নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-৮

সাহ পাহলোয়ান তাঁকে পিতৃবৎ স্নেহে আশ্রয় দান করেন এবং নিজ কন্যার সাথে বিবাহ দেন। সাহ সাদুল্লার বংশধর, কালে পদমদি বসতি স্থাপন করেন। সাহ সাদুল্লার পৌত্র সাহ সৈয়দ মীর কুতুবুল্লা। কার্যের পারদর্শীতা অনুসারে রাজদত্ত উপাধি মীর এবং বংশ মর্যাদা ও বংশ পরিচয়ের উপাধি সৈয়দ। তাঁরা বংশ পরস্পরায় মীর উপাধিতে পরিচিত। সৈয়দ তাঁদের বংশের উপাধি। মীর কুতুবুল্লার দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ সৈয়দ মীর ওমরদ্বারাজ, কনিষ্ঠ সৈয়দ মীর আলী আকবর। পদমদিকে আশ্রয় করে দুই পুত্রের বংশধর ঘটনাস্রোতে জমিদারী, চাকরি, ব্যবসা, সাহিত্য চর্চায় যে পারিবারিক ইতিহাস ঐতিহ্য সৃষ্টি করেন তা আজ ‘ঐতিহ্যবাহী পদমদি’ বলে সারাদেশে বিখ্যাত। এ গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়ে পদমদি এস্টেট ও মীর মশাররফ হোসেন অনুষঙ্গে বিশদ আলোচনা আছে।

বহরপুর জমিদার মহিম চন্দ্র সাহা

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে রাজবাড়িতে যে সমস্ত জমিদার বংশের উত্থান ঘটে তাদের মধ্যে বহরপুর জমিদার মহিমচন্দ্র সাহা অন্যতম ও স্মরণীয় জমিদার। তাঁর ভ্রাতা আদ্যনাথ সাহা ও তারাচাঁদ সাহা জমিদারীর অংশীভূত ছিলেন। বহরপুর বাজারের অনতিদূরে (পশ্চিমে) প্রাচীন কারুকার্যখচিত ১৫০ ফুট দৈঘ্য ও ৪২ ফুট প্রশস্ত ২ তলা দক্ষিণমুখী প্রাসাদ তার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। প্রায় তিনি একর জমিদর উপর ৬০ ফুট প্রশস্ত আরো পাঁচটি প্রাচীন দালান, প্রকাণ্ড পুকুর, বাগানসহ জমিদার বাড়িটি প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন। পূর্ব ও পশ্চিম পাশে শৈল্পিক নিদর্শন সম্বলিত দুটি মন্দির। এর চিত্রকর্ম, কারুকাজ, নক্সা দৃষ্টিনন্দন। মন্দিরের দেয়ালে আছে দেবী দুর্গার ভাস্কর্য। দেয়ালে কারুকাজখচিত নক্সা। প্রায় পৌনে দু’শ বছরের পুরাতন এসব প্রাসাদের কারুকাজ সেকালের এ অঞ্চলের শিল্পীদের শিল্পনৈণ্যের ঐতিহ্য স্মরণে আনে।

মহিমচন্দ্র সাহার মূল জমিদার অত্র অঞ্চল বিশেষ করে নসিবশাহী ও মহিমশাহী পরগনার মালিক রানী হর্ষমূখী। মহিমচন্দ্র হর্ষমূখীল ছেলে অরুন সিংহ এর থেকে জমিদারীপাপ্ত হন। মহিম সাহের জমিদারীর বিস্তৃতি ছিল রাধাগঞ্জের বিলসহ ১৬টি গ্রাম। এছাড়া মহিমচন্দ্রের ছিল পাশ্ববর্তী ১৬টি মোকামে বিশাল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। মোকামসমূহের স্থান ছিল বহরপুর, দিনাজপুর, খোকসা, কালুখালি। একমাত্র খোকসা মোকামে চার থেকে পাঁচশত ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গার কাজ চলত।

জমিদার মহিম সাহেব জমিদারী লাভ এক মজার কাহিনী। রানী হর্ষমূখী বালিয়াকান্দি এলাকায় প্রাচীন ও মূল জমিদার। রাজা ও রানী পরিবারসহ কলিকাতায় থাকতেন। অত্র এলাকার অন্যান্য জমিদার তার অধীন জমিদার ছিলেন(পুরান পরচায় রানী হর্ষমূখীর নাম পাওয়া যায়)। রানীর নায়েব একবার জমিদারের খাজনা পরিশোধ করতে বিপাকে পড়েন। অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না। অথচ সময় মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে চাকরি যাবে। নায়েব ব্যবসায়ী মহিমের নিকট থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার নেন। একথা জানাজানি হলে রানীর পুত্র অরুণ সিংহ ব্যবসায়ী মহিমের বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে ১৬টি গ্রাম ও রাধাগঞ্জের জমিদারী মহিমকে প্রদান করেন। জমিদার মহিম সাহা জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করে গেছেন। মহিম সাহা তাঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের সহযোগিতায় বহরপুরের হাট, বাজার, স্কুল, মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি গরিব প্রজাদের প্রতি সদয় আচরণ করতেন। এ বাড়িতে আগমন ঘটেছে অনেক খ্যাতনামা মানুষের। মহিম সাহার ছেলে অ্যডভোকেট যোগেন্দ্রনাথ সাহা ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের নেতা। সুভাষ বসু, শ্যামা প্রসাদের মতো নেতাও এ বাড়িতে আগমন করেছেন। এছাড়া সনাতন ধর্মের বিশিষ্ঠ আধ্যত্মিক ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী (এম এ ডবল), ডিলিট এ বাড়িতে পা রেখেছেন। আর এক সাধক স্বামী সমাধি প্রকাশরণ্য এখানে এসেছেন। মহিমচন্দ্র সাহার পৌত্র নারায়ণচন্দ্র সাহা বহরপুর ইউপি’র প্রেসিডেন্ট ও স্বনামধন্য ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট গৌরচন্দ্র বালা এখানে আগমন করেন। এক সময় এ বাড়ির নাট্যমঞ্চে নাটক, যাত্রা, পালাগান, জলসা জমে উঠত। আগমন ঘটত কলিকাতা থেকে নামী দামী শিল্পীর। পূজা, পার্বণ, আহ্নিকে তা ছিল সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র। মহিম সাহার পুত্র রাধারমণ। রাধারমণ সাহার পুত্র নারায়ণ চন্দ্র সাহা। নারায়ণচন্দ্র সাহার পুত্র প্রাণকৃষ্ণ সাহা ও জীবনকৃষ্ণ সাহা। প্রাণকৃষ্ণ সাহা (বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি জেলা স্কুলের শিক্ষক) তিনি ও ভ্রাতা বাড়িটির মালিকানা স্বত্ত্বে বসবাস করছেন। অক্ষত ও সুরম্য প্রাসাদসমূহের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সচেষ্ট আছেন।

Additional information