জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১৫

এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জের প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুলভ স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান, শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে।’ খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের বিনয়ী ব্যবহার, পদ্মার মনোরম দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash----a Stew of steak and vegetables-oxford learner's Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত।

ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তী এলাকা গোয়ালীশ ল্যান্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যাণ্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচীন নথিপত্রে ‘goalandu' দেখা যায় `goalanda' নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনারগুলো নিলামে বিক্রি হয় (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যন্ড হিসেবেই সরকারি নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপাড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকারে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয়

Additional information