নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-২

গৌরী প্রসাদ

গৌরী প্রসাদ প্রভুরামের পুত্র। তাঁর সময়কাল ১৭৫৭ থেকে ১৮০০ শতক পর্যন্ত অনুমান করা যায়। এ সময়ের মধ্যে লক্ষীকোল জমিদার এস্টেটের প্র্র্র্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় ‘সরকার হইতে কোনোরুপ উপাধি না পাইলেও স্বদেশীয়রা ইহাদের রাজা বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকে।’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-২০৬)। গৌরী প্রসাদের কোনো সন্তানাদি না থাকায় দীগিন্দ্র প্রসাদকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

বিশ্বদীগিন্দ্র প্রসাদ

বিশ্বদীগিন্দ্র প্রসাদ গৌরী প্রসাদের পুত্র, তার সময়কাল ১৭৯০ থেকে ১৮৬০ সাল জানা যায়। দীগিন্দ্র প্রসাদ রাজবাড়ি এবং দিনাজপুর অঞ্চলে বিরাট জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। দীগিন্দ্র প্রসাদের সময়কালে রাজবাড়ি লক্ষীকোল রাজার বাড়ির প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে যা রাজা সূর্যকুমারের সময় পূর্ণতা পায়। দীগিন্দ্র প্রসাদ ও স্বাধীনচেতা জমিদার ছিলেন।

তার জমিদারীর রাজকাজ, লক্ষীকোলে প্রসাদোপম বাড়ি, প্রজা বাৎসল্য ইত্যাদি কারণে এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি বর্তমান রাজবাড়ি শহর থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। রাজবাড়ি শহর থেকে পূর্ব সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার পূর্বে এসে লোকোশেডের উত্তর পাশ দিয়ে এতিমখানার পশ্চিম হয়ে যে রাস্তা গিয়েছে এর সামান্য উত্তরে লক্ষীকোলে ছিল রাজার বাড়ির অবস্থান। দীগিন্দ্র প্রসাদ নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি রাজা সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার ছিলেন প্রতাপশালী ও জনদরদী। তার সময়কাল ১৮৪০ থেকে ১৯১২ এর মধ্যে জানা যায়।

রাজা ‍সূর্যকুমার গুহরায়

‘রাজা সূর্যকুমার’ এক কিংবদন্তি নাম। জেলার নামকরণে লক্ষীকোল জমিদার বাড়ির পরিচিতি ‘রাজবাড়ি জেলার নামকরণ’ শিরোনাম নিবন্ধে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আবশ্যকীয় মন্তব্য হল ১৮৮০‘র দশকে জমিদার সূর্যকুমার বৃটিশ রাজ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হলে ‘লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি’ রাজবাড়ির ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। প্রায় এক দশক যাবৎ বিভিন্ন সূত্র থেকে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সামগ্রীক জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পারিনি। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি দর্শন, রাজার পারিবারিক সূত্র, লোকমুখে এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে সূর্যকুমার সম্বন্ধে যতটা জেনেছি সে তথ্যবলীর আশ্রয়ে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস লিখিত হল। উল্লেখ্য শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজার আশ্রয়ে তাঁর বাসভবনে থেকে রাজার হাতে গড়া ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের’ (R.S.k) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে ত্রৈলোক্যনাথ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্যকুমার ও রানী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলিকাতায় এফএ (বর্তমান আই,এ) পড়তে যান তখনও তিনি রাজার কলিকাতার বাড়িতে থাকতেন। অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজার জীবিতকালে ও পরে শিক্ষাকতা করেন। রাজাকে তিনি কাছে থেকে দেখেছেন, রাজার স্টেটের ইকসিকিউটর ছিলেন। রাজার শ্যালক, সন্তান ও আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা, রানী, রাজার বাড়ি, লক্ষীকোল এস্টেটের অনেক কাহিনী ও ঘটনার সাক্ষী ত্রৈলোক্যনাথ। এর অনেক বিষয় তিনি ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে জানা থাকলেও কোনোভাবেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নিত্যরঞ্জন ভট্রাচর্যা জানুয়ারি ২০০৯ এ কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি সংগ্রহ করে আমার হাতে দেন। তাঁর এ অবদান স্মরণীয়। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সূর্যকুমার ছিলেন দরদী ও প্রজাপ্রেমী। সমাজসচেতন রাজা, সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার, রাস্তাঘাট, পোস্ট অফিস, মন্দির। তাঁর আশ্রয়ে লালিত পালিত হয়েছেন ছাত্র, আশ্রয়হীন বালক, দরিদ্র ঘরের অসহায় সন্তান। রাজার দুই রানী।

Additional information