জেলা গঠনের ইতিহাস

জেলা গঠনের ইতিহাস ও প্রাচীন কয়েকটি গ্রাম

প্রশাসনের শুরুটা হয়েছিল রাজার শাসন ও রাজস্ব আদায়ের মধ্য দিয়ে । ধারাটি বর্তমানেও বহাল আছে। তবে প্রশাসন ও রাজস্ব আদায়ের কর্মকৌশল ভিন্ন। বর্তমানে রাজস্ব প্রাপ্তির নানা খাত ব্যবহহৃত হলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের একমাত্র খাত ছিল উৎপাদনশীল ভূমি। ভূমিনির্ভর রাজস্ব আদায়ে তাদের সামান্তশাসক বা সামন্তরাজা বলে আখ্যায়িত করা হয়। সে সময়ে গ্রামীণ জীবনে কিছু নগরও গড়ে উঠেছিল। গ্রামগুলো গ্রাম প্রধান, পঞ্চায়েত বা গ্রাম পরিষদ দ্বারা শাসিত হত। আর নগর শাসিত হত নগরপাল দ্বারা। এ ছাড়া সমগ্র রাজ্যকে আবার ভুক্তি বিষয়, বিথী, মণ্ডল, তালক ইত্যাদি ভাগ করে মূল রাজার অধীনে সামন্ত রাজা দ্বারা শাসন করা হত। ৭ম শতকের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে দ্রোণমুখ, সর্বতিবন সংগ্রহণ ইত্যাদি বিভক্তির নাম পাওয়া যায়।

ত্রয়োদশ শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত সুলতান মোগল, পাঠান, নবাব শাসনকালে ইকলিম, আরসা, চাকলা, সুবা, পরগনা, মৌজা ইত্যাদি প্রশাসনিক ইউনিটের বিভক্তি ছিল। মৌজা ছিল ইউনিটের ষেশ স্তর। তখন সমগ্র সম্রাজ্য কয়েকটি সুবায় (প্রদেশ) বিভক্ত হত। সুবা-চাকলায় এবং চাকলা বিভক্ত হত পরগনায়। অনেকগুলো মৌজা বা গ্রাম নিয়ে গঠন করা হত পরগনা। রাজস্ব আদায় হত পরগনাভিত্তিক। চাকলা ছিল রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র। জমিদার ও স্থানীয় রাজাদের সাহয্যে রাজস্ব আদায় হত। রাজস্ব আদায়, ভূমি জরিপ ও প্রশাসন সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত থাকতেন একজন কানুনগো। শাসন কার্য ও বিচারকার্য পরিচালিত হত ফৌজদার, মুন্সেফ ও কাজির দ্বারা। বেশির ভাগ পরগনার প্রধান থাকতেন মুন্সেফ। পরগনার প্রধান হিসেবে রাজস্ব নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। গ্রামের প্রশাসন গড়ে উঠেছিল গ্রাম রক্ষক, হিসেবে রক্ষক ও পাটোয়ারী দ্বারা। পাঠান সুলতান শের শাহ প্রথম ভারতের ভূমি জরিপ করেন যার মধ্যে বাংলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি কবলিয়ত ও পাট্রার মাধ্যমে প্রজার ভূমিস্বত্ব প্রদান করেন। সম্রাট আকবরের সময়ে রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল রাজস্ব ও প্রমাসন ব্যাবস্থাপনার পুনর্গঠন করে ৩৩টি সরকার বা রাজস্ব আদায় বিভাগে বিভক্ত করেন। রাজস্ব আদায় বিভাগ বিভক্ত হয় পরগানায়। রাজবাড়ি এ সময় মাহমুদাবাদ সরকারে অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং রাজবাড়ি জেলার বিভিন্ন অংশ নসিবশাহী, মহিমশাহী, নশরৎশাহী, কাসিম নগর, বিরাহিমপুর পরগনার অন্তর্ভুক্ত হয় (বৃটিশ শাসনকালে বেলগাছি ও বাণীবহ আরো দুটি পরগনার সৃষ্টি হয়)। সম্রাট আকবরের সময়ে বঙ্গে বার ভূঁইয়াদের উত্থানকালে ভূষণা চাকলার মকুন্দ রায় প্রবল হয়ে ওঠেন। মুকুন্দ রায়ের অধীনে রাজবাড়ি শাসিত হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে সংগ্রাম সাহকে মগ, পর্তুগীজ জলদস্যু দমনের জন্য পাঠানো হয়। জলদুস্যু দমনের কৃতিত্বের জন্য সংগ্রাম সাহকে নাওয়াড়া মহল (রাজবাড়ির কিয়দংশ) ও ভূষণা প্রদান করা হয়। সংগ্রাম সাহ দীর্ঘ সময় অত্র অঞ্চল শাসন করেন (সংগ্রাম সাহ আলোচিত)। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শীদকুলি খাঁ সরকারগুলোকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করেন। ঢাকা চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল সোনারগাঁ, বাকলা (বাকেরগঞ্জ), বাজুহা (নোয়াখালি) ফতেহবাদ, ভূষণা (বর্তমান মধুখালি উপজেলা)। মুর্শীদকুলি খাঁর সময়ে মুহম্মদপুরে রাজা সীতারামের উত্থান ঘটে। রাজা সীতারামের শাসনভুক্ত ভূষণা চাকলার অন্তর্গত রাজবাড়ি সীতারামের দ্বারা শাসিত হয়। আকবর বাদশাহের রাজত্বকালে মহাত্মা টেডরমল কর্তৃক বঙ্গদেশকে ৩৩টি সরকারে বিভক্ত হইয়া রাজস্ব আদায়ের কার্য চালিতে থাকে। উহার আওরঙ্গজেব বাদশাহের সময়ে মুর্শীদকুলি খাঁ যখন বাংলার শাসনকার্য আরম্ভ করেন তৎকালে ঐ চাকলার পরিবর্তে বঙ্গদেশকে ২৭টি সরকারে বিভক্ত করিয়া রাজস্ব আদায়ের সুবিধা করিয়া লন। তৎমধ্যে চাকলে জাহাঙ্গীনগর ও চাকলে ভূষণার কতকাংশ লইয়া ফরিদপুর জেলার সংগঠন হইয়াছে। এই চাকলা বিভাগ ভূষণার সীতারাম একজন প্রবল প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন।

Additional information