেক জমিদারের অধীনেই পদাতিক, অশ্বরোহী, নৌযান, সদা প্রস্তত থাকত। আইনী আকবর গ্রন্থ থেকে জানা যায় বাদশা আকবরের রাজত্বকালে স্বদেশীয় জমিদাররা ২৩৩৩০ জন অশ্বারোহী, ৮০১১,৫০ জন পদাতিক ১৭০টি হস্তী, ৪২৬০টি কামান এবং ৪৪০০ নৌকা সম্রাটের জন্য সদা প্রস্তত রাখতেন। আকবরের রাজত্বকালে অনেক জমিদারই তাঁর আজ্ঞা শিরোধার্য বলে বিবেচনা করত। কিন্তু দ্বাদশ ভৌমিক তার বিরুদ্ধাচরণ কেন করল সে প্রশ্নে ইতিহাসবিদদের অভিমত বাদশাহের কর্মচারীদের সাথে তাদের বনিবনাও হত না। এছাড়া পরাজিত পাঠানদের অনেকই তাদেরকে উত্তেজিত করত। উররোরণ্ড টোডর মলের অন্যায় বন্দোবস্ত ভূ্ম্যাধিকারীদের বিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভূষণার মুকুন্দরাম এমনি একজন সাধারণ জমিদার মুকুন্দরামের পূর্ব পুরুষের বিষয়ে আনন্দনাথ এর অভিমত চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের পূর্ব পুরুষ যে সময় বিক্রমপুর আগমন করেন সে সময়ই মুকুন্দ রামের পূর্ব পুরুষেরা ফতেহাবাদ আগমন করেন। বিক্রমপুরের রায়রাজগণ, চন্দ্রদ্বীপের রাজরাজাগণ, ফাতেহাবাদের রাজরাজাগণ সকলেই উপাধিধারী কায়স্থ ছিলেন। বখতিয়ার খলজি যখন বাংলাদেশ আক্রমণ করেন অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন সেই সময় বাকলা চন্দ্রদ্বীপের ধনুজমর্দন রায়ের বংশাবলীর অনেকে পূর্বে বঙ্গের অনেক স্থানে জমিদারী সৃষ্টি করলে তারা নানা সম্প্রদায়ের বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই সময়ে ‘ভূষণা পট্রি বলয়া’ একটা সাধারণ সমাজের সৃষ্টি হয়। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণ মধ্যে ‘ভূষণা পট্রি বলায়’ এক সম্প্রদায়ের বর্তমান দেখা যায়। এই রাজবংশের উৎসাহে ভূষণার বিবিধ প্রকারে শিল্পকর্মের উৎকর্ষ সংগঠিত হয়। ভূষণা বর্তমান মধুখালির অন্তর্গত। ভূষণা বিভাগের বিশেষ করে বালিয়াকান্দি অঞ্চলের উৎপাদিত কার্পাস, পাট, ইউরোপে রপ্তানি হত। ফাতেহাবাদের স্থপতিরা এক সময় যাবতীয় নির্মাণ কাজ করত।ভূষণার কাঁসা পিতল বিখ্যাত ছিল। এ অঞ্চলে রেশম, মসলা, পান সুপারি, খয়ের, তিল, তিসি কার্পাস, জাফরান ইত্যাদি ব্যবসা জমজমাট ছিল। এই স্থানেই মুকুন্দরাম জমিদারী গড়ে তোলেন। পাঠান কোতল খাঁ ফাতেহাবাদ আক্রমণ করলে মুকুন্দ রায় মোগলদের পক্ষ অবলম্বন করেন। এতে মানসিংহ সন্তুষ্ট হয়ে মুসলমানদের অন্য কোনো শাসনকর্তা নিয়োগ না করে মুকুন্দ রায়কে রাজোপাধি অর্পণ করে তাঁকে ফাতেহাবাদের শাসনভার অর্পণ করেন।

মোরাদ খানের মৃত্যুর পর মুকুন্দরাম মোরাদের পুত্রগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে সমগ্র ফতেহাবাদের রাজা হন। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী টোডরমল মুকুন্দরামকেই ভূষণার জমিদার বলে স্বীকার করেন (১৫৮২)। মুকুন্দরাম মাঝেমধ্যে নামে মাত্র পেশকাম পাঠিয়ে দিল্লী সম্রাটের অধীনতার ভান করতেন। কিন্তু কার্যত তিনি ছিলেন স্বাধীন। আকবরের রাজত্বকালের শেষে বার ভূঁইয়াদের বিদ্রোহকালে বিদ্রোহীদের নেতা ছিলেন। প্রতাপাদিত্য ও কেদার রায়ের রাজ্য উৎসন্নে গেলেও মুকুন্দরাম দমিত হন নাই। জাহাঙ্গীরের সময় ইসলাম খাঁ (১৬০৮) বঙ্গের শাসনকর্তা হয়ে আসলে তিনি মুকুন্দরামের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং তার অধীনে একদল সৈন্য পাঠিয়ে কোষহাজো (আসামের কামরুপ) অধিকার করেন। মুকুন্দরাম তখন গৌরহাটি ও পুণ্ড্রর থানাদার নিযুক্ত হন। পরে তিনি তার পুত্র ছত্রাজিতকে রেখে ভূষণায় ফিরে আসেন। এসময় তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে নামমাত্র পেশকামও বন্ধ করে দেন। মানসিংহের সময়ে সৈয়দ খাঁ যখন বঙ্গের শাসনকর্তা তখন সৈয়দ খাঁর সাথে যে যুদ্ধ হয় তাতে মুকুন্দরাম নিহত হন। এরপর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগল বশ্যতা স্বীকার করেন।


অধ্যাপক যদুনাথ সরকার কর্তৃক আবিস্কৃত আব্দুর লতিফের ভ্রমণ কাহিনী বিষয়ক গ্রন্থ থেকে জানা যায় ইসলাম খাঁ ঢাকার যাবার পথে ভূষণার রাজা ছত্রাজিতকে কয়েকটি হাতি উপহার দিয়ে নবাবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নবাব পুনরায় কোষহাজো অধিকার করার জন্য যে সৈন্য প্রেরণ করেন তার সাথে ছত্রাজিত ছিলেন। ছত্রাজিত কোষহাজোর রাজ ভ্রাতা বলদেবের সাথে গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে মোগলদের গতিবিধি জানানোর কারণে বন্দি হয়ে ঢাকায় আনিত হন এবং নিহত হন (১৬৩৬)।

বার ভূঁইয়াদের স্মৃতি

বঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ধারায় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় পাল ও সেন রাজাদের শাসনের পর বঙ্গ ধীরে ধীরে মুসলিম শাসনাধীন হয়। ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় থেকে শুরু হয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাবই সিরাজ-উদ-দৌলার পতন পর্যন্ত বঙ্গে মুসলিম শাসনকাল স্থায়ী হলেও সমগ্র বঙ্গে  মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা। গৌড় অধিকার করেই পাঠানেরা বঙ্গের রাজা হয় নাই, বঙ্গ অধিকার করতে তাদের অনেকদিন লেগেছিল। খিলজীর পরবর্তী পাঠান রাজারা দেশীয় জমিদার ও প্রজার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। এ ছাড়াও তারা দিল্লীর সম্রাটদের সন্তুষ্ট রাখতে ব্যাস্ত থাকত। দিল্লীতে সুলতান মইজুদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের বংধরগণ বাংলাদেশ শাসন করেন। তাদের মধ্যে প্রথম সুলতান বুঘরা খান ১২৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১২৮৭ পর্যন্ত ছয় বছর ধরে লক্ষ্ণৌতে দিল্লীর শাসনকর্তা হিসেবে শাসন করেন। কিন্তু সুলতান বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের সুচনা। এ যুগেই মুসলমান রাজাদের ইতিহাস বাংলার ইতিহাসের অধ্যায়ের সূচনা করে। এ সময় সমগ্র বাংলাদেশ চারটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে বিভক্ত হয় যথা লক্ষ্ণৌতি, সাতগাঁও সোনারগাঁ, চাটিগাঁও (চট্রগ্রাম)। এ সময় শক্তি, সম্পদ ও ঐশ্বর্যে সোনারগাঁ লক্ষ্ণৌতিকে অতিক্রম করে। তবে ২০/২২ জন পাঠান নৃপতি ১৪০ বছর যাবৎ বঙ্গদেশ শাসন করলেও সমগ্র বাংলা তাদের করায়ত্ব হয় নাই। খণ্ডিতভাবে সুলতানদের দ্বারা বাংলা শাসিত হত। শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩০১-১৩২২) কেবল পূর্ববঙ্গ অধিকার করতে সমর্থ হন।

এরপর ১৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ পূর্ববঙ্গে এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পশ্চিমবঙ্গে দিল্লীর অধীনতা অস্বীকার করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে ইলিয়াস শাহ সমগ্র বঙ্গের স্বাধীন নৃপতি হন। এই সময় থেকেই সমগ্র বাংলাদেশ ‘বাঙলা সবে’ বা ‘সুবে বাঙলা’ নামে আখ্যায়িথ হয়। ১৩৫৮ সালে তাঁর মুত্যুর পর নানা অরাজকতা শুরু হয়। বস্তুত বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলে বিশেষ করে মোগল সম্রাট আকবরের বঙ্গ বিজয়ের (১৫৭৬) পূর্ব পর্যন্ত পাঠান, আফগান সুর করবানী বংশীয় শাসনকালে স্থানীয় জমিদার, প্রভাবশালী বীর সেনানায়কদের দ্বারা সুলতানগণ প্রায়শঃই প্রতিবাদের সম্মুখীন হতেন। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে দাউদ খান করবানীর পরাজয় ও হত্যার ফলে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। কিন্তু বিশ বছর যাবৎ মোগলদের রাজ্য শাসন এদেশে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বাংলায় একজন মোগল সুবাদার ছিলেন এবং অল্প কয়টি সেনানিবাস স্থাপিত হয়েছিল। কেবলমাত্র রাজধানী ও সেনানিবাসের জনপদগুলো মোগল মেনে চলত, অন্যত্র ব্যাপক অরাজকতা ও বিশৃংখলা চরমে পৌছেছিল। আফগান সৈন্যরা লুটতরাজ করত এবং মোগল সেনারাও এভাবে অর্থ উপার্জন করত। বাংলার বড় বড় জমিদারগণ করবানী রাজত্বের অবসানের পর নিজেদের জমিদারীতে স্বাধীনতা অবলম্বন করেন।


তাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী ছিল। এই সকল জমিদারগণ, ‘জোর যার মুল্লুক তা’ নীতি অবলম্বন করে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল দখল করতে সচেষ্ট থাকতেন। কখনো কখনো জমিদারগণ সাময়িকভাবে বাংলায় মোগল শাসন প্রতিষ্ঠায় আকবরের সেনাপতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। এই জমিদারেরা বাংলায় বার ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ভূঁইয়াদের বিষয়ে শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন-- ‘উহাদের কাহারো বা শাসনস্থল একটি পরগনাও নহে, আবার কেহ বা একখণ্ড রাজ্যের অধীশ্বর। কোথাও বা দশ বারোজন ভূঁইয়া একজনকে প্রধান বলিয়া মানিয়া তাহার বশ্যতা স্বীকার করিত। প্রতাপান্বিত ভূঁইয়া অন্য ভূঁইয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হইতেন। তখন রণরঙ্গ রাজায় রাজায় না হইয়া ভূঁইয়া ভূঁইয়া চলিত। আর প্রজাদিগের সকলেই সেই যুদ্ধ ব্যাপারে যোগ দিয়া ফলত্যাগী হইতে হইত।  এই অরাজকতার যুগে কেহ নির্লিপ্ত থাকিতে পারিতেন না। সকলকেই রাজনৈতিকতায় যোগ দিতে হইত নইলে আত্ম পরিবারের প্রাণ রক্ষা পর্যন্ত অসম্ভব হইত।’ ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের রাজ্য আরম্ভ হতে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের রাজ্য লাভ পর্যন্ত বঙ্গে কোনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় নাই। সুলেমান ফরায়েজীর কঠোর শাসনের মধ্যে যে শান্তিটুকু ছিল সেনাপতি কালাপাহাড়ের অত্যাচারে তাও তিরোহিত হয়। এই সময় সাধারণ প্রজাকুল মোগল কর্মচারী কর্তৃক নানভাবে প্রতারিত হতে থাকে। কবি কঙ্কনের ভাষায় তার পরিচয় পাওয়া যায়---মোগল ডিহিদার বা তহশীলদার ঘুষ নিয়ে খিল (পতিত) ভূমিতে নাল লিখে প্রজাদের প্রতারিত করত। ভূঁইয়াগণ ঐ সময় অনেক স্থলে ডিহিদারের হাত থেকে বিদ্রোহী প্রজাদের আশ্রয় দিত।

সরকার হইলা কাল, খিল ভূমি লেখে নাল

বিনা উপকারে খায় অতি (ঘুষ)

পোদ্দার হইল যম, টাকায় আড়াই আনা কম,

পায় লভ্য, পায় দিন প্রতি।

জমিদার পতিত আছে, প্রজারা পালায় আছে

দুয়ার চাপিয়া খায় খানা

প্রজা হইল ব্যকুলী, বেঁচে ঘরের কুড়ালী,

টাকার দ্রব্য বেঁচে দশ আনা----

(কবি কঙ্কন চণ্ডী, পৃষ্ঠ-৫)

উক্ত ভূঁইয়া বা ভূঁইয়াগণকে শুদ্ধ ভাষায় ভৌমিক বলা হয়। ইংরেজ আমলে যাদের জমিদার বলা হত অনেকটা সেরকম। ভূঁইয়াগণ আত্মরক্ষা ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট সৈন্য সংগ্রহে রাখতেন। অস্ত্রসহ দুর্গ ও নৌবাহিনীর আয়োজন করতেন। বীর বলে তাদের খ্যাতি ছিল। প্রজারা তাদের ভয় ভক্তিও করত। ঐতিহাসিকদের মতে সে সময় যে কত পরচিত ও অপরিচিত ভূঁইয়া ছিলেন তার হিসেব কেউ রাখতেন না। তবে তাদের মধ্যে যারা বীরত্বে অগ্রগণ্য, যাদের রাজত্ব বিস্তীর্ণ এবং যারা বিপুল সৈন্যবলে শক্তি সম্পন্ন হতেন তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ত। ইতিহাসগতভাবে এরুপ ১২ জন ভূঁইয়ার বিশেষ পরিচিতি পাওয়া যায় এবং তারা বঙ্গদেশে বার ভূঁইয়া বলে পরিচিত। তারা হলেন---(১) ঈশা খাঁ--মসনদ


আলী খিজিরপুর বা কত্রাস্থ-সোনারগাঁ (২) প্রতাপাদিত্য-যশোহর বা চাণ্ডিক্যান---বর্তমান রাজবাড়ির পশ্চিমাংশ (৩) চাঁদ রায় ও কেদার রায়----শ্রীপুর বা বিক্রমপুর (৪) কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায়----বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ-বরিশাল (৫) লক্ষণ মাণিক্য----ভূলুয়া-নোয়াখালি (৬) মুকন্দরাম রায়----ভূষণা বা ফতেহাবাদ-ফরিদপুর-রাজবাড়ি (৭) ফজল গাজী, চাঁদ গাজী----ভাওয়াল (৮)হামীদ মল্ল বা বীর হাম্বির---বিষ্ণুপুর (৯) কংস নারায়ণ----তাহিরপুর (১০) সঁ-তৈর বা সান্তোল (১১) পিতাম্বর ও নীলাম্বর----পুঁঠিয়া (১২) ঈশা খাঁ লোহানী ও ওসমান খাঁ ----উড়িষ্যা ও হিলি।

ঐতিহাসিকদের মতে এদের মধ্যে প্রথম ছয়জন খুবই বিখ্যাত। ফলে দেখা যায় ভূঁইয়াদের উত্থান ঘটেছিল সোনার গাঁ, বিক্রমপুর, নোয়াখালি, ফরিদপুর, যশোহর ও বরিশাল। তাদের মধ্যে ভূষণা বা ফতেহাবাদের মুকুন্দরাম রায় ও প্রতাপাদিত্য রাজবাড়ি জেলার ইতহাসে বিবেচ্য। (ইতিপূর্বে ভূষণাধিপতি, অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম রায় আলোচিত।

যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর বংশধর বাগডুলিতে

পাংশা উপজেলার রঘুবীর সম্বন্ধে কথিত নানা কাহিনী লোকমুখে শোনা যায়। পাংশার কোনো একজন ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন কথিত আছে এ অঞ্চলে রঘুবীর নামক এক অসম বীর ছিলেন যিনি বড় আকারের একটি নৌকা মাথায় করে বহন করতে পারতেন। খাদ্যখানা ছিল দিনে ২০/২৫ জন মানুষের খাদ্যের সমান। হাজার লোকও তার সাথে লড়তে সাহস পেত না----ইত্যাদি। ভদ্রলোক আমাকে এ বীরের কাহিনীর সত্যতা খুঁজে পেতে অনুরোধ করেছিলেন। এক্ষণে এর রঘুবীরের সন্ধান করা গেছে যিনি যশোহর রাজ প্রতাপাদিত্যের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। তবে রঘু নয় রঘুর ছেলে বাস করতেন পাংশার বাগডুলিতে।

বাংলায় বারভূঁইয়াদের মধ্যে স্বাধীনচেতা যশোহর-খুলনার পরাক্রমশালী ভূঁইয়া ছিলেন প্রতাপাদিত্য। পিতা বিক্রমাদিত্যর ১৫৮৩ সালে মৃত্যুর পর ১৫৮৪ সালে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়। সে সময় সম্রাট ছিলেন মহামতি আকবর। প্রতাপাদিত্য প্রবল ও পরাক্রমশালী জমিদার হিসেবে অচিরেই আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ এবং সুশৃঙ্খল সৈন্যদল গঠন করে যশোর খুলনাসহ উড়িষ্যা পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। প্রতাপাদিত্যের সময়ে সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বঙ্গের সুবেদার হয়ে আসেনে (১৫৮৯-১৬০৪) এবং রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৬০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ যশোহর আক্রমণ করেন। প্রতাপের সাথে মানসিংহের যুদ্ধ ও সন্ধি হয়। ১৬১০-১১ ধুমধাটের নৌ-যুদ্ধে প্রতাপের পরাজয় হলে প্রতাপ পিঞ্জিরাবদ্ধ হয়ে আগ্রায় প্রেরিত হন। পরে বারানসীতে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতাপাদিত্যের ছিল ৫২ হাজার ঢালী, ৫১ হাজার তীরন্দাজ, বিশ হাজার পদাতিক এবং বিপুল পরিমাণ কুকী সৈন্য।

তাঁর কয়েকজন সেনাপতির মধ্যে রঘু ও মুঘা ছিলেন অন্যতম। সেনাপতি রঘুর অধীনে ছিল একদল পার্বত্য কুকীর সুঠাম দেহের শক্তিশালী সৈন্যদল। তারা তীর, ধনুক, বর্শা ও টাঙ্গী দিয়ে যুদ্ধ করত। তারা নৌবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিল। যশোর-খুলনার ইতিহাসের ২৬৯ পৃষ্ঠায়---‘প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি রঘুর নিবাস ছিল রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণে গড়াই নদীর ওপারে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শ্রীপুরে। তিনি সৌপায়ন গোত্রীয় নাগবংশীয় বরেণ্য কায়স্থ ছিলেন। পূর্বপুরুষ কর্কট তারা উজালীয়া পরগানার অধীশ্বর হয়ে শৈলকুপায় ছিলেন।


রাজা কর্কটের বংশধর রাজবল্লভ। রাজা রাজবল্লভের পৌত্র রঘুনাথ ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি। তিনি পূর্ব দেশীয় সৈন্যদলের অধিনায়ক ও দুর্গাধ্যক্ষ ছিলেন।’ কিঙ্কর রায় রচিত----নাগবংশ ঢাকুর পৃষ্ঠা-১৪-১৫

প্রতাপ আদিত্য রাজা বঙ্গ-অধিপতি,

পূর্ব খণ্ডে ছিল তাঁর রঘু সেনাপতি

মানসিং হস্তে সদা-----প্রতাপ পড়িল

মাহযুদ্ধে রঘুবীর প্রাণ বিসর্জিল

বিস্ময় বিভব সব পর হস্তগত

দেবালয় সমজিদে হইল পরিণত।

রঘুবীরের মৃত্যুর পর তাঁর জমিদারী মানসিংহের সময়ে বাজেয়াপ্ত হয় নাই। সম্ভব ত ইসলাম খাঁর সেনানী ইনায়েত খাঁর আদেশে তা সাধিত হয়। তখন রঘুর পুত্র রামনারায়ন রাজ্যহীন হয়ে শৈলকুপা ত্যাগ করে বাগডুলী গ্রামে (রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার অন্তর্গত) বাস করেন। এরপর এ বংশ নান স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত বাগডুলীতে বসবাসরত রঘুর পুত্রের কারণে অত্র অঞ্চলে রঘুবীর সম্বন্ধে নানা কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে।

সংগ্রাম সাহ

মোগল শাসনকালে সেনাপতি সংগ্রাম সাহর সাথে রাজবাড়ি জেলার অনেক কাহিনী ও স্মৃতিবিজড়িত আছে। নাওয়াড়া মহল, রাজবাড়িতে লালগোলায় সংগ্রাম সাহর দুর্গ, বাণীবহ গ্রামে তাঁর বিবাহ ও কোমরপাড়ায় তাঁর বংশধর, বাণীবহে তলাপাত্রের দিঘি(যা বর্তমান আছে), মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহর দেউল (মথুরাপুরের দেউল), মগ পর্তুগীজ জলদস্যু দমন ইত্যাদি এ অঞ্চলে তাঁর পদচারণা ও স্মৃতিচিহ্ন বহন করে। অনেক ঐতিহাসিক সংগ্রাম সাহ সম্বন্ধে নিরবাত পালন করলেও ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দের কিঞ্চিৎ পূর্ব থেকে ১৬৪১ পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিকের লেখায় সংগ্রাম সাহর বিচরণ কাল দেখা যায়। এসময় কালে কখনো শাহবাজপুর (মেঘনা নদীর মোহনায়), কখনো বাখরগঞ্জ, কখনো ভূষণা ও মাহমুদপুর, কখনো রাজবাড়ি জেলার বাণীবহ, কখনো মারওয়ার প্রদেশ, কখনো যোধপুর, কখনো রাজস্থানের অন্তর্গত মারবার প্রদেশ তার বিচরণ ভূমি। আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৭৫ পৃষ্ঠায় ‘দ্বিশত বৎসর অতীত হইলে বঙ্গদেশে সংগ্রাম সাহর প্রাদুর্ভুত হইয়াছিলেন। পূর্ববঙ্গের নানা স্তানে আজও তাহার পরিচয়ের কতিপয় চিহ্ন বর্তমান থাকিয়া তাহাকে স্মরণীয় করিয়া রাকিয়াছে। যশোহর, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ ও নোয়াখালি প্রভৃতি জেলা সংগ্রামের প্রধান লীলাক্ষেত্র ছিল বলিয়া বোধ হয়। এতদ্ভিন্ন সুদূর মারাবাড় বা যোদপুরের ইতিবৃত্ত পাঠ করিলেও সংগ্রামের শৌর্যবীর্যের পরিচয় পাইয়া স্বততই তাহার ধন্যবাদ করিতে ইচ্ছা হয়। কবি কণ্ঠহার কৃত সদ্বৈদ্যকুল পঞ্জিকা, মাহমহোপাধ্যায়ের ভরত মল্লিকৃত চন্দ্র-প্রভা, আলমগীর নামার আংশিক অনুবাদ হইতে উদ্ধৃত, কলিকাতা রিভিউর কতিপয় প্রবন্ধ, মি. বিভারেজকৃত বাখরগঞ্জের ইতিহাস এবং মহাত্মা কর্ণেল টডকৃত রাজস্থানের ইতিহাস এবং অন্যান্য কতিপয় প্রবন্ধ অবলম্বনে এই প্রস্তাব সংক্রান্ত উপকরণগুলি সংগৃহীত হইয়াছে।’


আমি আনন্দনাথের উক্ত উপকরণগুলি, তৎসহ সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস, এল এন মিশ্রের বাংলার রেলভ্রমণ, যগেন্দ্রনাথ মিত্রের বিক্রমপুরের ইতিহাস এবং স্থানীয় কিছু প্রাচীন দলিলপত্র এবং বাণীবহে সরেজমিনে তথ্য নিয়ে সংগ্রাম সাহর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করছি। মোগল রাজত্বের প্রারম্ভে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গ মগ, পর্তুগীজ ও ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের দ্বারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের একদল আরাকানবাসী মগ আর অপরদল ইউরোপের পর্তুগীজ জলদস্যু। তারা সন্দীপ থেকে পূর্বে মেঘনা ও পদ্মা নদীর তীর ধরে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তর করেছিল। কথিত আছে তাদের নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের নামানুসারে গোয়ালন্দের নামকরণ হয়। গঞ্জালেস গোয়ালন্দে আস্তানা গড়ে তোলে। পর্তুগীজ জলদস্যুরা এতই ভয়ানক ছিল যে, তারা মানুষ ধরে ইউরোপে চালান দিত এবং ধৃত মানুষের হাত ছিদ্র করে এক সাথে বেঁধে নৌকার খোলের মধ্যে মাছের সারির মতো রেখে দিত। বাদশা আকবর শাহবাজ খাঁ নামক একজন সুদক্ষ সেনাপতিকে দস্যু দমনের জন্য বাংলায় প্রেরণ করেন। সাহবাজ খাঁ মেঘনা নদীর মোহনায় সেনানিবাস গড়ে ঐ স্থানের নাম রাখেন শাহাবাজপুর। অতঃপর বাদশা জাহাঙ্গীর এর সাথে বাংলায় বারভূঁইয়াদের মনোমালিন্য ঘটে। এই সুযোগ আবার পর্তুগীজ, মগ জলদস্যুরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এরপর থেকে বাদশাহী সৈন্য মেঘনা নদীর মোহনায় নিয়ত অবস্থান করে মগ পর্তুগীজদের উৎপত্তি নিবারণ করত। উল্লেখ্য আওরঙ্গজেব বাংলায় একচ্ছত্র অধিপতি বলে পরিচিতি হন। বাদশা আওরঙ্গজেবের দস্যু দমনের ভার সেনাপতি সংগ্রাম সাহর উপর অর্পণ করেন। সংগ্রাম শাহ বাদশা কর্তৃক প্রেরিত হয়ে শাহাবাজপুর আগমন করেন। শাহাবাজপুরে তখন কোনো দুর্গ ছিল না, যাতে নিরাপদে সৈন্য রক্ষা করা যায়। এই জন্য সংগ্রাম সাহ সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন।

‘প্রায় দেড়শত বছর পূর্বেও মানুষ তাকে সংগ্রাম সাহর কেল্লা বলত। দস্যুদলের অপসারণ করিবার জন্য সংগ্রাম সাহ নানা স্থানে গড়বন্দি করিয়া সৈন্য রক্ষায় উপায় করিয়া লইলেন। পরে মগ ও পর্তুগীজদের প্রতিকূলে সৈন্য পরিচালনাপূর্বক তিনি তাহাদিগকে পরাস্ত করিয়া বঙ্গদেশ হইতে দূরিভূত করিয়া দেন। এই সময় চাঁদকরম নামে বৈদ্যবংশীয় অপর এক মহাত্মা সংগ্রামের প্রধান সহকারী ছিলেন। সংগ্রাম সাহ তাহার দ্বারা নানা বিষয়ে সহায়তাপ্রাপ্ত হন। সে যাহা হউক এই সকল কথা অচীরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট পৌঁছালে তিনি সন্তু হইয়া সংগ্রাম সাহকে পুরস্কারস্বরুপ ভূষণা, মাহমুদপুর ও চাঁদ রায়কে সাহাবাজপুরের পরগনার জমিদারী প্রদান করেন।’ (আনন্দনাথ রায়, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৭৯) সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস ৩৩৫ পৃষ্ঠায়---‘জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তৎপুত্র শাহজাহান বাদশা হইল। তিনি স্বীয় প্রিয় পাত্র কাশিম খাঁকে বাংলার নবাব করিয়া পাঠান (১৬২৮)। হুগলী প্রভৃতি স্থানের পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমন করাই তাহার শাসনের প্রধান কাজ। সম্ভবত এই সময়ে বা কিছু পূর্বে সংগ্রাম সিংহ নামক একজন মসনবদার বঙ্গে আসিয়াছিলেন এবং বঙ্গীয় নাওয়াড়া বিভাগে অধ্যাক্ষ হন। কীরুপে কাশিম খাঁর নাওয়াড়া ও অংসক্য স্থল সৈন্য সাড়ে তিনমাসকাল হুগলী অবরোধ করিয়া পর্তুগীজদিগকে পর্যুদস্ত ও উৎসন্ন করে, তা বঙ্গের ইতিহাসের একটি প্রধান ঘটনা। এই ঘটনার পর কাশিম খাঁর মৃত্যু হইলে সংগ্রাম সানাওয়াড়া মহলের অধ্যক্ষ হইয়া পূর্ববঙ্গে স্থাপিত হল। সংগ্রাম পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে অধিষ্ঠান করিয়া মগ ও ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের হস্ত হইতে ঢাকা অঞ্চল রক্ষা করিতেন। এই সময়ে তিনি নাওয়াড়ার প্রধান আড্ডা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গম স্থলে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। তার নাম হয় সংগ্রামগড়। তখন যমুনা নদী ছিল না। গঙ্গার প্রবাহ ছিল বর্তমান পদ্মা থেকে আরো উত্তরে। (এই নাওয়াড়া মহল তৎকালীন মানিকগঞ্জের দক্ষিণ এবং রাজাবাড়ি উত্তর অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয়) যা হউক কাশিম খাঁর সময় হতে প্রায় ৩০ বছর কাল সংগ্রাম সিংহ পূর্ববঙ্গের নাওয়াড়া মহলের কর্তৃত্বে থাকিয়া মগ ফিরিঙ্গী প্রভৃতি দস্যু দমন করিয়াছিলেন।


এই কার্যের পুরস্কারস্বরুপ সত্রাজীতের মৃত্যুদণ্ডের পরে তিনি ভূষণা জায়গীরপ্রাপ্ত হন। জায়গীর প্রাপ্তির পর সংগ্রাম নিজ দেশে ফিরিয়া যাইবার কল্পনা ত্যাগ করে ভূষণার সন্নিকট মথুরাপুর নামক স্থানে বাসস্থান স্থাপন করেন। তিনি রাজার মতো রাজত্ব করিতেন। তাই মুসলমানি রীতিতে উপাধি হইয়াছিল শাহ। উহারই অপভ্রংশে সাহ হইয়া গিয়াছে। সংগ্রাম এদেশে কাজ করিবার ফলে এতদ্দেশীয় সমাজে প্রবেশ লাভ করেন।

এদেশে যখন কাম করতেই হইবে তখন সমাজের কোনো উচ্চ শ্রেণীতে প্রবেশ না করিলে চলে না। তিনি ক্ষত্রিয় ছিলেন, প্রবাদ আছে সংগ্রাম মথুরাপুরে আসিয়া স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করেন, এদেশে ব্রাহ্মণের নীচে কোনো জাতি? তার উত্তরে তাঁকে বলা হয় বৈদ্যই ব্রাহ্মণের পর শ্রেষ্ঠ জাতি। তখন তিনি বললেন ‘হাম বৈদ্য’ অর্থাৎ তবে আমি বৈদ্য। এরপর তিনি বৈদ্য সমাজের সাথে বৈবাহিক সূত্র স্থাপন করেন। সংগ্রাম সাহ পরে সালাস্কায়ন গোত্রসম্ভূত পরিচয় দিতেন। ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের ভট্রাচার্যগণ সংগ্রামের গুরুপদে জড়িত হতে বাধ্য হন। এখনো তাহাদিগের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমিবৃত্তির সনদ আছে। যশোহর কালেক্টরীতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রহ্মোত্তরের তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্যকীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত একটি উচ্চ দেউল বা মন্দির আছে। গল্প আছে, তিনি একটি বিগ্রহ নির্মাণের জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিন্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যু মুখে পতিত হয় বলিয়া সে পরিকল্পনা পরিত্যাগ হইয়াছিল।’

সতীশ চন্দ্র মিত্র আরো উল্লেখ করেছেন, ‘১৬৫০ এর বহুপূর্বে অর্থাৎ শাহজাহানের রাজত্বকালে সংগ্রাম সাহ ভূষণার জায়গীর পেয়েছিলেন। সংগ্রামের মৃত্যুর পর তার পুত্র কিছুকাল জায়গীর ভোগ করেন। এরপর ভূষণা অঞ্চল ফাকা হয় এবং অব্যাবহিত পরে সীতারামের পিতা উদয় নারায়ণ ভূষানার সাঁজোল বা তহশিলদার হইয়া আসেন।’

কলিকাতা রিভিউ’র ৫৩ ভল্যুমের ৭৩ পৃষ্ঠায় চট্রগ্রামের ফিরিঙ্গী শীর্ষক প্রস্তাবে এই দুর্গ ও সংগ্রাম সাহর প্রতিষ্ঠিত আরো দুটি দুর্গের পরিচয় প্রদত্ত হয়েছে। এরমধ্যে এল, এন মিশ্র প্রণীত বাংলায় রেল ভ্রমণ পুস্তকে দেখা যায় বর্তমানে রাজবাড়ি শহরের অনতিদূরে পদ্মা নদীর নিকটবর্তী লালগোলা নামক একটি গ্রাম রয়েছে। উক্ত লালগোলা নামকরণ হয়েছে সংগ্রাম সাহর গোলাবারুদের নামানুসারে। সেখানে একটি দুর্গ ছিল তাকে সংগ্রাম সাহর দুর্গ বলে জানা যায়। বাখরগঞ্জ জেলার ঝালকাঠি থানার অধীন রামনগর, গাবখান প্রভৃতি স্থানের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম নীলের খাল বলে একটি দোনের পরিচয়ও পাওয়া যায়। সম্ভবত এটি সংগ্রাম সাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। দস্যু দমনের জন্য সংগ্রাম সাহ নানা স্থানে সৈন্য সামন্তের সামাবেশ ও নিরাপত্তার জন্য এরুপ দোন ও দুর্গ নির্মাণ করেন। পরে তিনি মগ ও পর্তুগীজ দমন পূর্বক তাদের বঙ্গদেশ থেকে বিতাড়িত করেন। শত্রুদমনের কথা সম্রাট  আওরঙ্গজেবের নিকট পৌঁছালে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে সংগ্রামকে পুরস্কারস্বরুপ  ভূষণা ও মহাম্মদপুরের জমিদারী প্রদান করেন। ইতিপূর্বে মানসিংহকর্তৃক বার ভূঁইয়া দমন হলে বিদ্রোহী রাজাগণের রাজ্যের কতক অংশ সরকারের খাস রাখা হয়। খাস বা বাজেয়াপ্ত মহল থেকে জলযুদ্ধ বা নৌপথের ব্যয় নির্বাহের জন্য নাওয়াড়া মহল বলে তা গণ্য হল। ভূষণা ও মাহমুদপুর মহলের অন্তর্ভূক্ত হল। আওরঙ্গজেব এই খাস নাওয়াড়া ভূষণা, মাহমুদপুর সংগ্রামকে প্রদান করেন। রাজবাড়ি জেলায় অনুরুপ অনেক খাসভূমি যা নাওয়াড়া বলে পুরাতন রেকর্ড পর্চায় দৃষ্ট হয়।


রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়ুয়া বলে একটি ইউনিয়ন আছে যার পূর্ব পরিচিতি ছিল নাওয়াড়া। বর্তমানে তা নাড়ুয়া। নাড়ুয়া স্থানটি গড়াই নদীর তীরে। নদী সংলগ্ন এ সকল স্থানে মগ ও পুর্তগীজদের উপদ্রব ছিল।

সংগ্রাম সাহ রাজবাড়ি শহরের অদূরে বাণীবহ গ্রামবাসী শক্তি মাধব বংশীয় সদাশীব সেনের কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সদাশীবের পুত্র গোপীরমণ সেন এবং তাঁর পুত্র মাধব রায় ও জগানন্দ রায়। ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত কেয়ারপুর (বর্তমানে কোমরপুর) মাধবের বংশ এবং বাণীবহ গ্রামে জগানন্দের বংশ বাস করেন। সংগ্রাম বাণীবহ নিবাসী শক্তিমাধব বংশীয় সদাশীব সেনের কন্যা বিবাহ করেন। সদাশীব সম্বন্ধে কবি কণ্ঠকারে আছে -----‘কন্যামেকাং ব্যুবাহ চ সালঙ্কারণ স্মৃতি সংগ্রাম সাহ ভূপতি।’। (যশোর-খুলনার ইতিহাস, সতিশ চন্দ্র মিত্র, পৃষ্ঠা-৩৩৯) তার পুত্র রাধাকান্ত আদিত্য বংশীয় কাশিনাথ সেনের কন্যাকে বিবাহ করেন। এছাড়া সংগ্রাম শাহর আরো ৬টি কন্যার কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য আনন্দনাথ রায় তার ফরিদপুরের ইতিহাসের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন ‘রাদাগঞ্জের ভরাটস্থান এখন রাধাগঞ্জের অথবা পেঁইজ ঘাটার বিল নামে প্রসিদ্ধ।

যাহা হউক, নাওযাড়া চৌধুরীগণ নানা উপদ্রবের আশঙ্কায় পাঁচথুবী পরিত্যাগ করিয়া প্রায় দুইশত বছর পূর্বে (বর্তমানে ৩০০ প্রায়) বাণীবহে আগমন করেন। বাণীবহ গ্রাম উত্তর দক্ষিণে সাড়ে তিন মাইল পূর্ব-পশ্চিমে তিন মাইল হইবে। এই গ্রামে রাঢ়ী ও বরেন্দ্র প্রায় সাত-আটশত ঘর, বৈদ্য প্রায় দুইশত ঘর, কায়স্থ ও অন্যান্য জাতি প্রায় আড়াইশত ঘর বলে জানা যায়। এই গ্রাম এত জনতাপূর্ণ ছিল যে, কাহারও বহিরাঙ্গন ছিল না। স্ব-স্ব গৃহের বারান্দায় বৈঠকখানা ছিল। এরুপ জনতা নিবন্ধন ১২৩৩ বাং সালে তথায় ভীষণ মহামারী উপস্থিত হয় এবং উহাতে বহুলোক মারা যায় এবং বহুলোক স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। বিদ্যাবাগীস পাড়া, সরখেল পাড়া, ভট্রাচার্য পাড়া সেনহাটিপাড়া, বসু পাড়া, নুঁনে পাড়া, পচাপাড়া প্রভৃতি জনহীন পাড়া আজও বিদ্যামান রয়েছে। সংগ্রাম সাহর বংশধর যদুনাথ তালপাত্র এই বংশেরই আদি পুরুষ। তাহার বংশধর দ্বারা এই গ্রামে যে পুস্করণী খনন করা হয় তা তলাপত্র দিঘি নামে আজও পরিচিত। (বাণীবহে তালপাত্রের দিঘি এখনো বিদ্যামান)। নাওয়াড়া চৌধুরীদের বাড়ি স্বদেশীয়দের নিকট রাজবাড়ি নামে অবহিত হত। সাধারণ্যে তারা মহাশয় নামে খ্যাত। তারা দুই ভাগে বিভক্ত। তম্মধ্যে সদাশিবের পৌত্র মাধবানন্দ রায় সম্পত্তির নয় আনা ও জগানন্দ রায় সাত না অংশ ভাগ করিয়া লন। পাঁচথুবীর উত্তরে রাধাগঞ্জের বড় একটি বন্দর ছিল। পদ্মার প্রবাহ হড়াইয়ে এই বন্দর দক্ষিণে রামাপুর পাঁচথুবী পূর্বদিক দিয়া এক বিস্তীর্ণ বর্ত্য বিদ্যামান ছিল। তাকে সাধারণ লোকে পল্টুনের রাস্তা বলত। মোগলদের সময় সৈনিকদের যাতায়াতের জন্য এই রাস্তা ব্যবহৃত হত। ভূষণা চাকলার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থানে তাহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি অধুনা ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত কোড়কদি ও মধুখালি স্থানদ্বয়ের সন্নিকট অবস্থিত। কোড়কদি ও মধুখালি (বিগত ১৫ বছর পূর্বে রাজবাড়ি জেলার অন্তভুক্ত ছিল) কোড়কদি মাননীয় ভট্রাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাঁহার গুরু ছিলেন। অদ্যপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূবৃত্তির লিখন উক্ত ভট্রাচার্য মহাশয়ের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজও একটা প্রকাণ্ড মঠ দৃষ্ট হয়। যাহাকে সাধারণ্যে সংগ্রামের দেউল বলিয়া থাকে।’

সংগ্রাম সাহর সভায় শ্রীকান্ত বেদাচার্য নামে এক জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি গণনা করিয়া পর দিবস সংগ্রামের মৃত্যু হবে এই কথা প্রকাশ করায় তার সম্পত্তি খাস করা হয়। কেহ কেহ অনুমান করেন ১৬৪২ খ্রি. সংগ্রামের মৃত্যু হয়। সংগ্রাম সাহ বিষয়ে সতিশ চন্দ্র মিত্র লিখিত যশোর খুলনার ইতিহাসের ৩৩৫ পৃষ্ঠায় দেখা যায়। ‘পূর্বে সংগ্রাম সাহ নৃপতি প্রভৃতিতে পালিতা।


ভূষণা সীতারামের পশ্চাদদনু সবতি। রামকান্তেন চোঢ়া সা চেদাং সপত্মীক কর যুগলতা। বিরুপা কেষাং বা নানুগাছো নচ ভবতি কথং কেন বা নামুদর্শ।’ সংগ্রামের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্য রাজা সীতারামের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সীতারামের পতনের পর সীতারামের রাজ্য তথা রাজবাড়ির অনেকাংশ নাটোর রাজ রানী ভবানীর জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত হয়। রানীভবানী নাটোর রাজ রামকান্তের সহধর্মিনী ছিলেন। রামকান্ত ভূষণাধিপতি ছিলেন। তদন্তরে তা রানী ভবানীর হস্তগত হয়। এই জন্য কবি ভূষণাকে স্বপত্মিক করযুগলতা বলে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য তৎকালীন রাজবাড়ি জেলার পরগনা নসিবসাহী, মহীমসাহী বেলগাছি নসরৎ সাহী পরগনা ভূষণা চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মথুরাপুরে সংগ্রাম সাহের দেউল

মথুরাপুরের দেউলবর্তমান মধুখালি পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমা এবং বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন  ছিল। সাম্প্রতিকালে মধুখালি ফরিদপুর জেলাভুক্ত করা হয়। মধুখালির সন্নিকটে মথুরাপুরে মন্দির সদৃশ্য প্রায় ৭০ ফুট উঁচু, ১২টি কোণ অলঙ্কৃত দেওয়াল এবং ফাঁকে ফাঁকে ইটের কার্ণিশ বিশিষ্ট দেওয়াল। বিভিন্ন থাকের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ করে নিচের দিকে পোড়া মাটির চিত্রফলক বসানো।

এগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র আছে। সর্ব সাধারণ্যে এটি ‘মথুরাপুরের দেউল’ বলে পরিচিত। দেউলটির ইতিহাস এবং নির্মাণকাল নিয়ে যেমন উৎসুক্য আছে তেমনি আছে নানা মতভেদ। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় এবং সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস এবং যশোর-খুলনার ইতিহাসে উক্ত দেউলকে সংগ্রাম সাহর দেউল বলা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন মানসিংহের সাথে যশোরের ভূমিরাজ প্রতাপাদিত্যের যে যুদ্ধ হয় তাতে প্রতাপ হেরে যান। বিজয় স্তম্ভ হিসেবে মানসিংহ তা নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য মানসিংহ আগমন করেন ১৫৯৫ সালে এবং প্রস্থান করেন ১৬০৪ সালে। তিনি বাংলায় বার-ভূইয়া দমনের উদ্দেশ্যেই আগমন করেছিলেন। তখন প্রতাপাদিত্য ছিলেন যশোহরের রাজা আর মুকুন্দরাম ছিলেন ভূষণার রাজা। ১৬০৩ সালে ধুমঘাটে প্রতাপাদিত্যের সাথে মানসিংহের যুদ্ধে প্রতাপ পরাজিত হলে মানসিংহের সাথে তার সন্ধি হয়। এরপর প্রতাপাদিত্য ১৬০৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। প্রতাপাদিত্র ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দ ইসলাম খাঁর হাতে বন্ধি হন। তার পূর্বেই ১৯০৪ এর মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান। এদিকে ভূষণার রাজা মুকুন্দরামের সাথে মানসিংহের কোনো যুদ্ধই হয় নাই। তাই ভূষণার অন্তর্গত মথুরাপুরে মানসিংহ বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন কেন? আনম আব্দুস সোবহান লিখিত ‘ফরিদপুরের ইতিহাস----বৃহত্তর ফরিদপুর’ গ্রন্থে ৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ‘সীতারামের পতনের পর ভূষণার নিকটবর্তী মথুরাপুর গ্রামে একটি বিজয় স্তম্ভ নির্মিত হয়। সীতারাম নবাব মুর্শীদকুলি খাঁর নিকট পরাজিত হন।’

মুর্শীদকুলি খাঁর দ্বারা তা নির্মিত হলে মুসলিম স্থাপত্য বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্তম্ভটিতে রয়েছে হিন্দু স্থাপত্যসহ রামায়ণ, মহাভারতসহ পৌরাণিক বিষয়, যে কারণে বলা যায় তা হিন্দু কোনো সৈনিক বা রাজা তা নির্মাণ করেন। ইতিপূর্বে আমি রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে স্তম্ভটিকে সীতারামের দেউল বলে উল্লেখ করেছি। বস্তুত প্রাচীন ইতিহাস লিখন ব্যাপক গবেষণা নির্ভর। সে সময় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনায় অতি নির্ভর আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসটি কোথাও খুঁজে পাই নাই।


খণ্ডিত যে অংশটি পেয়েছিলাম তাতে সংগ্রাম সাহর অংশটুকু ছিল না। এছাড়া যশোর-খুলনার ইতিহাস (সতীশ চন্দ্র মিত্র) গ্রন্থটির পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারি নাই। এক্ষণে আনন্দনাথ রায়ের ১০০ বছর পূর্বে লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থটি ঢাকা থেকে পুনমুদ্রন (‘ম্যাগনাম ওপাস এবং ড. তপন বাগচী সম্পাদিত----শত বছরের শুদ্ধাঞ্জলি----আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, আহমদ কাউছার, বইপত্র, ৩৮/৪ বাংলাবাজার ঢাকা থেকে প্রকাশিত) হয়েছে। এ ছাড়া শত বছরের পুরোন---যোগেন্দ্র নাথ রচিত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এবং ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এল এন মিশ্রের ‘বাংলায় রেল ভ্রমণ’ গ্রন্থগলি আমার হাতে থাকায়, এক্ষণে দেউলটির প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

প্রথমেই দেউল সম্পর্কে বলা যাক----দেউল বলতে বোঝায় দেবালয়। দেবকুল শব্দ থেকে দেউল শব্দের উৎপত্তি। দেবকুলিকা শব্দের অর্থ ক্ষুদ্র দেউল বা মন্দির। গবেষক অধ্যাপক কিলহর্ন দেবকুলিকাকে ক্ষুদ্র দেবমন্দির বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার এ বাক্যটি হয়ত অনেকেরেই জানা ‘আছিল দেউল এক পর্ব্বত সমান। কাজেই দেউল বলতে বৃহদাকার দেব মন্দিরও বোঝায়। দেউল বা দেবমন্দির নির্মাণের প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। সেন রাজত্বকালে তান্ত্রীক মন্ত্রে দিক্ষিত সেনেরা স্থানে স্থানে দেবদেবী পূজায় দেউল নির্মাণ করত। তৎকালীন সেন রাজাদের রাজধানী বিক্রমপুরে দেউল নির্মিত হয়েছিল (বিক্রমপুরের ইতিহাস----যোগেন্দ্রনাথ)। ইতিপূর্বে মথুরাপুরের দেউল বিষয়ে যা বলেছিলাম তাতে দেউলের আকার আয়তনে দৃষ্ট হয় এটি ছিল বড় আকারের দেব মন্দির-দেবালয় বা দেউল। মথুরা পুরের দেউল বিষেয়ে আনন্দ নাথের ফরিদপুরের ইতিহাসের ৮২ পৃষ্ঠায় ‘১৬৫৩ হইতে ১৬৮৪ পর্যন্ত প্রায় একত্রিংশ বৎসর পর্যন্ত এইরুপে আমরা বঙ্গদেশ ও রাজপুতনায় সংগ্রামকে দেখতে পাই। আবার এই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঔরঙ্গজেব বাদশাই দিল্লীর সিংহাসনে রাজত্বকারী ছিলেন। মোগল রাজবংশ মধ্যে আওরঙ্গজেব যত দীর্ঘকাল শাসনদণ্ড পরিচালনা করেন সেরুপ আর কেহ পারেন নাই।

এই সম্রাটের অধীন থাকিয়া যে একই সংগ্রাম বিভিন্ন স্থানে নানা কার্যসম্পাদন করিয়াছিলেন এদ্বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকিতে পারে না। সম্রাট ম্যধবাঙলার ভূষণা, মাহমুদপুর প্রভৃতি স্থান তাকে জায়গীর অর্পণ করেন এবং কালিয়াতেও একটি জায়গির ছিল যাকে আজও নাওয়াড়া বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। ভূষণা পরগনার অন্তর্গত মথুরাপুর নামক স্থানে তাঁহার প্রকাণ্ড বাড়ি বর্তমান ছিল। এই স্থানটি ফরিদপুর জেলার কোড়কদি ও মধুখালির স্থানদ্বয়ের সন্নিকটে অবস্থিত। কোড়কদির মাননীয় ভট্রাচার্য বংশের পূর্বপুরুষ তাহার গুরু ছিলেন। অদ্যাপি তৎপ্রদত্ত কতিপয় ভূ-বৃত্তির লিখন উক্ত মহাশয়দিগের নিকট বর্তমান আছে। মথুরাপুর গ্রামে আজও প্রকাণ্ড মঠ দৃষ্ট হয় যাকে সাধারণ্যে সংগ্রামের দেউল বলে।’

এদিকে শ্রদ্ধেয় সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাসের ৩৩৬ পৃষ্ঠায়----‘ভূষণার নিকটবর্তী কোড়কদি গ্রামের প্রখ্যাত ভট্রাচার্যগণ সংগ্রামের গুরুপদে বারিত হইতে বাধ্য হন। এখনো তাহাদের গৃহে সংগ্রাম প্রদত্ত ভূমি বৃত্তির সনদ আছে। যশোহর কালেক্টরিতে তৎপ্রদত্ত আরো কয়েকখানি ব্রহ্মোত্তর তায়দাদ পাওয়া গিয়াছে। সংগ্রামের অন্য কীর্তির মধ্যে মথুরাপুরে তাহার সময়ে নির্মিত দেউল বা মন্দির বর্তমান আছে। গল্প আছে তিনি একটি বিগ্রহ পরিচালনার জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করিতেছিলেন, কিন্তু একজন রাজমিস্ত্রী দেউলের চূড়া হইতে পড়িয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয় বলিয়া সে সঙ্কল্প পরিত্যক্ত হইয়াছিল।’সংগ্রাম সাহর বিশদ আলোচনার পর এ বিষয়ে আর সন্দেহ থাতার কথা নয় যে মথুরাপুরের দেউল অন্যকারো কীর্তি নয়। নিঃসন্দেহ দেউলটি সংগ্রাম সাহর-ই কীর্তি। বর্তমানে দেউলটি ভগ্ন প্রায়। রাজবাড়ি তথা এতদ্বঅঞ্চলে প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিজড়িত এ দেউলটি সংস্কার করতঃ ঐতিহ্যটি রক্ষা করা প্রয়োজন।


 সীতারামের শাসন

সীতারামের পিতামহ হরিশচন্দ্র যখন ঢাকায় আসেন তখন ভূষণা বারভূঁইয়াদের অন্যতম ভূঁইয়া মুকুন্দরাম ভূষণার শাসনকর্তা। চাকলা ভেঙ্গে ভূষণা তখন প্র্রশস্ত জমিদারীতে পরিণত হয়েছে। এ জমিদারী বর্তমান রাজবাড়ি জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মুকন্দ রামের পর তার পুত্র ছত্রাজিত মোগলের অধীনে সামান্ত রাজা ছিলেন। তিনি নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় মোগল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। অতঃপর সংগ্রাম সাহ নামক এক মোগল কর্মচারী জায়গীরপ্রাপ্ত হন। সংগ্রাম সাহ সম্মন্ধে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। সংগ্রাম ও পুত্রের ও তাঁর পুত্রের মৃত্যু হলে এই জায়গীর খাশ হয় এবং মোগল ফৌজদার আবু তোরাপের হস্তে অর্পিত হয়। এই ফৌজদারের সময় রাজা সীতারামের উত্থান ঘটে।

 ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তি নাম-----রাজা সীতারাম যার শাসন স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস। ১৬৯৯ অব্দ হতে রাজা সীতারাম স্বাধীন রাজার মত রাজত্ব আরম্ভ করেন। ষোড়ষ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা মানসিংহ যখন রাজমহলে রাজধানী স্থাপন করেন তখন সীতারামের পূর্ব পুরুষ শ্রীরাম দাস তাঁর নিকট থেকে রাজা উপাধি লাভ করেন। তিনি সুবাদারের খাশ সেরেস্তায় হিসাব বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। তাঁর পুত্র হরিশচন্দ্র অল্প বয়সে পিতার সঙ্গে রাজ সরকারে কাজ আরম্ভ করেন। রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় কর্মক্ষমতার গুণে তিনি রায় উপাধিপ্রাপ্ত হন। তার পুত্র উদায়নারায়ণ ভূষণার ফৌজদারদের অধীন সাজোয়াল বা তহশীলদার হয়ে আসেন।

উদয়নারায়ণ যখন রাজমহলে নবাব সরকারে চাকরি করতেন তখন তিনি বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত মহিতাতপুর গ্রামে এক কুলীন ঘোষকন্যা বিবাহ করেন। তার নাম দয়াময়ী। দয়াময়ীর গর্ভে ১৬৫৮ সালে উদয়নারায়ণের যে প্রথম সন্তান জন্ম লাভ করেন তিনিই সুপ্রসিদ্ধ সীতারাম। উদয় নারায়ণ ঢাকা আসার কয়েক বছর পর তহশীলদারের কার্যে ভূষণায় আসেন।

তিনি পরিবারবর্গ আনেন নাই। প্রথমে ভূষণার নিকটবর্তী গোপালপুরে তার বাসাবাটি ছিল। কিছুদিন পর তিনি একটি ক্ষুদ্র তালুক এবং বর্তমান মুহম্মদপুরের পার্শ্ববর্তী শ্যামনগরে একটি জোত বন্দোবস্ত নেন। তিনি মধুমতির অপর পাড়ে হরিহর নগরে নিজের বাসস্থান নির্মাণ করেন এবং পরিবারবর্গকে নিয়ে আসেন। হরিহর নগরে এখনো উদয়নারায়নের বংশধর আছে। সীতারামের বাল্যজীবন সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না তবে তহশীলদার পুত্রের কপালে রাজটিকা ছিল তা হয়তো কেউ অনুমানও করেননি। তখনকার দিনে রাজভাষা ছিল আরবি ও ফারসি। রাজদরবারে কার্যসিদ্ধি করতে হলে আরবি, ফারসি ও উর্দু জানতে হত।

যতদূর জানা যায় সীতারাম ভালো ফারসি ও উর্দু জানতেন। তার বাল্যজীবন কাটোয়ায় কাটে। ভূষণায় এসে তিনি মুসলমানদের সাথে মিশে ফারসি ও উর্দুতে দক্ষতা অর্জন করেন। সে সময় মোগলদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পাঠানেরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত। এ ছাড়া চোর, ডাকাত এবং দস্যুদের উপদ্রবে ভূষণা অঞ্চল অশান্ত হয়ে ওঠে। সঁ-তৈর পরগনার করিম খান নামক একজন পাঠান বিদ্রোহী হয়। এ সময় শায়েস্তা খান নানা প্রসঙ্গে সীতারামের অস্ত্র পরিচালনা ও সাহসিকতার পরিচয় পান। সীতারাম নবাবের প্রস্তাবে সাহসিকতার সাথে পাঠান বিদ্রোহী করিম খাঁকে পরাস্ত করেন। করিম খাঁ পরাজিত ও নিহত হন। যুদ্ধ বিজয়ী সীতারাম ঢাকায় গেলে শায়েস্তা খান সন্তুষ্ট হয়ে ভূষণার অন্তর্গত নলদী পরগনার জায়গীর দিলেন।


সীতারামের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, একজন মুনিরাম অন্যজন রঘুরাম বা রামরুপ। রামরুপ শিশুকাল থেকে নানা স্থানে পাহলোয়ানের নিকট কুস্তি, লাঠি খেলা উত্তমরুপে শিখেছিলেন। তার দীর্ঘকায় বপু, মস্তক, লম্বা হাত দেখে লোকে চমকিত হত। তিনি সীতারামের সৈন্যবিভাগে প্রবেশ করেন। তাকে হাতি বা ক্ষুদ্রকায় হাতি বলা হত। সীতারাম অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে রুদ্রমূর্তিতে দস্যুদমন ও চোর ডাকাতদের উৎপাত থেকে মুক্ত করে ভূষণা অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। মগদুস্যু, জলদস্যু, চোর ডাকাত দেশ থেকে মুক্ত করে সীতারাম বাদশা, প্রজা সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ, সতীশচন্দ্র মিত্রসহ অনেক ঐতিহাসিক তার বীরত্বের ও সুকর্মের প্রশংসা করে গেছেন। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তার লেখায় সীতারামের উল্লেখ করেছেন। তার আমলে ভূষণা অঞ্চলে প্রজাবর্গ খুশি হল। গ্রাম্য কবিরা গান রচনা করলেন।

ধন্য রাজা সীতারাম বাংলা বাহাদুর

যার বলেতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেল দুল।

বাঘ মানুষে একই ঘাটে মুখে জল খাবে

রামী শ্যামি পোটলা বেঁধে গঙ্গাস্থানে যাবে।

এইভাবে শান্তি সুখ দেখে নলদী পরগনার প্রজাগণ সীতারামের প্রতি আসক্ত হল। পরগনার আয় বহু পরিমাণে বৃদ্ধি পেল। সীতারাম রীতিমত জমিদারে পরিণত হলেন। সাঁ-তৈর পরগনার কতকাংশ তালুক বন্দোবস্ত লইলেন। সূর্যকুণ্ডু গ্রামে অট্রালিকাসম আকাশবাতি নির্মাণ করলেন। সীতারামের পিতৃকুল শাকমন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। সীতারাম বৈষ্ণব দীক্ষা লন। এতে তার শাকবিদ্বেষ ছিল না। রাজধানী স্থাপন করে তিনি সর্বাগ্রে দশভূজার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। আসলে তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। এ সময় সীতারাম জমিদার মাত্র। তখনও তিনি রাজা হন নাই।

সীতারাম যখন প্রতিপত্তিশালী জমিদার তখন তার পিতা মাতা পরলোক গমন করেন। কথিত আছে তিনি পিতা মাতার মৃত্যুর পর লক্ষীনারায়ণের উপর জমিদারির ভার দিয়ে তিনি গয়ায় পিণ্ডদানের পর বহুবিধ উপহার নিয়ে রাজধানী দিল্লীতে উপস্থিত হন। নবাব শায়েস্তা খাঁ তার সুকর্মের কথা দিল্লীতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তার প্রার্থনা মতে আওরঙ্গজেবের ভারপ্রাপ্ত রাজকর্মচারী রাজা উপাধির পাঞ্জাসহ ফরমান এবং দক্ষিণেশ্বর আবাদি সনদপ্রাপ্ত হলেন। এই জাতীয় সনদ পেলে রাজাকে কিছুকাল খাজনা দিতে হত না। রাজা হওয়ার পর তিনি মুহম্মদপুরে রাজধানী স্থাপন করেন। এরপর সীতারাম রাজ্য বিস্তারে ব্রতী হয়ে ওঠেন। প্রথমে পশ্চিম দিকে তার নজর পড়ে। ভূষাণা চাকলার অন্তর্গত রুপপার, পোকতালী, রোকনপুর কয়েকটি ক্ষুদ্র পরগনা দখল করেন। এসব পরগনার মালিক ছিলেন ছত্রাজিতের পুত্র কালিনারায়ণ। এরপর ছত্রাজিতপুরের পশ্চিমে মাহমুদশাহী পরগনা তার হস্তগত হয়। এরপর তিনি সফর দেন উত্তর দিকে। তখন মুহম্মদপুরের উত্তর দিকে পদ্মা পর্যন্ত পাঠানদের এবং রাজা সংগ্রাম সাহের বংশধরদের দখলে ছিল। সাঁতৈরের উত্তরে দৌলত খাঁ এক পাঠান পশ্চিমে গড়াই থেকে পদ্মা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ স্থানের মালিক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তৎপুত্র নাসির ও নশরত খাঁর নামানুসারে এই প্রদেশ নসীবশাহী ও নশরতশাহী নামক দুই পরগনায় বিভক্ত হয় এবং মহিমশাহী ও বেলগাছি নামক আরো দুটি পরগনা বের হয়। রাজবাড়ি জেলার পুরাতন পরগনার ভিত্তি হল পূর্বে মুরাদনগর নশরতশাহী কাসিমনগর, নসিবনগর যা বর্তমানে গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলার পূর্বাংশ ও উত্তরাংশ।


এরপর রাজবাড়ি উপজেলার দক্ষিণাংশ ও পশ্চিমাংশ এবং বালিয়াকান্দি ও পাংশা উপজেলার নসিব শাহী, নশরত শাহী, মহিম শাহী, ও বেলগাছি পরগনা ছিল। এ ছাড়া সংগ্রাম শাহের বংশধরদের অধীনে নাওয়াড়া মহলও রাজবাড়ির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সকল পরগনার অধিকার নিয়ে দৌলত খার পুত্রগণের মধ্যে বিবাদ চলছিল। শায়েস্তা খাঁর আদেশে তা দমনের ভার পড়েছিল সীতারামের ওপর। মোগলদের জ্ঞাতসারে তিনি পরগনার পর পরগনা তার রাজ্যের আয়ত্বাধীন করেন। নসিব শাহী, ও বেলগাছি পরগনা জয় করার জন্য তিনি পদ্মার কুলে উপনীত হয়ে কয়েক স্থানে দুর্গ স্থাপন করেন। ক্রমাগত যুদ্ধ চলতে থাকে। বর্তমান পাংশার রেল স্টেশনের ৩ মাইল দক্ষিণে মালঞ্চী গ্রামের একটি উপঞ্চলকে ৫০ বছর পূর্বেও মানুষ তাকে সীতারামের গড় বলত। পাংশার পূর্বদিকে কালিকাপুরীতেও তার একটি দুর্গ ছিল। ঐ দুর্গের সন্নিকটে পাঠানদের সাথে বড় যুদ্ধ হয়েছিল। কালিকাপুরিতে এখন মেলা বসে। আখরজানি গ্রামের মসজিদটিকে মানুষ এখন ছুটি মণ্ডলের মসজিদ বলে। পূর্বে ঐ মসজিদটির স্থানে সীতারামের দুর্গ গড়ে তোলে বলে জানা যায়। বেলগাছির একটি পুকুরকে এখনো লোকে সীতারামের পুকুর বলে। এদিকে বাণীবহের সংগ্রাম সাহর নাওয়াড়া মহলও তার অধীন হয়।ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন এসব ঘটনা ১৭০২ থেকে ১৭০৪ এরমধ্যে সংগঠিত হয়। তাঁর রাজ্য ক্ষুদ্র হলেও ঐ রাজ্যের বিস্তার ছিল পদ্মার ওপাড় পাবনা এবং পদ্মার এপাড় রাজবাড়ি থেকে বোয়ালমারী, মাগুরা নড়াইল, গোপালগঞ্জের অংশবিশেষ, যশোরের অংশবিশেষ এবং খুলনার সুন্দরবন পর্যন্ত।

সীতারাম আদর্শ হিন্দু নৃপতি বলে ঐতিহাসিকগণ মনে করেন। তিনি ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে হিন্দু রাজত্বের আদর্শ সম্মুখে রেখে প্রজাপালনের চেষ্টা করেছিলেন। প্রজার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করার কার্পণ্য তার মধ্যে ছিল না। রাজধানী মুহম্মদপুরের মনোরম রাজ্যের সংস্থাপন করে একটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল।

সে সময় নলকূপ ছিল না। নদীকূল দূরবর্তী লোকেরা নিদারুণ জলকষ্টে ভুগতো। তাঁর রাজ্য মধ্যে যাতে জলকষ্ট না থাকে এ জন্য তিনি ২২০০ লোক দ্বারা বেলদার সৈন্য গঠন করেন। তাদের কাজই ছিল নিত্য নতুন পুকুর খনন করা। সর্বত্রই জলাধার প্রতিষ্ঠা দ্বারা তিনি প্রজাদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রবাদ আছে তিনি প্রতিদিন নতুন পুস্কুরিণীর জলে স্নান করতেন এবং প্রতিদিন নবনির্মিত পুকুরের জল রাজধানীতে আনা হত। তিনি রাজধানী পাশে রামনগর, সুখনগর, কৃষ্ণনগর, প্রভৃতি বৃহৎ দিঘি খনন করেন। এসব দিঘি এখনো তার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে।

জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার জন্যও মহম্মদপুর খ্যাত ছিল। তিনি বহু অধ্যাপককে বৃত্তিদানে পোষণ করতেন। তার সময় থেকে রাজবাড়ির নলিয়া, কোড়কদি, বানা, নহাটা, বাণীবহ, খালকুলা, পশ্চাত্য ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বহু অধ্যাপক দ্বারা তিনি মুহম্মদপুরে চতুস্পাটি খুলেছিলেন। সে সকল টোলে বাক্য, ব্যাকরণ, স্মৃতি, দর্শন প্রভৃতি শাস্ত্র শিক্ষা দেওয়া হত। সেখানে জ্যোতিষ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পাঠদান করা হত। রাজবাড়ির খালকুলা বহুদিন যাবৎ জ্যোতিষ চর্চা করতো এবং এখান থেকে পঞ্জিকা প্রকাশ করা হত।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতক থেকে পূর্ববাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রথম প্রসার শুরু হয়। পাঠান, মোগলশাসকসহ পীর, আওলিয়া, দরবেশ, ফকীর, ব্যবসায়ীর প্রভাবে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সীতারাম মুসলমানদেরও শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। মুসলমানদের জন্য তিনি অনক মক্তব স্থাপন করেন। মৌলবীরা সেখানে শিক্ষা দিতেন। বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য পাঠশালা ছিল। হিন্দু মুসলমান সকলেই সেখানে শিক্ষক হতেন।


প্রজাগণে অন্নজল ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে সীতারাম রাজসম্মান লাভ করেন। ধর্মপরায়ণতা আর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি রাজধানী প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে দশভূজা দুর্গামন্দির স্থাপন করেন। সীতারাম তার নতুন গুরুদের কৃষ্ণবল্লভ গোস্বামীর নিকট বৈষ্ণব ধর্মগ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে কারুকার্যখচিত জোড় বাংলা মন্দির নির্মাণ করেন এবং কৃষ্ণবিগ্রহ স্থাপন করেন। রাজবাড়ি জেলায় বালিয়াকান্দি উপজেলায় নলিয়া গ্রামে একটি জোড়বাংলা মন্দির স্থাপন করেন। নলিয়ার জোড় বাংলা মন্দিরটি ভগ্ন অবস্থায় আছে।

কৃষাননের পৌত্র রাজিবলোচন সপরিবারে হনু নদীর তীরবর্তী দরিয়াপুর (মাগুরা) গ্রামে ও পরে কাদিরপাড়ায় সম্পত্তি পাইয়া তথায় আসিয়া স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। রাজীবলোচনের তিন পুত্র------হরিরাম, রাসরাম ও দুর্গারাম। তিন ভ্রাতাই বিপুল দেহশালী ও অত্যন্ত বলবান ছিলেন। সে জন্যই তারা রাজা সীতারামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কথিত আছে রাসরাম ও দুর্গারাম অসীম সাহসের সহিত ডাকাইতদের আক্রমণ বিতারণ করায় সীতারাম সন্তুষ্ট হয়ে বিলপাকুরিয়া নামক একখানি গ্রাম দুই ভ্রাতাকে দুগ্ধ খাওযাইবার জন্য নিষ্কর দান করেন। ‘এই গ্রামখানি পরগনে বেলগাছির অন্তর্ভুক্ত এবং ফরিদপুরের বালিয়াকান্দি পুলিশ স্টেশনের অধীন। ঐ গ্রাম এখানো রাসরামের নামীয় খারিজা তালুক বলিয়া ফরিদপুরের কালেক্টরীর তৌজিভুক্ত ও উহা মুন্সীগণের দখলে আছে।’ (যশোহর খুলনার ইতিহাস, সতীশ চন্দ্র মিত্র, পৃষ্ঠা-৪৬১)। বিলপুকুরিয়া গ্রামটি বর্তমান এবং বিল অঞ্চলের জমি নিয়ে আদালতে মামলা আছে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় রাজবাড়ি জেলার খারিজী তালুক থেকে রাজস্ব আদায় হত নিম্নরুপ---

বেলগাছি পরগনা (পাংশা) ৩৫৭ টাকা, মহিম শাহী পরগনা (বালিয়াকান্দি) ৩৬০৬ টাকা, নশরতশাহী (পাংশা) ১৬৯০ টাকা, নসিব শাহী (গোয়ালন্দ) ৬৯০০ টাকা, সূত্র-(ফরিদপুর গেজেটিয়ার পৃষ্ঠা-২৭০। রাজবাড়ি জেলায় খারিজী তালুকের ছড়াছড়িতে অনুমান করা যায় সীতারাম ও তৎপরবর্তী সময়ে জমিদারী সম্পত্তির বাইরে বহুসম্পত্তি খাস হিসেবে খারিজী তালুকের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তার মালিক হন ব্যক্তি বিশেষ। লেখকের নিজ বাড়ি বিলমালেঙ্গা গ্রামে। এর পাশেই ছোট গ্রাম তালুকপাড়া। এখন ভাবতে পারছি বিলমালেঙ্গা তালুকপাড়া খারিজী সম্পত্তি ছিল। আর এসব গ্রামের পত্তনও হয়েছে মোগল শাসনকালে।

সীতারামের পতন :

প্রবল পরাক্রশালী প্রজাহিতৈষী রাজা সীতারামের পতন সামান্য হলেও রাজবাড়িবাসীর মনে বেদনা সৃষ্টি করবে। কারণ তার শাসনকালে তার রাজ্যে প্রজা পীড়নের কোনো ইতিহাস নেই। তিনি মাত্র ১৩/১৪ বছর এ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। এরই মধ্যে তিনি এ অঞ্চলের মানুষের জলকষ্টে পুকুর খনন, শিক্ষার জন্য টোল, রাজস্ব আদায়ে নমনীয়তা, চোর ডাকাত দমন করে সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে লোকের মুখে সীতারামী সুখের কথা প্রবাদ হয়ে আছে।

হিন্দুবাড়ির পিঠা কাশন মুসলমানে খায়

মুসলমানের রস পাটালী হিন্দুরা খায়


রাজা বলে আল্লা হরি নহে দুইজন

ভজন পুজন যেমন ইচ্ছা করগে তেমন।

মিলে মিশে থাকা সুখ তাহে, বাড়ে বল

ডরেতে পালায় মগ ফিরিঙ্গীর দল।

চুলে ধরে নারী লয়ে চড়তে নারে নায়

সীতারামের নাম শুনিয়া পালাইয়া যায়।

১৬৮৯ সালে শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ত্যাগ করার পর এবং মুর্শীদকুলি খাঁ সুবেদার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৪ বছর বাংলায় কোনো শাসন শৃঙ্খলা ছিল না। ও সময়েই সীতারামের উত্থান। বাদশা আওরঙ্গজেব তার পৌত্র আজিমুশ্বানকে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার বা নাযিম ‍নিযুক্ত করেন। এরপর ১৭০১ সালে মুর্শীদকুলি খাঁ ঢাকায় দেওয়ান হয়ে আসেন। কিছুদিনের মধ্যে আজিমুশ্বানের সাথে মুর্শীদকুলি খাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। ১৭০৩ সালে ঢাকায় মুর্শীদকুলি খাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হলে তিনি দেওয়ানী সেরেস্তা মকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। মকসুদাবাদ পরে মুর্শীদদাবাদ হয়। ঐ সময় নায়েবে নাযিম পদের সৃষ্টি হয় এবং মুর্শীদকুলি খাঁ দেওয়ানী লাভের সাথে নাযেবে নাযিম হন। উভয় পদের বলে তিনি প্রবল পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। ঢাকায় থেকে আজিমুশ্বান কিছুতেই কিছু করতে পারছিলেন না। এরপর আজিমুশ্বান বাদশার আদেশে বিহারে রাজধানী স্থাপন করেন। ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যু হলে জ্যেষ্ঠ পুত্র বাহাদুর শাহ সম্রাট হন। তিনি আজিমুশ্বানের পিতা হওয়ায় পাঁচ বছর বিহার উড়িষ্যার শাসনকর্তা ছিলেন। কিন্তু এতে মুর্শীদকুলি খাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস পায় না কারণ তিনি প্রজার থেকে অধিক হারে রাজস্ব সংগ্রহ করে দিল্লীতে পাঠাতেন। মুর্শীদকুলি খাঁ কর সংগ্রহে নিদারুণ কঠোরতা পালন করতেন। রাজস্ব বাকি থাকলে জমিদারদের ধরে এনে সাধারণ লোকের মতো কারাগারে নিক্ষেপ করা হত। এমন কি খাদ্য ও পানীয় তাদের দেওয়া হত না। জমিদারী খাস হত এবং চড়া দামে অন্যের বন্দোবস্ত দেওয়া হত। তিনি কর সংগ্রহের জন্য যে সব কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন তাদের মধ্যে নাজির আহম্মেদ ও সৈয়দ রেজা খান আরও বেশি অত্যাচারী হয়ে ওঠেন।

জানা যায় নাজির আহম্মেদ জমিদারদের ধরে এনে কখনো পা ঝুলিয়ে বেধে নির্যাতন করতেন। মুরশিদ কুলি খাঁ বাদশার দরবারে ন্যায় নিষ্ঠা ও সুনামধারী থাকলেও দেশময় তার রাজস্ব আদায়ের কলঙ্ক ছড়েয়ে পড়ে। বহু জমিদার তার বিরুদ্ধচারী হয়ে ওঠেন। এরমধ্যে রাজা সীতারাম এবং রাজশাহীর ব্রাহ্মণ উদয়নারায়ণ বিদ্রোহী হন।

এদিকে আজিমুশ্বান যখন বাংলার শাসনকর্তা তখন তার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আবু তোরাপকে ভূষণার ফৌজদার করে পাঠান। পরাক্রান্ত জমিদার সীতারামের প্রতি দৃষ্টি রাখাই ছিল তার প্রধান কাজ। আবু তোরাপ আজিমুশ্বানের আত্মীয় হওয়ায় খুব গর্বিত ছিলেন এবং কারো নিকট বশ্যতা স্বীকার করত না। তিনি মুর্শীদ কুলিকেও শত্রুর মতো মনে করতেন। এ ছাড়া মুর্শীদকুলি খাঁ প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন পরে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় আবু তোরাপ তার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। অন্যদিকে সীতারাম পাঠানদের দমনের কারণে মুর্শীদকুলি খাঁর সুনজরে ছিলেন। এদিকে ফৌজদার আবু তোরাপ কেবল কর দিলেই চলবে এ অনুরোধও সীতারাম মেনে নেন না। আবু তোরাপ তর্জ্জন গর্জ্জন করে পত্র লিখলেন।


তবে সীতারাম আরও ক্রোধান্বিত হন। ফৌজদারের সামরিক শক্তি কি তা সীতারাম জানতেন। সে সময় খাল বিল জঙ্গল বেষ্টিত এলাকায় বাদশার কর্ম কর্তৃত্ব গ্রাহ্য করতেন না এবং নিজ জমিদারীর সীমার মধ্যে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। ফৈাজদারের সৈন্যদের সাথে প্রায়ই হাঙ্গামা লেগে থাকত। মীর আবু তোরাপ সীতারামকে দমন করার জন্য সেনাপতি পীর খার উপর ভার ন্যাস্ত করেন। সীতারামের সৈন্যদল শক্তিশালী ছিল। বারসিয়া নদীর কূলে উভয়পাশের সেনাদের যে যুদ্ধ হয় তাতে আবু তোরাপ নিহত হন। এরপর সীতারাম ভূষণা দুর্গ দখল করে নেন। আবু তোরাপের মৃত্যু সংবাদ দিল্লীতে পৌছালে দিল্লীশ্বর ফররুখ শিয়ার সীতারামকে দমনের জন্য মুর্শীদকুলি খাঁকে আদেশ দেন। এ সময় বক্স আলী খাঁ নিজ সহকারী সংগ্রাম সিং (সংগ্রাম সাহ নয়) সঙ্গে নিয়ে ভূষণা দখলের উদ্দেশ্যে পদ্মা দিয়ে স্থলপথে ভূষণার উত্তর দিকে উপনীত হন। সীতারাম স্বসৈন্যে অগ্রসর হয়ে গতিরোধ করে। যুদ্ধে সীতারামের জয় হয়। এদিকে দয়ারাম রায় মুহম্মদপুর আক্রমণের জন্য জমিদারী ফৌজ নিয়ে পদ্মা হয়ে গড়াই নদী পাড় হয়ে কুমার নদীর তীরে বারাসাতে পৌছেন। মুহম্মদপুরের দুর্গ রক্ষা  করতেন রামরুপ বা মেনা হাতি। গুপ্ত ঘাতকেরা তাকে হত্যা করে। এরপর তার মস্তক কেটে দয়ারামের নিকট দেওয়া হলে দয়ারাম ছিন্ন মুণ্ডুটি মুর্শিদাবাদ নবাবের নিকট পাঠিয়ে দেন। কথিত আছে নবাব সে প্রকাণ্ড মুণ্ডু দেখে শিহরিত হন এবং তাকে স্বশরীরে কারাবদ্ধ না করে গুপ্তভাবে কেন হত্যা করা হল সে অনুযোগ করেন। নবাব সসম্মানে সে ছিন্ন মুণ্ডু মুহম্মদপুরে ফিরিয়ে দেন। ভূষাণা থেকে রামরুপের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সীতারামের মনোবল অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। এরপর মধুমতির কূলে দয়ারামের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে আহত এবং ধৃত হন। দয়ারাম তাকে মুর্শিদাবাদে নবাবের হাতে অর্পণ করেন। মুর্শিদাবাদেই ১৭১৪ সালে তার মৃত্যু হয় তবে তার পরিবার পরিজনকে মোহাম্মদপুরে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। সীতারামের মৃত্যু সম্বন্ধে দুটি মতো জানা যায়। কেহ বলেন নবাব কর্তৃক তার মৃত্যুদণ্ড হয়, কেহ বলেন কারাগারে বিষপান করে তিনি আত্মঘাতি হন।

সীতারামের মৃত্যুর পর রাজবাড়ির জমিদারীর বিভক্তিকরণ :

‘নবাবী আমলের জমিদারী খাস হইলে যেরুপ ব্যাবহার হইয়া থাকিত এ সূত্রেই তাহাই হইল। সীতারামের ভূষণা জমিদারী নিম্নলিখিত মোতাবেক বাটোয়অরা হইয়া গেল। (আনন্দ রায়)। রঘু নন্দন স্বীয় ভ্রাতা রামজীবনের নামে নলদী বিভাগে ভূষণা চাকলার আমিরাবাদ, আরঙ্গাবাদ, বাজুবন্দ, মাহমুদশাহী, নলদী, তেলীহাটি, নশরৎশাহী, সেনদিয়া, কাশিমনগর, প্রভৃতি লইয়া ১৩০ পরগনায় বিভক্ত এবং রাজস্ব ১৬৯৬০৮৭ টাকা নির্ধারিত হয়। নাটোর জমিদারীর ইহাই প্রধান অংশ।’

(আনন্দনাথ রায়, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৮৪)। উল্লেখ করা যায় পরগনা নসীব শাহী, বেলগাছি, মহিম শাহীর অংশবিশেষ নাটোর রাজার জমিদারীভুক্ত হয়। ফলে রাজবাড়ি জেলার আমিরাবাদ (বর্তমান খানখানাপুর, সুলতানপুর) নশরত শাহী (বর্তমান বসন্তপুর, মূলঘর), কাশিম নগর বর্তমান গোয়ালন্দ (বরাট, রাজবাড়ির উত্তরাংশ) বেলগাছি (বর্তমান বেলগাছি) নসিব শাহী (বর্তমান বহরপুর, জামালপুর, বালিয়াকান্দি, ইসলামপুর) মহিম শাহী বর্তমান পাংশার দক্ষিণ ও উত্তরাংশে নাটোর রাজার রাজ্যভুক্ত হয়। বাকি অংশ নড়াইল এস্টেটের অধীনে আসে।


নাটোর রাজবংশ ও রাজবাড়ি

সুলতান, মোগল ইংরেজ শাসনকালে কত শত জমিদারের উত্থান পতন ঘটেছে তার ইয়াত্তা নাই। তৎকালীন যে সব বৃহৎ জমিদার আত্মপ্রকাশ করে তারমধ্যে নাটোর রাজবংশের রাজা রামজীবন , রাজা রামকান্ত, রানী ভবানী, মহারাজ রামকৃষ্ণ, রাজা বিশ্বনাথ, নাটোর রাজবংশের বিখ্যাত রাজ জমিদার। সীতারাম কারাগারে থাকার সময়েই তার জমিদার প্রত্যর্পিত হবে এরুপ কথা ওঠার প্রেক্ষিতে জানা যায় কোনোক্রমে দুইলক্ষ টাকা সংগ্রহ করে সীতারামের ভ্রাতা লক্ষীনারায়ণ পুত্র শ্যামসুন্দর মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে অর্থ ব্যয় হলেও কী কারণে জমিদারী পাওয়া যায় না তা জানা যায় না। লক্ষীনারায়ণ ও শ্যামসুন্দর মুর্শিদাবাদে থাকার সময়েই সীতারামের মৃত্রু হয় এবং জমিদারী খারিজ হয়ে যায়। এ বিষয়ে সতিশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন, ‘সুবে বাংলার অন্তর্গত ভূষণার জমিদারী তফসীল জমা ও পেসকম প্রদান স্বীকারে রামজীবনকে প্রদত্ত হইতে এই মর্মে ফররুখ শিয়রের সনন্দে দেখতে পাই। রামজীবনই নাটোর রাজ্যের অধিশ্বর হন।’ এখন রামজীবন ও নাটোর রাজবংশের পরিচয় জানা যাক।

নাটোর রাজবংশের আদিপুরুষ কামদো লস্করপুর পরগনার বারাইহাটি মৌজার তহশীলদার ছিলেন। কামদোরের তিন পুত্র রামজীবন, রঘুনন্দন ও বিষ্ণুরাম। তাদের মধ্যে রঘুসন্দন মেধাবী ও অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ছিলেন। তিনি অল্প বয়সে রাজ সরকারের উকিলরুপে ঢাকায় ও মুর্শিদাবাদে অবস্থান করেন। সীতারামের সম্পত্তি পাওয়ার জন্য তিনি উঠে-পড়ে লাগেন। এ ছাড়া তিনি নানা কৌশলে অনেকের জমিদারী নিজ জেষ্ঠ ভ্রাতা রামজীবনের নামে লিখে নেন। রঘুনন্দন ১৭২৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। রামজীবনের একমাত্র পুত্র কালিকাপ্রসাদ মারা যান। এদিকে রামজীবন একমাত্র দত্তক রামকান্তকে রেখে ১৭৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৭৩৪ সালে রামকান্ত বয়োপ্রাপ্ত হলে সমস্ত সম্পত্তি তার হস্তগত হয়। এই রামকান্তের স্ত্রীই স্বনামধ্যা রানী ভবানী।

১৭৪৪ সালে রাজা রামকান্তের আকস্মিক মৃত্যু হলে রানী ভবানী বিপুল রাজ্যের অধীশ্বর হন। এক কন্যা সন্তান ছাড়া তার সন্তানাদি ছিল না। দেওয়ান দয়ারামের দ্বারা রাজকার্য পরিচালিত হত। অবশেষে রামকৃষ্ণকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। বাদশা শাহ আলম রামকৃষ্ণকে, ‘মহাধিরাজ পৃথ্বিপতি রায়বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেন। তবে তিনি নামমাত্র রাজাধিরাজ। বাস্তবত তিনি ছিলেন সাধক। পূজা অর্চনা নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকতেন। সংসার তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। প্রকৃত রাজকার্য পরিচালনা করতেন রানী ভবানী। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্না, দানশীল, ধর্মপরায়ন। দান পূণ্যে তিনি অতি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তখন ইংরেজ রাজত্ব চলছিল। রামকৃষ্ণ বিশাল সাম্রাজ্য সংসার তুচ্ছ ভেবে উপেক্ষায় উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। রানী ভবানী কেবল বারানসীসহ কিছু জমিদারী ঠিক রেখে চলছিলেন। এদিকে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। নতুন আইন অনুসারে নির্দিষ্ট দিনে লাটের কিস্তি দিতে না পারলে জমিদারী নিলামে খণ্ডে খণ্ডে বিক্রি হয়ে যেতে লাগল। আমলা কর্মচারী এমন কি ভৃত্যগণও অর্থ সঞ্চয় করে জমিদারী ক্রয় করতে থাকল। তাদের মধ্যে নড়াইলের আমত্য কর্মচারী কালিশংকরকে নাকি একটি গানের জন্য মহারাজ রামকৃষ্ণ কাটিহাট পরগনা কালীশংকরকে দিয়ে দেন এবং ভূষণার অবশিষ্ট অংশ ইজারা দেন। অবশ্য কালীশংকর প্রজাপীড়ন আরম্ভ করলে রামকৃষ্ণ নাবালক জ্যৈষ্ঠপুত্র বিশ্বনাথকে হেবানামা করে দেন। বিশ্বনাথ নাবালক বলে ভূষানার সমস্ত সম্পত্তি কোর্ট অব জাস্টিস হস্তে অর্পণ করা হয়। দেখা যায় ১৭৮৬ সালে যশোহর জেলা গঠিত হলে ভূষান তার অন্তর্ভুক্ত হয় নাই।


তবে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ভূষণা যশোহরের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজবাড়ির দলিলপত্রে দেখা যায় ১৭৯৩ সালে ‘গোয়ালন্দ ঘাট’ গোয়ালন্দ হিসেবে যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ থেকে প্রমাণ হয় গোয়ালন্দ ভূষণা অঞ্চল নাটোর রাজার জমিদারী হিসেবে তা যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেল। এরপর রাজা বিশ্বনাথ যখন বয়োপ্রাপ্ত হলেন তখন লোকসানের সম্পত্তি ভেবে বিশ্বনাথ ভূষণা গ্রহণ করেন না। দেখা যাচ্ছে ১৭৯৯ সালে যশোর কালেক্টর হতে ভূষাণা পরগনা খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে নিলাম হয়ে যাচ্ছে। এর একটি বিবরণী নিম্নে দেওয়া হল।


পরগনা                        রাজস্ব           নিলামের তারিখ             খরিদকারী


হাবেলী ফরিদপুর        ৩৬৬১৩ টাকা       ১৫-২-১৭৯৯               রামনাথ রায়


মকিমপুর                 ২৫৩৪৭ টাকা       ১৫-২-১৭৯৯               রামনাথ রায়


নসিবশাহী (রাজবাড়ি)   ১৬৯৩৭ টাকা       ২৫-২-১৭৯৯    ভৈরবনাথ রায় (পাংশা)


সাঁ-তৈর                  ৩৯৯৬৮ টাকা      ২৮-২-১৭৯৯             শিব প্রসাদ রায়


নলদী                      ৬৬৭০০ টাক      ২৩-৩-১৭৯৯    ভৈরবনাথ রায় (পাংশা)


(সুত্র: যশোর খুলনার ইতিহাস পৃষ্ঠা-৩৯৩)

মহারাজ রামকৃষ্ণ যখন ভূষণা ইজারা দিতে যাচ্ছিলেন তখন বৃদ্ধা রানী ভবানী বুঝতে পেরেছিলেন ভূষণা জমিদারী টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তখন সীতারামের বিগ্রহসহ ধর্মপায়ানা রানী ভবানী পৃথক মৌজা করে কতকগুলি দেবোত্তর মহলের সৃষ্টি করেন এবং উক্ত মোকামসমূহ পৃথক দেব সেবার জন্য অর্পণ করেন। আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাসের ২৭ পৃষ্ঠায়----‘বেলগাছি স্টেশনের নিকট হারোয়া গ্রামের মদন মোহনের মন্দির বেলগাছি পরগনা-পূর্বে নাটোর রাজ স্টেটের অন্তর্গত ছিল। ইহা হইতে কেহ কেহ অনুমান করেন উক্ত মন্দির এবং বিগ্রহ নাটোর রাজবংশেরই কর্তৃক এই মন্দিরাধীষ্ঠিত। ‘মদনমহোন অতি সুন্দর ত্রিভুজমূর্তি প্রস্তর নির্মিত । ১/১/২ হাত উঁচু। মন্দিরে ব্যয় নির্বাহে প্রচুর দেবোত্তর ভূমি প্রদত্ত হইয়াছে। রাজবাড়িতে মদনমোহন জিউর নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। ইতিহাসের ধারায় অঞ্চলটি রাজা সীতারামের অধীন থাকায় রানী ভবানী তা রক্ষার জন্য দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করেন বা রানী ভবানী নিজেই তা প্রতিষ্ঠা করেন। মদন মোহন জিউর রাজা রাম জীবনের নামে উৎসর্গকৃত। যেভাবেই হোক তা ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করছে। জানা যায় মূল বিগ্রহটি ১৪/১৫ বছর আগে চুরি হয়ে যায় এবং মন্দিরটি স্থানান্তর করা হয়।

বেলগাছিতে নাটোর রাজবংশের ঐতিহ্য হিসেবে নির্মিত ‘সানমঞ্চ’ ও ‘দোলমঞ্চ’ বর্তমান আছে। প্রতিবছর এখানে রামজীবনের নামে রথের মেলা বসে। প্রসঙ্গত রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী, নশরতশাহী, বিরাহিমপুর, কাশিমনগর, আমিরাবাদ, সুলতানপুর, বেলগাছি সকল পরগনা সীতারামের রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল তাও যেমন ঠিক নয় আবার সীতারামের সকল অঞ্চলই যে নাটোর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় তাও ঠিক নয়।

Additional information