জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১৩

  উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একক কোনো রাজা নয় বরং রাজবাড়ি এলাকাভিত্তিক বিদ্রোহী রাজন, সেনাপ্রতি, সমসাময়িককালের বর্ধিষ্ণু ও অভিজাত এলাকা এবং খেতাবপ্র্রাপ্ত রাজা থেকে এলাকাটি সাধারণ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে রজাবাড়ি রেলশহর হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি কালে রাজা সূর্যকুমারের লক্ষীকোলে রাজার ঐতিহ্যবাহী সুদৃশ্য বাড়ি দেশমহলে বিশেষ সাড়া জাগায়। ১৯৮০’র দশকের প্রথমে বাড়িটির স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাজা সূর্যকুমারের রহস্যঘেরা বাড়ি দেখতে ও ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করতে দেশ দেশান্তর থেকে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটত। রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি, রেললাইন, রেলস্টেশন এবং রহস্যঘেরা কুঠি নিয়ে ‘রাজবিাড়ি’ নামে সত্তর দশকে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তাই ‘রাজবাড়ি’ অনেক রাজার ভিরের রাজবাড়ি রাজা সূর্যকুমার ও তাঁর বাড়ির পরিচয়ে দেশ দেশান্তরে পরিচিত রাজবাড়ি।

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলাদেশের প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ি জেলা। ইতিহাস ঐতিহ্য গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধুত। আট হাজারী দ্বীপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

‘একদিন গোয়ালন্দ অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে।’ পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫। উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে গোয়ালন্দের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিত ছিল ১৫৮২১ টাক (Faridpur District Gazetteer-Page 270)।

Additional information