জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১৬

(আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)  ১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভিশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু- মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাশিমনগর, নশরতশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলে নিকটবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমিটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারের নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজা’ বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডাব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জানুয়ারি  মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে পাংশা কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবর্তী স্থানে পৌছায়।

তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড় রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শণ বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন।’ (আমার স্মৃতিকথা - ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)। রেল সস্প্রসারণ ও প্রশানিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা, উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়, জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে গাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়।

Additional information