জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১২

নামটি এখনো জেলা স্কুলের পুরাতন ভবনের পশ্চিম দিকে লেখা আছে। অর্থাৎ রাজবাড়ি মুখে মুখে প্রচলিত থাকলেও লিখিত ছিল গোয়ালন্দ। প্রশ্নটি ছিল রাজা সূর্যকুমারের বাড়ির নামকরণে রাজবাড়ি কি না? প্রসঙ্গত বর্তমান রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের (RSK রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত )বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজা সূর্যকুমারের আশ্রয়ে তাঁর বাড়িতে থেকে উক্ত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। ত্রৈলোক্যনাথ লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থের ৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘বড় রানীর পরামর্শেই রাজা দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন লক্ষীকোলের সন্নিকট ভবদিয়া গ্রামের কোচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎসুন্দরীকে। তাহার গর্ভেও কোনো সন্তান জন্মে না। যাহা হউক তখন তাহার বয়স অল্প (১৮-১৯ হইবে)। তিনি আমার সহিত কথা বলিতেন না লজ্জায়। একদিন রাজা তাহা জানিতে পারিয়া ছোটকে বকেন ‘তুমিত আচ্ছা প্রকৃতির! ও ছেলের মতো। উহার সহিত কথা বলিতে লজ্জা? ছি! তখন হইতে তাহার মুখ খুলিল কথাত নয় একেবারে কথার ঝড়। ‘বাবা তুমিত রাজবাড়ি যাও, আমাকে অমুক অমুক জিনিস আনিয়া দিবে।’

সোয়াশত বছর পূর্বে রানীর মুখে রাজবাড়ি, প্রমাণ করে সে সময় রাজবাড়ি পণ্য বিপণন কেন্দ্র বা বাজর ছিল। এ থেকে আরো স্পষ্ট হয় রাজারবাড়ি (রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি) এবং রাজবাড়ি ভিন্ন ‍দুটি স্থান। অর্থাৎ স্থান হিসেবে রাজবাড়ি পূর্ব প্রচলিত।

রাজবাড়ি নামকরণের বিষেয়ে একটি শ্রুতি আছে এবং তা স্পষ্টত রাজবাড়ি নামের স্থায়িত্বদানে এবং আজকের রাজবাড়ি জেলার সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি ছিল বিশেষ একটি ঘটনা। পূর্বদেশ রেল ১৮৭১ সালে জগতি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কালে ‘সূর্যনগর’ এবং ‘রাজবাড়ি’ রেলস্টেশন ছিল না। রেললাইন বর্তমান কালুখালির প্রায় ৩ কিমি উত্তর এবং বর্তমান রাজবাড়ি শহরের ১/২ কিমি উত্তর দিয়ে উড়াকান্দা হাট তথা তেনাপচা জামালপুর বিস্তৃত ছিল। কিছুকাল পূর্বেও এর চিহ্ন দেখা যেত। ১৮৯০ সালে পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাট বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন স্থানে স্থানান্তর করা হলে রেললাইন কালুখালি, বেলগাছি, রাজবাড়ি (বর্তমান স্টেশন) পাঁচুরিয়া হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। এ সময় রাজবাড়ি স্টেশন প্রতিষ্ঠা পায়। রাজবাড়ি স্টেশন প্রতিষ্ঠাকালে স্টেশনের নামকরণ বিষয়ে বাণীবহের জমিদার এবং রাজা সূর্যকুমারের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় বলে শ্রুতি আছে।

যেহেতু স্টেশনটি বাণীবহের জমিদারীর মধ্যে, ফলে নামকরণ বিষয়ে গীরিজাশংকর তার নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখেন। অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজা সূর্যকুমারও অনুরুপ দাবি উত্থাপন করেন। সর্বশেষ ঐতিহ্যবাহী রাজ রাজাদের ‘রাজবাড়ি’ এবং সূর্যকুমারের ঐতিহ্যবাহী রাজার বাড়ির বিবেচনায় স্টেশনের নামকরণ হয়, রাজবাড়ি। রাজার দাবি ও সম্মানে পরবর্তী স্টেশনের নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়, সূর্যনগর স্টেশন। স্টেশন হিসেবে রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতদ্বাঞ্চলের রেল প্রশাসন, মেরামত ইত্যাদির কারণে পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য পাকা ও সুদৃশ্য বাসভবন, অফিস, রেস্ট হাউস, কোয়ার্টার, লোকোশেড স্থাপিত হতে থাকে। পদ্মার বিপুল পরিমাণ ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের ব্যবসা ও রপ্তানির কারণে গড়ে ওঠে আড়ত এবং বেশ কয়েকটি আইসফ্যাক্টরি। মূলত রাজবাড়ি রেল শহর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

Additional information