নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-৩

কোনো রানীরই সন্তান না থাকায় রাজা যেন সকলের সন্তানকে আপন সন্তান ভাবতেন। নিজের শ্যালকদের পুত্রবৎ স্নেহে স্বগহে আশ্রয় দিয়ে পালন করেছেন। তৎকালীন জমিদারের শোষণ, অত্যাচারের নানা কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে কিন্তু প্রতাপশালী রাজা সূর্যকুমারের এরুপ কোনো ঘটনা রাজবাড়ির কোনো মানুষের মুখে শোনা যায় না।

বরং একজন তেজস্বী, অথচ কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। প্রতাপশালী বৃটিশ রাজার কাছে তিনি মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। লোকমুখে জানা যায় একবার বড়লাট অত্র এলাকার সকল জমিদারদের দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে লাটের দরবারে প্রবেশ করেছিল কিন্তু সুর্যকুমার জুতা পায়ে লাটের দরবারে প্রবেশ করলে লাট সাহেব বললেন ‘রাজা বটে’? অনেকে মনে করেন সেই ঘটনা থেকে রাজা বলে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। সূর্যকুমারের ব্যক্তিত্ব, জনহিতকর কাজ, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং প্রজা প্রেমের জন্য ১৮৮০‘র দশকে কারোনোশনের মাধ্যমে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ গুহ রায়ের কোনো সন্তান না থাকায় অনুমান ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রবীনদের মুখে শোনা যায় দীগিন্দ্র প্রসাদ দত্তক গ্রহণে সূর্যনগরের নিকটবর্তী কোনো গ্রামে (মতভেদে চরনারায়ণপুর) পালকি প্রেরণ করেন। সুর্য্যকুমারেরা ছিলেন দুই ভ্রাতা। দৈহিক কান্তির যে ছেলেটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ছিল সে পালকিতে চড়ে না। শীর্ণকায় ভাইটি পালকিতে ওঠে। এই ভাইটি সুর্যকুমার। দীগিন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুর পর সূর্যকুমার এস্টেটের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। প্রথম অবস্থায় লক্ষীকোল, বিনোদপুর মৌজা এবং লক্ষীকোলের উত্তর পূর্বে কাশিমনগর পরগনার পদ্মা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে লক্ষীকোল এস্টেটের বিস্তৃতি ছিল। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর লক্ষীকোল এস্টেট তেঁওতার রাজার সাথে মামলায় জড়িয়ে পরে। এ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘আমি যখন এই বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম (RSK-১৯১৪) ঠিক সেই সময়ে লক্ষীকোল স্টেট একটি বড় রকমের মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া পড়ে। পদ্মার চর লইয়া তেঁওতার জমিদারদের সঙ্গে মামলার জন্য স্টেট হইতে টাকা দিয়া বিল্ডিং শেষ করা সম্ভব হয় নাই’ (আমার স্মৃতিকথা-ত্রৈলোক্যনাথ - পৃষ্ঠা-২৬)। কাশিমনগর পরগনার পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল, (পদ্মা তখন লক্ষীকোল থেকে ৬ মাইল/প্রায় ১০ কিমি উত্তর দিয়ে প্রবাহমান ছিল), সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবেনেশ্বর, কলিকাতা, কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারী প্রতিষ্ঠা পায়।

এ সকল জমিদারী থেকে লক্ষীকোলে এস্টেটের বাৎসরিক আয় তখনকার দিনে ছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। রাজপ্রাসাদ ও রাজার বাড়ির নাম ছিল দেশখ্যাত। প্রায় ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ, অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, আঙ্গীনা, বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস কর্মচারী, পাইক পেয়াদা, গোশালা, আস্তাবল নিয়ে রাজার বাড়ি ছিল জমজমাট। এ ছাড়া রাজা কলিকাতায় বাসস্থান নির্মাণ করেন। দুই রানীর মধ্যে কোনো রানীরই সন্তানদি না থাকায় রাজা ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে নরেন্দ্রনাথকে প্রথমে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটান কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখা করতেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকে। কিন্তু সহসাই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পূর্বে রাজার এক শ্যালক হীরালাল যাকে রাজা পুত্রবৎ স্নেহ করতেন তিনিও রাজবাড়িতে দুর্ঘটানায় মারা যান। স্নেহপ্রবণ রাজা শ্যালক ও পুত্রের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পুরিধামে গমন করেন এবং পুরিতে ৬০,০০০.০০ (ষাট হাজার) টাকা ব্যয়ে সমুদ্র তীরে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। রাজা ঐ বাড়ির নাম রাখেন, নরেন্দ্র কুটির। পুত্রের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ নামকরণ করা হয়। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর ঐ বাড়ির নাম দেওয়া হয়, ভিক্টোরিয়া ক্লাব। রাজা ভবেশ্বরেও একখানি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে অনক ভূ-সম্পত্তি করেন।

রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝমাঝি বরিশালের গাভা নিবাসি উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রানীকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় রাজা দুই শ্যালক হীরালাল ও মতিলালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পুত্রবৎ তাদের লালন পালন করেন। ১৭/১৮ বছর দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রানীর গর্ভে সন্তানাদি জন্মায় না। রানীর পরামর্শে রাজা লক্ষীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন।

Additional information