নব্যজমিদার বংশ

তৃতীয় অধ্যায়

নব্যজমিদার বংশ

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর দেশে ইংরেজ শাসন শুরু হলেও কোম্পানি ১৭৬৫ সালে দেওয়ানী লাভ করার পর থেকে কিছু ‍কিছু জমিদার বংশের উত্থান হতে থাকে। পূর্বে অনেক জমিদারী নিলাম হলে অনেকে তা ক্রয় করে, আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তালুক ক্রয় করে জমিদারী পত্তন ঘটায়। রাজবাড়ির রাজা সূর্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম, বাণীবহের গীরিজাশংকর মজুমদার (গীরিজাশংকর মজুমদার প্রাচীন প্রসিদ্ধগ্রাম বাণীবহে আলোচিত) পূর্বপুরুষ, নড়াইল জমিদারী স্টেট, পাংশার ভৈরবনাথ রায়, পদমদীর মীর নবাব মোহাম্মদ আলী পূর্বপুরুষ, রতনদিয়ার ইউসুফ হোসেন।  চৌধুরীর পিতামহ, বারবাকপুরের জমিদার বংশ, বালিয়াকান্দির রানী হর্যমুখী, মুকুন্দিয়ার দ্বারকানাথ ঠাকুর, নলিয়ার সুরেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্য, ঘিকমলার জমিদার, বহরপুরের জমিদার মহিম সাহা, পাংশার রতন বাবু, পাংশার রুপিয়াট জমিদার পরিবার, তেওতার শ্যামশংকর জয়শংকর

অন্যতম।

রাজা সূর্যকুমারের প্রপিতামহ প্রভুরামের আগমন

প্রভুরাম

গৌরী প্রসাদ

বিশ্বদীগিন্দ্র প্রসাদ (দত্তক পুত্র)

সূর্যকুমার (দত্তক পুত্র)

সৌরিন্দ্র মোহন, (কুমার বাহাদুর দত্তক পুত্র)

সৌমিরেন্দ্র মোহন (বেবী) ও সৌমেন্দ্রনাথ (তদ্বীয় পুত্র)

নবাব আলীবর্দি খাঁর শাসনামলে চীনুরায়, বীরদত্ত, রাজা কিরৎ চাঁদ, উমেদ রায় আলীবর্দীর দেওয়ান ছিলেন। জানকী রাম, রাম নারায়ণ বিহারে নায়েবে নাযিম নিযুক্ত হন। আরো অনেক হিন্দু বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এদের মধ্যে রাজা সূর্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম ছিলেন নবাব আলীবর্দী খাঁর কোনো বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী।ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য সূর্যকুমারের প্রতিষ্ঠিত (১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে) বর্তমান R.S.K (রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন) দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজা সূর্যকুমারের সমসাময়িক এবং ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তার লেখা আমার স্মৃতি কথা পুস্তকে প্রভুরাম সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘স্বাধীনচেতা প্রভুরাম ছিলেন নবাব আলীবর্দি খাঁর নবাব এস্টেটের পদস্থ কর্মচারী। কর্মচারী থাকাকালে কোনো এক সময়ে এক ইংরেজ সিপাইকে গুলি করে হত্যা করেন। অতঃপর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর বিপর্যয়ের পর অনেকের মতো তিনিও পলায়ন করেন এবং এ অঞ্চলে এসে রাজবাড়ির লক্ষীকোলে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন। আনন্দনাথ রায় -ফরিদপুরের ইতিহাস ২০৬ পৃষ্ঠায়----‘নবাব আলীবর্দী খাঁর অধীন কোনো কার্য করিয়া, কায়স্থ গুহ বংশীয় প্রভুরাম রায় প্রতুত সম্পত্তি অর্জন করেন।’ লক্ষীকোল এলাকা তখন জঙ্গলাকীর্ণ বিরানভূমি ছিল। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর তিনি ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার শুরু করেন। তিনি লক্ষীকোলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং রাজবাড়ির সূর্যনগর, দিনাজপুর এলাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদারী ক্রয় করে লক্ষীকোলের জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। প্রভুরামের পুত্র গৌরী প্রসাদ।


গৌরী প্রসাদ

গৌরী প্রসাদ প্রভুরামের পুত্র। তাঁর সময়কাল ১৭৫৭ থেকে ১৮০০ শতক পর্যন্ত অনুমান করা যায়। এ সময়ের মধ্যে লক্ষীকোল জমিদার এস্টেটের প্র্র্র্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় ‘সরকার হইতে কোনোরুপ উপাধি না পাইলেও স্বদেশীয়রা ইহাদের রাজা বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকে।’ (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-২০৬)। গৌরী প্রসাদের কোনো সন্তানাদি না থাকায় দীগিন্দ্র প্রসাদকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

বিশ্বদীগিন্দ্র প্রসাদ

বিশ্বদীগিন্দ্র প্রসাদ গৌরী প্রসাদের পুত্র, তার সময়কাল ১৭৯০ থেকে ১৮৬০ সাল জানা যায়। দীগিন্দ্র প্রসাদ রাজবাড়ি এবং দিনাজপুর অঞ্চলে বিরাট জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। দীগিন্দ্র প্রসাদের সময়কালে রাজবাড়ি লক্ষীকোল রাজার বাড়ির প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে যা রাজা সূর্যকুমারের সময় পূর্ণতা পায়। দীগিন্দ্র প্রসাদ ও স্বাধীনচেতা জমিদার ছিলেন।

তার জমিদারীর রাজকাজ, লক্ষীকোলে প্রসাদোপম বাড়ি, প্রজা বাৎসল্য ইত্যাদি কারণে এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি বর্তমান রাজবাড়ি শহর থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। রাজবাড়ি শহর থেকে পূর্ব সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার পূর্বে এসে লোকোশেডের উত্তর পাশ দিয়ে এতিমখানার পশ্চিম হয়ে যে রাস্তা গিয়েছে এর সামান্য উত্তরে লক্ষীকোলে ছিল রাজার বাড়ির অবস্থান। দীগিন্দ্র প্রসাদ নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি রাজা সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার ছিলেন প্রতাপশালী ও জনদরদী। তার সময়কাল ১৮৪০ থেকে ১৯১২ এর মধ্যে জানা যায়।

রাজা ‍সূর্যকুমার গুহরায়

‘রাজা সূর্যকুমার’ এক কিংবদন্তি নাম। জেলার নামকরণে লক্ষীকোল জমিদার বাড়ির পরিচিতি ‘রাজবাড়ি জেলার নামকরণ’ শিরোনাম নিবন্ধে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে আবশ্যকীয় মন্তব্য হল ১৮৮০‘র দশকে জমিদার সূর্যকুমার বৃটিশ রাজ কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধিপ্রাপ্ত হলে ‘লক্ষীকোলের রাজার বাড়ি’ রাজবাড়ির ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। প্রায় এক দশক যাবৎ বিভিন্ন সূত্র থেকে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁর সামগ্রীক জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পারিনি। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি দর্শন, রাজার পারিবারিক সূত্র, লোকমুখে এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থ থেকে সূর্যকুমার সম্বন্ধে যতটা জেনেছি সে তথ্যবলীর আশ্রয়ে রাজা সূর্যকুমারের জীবন ইতিহাস লিখিত হল। উল্লেখ্য শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজার আশ্রয়ে তাঁর বাসভবনে থেকে রাজার হাতে গড়া ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের’ (R.S.k) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮৯ সালে ত্রৈলোক্যনাথ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্যকুমার ও রানী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলিকাতায় এফএ (বর্তমান আই,এ) পড়তে যান তখনও তিনি রাজার কলিকাতার বাড়িতে থাকতেন। অতঃপর ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রাজার জীবিতকালে ও পরে শিক্ষাকতা করেন। রাজাকে তিনি কাছে থেকে দেখেছেন, রাজার স্টেটের ইকসিকিউটর ছিলেন। রাজার শ্যালক, সন্তান ও আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রাজা, রানী, রাজার বাড়ি, লক্ষীকোল এস্টেটের অনেক কাহিনী ও ঘটনার সাক্ষী ত্রৈলোক্যনাথ। এর অনেক বিষয় তিনি ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে লিখেছেন। গ্রন্থটির বিষয়ে জানা থাকলেও কোনোভাবেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর আমার বন্ধু প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ নিত্যরঞ্জন ভট্রাচর্যা জানুয়ারি ২০০৯ এ কলিকাতা থেকে গ্রন্থটি সংগ্রহ করে আমার হাতে দেন। তাঁর এ অবদান স্মরণীয়। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সূর্যকুমার ছিলেন দরদী ও প্রজাপ্রেমী। সমাজসচেতন রাজা, সমাজ উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পাঠাগার, রাস্তাঘাট, পোস্ট অফিস, মন্দির। তাঁর আশ্রয়ে লালিত পালিত হয়েছেন ছাত্র, আশ্রয়হীন বালক, দরিদ্র ঘরের অসহায় সন্তান। রাজার দুই রানী।


কোনো রানীরই সন্তান না থাকায় রাজা যেন সকলের সন্তানকে আপন সন্তান ভাবতেন। নিজের শ্যালকদের পুত্রবৎ স্নেহে স্বগহে আশ্রয় দিয়ে পালন করেছেন। তৎকালীন জমিদারের শোষণ, অত্যাচারের নানা কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে কিন্তু প্রতাপশালী রাজা সূর্যকুমারের এরুপ কোনো ঘটনা রাজবাড়ির কোনো মানুষের মুখে শোনা যায় না।

বরং একজন তেজস্বী, অথচ কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। প্রতাপশালী বৃটিশ রাজার কাছে তিনি মাথা নোয়াবার পাত্র ছিলেন না। স্বদেশী ও স্বরাজ আন্দোলনে পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। লোকমুখে জানা যায় একবার বড়লাট অত্র এলাকার সকল জমিদারদের দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে লাটের দরবারে প্রবেশ করেছিল কিন্তু সুর্যকুমার জুতা পায়ে লাটের দরবারে প্রবেশ করলে লাট সাহেব বললেন ‘রাজা বটে’? অনেকে মনে করেন সেই ঘটনা থেকে রাজা বলে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। সূর্যকুমারের ব্যক্তিত্ব, জনহিতকর কাজ, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং প্রজা প্রেমের জন্য ১৮৮০‘র দশকে কারোনোশনের মাধ্যমে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেওয়া হয়। লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ গুহ রায়ের কোনো সন্তান না থাকায় অনুমান ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্যকুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রবীনদের মুখে শোনা যায় দীগিন্দ্র প্রসাদ দত্তক গ্রহণে সূর্যনগরের নিকটবর্তী কোনো গ্রামে (মতভেদে চরনারায়ণপুর) পালকি প্রেরণ করেন। সুর্য্যকুমারেরা ছিলেন দুই ভ্রাতা। দৈহিক কান্তির যে ছেলেটিকে দত্তক নেওয়ার কথা ছিল সে পালকিতে চড়ে না। শীর্ণকায় ভাইটি পালকিতে ওঠে। এই ভাইটি সুর্যকুমার। দীগিন্দ্র প্রসাদের মৃত্যুর পর সূর্যকুমার এস্টেটের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। প্রথম অবস্থায় লক্ষীকোল, বিনোদপুর মৌজা এবং লক্ষীকোলের উত্তর পূর্বে কাশিমনগর পরগনার পদ্মা তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে লক্ষীকোল এস্টেটের বিস্তৃতি ছিল। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের মৃত্যুর পর লক্ষীকোল এস্টেট তেঁওতার রাজার সাথে মামলায় জড়িয়ে পরে। এ প্রসঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘আমি যখন এই বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম (RSK-১৯১৪) ঠিক সেই সময়ে লক্ষীকোল স্টেট একটি বড় রকমের মোকদ্দমায় জড়িত হইয়া পড়ে। পদ্মার চর লইয়া তেঁওতার জমিদারদের সঙ্গে মামলার জন্য স্টেট হইতে টাকা দিয়া বিল্ডিং শেষ করা সম্ভব হয় নাই’ (আমার স্মৃতিকথা-ত্রৈলোক্যনাথ - পৃষ্ঠা-২৬)। কাশিমনগর পরগনার পদ্মার তীরবর্তী অঞ্চল, (পদ্মা তখন লক্ষীকোল থেকে ৬ মাইল/প্রায় ১০ কিমি উত্তর দিয়ে প্রবাহমান ছিল), সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবেনেশ্বর, কলিকাতা, কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারী প্রতিষ্ঠা পায়।

এ সকল জমিদারী থেকে লক্ষীকোলে এস্টেটের বাৎসরিক আয় তখনকার দিনে ছিল প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। রাজপ্রাসাদ ও রাজার বাড়ির নাম ছিল দেশখ্যাত। প্রায় ৬০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাসাদ, অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, আঙ্গীনা, বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস কর্মচারী, পাইক পেয়াদা, গোশালা, আস্তাবল নিয়ে রাজার বাড়ি ছিল জমজমাট। এ ছাড়া রাজা কলিকাতায় বাসস্থান নির্মাণ করেন। দুই রানীর মধ্যে কোনো রানীরই সন্তানদি না থাকায় রাজা ১৮৯০ এর দশকের শুরুতে নরেন্দ্রনাথকে প্রথমে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটান কলেজিয়েট স্কুলে পড়ালেখা করতেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকে। কিন্তু সহসাই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পূর্বে রাজার এক শ্যালক হীরালাল যাকে রাজা পুত্রবৎ স্নেহ করতেন তিনিও রাজবাড়িতে দুর্ঘটানায় মারা যান। স্নেহপ্রবণ রাজা শ্যালক ও পুত্রের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পুরিধামে গমন করেন এবং পুরিতে ৬০,০০০.০০ (ষাট হাজার) টাকা ব্যয়ে সমুদ্র তীরে বাড়ি নির্মাণ করে বাস করতে থাকেন। রাজা ঐ বাড়ির নাম রাখেন, নরেন্দ্র কুটির। পুত্রের স্মৃতি রক্ষার্থেই এ নামকরণ করা হয়। অবশ্য রাজার মৃত্যুর পর ঐ বাড়ির নাম দেওয়া হয়, ভিক্টোরিয়া ক্লাব। রাজা ভবেশ্বরেও একখানি বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে অনক ভূ-সম্পত্তি করেন।

রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝমাঝি বরিশালের গাভা নিবাসি উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রানীকে বিবাহ করেন। বিবাহের সময় রাজা দুই শ্যালক হীরালাল ও মতিলালকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং পুত্রবৎ তাদের লালন পালন করেন। ১৭/১৮ বছর দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রানীর গর্ভে সন্তানাদি জন্মায় না। রানীর পরামর্শে রাজা লক্ষীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন।


এ ঘরেও কোনো  সন্তানাদি জন্মায় না। অনুমান ১৮৯১ সালে রাজা স্ত্রীদের পরামর্শে রাজবাড়িতেই নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন। এ সময় ত্রৈলোক্যনাথ রাজার বাড়িতে সূর্যকুমার ইনস্টিটিউমনে লেখাপড়া করতেন।

রাজার দুই শ্যালক, ত্রৈলোক্যনাথ এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্র একসাথে চলাফেরা করতেন। বিশেষ করে রাজার শ্যালকদের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়---‘এ সময় রাজবাড়িতে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। পুত্রেষ্টি উপলক্ষে রাজবাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা, থিয়েটার, বাজী পোড়ান ইত্যাদিতে বহু অর্থ ব্যয় হয়। বাহির আঙ্গিনায় বৃহৎ মঞ্চ তৈয়ারী হইতেছে, মঞ্চ বাঁধিতে অন্যসব লোকের সঙ্গে রাজার শ্যালক হীরালালও মঞ্চে গিয়া ওঠে এবং হঠাৎ পড়িয়া গিয়া প্রাণ হারায়। যাহা হউক উৎসব নিরানন্দের মধ্যে কোনো রকমে শেষ হইয়া গেল বটে কিন্তু রাজা এই দারুণ ধাক্কা সহ্য করিতে পারিলেন না-----দেশত্যাগী হইয়া কলিকাতাবাসী হইলেন। রাজা তখন স্বপরিবারে কলিকাতাবাসী হলেও রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস করতে থাকেন এবং পুনরায় দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজা ও দুই রানীসহ রাজা শ্রীমান সৌরেন্দ্র মোহনকে দত্তক গ্রহণ করেন। এ উৎসব পুরিধামে নিজ বাড়িতে সম্পন্ন হয়।’ (আমার স্মৃতিকথা, ত্রেলোক্যনাথ, পৃ-১১)।

যথা সময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে লক্ষীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন। তিনি ‘কুমার বাহদুর’ হিসেবে রাজবাড়িতে সকলের নিকট পরিচিত ছিলেন। রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষীকোলে সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল নির্মাণ, লক্ষীকোল পোস্ট অফিস স্থাপন, রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা, নিজ জমিদারী সূর্যনগরে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা অন্যতম কাজ। লক্ষীকোল রাজার বাড়ি ছিল ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘রাজবাড়ি’ দর্শনে আসত। দেশের দর্শনীয় ঐতিহ্য হিসেবে পরিগণিত হত।

স্বাধীনতার পর লক্ষীকোল রাজবাড়ির ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে ‘রাজবাড়ি’ একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রটি কয়েকবার টিভি পর্দায় দেখান হয়েছে। রাজার বাড়ির ধবংসাবশেষ বলতে বর্তমানে কিছুই নেই। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটবৃক্ষ। শান বাঁধানো পুকুরট ভরাট হলেও পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। প্রতি বছর এখানে নববর্ষের আগমনে বৈশাখী মেলা বসে। তবে ১৮৮৮ সালে তাঁর হাতে গড়া রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত আর.এস.কে ইনস্টিটিউশন তাঁর স্মৃতি বহন করছে। রাজা সূর্যকুমার আমোদপ্রবণ ও রসিক প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সময়েই লক্ষীকোল মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরণত হয়। রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠান হত। বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর। রাজার বাড়ির অন্দর মহলের আনন্দ উচ্ছাস বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথের কথায়-----‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান, বাজনা, আমোদ প্রমোদ-----মদ পর্যন্ত চলত। রাজা মদ খাইতেন কোনো কোনো দিন নামমাত্র-ইয়ার বন্ধুদের যোগাইতেন প্রচুর। বড় মা (বড় রানী) আমাকে একদিন বলিলেন তুমি নায়েব মশাইকে বল চাকর গিয়া টাকা চাহিলেও যেন না দেন। বলিবে আমার হুকুম। আমি বলিলাম, কিন্তু রাজা যদি আমাকে ঘাড় ধরিয়া বাহির করিয়া দেন তখন? বটে! তাহা আমি বুঝিব, তুমি যাও। আমি তাহার আদেশ পালন করিলাম। রাজা আমাদের ষড়যন্ত্র টের পাইলেন। তবে আমাকে কিছু বলিলেন না। বরং তখন হইতে আমাকে অধিকতর স্নেহ করিতে লাগিলেন। তার কিছু দিন পর অনুমান ১৮৯১ নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ‘তো উঠিয়া গেলই বাদ্যযন্ত্র সব, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধুবান্ধদিগের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন, বলিলেন-----এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে----তার লেখাপড়া কিছু হইবে না।’ (আমার স্মৃতিকথা-৯ পৃষ্ঠা)। পারিবারিক স্নেহ মমতায় আবিষ্ট রাজা ছিলেন অত্যন্ত কৌতুক প্রিয় এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের দেশে এখনো নতুন ঘর বা পাকা বাড়ি নির্মাণের সময় প্রথমত দুই চার কোপ মাটি কেটে মোনাজাত করা হয়। অনেক সময় গর্তের মধ্যে টাকা পয়সা ফেলা হয়। তখনকার দিনে গর্তমধ্যে সোনা, রুপা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজা আর,এস,কে স্কুলের মূল বিল্ডিংটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে সোনা আনা হয়েছিল কিন্তু রুপা আনা হয় নাই। ত্রৈলোক্যনাথের পকেটে দুই আনার রুপার মুদ্রা ছিল। তিনি তা গর্তমধ্যে ফেললে রাজা হেসে বললেন, ‘বেশ হইল, এই স্কুল বিল্ডিং এর দুই আনা যত্ন হইল তোমার।’  আমি বলিলাম এ হাতি পোষা রাজরাজাদেরই খাটে----গরীব স্কুল মাস্টারের কাজ নয় (স্মৃতিকথা-২১)।


আর একদিনের কথা, স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য রাজা ঢাকা থেকে গ্রীনবোট এনে বেলগাছি নিয়ে পদ্মা নদীতে অবস্থান করছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথের কথায়----‘আমি গিয়া বোটে উঠিলাম। রাজা তখন নৌকায় বসিয়া ছিপ দিয়া মাছ ধরিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়াই বলিলেন, কী হে, ব্যাপার কী? ঠিক ঐ সময়ে ভারী ওজনের একটি কাতলা মাছ লাফ দিয়া নৌকা গর্ভে পড়িল। তিনি আনন্দিত হইয়া বলিলেন----‘তুমি তো আচ্ছা মৎস্যরাশির মানুষ? আমি এক ঘন্টা বসিয়া আছি একটি মাছেও টোপ গিলছে না, আর তুমি আসা মাত্র তোমাকে দেখিতে আসিল। (পৃষ্ঠা-১৭)।

ত্রৈলোক্যনাথ গ্রীনবোটে রাজার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন একটি বিষয়ে পরামর্শ করতে। ফরিদপুরের সেটেলমেন্ট অফিসার জ্যাক সাহেব (আইসিএস) গ্রাজুয়েটদের মধ্য থেকে কানুনগো নিয়োগ করছেন। যারা এখন ঢুকবে তারা কানুগো কাজ শেষ হইলে সাব ডেপুটির কাজ পাবে। ত্রৈলোক্যনাথ জ্যাক সাহেবের সাথে দেখা করে চাকরিত যোগদানের জন্য সাতদিনের সময় নিয়ে এসেছেন। এখন রাজার অনুমতি পেলে যোগদান করবেন। ত্রৈলোক্যনাথের সব কথা শুনে রাজা বললেন, ‘বেশ তো স্কুল ঘরে তালা লাগাইয়া যাও। আমি স্কুল করিয়াছিলাম যখন রাজবাড়ির চর্তুদিকে ২০ মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না। একমাত্র ফরিদপুর জেলা স্কুল ছাড়া রাজবাড়িতে মাত্র ঈশ্বর পণ্ডিতের ছাত্রবৃত্তি স্কুল ছিল। তাহাও ভালোরুপ চলিত না। আমি স্কুল করিবার ৫ বছর পর বাণীবহের বাবুরা স্কুল করিলেন (গোয়ালন্দ হাইস্কুল)। তখান আর আমার স্কুল রাখিবার কী প্রয়োজন ছিল? একমাত্র তোমার জন্যই স্কুল রাখিয়াছিলাম। তুমি ডাকঘরে চাকরি পাইলে তাতে মন বসিল না। আসিলে রাজবাড়ি স্কুলে-২৫০ টাকা ছাড়িয়া ৫০টাকায় এখন চাও মেঠো আমিনী করিতে। জ্যাক সাহেবের বাচ্চা ----জল কাদা ভাঙ্গিয়া, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করিয়া বুট পায়ে ছুটবে মাঠে ঘাটে। তোমাকেও দৌড়াইতে হইবে। তোমাকেও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াইতে হইবে। পারিবে তাল সামলাইতে?’ (পৃ-১৭১৮)। এরপর ত্রৈলোক্যনাথ স্কুল ছেড়ে যাননি। সুদীর্ঘ ৪২ বছর উক্ত বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

রাজা বিদ্যান ছিলেন না কিন্তু বিদ্যার প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। গোয়ালন্দ মহকুমার গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি পদ্মার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হলে রাজবাড়ি উঠে আসে এবং তৎকালীন ডিপিআইসিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে রাজা সূর্যকুমার এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে (বর্তমান এসপি ও সিভিল সার্জন এর বাসা যে স্থানে ঐ স্থানটিতে সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতল ছিল। পরে তা সিভিল সার্জনের অফিস ছিল)। স্থানান্তর করা হয়। কোনো কারণে বিদ্যালয়টি পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় রাজা ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনটি (R.s.k) প্রতিষ্ঠা করেন। কেবল রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এস কে ইনস্টিটিউশনর প্রতিষ্ঠাতাই নন, নিজ গৃহে গড়ে তোলেন লাইব্রেরি। রাজার মৃত্যুর পর শ্যালক মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করতেন। তিনি কিছুটা অপ্রকৃতস্থ ছিলেন। লাইব্রেরি বিষয়ে ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন---‘একদিন শুনিলাম মতিলাল রাজার লাইব্রেরিটি রাজবাড়ি উডহেড লাইব্রেরিকে দান করিয়া বসিয়াছেন। ----আলমারী বুককেসসহ এবং এসডিও আর এস দাসকে কথা পর্যন্ত দিয়া ফেলিয়াছেন। আমি সারা থেকে (ত্রৈলোক্যনাথ ১৯১৯ হইতে ১৯২৪ পর্যন্ত সারা স্কুলে ছিলেন) ছুটিয়া আসিয়া এসডিও’র সঙ্গে দেখা করিয়া বললেন, ঐ লাইব্রেরিটি রানীদের ----তাহারা বহু টাকা ব্যয় করিয়াছেন উহার পিছনে। তাহারা এখনো জীবিত। তাছাড়া আমরা স্টেটের  একজিকিউটর মাত্র। স্টেটের বা অন্যের সম্পত্তি দান করিবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আপনি কিছু মনে করিবেন না।’ অতঃপর মতিকে বললেন, ‘একি তোমার পৈত্রিক সম্পত্তি যে দান করিয়া বসেছিলে।’ (পৃষ্ঠা-৮০)? এর পর মতিলাল ঘোষ দস্তিদার কাবিলপুর পরগনা পরিদর্শন করতে যেয়ে ‘জগন্নথ’ বেশ ধারণ করেন। প্রকৃতপক্ষে তার মুস্তস্ক বিকৃতি ঘটে(১৯২২)। পূর্বেই বলা হয়েছে রাজা ভুবেনশ্বরে একখানি বাড়ি এবং ভূ-সম্পত্তি করেন। রানীদের নিয়ে রাজা শেষজীবন ভূবেনশ্বরেই কাটান। অনুমান ১৯১২ সালে রাজা ভূবেনশ্বরে দেহত্যাগ করেন। সেখানেই রাজার শ্রদ্ধাদি এবং পারলৌকিক কার্যাদি সম্পন্ন হয়। রাজার শ্রদ্ধাতে এক হাজার ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হন। পাণ্ডাদের সাহায্যে এবং নিমন্ত্রিত অতিথেদের ভোজন ও দক্ষিণা দ্বারা আপ্যায়িথ ও পরিতুষ্ট করা হয়। পূর্ব হইতেই রাজাকে যেখানে দাহ করা হয় সেখানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প ছিল এবং যথাসময়ে রাজার প্রথম পক্ষের শ্যালক এবং দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কীয় শ্যালক অম্বিকাচরণ মজুমদার (ফরিদপুর) এবং ত্রৈলোক্যনাথ এর সহযোগিতায় শিবমন্দির নির্মাণ করা হয়।


শিবমন্দির নির্মাণ করতে অনেক টাকা কড়ি খরচ হয় যা রাজবাড়ির জমিদারী থেকে লওয়া হয়। মৃত্যুর পূর্বে রাজা উইল রেখে যান। উক্ত উইলে রাজার দুই রানী, শ্যালক মতিলাল ঘোষ এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথকে এস্টেটের একজিকিউটর নিযুক্ত করেছেন। উইলে আরো একটি শর্ত ছিল রাজার জীবনান্তে মতিলাল ও তার স্ত্রী পুত্রগণ (সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ) মাসোহারা পাইবেন। কুমারের (সৌরিন্দ্র) তখন সাবালক হওয়ার এক বছর বাকি ছিল। এরমধ্যে মতিলাল জমিদারী দেখাশোনা করলেও তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। ত্রৈলোক্যনাথ তখন ফরিদপুরের ডিএস-জেএ উডহেড (আইসিএস) এবং উকিল অম্বিকাচরণ মজুমদারের সাথে আলাপ করে সৌরেন্দ্র মোহনের হাতে স্টেটের ভার বুঝিয়া দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

এতে ডিএস সম্মত হন। সৌরেন্দ্র মোহনকে স্টেটের ভার বুঝিয়ে দিওয়া হয়। এদিকে অপ্রকৃতস্থ মতিলালকে একরকম জোর করে বরিশালে নেওয়া হয়। সে খুব কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকে। অপ্রকৃতস্থ হলেও মতিলাল রাজবাড়ি এসে উকিলের সাহয্যে উইলের শর্ত ধরে কুমারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ত্রৈলোক্যনাথ মামলা তুলে নেওয়ার ব্যাবস্থা করেন। সৌরিন্দ্র মোহন এস্টেটের মালিক হয়ে জমিদারী পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেসমিন চৌধুরী পিএইচডি এর লক্ষে, ‘রাজা সুর্যকুমার ও সমকালীন মুসলমানদের আর্থ সামাজিক অবস্থা’ অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনায় কর্মরত আছে।

নড়াইল জমিদার ও রাজবাড়ি

যশোর জেলার অন্তর্গত নড়াইলের রায় উপাধিযুক্ত কায়স্থ জমিদারগণ বিশেষ বিখ্যাত। রানী ভবানীর সময়েই এই কালিশংকরের মাধ্যমে এ জমিদারী উদ্ভব ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ বংশের রামরতন বা স্বনামধন্য রতন বাবু সমধিক বিখ্যাত। তাঁর সময়ে বেলগাছি পরগনা তার জমিদারী ভুক্ত হয়। পাংশার ও বালিয়াকান্দির অধিকাংশ অঞ্চল রামরতনের নামে পত্তন দেখা যায়। কালুখালির রতনদিয়া নামটি তার নামে বলে জানা যায়। পাংশা উপজেলার ইতিহাসে দেখা যায় নড়াইলের জমিদার একসময় দাপটের সাথে পাংশাকে শাসন করেছেন। বর্তমানে যেখানে পাংশা গার্লস হাই স্কুল সেখানেই ছিল নড়াইল স্টেটের কাচারী। ১৮০০ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত জমিদারী টিকে থাকে। এক সময় এই কাছারীর সম্মুখ দিয়ে কোনো লোক জুতা পায়ে কিম্বা সাইকেলে চড়ে যেতে পারত না। এমন কি ফুলবাবুরা পর্যন্ত বা পালকি চড়ে যেত না। সে সময় নীলের চাষ হত। জমিদারগণ নীলকুঠি ক্রয় করে লাভবান হতেন। তিনি পাংশা জালিপাড়া দুর্গাপুর, মৃগী প্রভৃতি অঞ্চলের নীলকুঠি ক্রয় করেন। পরবর্তিতে তার জমিদারী বেলগাছি চৌধুরীদের জমিদারীভুক্ত হয়।

ভৈরবনাথ রায়

১৭৯৯ সালে ভূষণার জমিদারী খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হতে থাকে। ঐ নিলামে ভৈরবনাথ ১৬৯৩৭ টাকায় ধার্যকৃত রাজস্বে ২৫-২-১৭৯৯ সালে নসিবশাহী পরগনা ক্রয় করেন। একই সময়ে তিনি নলদী পরগানাও ক্রয় করেন। এদিকে পাংশায় ভৈরবচন্দ্র মজুমদার নামে এক পরাক্রমশালী জমিদারের বাড়ির স্মৃতিচিহ্নসহ অনেক কাহিনী ও তথ্য জানা যায়। পাংশা উপজেলার ইতিহাস লেখক মুহম্মদ সবুরউদ্দিন তার সম্বন্ধে তথ্যপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন কিন্তু তার সময়কালটি সঠিকভাবে নির্ণয় করেননি। তিনি লিখেছেন-----‘ভৈরবচন্দ্র মজুমদার পাংশার জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। ধারণা করা যায় ১৭৯০ থেকে ১৮০০শতকের কোনো এক সময়ে তিনি অবস্থা সম্পন্ন ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ভৈরব বাবু খুব সুচতুর উচ্চভিলাশী অত্যাচারী জমিদার ছিলেন বলে শোনা যায়। পিয়ারী সেন নামে তার এক শক্তিমান পুরুষ জমিদার বাড়ির লাঠিয়ালবাহিনীর সর্দার ছিলেন। ভৈরব বাবুর বাড়ির পাশেই ছিল মালু ভাগ্রবানের বাস। ভাগ্যবান কিংবদন্তির এক মহানায়ক।


পল্লী কবি আনোয়ারুল ইসলাম সাহেবের একটি পুস্তিকায় ‍উল্লেখ আছে মালু ভাগ্যবান একদিন তার আত্মীয়-পরিজনসহ নিজ বাড়ির পাশেই দিঘিতে স্বেচ্ছায় সলীল সমাধি রচনা করেন। বৃটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত মনোবঞ্চা পুরনের জন্য প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার নরনারী আসত মালু ভাগ্যবানের পুকুরে অবগাহন করত।’ এ দৃশ্য আমি নিজেও দেখেছি।

 ‘ভৈরব কেবল অত্যাচারী জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা এবং সাহিত্যানুরাগী। সাহিত্যচর্চার জন্য তিনি পারিবারিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নীলকরের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ গড়ে তোলেন। ক্ষুদ্ধ হয়ে টিআই কেনী তার ট্রেজারী লুট করেন। পাবনার আদালতে কেনীর বিরুদ্ধে ট্রেজারী লুটের মামলায় ভৈরব বাবু জয়লাভ করেন।’ এই ভৈরব চন্দ্র মজুমদার ভৈরব নাথ যিনি নাটোর রাজবংশের নীলামকৃত জমিদারী ক্রয় করেন।

বেলগাছি এস্টেট

তৎকালীন নসিবশাহী, নসরতশাহী, মহিমশাহী পরগনার পাশাপাশি ছিল বেলগাছি পরগনা। এ পরগনার মালিক ফয়েজবক্স। রাজনীতি, সমাজ উন্নয়ন সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ পরিবারটি বিখ্যাত। ফয়েজবক্সের ভ্রাতা করিমবক্স অতি সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সেতার ও বাঁশি বাদক। করিমবক্স, ফয়েজবক্স বেলগাছি এস্টেট মালিকানায় অত্র অঞ্চলের সম্মান প্রতিপত্তির অধিকারী হন। সমাজ হিতৈষী কাজে তারা নিয়োজিত থাকতেন।

বেলগাছি এস্টেটের কৃতিপুরুষ ফয়েজবক্সের ছেলে খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী তৎকালীন ফরিদপুর জেলার তৃতীয় গ্রাজুয়েট এবং বৃটিশ ভারতে অন্যতম রাজনীতিক ছিলেন। অত্র অঞ্চলের মুসলিম জাগরণে মৌলভী তমিজউদ্দিন খান, খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী, তার ভ্রাতা ইউসুফ হোসেন চৌধুরী, আহম্মদ আলী মৃধা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। এদের মধ্যে আলীমুজ্জামান চৌধুরী বিশেষ ব্যক্তিত্ব। ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন হয়, যে সম্মেলনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয়। এ সম্মেলনে যোগদানকারীদের অন্যতম ছিলেন খান বাহাদুর আলীমুজ্জামন চৌধুরী। মুসলমানরা সমাজে ছিল পশ্চাৎপদ। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি প্রতিপত্তি সর্বত্রই হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। অত্র অঞ্চলের মুসলিম জাগরণে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। হাড়োয়া জমিদার পরিবারটি প্রতাবশালী হলেও তাদের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ। তারা বসবাস করতেন অতি সাধারণ ছনের গৃহে। কিন্তু ব্যক্তিত্বে তারা অনড়, আপোষহীন। আলীমুজ্জামান চৌধুরী নবাব পরিবারে বিবাহ করেন কিন্তু চৌধুরী বাড়ি ছনের গৃহ হওয়ায় স্ত্রী উম্মা প্রকাশ করেন। এতে অতি ব্যক্তিত্ববান আলীমুজ্জামান চৌধুরী বিবাহের পরপরই ফিরে আসেন আর শ্বশুড় বাড়িতে যাননি। তার ভাইয়ের নাতি রনজু চৌধুরীর নিকট থেকে জানা যায় জীবনের শেষ মুহুর্তে স্ত্রীর সাথে দেখা হয়। অনমনীয় ব্যক্তিত্ববান চৌধুরী আলীমুজ্জামান শুধুই মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সমাজহিতৈষী, প্রজাপরায়ণ, সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য খান বাহাদুর উপাধিপ্রাপ্ত হন। ফরিদপুর জেলা বোর্ড গঠিত হলে প্রথম চেয়ারম্যান হন রাজবাড়ির মাজবাড়ির খান বাহাদুর নাদের হোসেন। অতপর খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান ১৯২৩ থেকে ১৯৩৫ পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ফরিদপুরে তার নামে আলীমুজ্জামান হল, আলীমু্জ্জামান ব্রিজ বিদ্যামান। জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি রাজবাড়ি জেলায় রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয় নির্মাণ করেন। তিনি বেলগাছি থেকে ফেরিফান্ড রাস্তা সংযোগ করে প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করেন। বৃটিশ সরকার তাতে সিআইই (Companion of Indian Emperior) আপোসহীন প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী আলীমুজ্জামান রাজবাড়ির মানুষের নিকট আজও স্মরণীয়। খান বাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরী আলীমুজ্জামান চৌধুরীর ভ্রাতা। তিনি বৃটিশ ভারতে মুসলিম লীগের অন্যতম রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি এমএনএ নির্বাচিত হন। তার জেষ্ঠপুত্র রশীদ চৌধুরী দেশের অন্যতম চিত্রশিল্পী।

পদমদি নবাব এস্টেট : ষোড়শ শতক থেকে পদমদি জমিদার এস্টেটের উত্থান। এ শতকের প্রথমে সুদূর বোগদাদ থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তাপস প্রবর সাহ পাহলোয়ান এর আগমন ঘটে। তিনি পদমদির অদুরে চন্দনা নদীর তীরে নিভৃত পল্লী সেকাড়ায় আস্তানা গড়ে তোলেন। তাঁর অব্যবহিত পর এখানে বোগদাদ থেকে পিতৃ সন্ধানে আগমন করেন সাহ সাদুল্লা।


সাহ পাহলোয়ান তাঁকে পিতৃবৎ স্নেহে আশ্রয় দান করেন এবং নিজ কন্যার সাথে বিবাহ দেন। সাহ সাদুল্লার বংশধর, কালে পদমদি বসতি স্থাপন করেন। সাহ সাদুল্লার পৌত্র সাহ সৈয়দ মীর কুতুবুল্লা। কার্যের পারদর্শীতা অনুসারে রাজদত্ত উপাধি মীর এবং বংশ মর্যাদা ও বংশ পরিচয়ের উপাধি সৈয়দ। তাঁরা বংশ পরস্পরায় মীর উপাধিতে পরিচিত। সৈয়দ তাঁদের বংশের উপাধি। মীর কুতুবুল্লার দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ সৈয়দ মীর ওমরদ্বারাজ, কনিষ্ঠ সৈয়দ মীর আলী আকবর। পদমদিকে আশ্রয় করে দুই পুত্রের বংশধর ঘটনাস্রোতে জমিদারী, চাকরি, ব্যবসা, সাহিত্য চর্চায় যে পারিবারিক ইতিহাস ঐতিহ্য সৃষ্টি করেন তা আজ ‘ঐতিহ্যবাহী পদমদি’ বলে সারাদেশে বিখ্যাত। এ গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়ে পদমদি এস্টেট ও মীর মশাররফ হোসেন অনুষঙ্গে বিশদ আলোচনা আছে।

বহরপুর জমিদার মহিম চন্দ্র সাহা

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে রাজবাড়িতে যে সমস্ত জমিদার বংশের উত্থান ঘটে তাদের মধ্যে বহরপুর জমিদার মহিমচন্দ্র সাহা অন্যতম ও স্মরণীয় জমিদার। তাঁর ভ্রাতা আদ্যনাথ সাহা ও তারাচাঁদ সাহা জমিদারীর অংশীভূত ছিলেন। বহরপুর বাজারের অনতিদূরে (পশ্চিমে) প্রাচীন কারুকার্যখচিত ১৫০ ফুট দৈঘ্য ও ৪২ ফুট প্রশস্ত ২ তলা দক্ষিণমুখী প্রাসাদ তার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। প্রায় তিনি একর জমিদর উপর ৬০ ফুট প্রশস্ত আরো পাঁচটি প্রাচীন দালান, প্রকাণ্ড পুকুর, বাগানসহ জমিদার বাড়িটি প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন। পূর্ব ও পশ্চিম পাশে শৈল্পিক নিদর্শন সম্বলিত দুটি মন্দির। এর চিত্রকর্ম, কারুকাজ, নক্সা দৃষ্টিনন্দন। মন্দিরের দেয়ালে আছে দেবী দুর্গার ভাস্কর্য। দেয়ালে কারুকাজখচিত নক্সা। প্রায় পৌনে দু’শ বছরের পুরাতন এসব প্রাসাদের কারুকাজ সেকালের এ অঞ্চলের শিল্পীদের শিল্পনৈণ্যের ঐতিহ্য স্মরণে আনে।

মহিমচন্দ্র সাহার মূল জমিদার অত্র অঞ্চল বিশেষ করে নসিবশাহী ও মহিমশাহী পরগনার মালিক রানী হর্ষমূখী। মহিমচন্দ্র হর্ষমূখীল ছেলে অরুন সিংহ এর থেকে জমিদারীপাপ্ত হন। মহিম সাহের জমিদারীর বিস্তৃতি ছিল রাধাগঞ্জের বিলসহ ১৬টি গ্রাম। এছাড়া মহিমচন্দ্রের ছিল পাশ্ববর্তী ১৬টি মোকামে বিশাল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। মোকামসমূহের স্থান ছিল বহরপুর, দিনাজপুর, খোকসা, কালুখালি। একমাত্র খোকসা মোকামে চার থেকে পাঁচশত ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গার কাজ চলত।

জমিদার মহিম সাহেব জমিদারী লাভ এক মজার কাহিনী। রানী হর্ষমূখী বালিয়াকান্দি এলাকায় প্রাচীন ও মূল জমিদার। রাজা ও রানী পরিবারসহ কলিকাতায় থাকতেন। অত্র এলাকার অন্যান্য জমিদার তার অধীন জমিদার ছিলেন(পুরান পরচায় রানী হর্ষমূখীর নাম পাওয়া যায়)। রানীর নায়েব একবার জমিদারের খাজনা পরিশোধ করতে বিপাকে পড়েন। অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না। অথচ সময় মতো অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে চাকরি যাবে। নায়েব ব্যবসায়ী মহিমের নিকট থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার নেন। একথা জানাজানি হলে রানীর পুত্র অরুণ সিংহ ব্যবসায়ী মহিমের বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে ১৬টি গ্রাম ও রাধাগঞ্জের জমিদারী মহিমকে প্রদান করেন। জমিদার মহিম সাহা জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করে গেছেন। মহিম সাহা তাঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের সহযোগিতায় বহরপুরের হাট, বাজার, স্কুল, মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি গরিব প্রজাদের প্রতি সদয় আচরণ করতেন। এ বাড়িতে আগমন ঘটেছে অনেক খ্যাতনামা মানুষের। মহিম সাহার ছেলে অ্যডভোকেট যোগেন্দ্রনাথ সাহা ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের নেতা। সুভাষ বসু, শ্যামা প্রসাদের মতো নেতাও এ বাড়িতে আগমন করেছেন। এছাড়া সনাতন ধর্মের বিশিষ্ঠ আধ্যত্মিক ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী (এম এ ডবল), ডিলিট এ বাড়িতে পা রেখেছেন। আর এক সাধক স্বামী সমাধি প্রকাশরণ্য এখানে এসেছেন। মহিমচন্দ্র সাহার পৌত্র নারায়ণচন্দ্র সাহা বহরপুর ইউপি’র প্রেসিডেন্ট ও স্বনামধন্য ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট গৌরচন্দ্র বালা এখানে আগমন করেন। এক সময় এ বাড়ির নাট্যমঞ্চে নাটক, যাত্রা, পালাগান, জলসা জমে উঠত। আগমন ঘটত কলিকাতা থেকে নামী দামী শিল্পীর। পূজা, পার্বণ, আহ্নিকে তা ছিল সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র। মহিম সাহার পুত্র রাধারমণ। রাধারমণ সাহার পুত্র নারায়ণ চন্দ্র সাহা। নারায়ণচন্দ্র সাহার পুত্র প্রাণকৃষ্ণ সাহা ও জীবনকৃষ্ণ সাহা। প্রাণকৃষ্ণ সাহা (বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি জেলা স্কুলের শিক্ষক) তিনি ও ভ্রাতা বাড়িটির মালিকানা স্বত্ত্বে বসবাস করছেন। অক্ষত ও সুরম্য প্রাসাদসমূহের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সচেষ্ট আছেন।


রুপিয়াট জমিদার পরিবার

বৃটিশ শাসনামলের পূর্ব থেকেই জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হতে থাকে। এ সমস্ত জমিদার ‍বৃটিশ শাসনামলে অর্থ প্রতিপত্তির দ্বারা সামাজিক বলয় সৃষ্টিরমাধ্যমে সামান্ত শ্রেণি হিসেবে আত্ময়প্রকাশ করে। তবে তাদের মধ্যেও অনেক জমিদার পরিবার শিক্ষাদীক্ষায় মানবিক বোধের উন্মেষ ঘটিয়ে ঐতিহ্যবাহ জমিদার পরিবার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। রাজা সূর্যকুমার, বাণীবহের জমিদার পরিবার মুকুন্দিয়ার জমিদার দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাংশার জমিদার ভৈরব সাহ পরিবারের ঐতিহ্য সবার জানা।

এমন আর একটি পরিবার রুপিয়াট জমিদার পরিবার। এ পরিবারটি অত্র অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে খ্যাত। এ পরিবারের শশীভূষণ দত্ত রাজবাড়ির প্রথম এমএ বার এট ল। এ পরিবারে প্রতুল চন্দ্র দত্ত কাজী নজরুল ইসলামের অতি ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম একবার রুপিয়াট জমিদার বাড়িতে আতিথিয়তা গ্রহণ করেন। তখন কলিকাতা থেকে ‘নাচঘর’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। প্রতুল চন্দ্র ‘নাচঘর’ এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ‘নাচঘর’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে কলিকাতায় প্রতুল চন্দ্রের নিজস্ব বাড়িতে সাহিত্য আসর বসত। কবি সেখানে বসে অনেক গান রচনা করতেন। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সদ্য প্রকাশিত প্রায় সবগুলি কাব্যগ্রন্থে নিজহাতে বন্ধুপত্মীর (প্রতুল চন্দ্রের স্ত্রী) নাম লিখে তাঁকে উপহার দিতেন। (বাণীবহের জমিদার গ্রাম বাণীবহ অংশে আলোচিত)

অন্যান্য জমিদার

ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভকালে কর বা খাজনা সংগ্রহে ইংরেজগণ সূর্যস্ত আইন প্রবর্তন করেন। এক্ষেত্রে জমিদারকে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিশেষ দিনে খাজনা পরিশোধ করে নতুন করে জমি পত্তন নিতে হন। ব্যর্থ হলে ইংরেজরা তা অন্য ইজারাদারদের দিত। লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৭৩) পর এই প্রথার বিলোপ ঘটে। এখন থেকে জমিদার নির্দিষ্ট শর্তে চিরস্থায়ীভাবে জমির মালিক হতে পারতেন। বলা যায় এ সময় থেকে নতুন আঙ্গিকে জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। প্রজারা জমিদারের খাজনা প্রদান করে নির্দিষ্ট সময়ে ভূমি ব্যাবহার করতে পারতেন। রায়ত বা প্রজা এবং সরকারের মধ্যে জমিদার ছিল মধ্যবর্তী শ্রেণি। অর্থনীতির বিশ্লেষণে সমাজ বিন্যাসে এরা সামান্ত শ্রেণি। ১৭৯৩ থেকে ১৯৫০ সালে প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন পর্যন্ত দেশে এই সামন্ত শাসকদের ইতিহাস বাংলার ইতিহাসে বিশেষ একটি অধ্যায়। সমাজশাসন উন্নয়ন, ভোগ দখলে সামন্তরা একচেটিয়া প্রভাব বলয়ের মালিক। সামান্তগণ ইংরেজদের পদলোহী, ক্ষেত্র বিশেষে খেতাবপ্রাপ্ত রাজা, নবাব। তবে সবাই তৃণমূল উৎপাদক কৃষকের পরগাছা। সমাজ সংসারে তাদেরই নাম, জয়গান। বৃটিশ পূর্ব জমিদার, জোতদার, পরগনা মালিক গতটা কার্যক্ষেত্র স্বাধীন বৃটিশ শাসনামলে ততটাই পরাধীন। আজকের বাজার অর্থনীতিতে পুঁজিপতিরা যেমন পুঁজি বিকাশের দ্বারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কর্মহীন বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে কল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে স্থান করে নিচ্ছেন এমন সুবিধা তখন ছিল না। তা সত্ত্বেও তৎকালীন জমিদারগণ রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং দান দয়ার দ্বারা সমাজের কল্যাণকর্তা হিসাবে অনেকে সুনাম অর্জন করেন। রাজবাড়িতে ১৭৯৩ থেকে ১৯৪৭ এরমধ্যে প্রায় দেড়শত বৎসর যে সমস্ত জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয় তাদের মধ্যে রাজবাড়ির রাজা সূর্যকুমার, বাণীবহের গিরিজা শংকর, পদমদির নবাব মীর মোহাম্মদ আলী, বেলগাছির ফয়েজ বক্সা, করিম বক্স, বালিয়াকান্দির রানীহর্ষমুখী, মুকুন্দিয়ার দ্বারকানাথ ঠাকুর, নলিয়ার সুরেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্য, পাংশার রতন বাবু, ভৈরব বাবু, শিলাইদহের দ্বারকানাথ ঠাকুর, তেওতার জমিদার শ্যামশংকর, জয়শংকর উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য রাজবাড়ির কিছু অংশ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ও তেওতার রাজার জমিদারভুক্ত ছিল। 

চানকুঠি মুর্শিদাবাদ

রাজবাড়ির রেলষ্টেশনের পশ্চিমে ড্রাই-আইস উৎপাদন ফ্যাক্টরির স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এই ফ্যাক্টরিতে প্রকৌশলী হিসেবে ১৯৫৮ সাল থেকে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত নিরলস কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর (ইঞ্জিনিয়ারিং কোর) জনাব সাইদ উদ্দিন খান। সাধারণ্যে এসইউ খান বলে পরিচিত ছিলেন।


রাজবাড়ি কলেজ গেটে একটি ফলক রয়েছে তাতে লেখা রয়েছে এসইউ খান। তিনি কলেজ অফিস গেটের নমুনা তৈরী করেন। রাজবাড়ি জেলা প্রশাসকের বাসা সংলগ্ন চিলড্রেন পার্কের নমুনাও তিনি তৈরি করেন। সাইদ উদ্দিন খানের পূর্বপুরুষ নবাব সিরাজউদদৌলা পরিবারের রক্তের সম্পর্কে আবদ্ধ।

সাইদ উদ্দিন খানের ছেলে মোঃ জিন্নাহ খানের (আম বাবু) নিকট থেকে জানা যায় মুর্শিদাবাদের নবাব বাড়ির পার্শ্বস্থ চানকুঠি তাদের পূর্বপুরুষের বসতবাটি। সেখানে এখনো তাদের আত্মীয়স্বজন বসবাস করেন। নবাব সিরাজউদদৌলার শাসনকাল খুবই স্বল্প সময় স্থায়ী হয়। তার শাসনকালে বাংলার ইতিহাস যখন কালো মেঘের ঘনঘটায় আচ্ছন্ন, এ সময়কালেই সাঈদ উদ্দিন খানের পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহীতে চলে আসেন। তাদের বংশধর জসিম উদ্দিন খানের চার ছেলে। তাদের মধ্যে সাঈদ উদ্দিন কান বৃটিশ শাসনামলে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৫৮ সালে মেজর থাকাকালীন চাকরিতে অবসর নেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রাজবাড়িতে পরিত্যাক্ত ড্রাই-আইস উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে তাঁকে নিয়োগ করেন। সাইদ উদ্দিন খানের ছেলে মোঃ জিন্নাহ খান (আম বাবু) রাজবাড়ির সজ্জনকান্দায় স্বায়ীভাবে মা, বোন পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। মোঃ জিন্নাহ খান দ্বাদশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মোঃ জিন্নাহ খানের বাড়িতে নবাব পরিবারের ব্যবহৃত বহু জিনিসের স্মৃতি চিহ্ন এখনো বিদ্যামান। নবাবদের ব্যবহৃত ফল পরিবেশনের বর্তন, চানকুঠির ব্যবহৃত ব্যাংকের পাস বই স্বযত্নে সংরক্ষিত আছে। জিন্নাহ খান (আম বাবু) পরলোকগমন করেছেন। 

Additional information