জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১১

সংগ্রাম সাহের বংশধর যদুনাথ তলাপাত্র এই বংশের আদি পুরুষ তাহার বংশধর দ্বারা এই গ্রামে যে পুষ্করিণী খনন করা হয় তা তালপাত্র দিঘি নামে পরিচিত। নাওয়াড়া চৌধুরীগণের বাড়ি স্বদেশীয়দের নিকট ‘রাজবাড়ি’ নামে অভিহিত হত। পূর্বোক্ত ঘটনাসমূহ বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনকালে বিদ্রোহী পাঠান দাউদের বিদ্রোহ দমনে খানখানাপুরে সেনাপতি মোরাদ খানের বসবাস ও মৃত্যু, সংগ্রাম সাহের নাওয়াড়া মহল এবং আনন্দনাথ রায়ের বর্ণনায় সংগ্রাম সাহর বংশধরদের বাণীবহে বসবাস এবং বাণীবহকে সাধারণ্যে রাজবাড়ি বলে আখ্যায়িত করা থেকে প্রমাণিত হয় রাজবাড়ি নামটি বহুপূর্ব থেকেই লোকমুখে প্রচলিত ছিল যা বাণীবহ বা বর্তমান রাজবাড়ির পার্শ্বস্থ কোনো এলাকাকে নির্দেশ করত।

 রাজা সূর্যকুমারের লক্ষীকোলের প্রাসাদোপম বাড়ি সাধারণ্যে রাজার বাড়ি বলে পরিচিতি ছিল। রাজবাড়ির সাধারণ লোকসহ সকল স্তরের মানুষ মনে করেন রাজা সূর্যকুমারের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি থেকেই রাজবাড়ির নামকরণ হয়েছে। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম গুহ পলাশী যুদ্ধের পর (১৭৫৭) পলায়নপূর্বক তৎকালীন জঙ্গলঘেরা লক্ষীকোল গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ছোট জমিদারীর মালিক হন। তদ্বীয়পুত্র গৌরীপ্রসাদ গুহরায় ও তার পুত্র দিগেন্দ্র প্রসাদ গুহরায় জমিদারীর আকার বৃদ্ধি করে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে আনন্দনাথ রায়----‘নবাব আলীবর্দী খাঁ’র অধীনে কোনো কার্য করিয়া, কায়স্থ গুহ বংশীয় প্রভুরাম রায় প্রভুর সম্পত্তি অর্জন করেন। রাজ সরকার হইতে কোনোরুপ উপাধী না পাইলেও , স্বদেশীয়রা ইহাদিগকে রাজা বলিয়াই সম্বোধন করিয়া থাকে। প্রভুরামের পুত্র গৌরীপ্রসাদ ও তৎপুত্র বিশ্বদিগীন্দ্র প্রসাদ তৎপুত্র সূর্যকুমার।’ (ড. তপন বাগচী সম্পাদিত আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃ-২০৬)। রাজা সূর্যকুমার প্রভাব প্রতিপত্তিতে ১৮৮৫ সালে ইংরেজ সরকার কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধি প্রাপ্ত হন। রাজা সূর্যকুমারের রাজা উপাধি প্রাপ্তির পর (১৮৮৫) থেকেই রাজার বাড়ি তথা রাজবাড়ি নামকরণ হল কিনা?।

এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৭৯৩ সালে ‘গোয়ালন্দ ঘাট’ গোয়ালন্দ হিসেবে যশোহরের সাথে সংযুক্ত হয়। গোয়ালন্দ উত্থানের সাথে রাজবাড়ির পরিচিতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গোয়ালন্দ মোগল শাসনকালে একটি মৌজা ছিল। পদ্মা নদীর নাব্যতা এবং সুবিধামত ঘাট বিবেচনায় পাবনার কাজীর হাট থেকে ১০ মাইল পূর্বে আরিচা থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে এবং বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে ৮ মাইল উত্তর-পশ্চিমে গোয়ালন্দ ঘাটের স্থাপন হয়েছিল।

কাজীর হাট তখন প্রসিদ্ধ এবং দক্ষিণাঞ্চলের সাথে কাজীরহাটের যোগাযোগ গোয়ালন্দ ঘাটের মাধ্যমে সংগঠিত হত। ঘাটের দক্ষিণে হামুরীয়া এবং উত্তরে লতিপুর। এই হামুরিয়াতেই বৃটিশ শাসনকার্য পরিচালনায় গোয়ালন্দ নামে নানা অফিস গড়ে ওঠে। নদী ভাঙ্গনের কারণে ঘাট জামালপুর, তেনাপচা, দুর্গাপুর স্থানে সরে আসে। ১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠা লাভ করলে নদীভাঙ্গনের কারণে গোয়ালন্দ নামের সকল অফিস আদালত দুর্গাপুর, তেনাপচা থেকে রাজবাড়িতে স্থানান্তর হতে থাকে। এরপর পোড়াবাজার নামক স্থানে সরে আসে। বাজারটি আগুনে পুড়ে যায় সে কারণে নাম হয় পোড়া বাজার। পোড়াবাজার ঘাট রক্ষার জন্য নদীর তলা থেকে সিমেন্ট করে তোলা হয়। যার নিদর্শন এখনো আছে। গোয়ালন্দ মহকুমার সকল স্থাপনা গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়িতে স্থাপিত হয়। রেকর্ড, পরচা, দলিল দস্তাবেজ অফিস কার্যাদি গোয়ালন্দ নামে সম্পাদিত হতে থাকে। রাজবাড়ি সাধারণ মানুষের মুখে মুখেই থেকে যায়। এমন কি ১৮৯২ সালে বাণীবহের জমিদার গীরিজাশংকর মজুমদার প্রতিষ্ঠিত বর্তমান জেলা স্কুল এর নাম ছিল-----গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল।

Additional information