নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-৪

এ ঘরেও কোনো  সন্তানাদি জন্মায় না। অনুমান ১৮৯১ সালে রাজা স্ত্রীদের পরামর্শে রাজবাড়িতেই নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। এ সময় ত্রৈলোক্যনাথ রাজার বাড়িতে সূর্যকুমার ইনস্টিটিউমনে লেখাপড়া করতেন।

রাজার দুই শ্যালক, ত্রৈলোক্যনাথ এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্র একসাথে চলাফেরা করতেন। বিশেষ করে রাজার শ্যালকদের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়---‘এ সময় রাজবাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুত্রেষ্টি উপলক্ষে রাজবাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা, থিয়েটার, বাজী পোড়ান ইত্যাদিতে বহু অর্থ ব্যয় হয়। বাহির আঙ্গিনায় বৃহৎ মঞ্চ তৈয়ারী হইতেছে, মঞ্চ বাঁধিতে অন্যসব লোকের সঙ্গে রাজার শ্যালক হীরালালও মঞ্চে গিয়া ওঠে এবং হঠাৎ পড়িয়া গিয়া প্রাণ হারায়। যাহা হউক উৎসব নিরানন্দের মধ্যে কোনো রকমে শেষ হইয়া গেল বটে কিন্তু রাজা এই দারুণ ধাক্কা সহ্য করিতে পারিলেন না-----দেশত্যাগী হইয়া কলিকাতাবাসী হইলেন। রাজা তখন স্বপরিবারে কলিকাতাবাসী হলেও রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস করতে থাকেন এবং পুনরায় দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজা ও দুই রানীসহ রাজা শ্রীমান সৌরেন্দ্র মোহনকে দত্তক গ্রহণ করেন। এ উৎসব পুরিধামে নিজ বাড়িতে সম্পন্ন হয়।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রেলোক্যনাথ, পৃ-১১)।

যথা সময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন। তিনি ‘কুমার বাহদুর’ হিসেবে রাজবাড়িতে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষীকোলে সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, লক্ষীকোল পোস্ট অফিস স্থাপন, রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা, নিজ জমিদারী সূর্যনগরে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা অন্যতম কাজ। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি ছিল ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘রাজবাড়ি’ দর্শনে আসত। দেশের দর্শনীয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত হত।

স্বাধীনতার পর লক্ষীকোল রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ‘রাজবাড়ি’ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখান হয়েছে। রাজার বাড়ির ধবংসাবশেষ বলতে বর্তমানে কিছুই নেই। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটবৃক্ষ। শান বাঁধানো পুকুরট ভরাট হলেও পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নববর্ষের আগমনে বৈশাখী মেলা বসে। তবে ১৮৮৮ সালে তাঁর হাতে গড়া রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত আর.এস.কে ইনস্টিটিউশন তাঁর স্মৃতি বহন করছে। রাজা সূর্যকুমার আমোদপ্রবণ ও রসিক প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সময়েই লক্ষীকোল মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরণত হয়। রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠান হত। বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর। রাজার বাড়ির অন্দর মহলের আনন্দ উচ্ছাস বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথের কথায়-----‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান, বাজনা, আমোদ প্রমোদ-----মদ পর্যন্ত চলত। রাজা মদ খাইতেন কোনো কোনো দিন নামমাত্র-ইয়ার বন্ধুদের যোগাইতেন প্রচুর। বড় মা (বড় রানী) আমাকে একদিন বলিলেন তুমি নায়েব মশাইকে বল চাকর গিয়া টাকা চাহিলেও যেন না দেন। বলিবে আমার হুকুম। আমি বলিলাম, কিন্তু রাজা যদি আমাকে ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া দেন তখন? বটে! তাহা আমি বুঝিব, তুমি যাও। আমি তাহার আদেশ পালন করিলাম। রাজা আমাদের ষড়যন্ত্র টের পাইলেন। তবে আমাকে কিছু বলিলেন না। বরং তখন হইতে আমাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। তার কিছু দিন পর অনুমান ১৮৯১ নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ‘তো উঠিয়া গেলই বাদ্যযন্ত্র সব, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধুবান্ধদিগের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন, বলিলেন-----এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে----তার লেখাপড়া কিছু হইবে না।’ (আমার স্মৃতিকথা-৯ পৃষ্ঠা)। পারিবারিক স্নেহ মমতায় আবিষ্ট রাজা ছিলেন অত্যন্ত কৌতুক প্রিয় এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের দেশে এখনো নতুন ঘর বা পাকা বাড়ি নির্মাণের সময় প্রথমত দুই চার কোপ মাটি কেটে মোনাজাত করা হয়। অনেক সময় গর্তের মধ্যে টাকা পয়সা ফেলা হয়। তখনকার দিনে গর্তমধ্যে সোনা, রুপা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজা আর,এস,কে স্কুলের মূল বিল্ডিংটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সোনা আনা হয়েছিল কিন্তু রুপা আনা হয় নাই। ত্রৈলোক্যনাথের পকেটে দুই আনার রুপার মুদ্রা ছিল। তিনি তা গর্তমধ্যে ফেললে রাজা হেসে বললেন, ‘বেশ হইল, এই স্কুল বিল্ডিং এর দুই আনা যত্ন হইল তোমার।’  আমি বলিলাম এ হাতি পোষা রাজরাজাদেরই খাটে----গরীব স্কুল মাস্টারের কাজ নয় (স্মৃতিকথা-২১)।

Additional information