নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-৭

পল্লী কবি আনোয়ারুল ইসলাম সাহেবের একটি পুস্তিকায় ‍উল্লেখ আছে মালু ভাগ্যবান একদিন তার আত্মীয়-পরিজনসহ নিজ বাড়ির পাশেই দিঘিতে স্বেচ্ছায় সলীল সমাধি রচনা করেন। বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত মনোবঞ্চা পুরনের জন্য প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার নরনারী আসত মালু ভাগ্যবানের পুকুরে অবগাহন করত।’ এ দৃশ্য আমি নিজেও দেখেছি।

 ‘ভৈরব কেবল অত্যাচারী জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং সাহিত্যানুরাগী। সাহিত্যচর্চার জন্য তিনি পারিবারিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নীলকরের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ গড়ে তোলেন। ক্ষুদ্ধ হয়ে টিআই কেনী তার ট্রেজারী লুট করেন। পাবনার আদালতে কেনীর বিরুদ্ধে ট্রেজারী লুটের মামলায় ভৈরব বাবু জয়লাভ করেন।’ এই ভৈরব চন্দ্র মজুমদার ভৈরব নাথ যিনি নাটোর রাজবংশের নীলামকৃত জমিদারী ক্রয় করেন।

বেলগাছি এস্টেট

তৎকালীন নসিবশাহী, নসরতশাহী, মহিমশাহী পরগনার পাশাপাশি ছিল বেলগাছি পরগনা। এ পরগনার মালিক ফয়েজবক্স। রাজনীতি, সমাজ উন্নয়ন সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ পরিবারটি বিখ্যাত। ফয়েজবক্সের ভ্রাতা করিমবক্স অতি সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সেতার ও বাঁশি বাদক। করিমবক্স, ফয়েজবক্স বেলগাছি এস্টেট মালিকানায় অত্র অঞ্চলের সম্মান প্রতিপত্তির অধিকারী হন। সমাজ হিতৈষী কাজে তারা নিয়োজিত থাকতেন।

বেলগাছি এস্টেটের কৃতিপুরুষ ফয়েজবক্সের ছেলে খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী তৎকালীন ফরিদপুর জেলার তৃতীয় গ্রাজুয়েট এবং বৃটিশ ভারতে অন্যতম রাজনীতিক ছিলেন। অত্র অঞ্চলের মুসলিম জাগরণে মৌলভী তমিজউদ্দিন খান, খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী, তার ভ্রাতা ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, আহম্মদ আলী মৃধা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। এদের মধ্যে আলীমুজ্জামান চৌধুরী বিশেষ ব্যক্তিত্ব। ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন হয়, যে সম্মেলনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এ সম্মেলনে যোগদানকারীদের অন্যতম ছিলেন খান বাহাদুর আলীমুজ্জামন চৌধুরী। মুসলমানরা সমাজে ছিল পশ্চাৎপদ। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি প্রতিপত্তি সর্বত্রই হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। অত্র অঞ্চলের মুসলিম জাগরণে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। হাড়োয়া জমিদার পরিবারটি প্রতাবশালী হলেও তাদের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। তারা বসবাস করতেন অতি সাধারণ ছনের গৃহে। কিন্তু ব্যক্তিত্বে তারা অনড়, আপোষহীন। আলীমুজ্জামান চৌধুরী নবাব পরিবারে বিবাহ করেন কিন্তু চৌধুরী বাড়ি ছনের গৃহ হওয়ায় স্ত্রী উম্মা প্রকাশ করেন। এতে অতি ব্যক্তিত্ববান আলীমুজ্জামান চৌধুরী বিবাহের পরপরই ফিরে আসেন আর শ্বশুড় বাড়িতে যাননি। তার ভাইয়ের নাতি রনজু চৌধুরীর নিকট থেকে জানা যায় জীবনের শেষ মুহুর্তে স্ত্রীর সাথে দেখা হয়। অনমনীয় ব্যক্তিত্ববান চৌধুরী আলীমুজ্জামান শুধুই মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সমাজহিতৈষী, প্রজাপরায়ণ, সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য খান বাহাদুর উপাধিপ্রাপ্ত হন। ফরিদপুর জেলা বোর্ড গঠিত হলে প্রথম চেয়ারম্যান হন রাজবাড়ির মাজবাড়ির খান বাহাদুর নাদের হোসেন। অতপর খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান ১৯২৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ফরিদপুরে তার নামে আলীমুজ্জামান হল, আলীমু্জ্জামান ব্রিজ বিদ্যামান। জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি রাজবাড়ি জেলায় রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয় নির্মাণ করেন। তিনি বেলগাছি থেকে ফেরিফান্ড রাস্তা সংযোগ করে প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করেন। বৃটিশ সরকার তাতে সিআইই (Companion of Indian Emperior) আপোসহীন প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী আলীমুজ্জামান রাজবাড়ির মানুষের নিকট আজও স্মরণীয়। খান বাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরী আলীমুজ্জামান চৌধুরীর ভ্রাতা। তিনি বৃটিশ ভারতে মুসলিম লীগের অন্যতম রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি এমএনএ নির্বাচিত হন। তার জেষ্ঠপুত্র রশীদ চৌধুরী দেশের অন্যতম চিত্রশিল্পী।

পদমদি নবাব এস্টেট : ষোড়শ শতক থেকে পদমদি জমিদার এস্টেটের উত্থান। এ শতকের প্রথমে সুদূর বোগদাদ থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তাপস প্রবর সাহ পাহলোয়ান এর আগমন ঘটে। তিনি পদমদির অদুরে চন্দনা নদীর তীরে নিভৃত পল্লী সেকাড়ায় আস্তানা গড়ে তোলেন। তাঁর অব্যবহিত পর এখানে বোগদাদ থেকে পিতৃ সন্ধানে আগমন করেন সাহ সাদুল্লা।

Additional information