জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১৪

মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর। অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘বর্তমান শতাব্দীর (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ির মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চুড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।’ (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খণ্ড- পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিতি ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গী জলদুস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনে খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপাদনে নিয়োজিত থাকত। অনেকে মনে করেন গোয়ালা থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল। (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০)। রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পূর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়া উহা দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-১০২)।

মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thun Rajnagar, the dominant pargana in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-Page 209). এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবস্থিত ----রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুরের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধ ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদের এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

Additional information