নব্যজমিদার বংশ - পৃষ্ঠা নং-৯

রুপিয়াট জমিদার পরিবার

বৃটিশ শাসনামলের পূর্ব থেকেই জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হতে থাকে। এ সমস্ত জমিদার ‍বৃটিশ শাসনামলে অর্থ প্রতিপত্তির দ্বারা সামাজিক বলয় সৃষ্টিরমাধ্যমে সামান্ত শ্রেণি হিসেবে আত্ময়প্রকাশ করে। তবে তাদের মধ্যেও অনেক জমিদার পরিবার শিক্ষাদীক্ষায় মানবিক বোধের উন্মেষ ঘটিয়ে ঐতিহ্যবাহ জমিদার পরিবার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। রাজা সূর্যকুমার, বাণীবহের জমিদার পরিবার মুকুন্দিয়ার জমিদার দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাংশার জমিদার ভৈরব সাহ পরিবারের ঐতিহ্য সবার জানা।

এমন আর একটি পরিবার রুপিয়াট জমিদার পরিবার। এ পরিবারটি অত্র অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে খ্যাত। এ পরিবারের শশীভূষণ দত্ত রাজবাড়ির প্রথম এমএ বার এট ল। এ পরিবারে প্রতুল চন্দ্র দত্ত কাজী নজরুল ইসলামের অতি ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম একবার রুপিয়াট জমিদার বাড়িতে আতিথিয়তা গ্রহণ করেন। তখন কলিকাতা থেকে ‘নাচঘর’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। প্রতুল চন্দ্র ‘নাচঘর’ এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ‘নাচঘর’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কলিকাতায় প্রতুল চন্দ্রের নিজস্ব বাড়িতে সাহিত্য আসর বসত। কবি সেখানে বসে অনেক গান রচনা করতেন। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সদ্য প্রকাশিত প্রায় সবগুলি কাব্যগ্রন্থে নিজহাতে বন্ধুপত্মীর (প্রতুল চন্দ্রের স্ত্রী) নাম লিখে তাঁকে উপহার দিতেন। (বাণীবহের জমিদার গ্রাম বাণীবহ অংশে আলোচিত)

অন্যান্য জমিদার

ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভকালে কর বা খাজনা সংগ্রহে ইংরেজগণ সূর্যস্ত আইন প্রবর্তন করেন। এক্ষেত্রে জমিদারকে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিশেষ দিনে খাজনা পরিশোধ করে নতুন করে জমি পত্তন নিতে হন। ব্যর্থ হলে ইংরেজরা তা অন্য ইজারাদারদের দিত। লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৭৩) পর এই প্রথার বিলোপ ঘটে। এখন থেকে জমিদার নির্দিষ্ট শর্তে চিরস্থায়ীভাবে জমির মালিক হতে পারতেন। বলা যায় এ সময় থেকে নতুন আঙ্গিকে জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। প্রজারা জমিদারের খাজনা প্রদান করে নির্দিষ্ট সময়ে ভূমি ব্যাবহার করতে পারতেন। রায়ত বা প্রজা এবং সরকারের মধ্যে জমিদার ছিল মধ্যবর্তী শ্রেণি। অর্থনীতির বিশ্লেষণে সমাজ বিন্যাসে এরা সামান্ত শ্রেণি। ১৭৯৩ থেকে ১৯৫০ সালে প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন পর্যন্ত দেশে এই সামন্ত শাসকদের ইতিহাস বাংলার ইতিহাসে বিশেষ একটি অধ্যায়। সমাজশাসন উন্নয়ন, ভোগ দখলে সামন্তরা একচেটিয়া প্রভাব বলয়ের মালিক। সামান্তগণ ইংরেজদের পদলোহী, ক্ষেত্র বিশেষে খেতাবপ্রাপ্ত রাজা, নবাব। তবে সবাই তৃণমূল উৎপাদক কৃষকের পরগাছা। সমাজ সংসারে তাদেরই নাম, জয়গান। বৃটিশ পূর্ব জমিদার, জোতদার, পরগনা মালিক গতটা কার্যক্ষেত্র স্বাধীন বৃটিশ শাসনামলে ততটাই পরাধীন। আজকের বাজার অর্থনীতিতে পুঁজিপতিরা যেমন পুঁজি বিকাশের দ্বারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কর্মহীন বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে কল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে স্থান করে নিচ্ছেন এমন সুবিধা তখন ছিল না। তা সত্ত্বেও তৎকালীন জমিদারগণ রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং দান দয়ার দ্বারা সমাজের কল্যাণকর্তা হিসাবে অনেকে সুনাম অর্জন করেন। রাজবাড়িতে ১৭৯৩ থেকে ১৯৪৭ এরমধ্যে প্রায় দেড়শত বৎসর যে সমস্ত জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয় তাদের মধ্যে রাজবাড়ির রাজা সূর্যকুমার, বাণীবহের গিরিজা শংকর, পদমদির নবাব মীর মোহাম্মদ আলী, বেলগাছির ফয়েজ বক্সা, করিম বক্স, বালিয়াকান্দির রানীহর্ষমুখী, মুকুন্দিয়ার দ্বারকানাথ ঠাকুর, নলিয়ার সুরেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্য, পাংশার রতন বাবু, ভৈরব বাবু, শিলাইদহের দ্বারকানাথ ঠাকুর, তেওতার জমিদার শ্যামশংকর, জয়শংকর উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য রাজবাড়ির কিছু অংশ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও তেওতার রাজার জমিদারভুক্ত ছিল। 

চানকুঠি মুর্শিদাবাদ

রাজবাড়ির রেলষ্টেশনের পশ্চিমে ড্রাই-আইস উৎপাদন ফ্যাক্টরির স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এই ফ্যাক্টরিতে প্রকৌশলী হিসেবে ১৯৫৮ সাল থেকে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত নিরলস কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর (ইঞ্জিনিয়ারিং কোর) জনাব সাইদ উদ্দিন খান। সাধারণ্যে এসইউ খান বলে পরিচিত ছিলেন।

Additional information