জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-১৯

প্রাচীন গ্রাম বাণীবহ

রাজবাড়ি জেলায় বাণীবহ অতি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ গ্রাম। এ গ্রামকে নিয়ে এখনো নানা কথা নানা কাহিনী লোক মুখে প্রচলিত আছে। কোলকাতা শহরের পত্তন নাকি এখানেই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অতি ঘনবসতি গ্রামে ধান ভাঙ্গানো এবং চিড়া কোটার জন্য এত বেশি ঢেঁকি ব্যবহার হত যে,  ইংরেজ সাহেব তা দেখে ভীত হয়ে পড়েন।

না-জানি হড়াই নদীর তীরে অবস্থিত শহরসম এ গ্রামটি ঢেঁকির পাড়ের চাপে ভেঙ্গে পড়ে। লোকমুখে জানা যায় এক রাতে কোনো অজ্ঞাত রোগে এ গ্রামটির সকল মানুষ মারা যায় এবং গ্রামটি বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়। সত্যিকার অর্থেই বাণীবহ স্বাধীনতার কয়েক বছর পূর্ব থেকে দ্বিতীয় ধাপের বসতি গড়ে ওঠে। এর পূর্বে প্রায় ৫০/৬০ বছর বাণীবহ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা পরিত্যক্ত ও বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন ছিল। পরিত্যক্ত চিহ্নিত এলকায় ভাঙ্গা মন্দির, দালান, ইটের স্তুপ, কূপ, পুকুর, দেখা যেত। বস্তুত অতি ঘনবসতিপূর্ণ এ গ্রামে এখন থেকে প্রায় দুইশত বছর পূর্বে পুস্কর লেগে গ্রামটি উজার হয়ে যায়। (পুস্কর এক ধরণের বায়ু দূষণজনিত মহামারী)। গ্রামটির প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায় কবি কণ্ঠহার বিরচিত সম্ভ্রান্ত বৈদ্যগণের পরিচয় পরিচিতি ‘কুলজী’ গ্রন্থ থেকে। এ অঞ্চলে বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ি, গোপালগঞ্জ অঞ্চলের সেনদিয়া, কাজুলিয়া, খান্দারপাড়, রুপসা, রাজনগর, সোনারং, মূলঘর, ফতেজঙ্গপুর, বাণীবহ, সেকাড়া, গ্রামে কুলীন বৈদ্য সমাজপতিদের বসবাস শত বছর পূর্বে খ্যাতিলাভ করেছিল। ‘কুলজী’ গ্রন্থে তৎকালীন খ্যাতিসম্পন্ন বৈদ্যগণের মধ্যে বাণীবহের নাম পাওয়া যায়। ১৫৭৫ এ বিরচিত এ কুলজী গ্রন্থ থেকে জানা যায় বৈদ্য শক্তির আবির্ভাব। বৈদ্যশক্তির গোত্রজ  মাধব সেন এবং ধনন্ত রী গোত্রের বলভদ্র বাণীবহের আদি নিবাসী। মাধব সেন ও বলভ্রদ্র সেনের দুটি বংশধারা কালক্রমে বিস্তার লাভ করে। বংশ দুটির মধ্যে মাধব বংশীয় জগাদানন্দ ও মাধবানন্দ রায়ের বংশধরগণই প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

মাধব সেন প্রথমে বাণীবহের অদূরে পাঁথুবী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ‘গণয়েস্তে নায়িস্তে ধর্ষ্যাং পরোগায়ঞ্চ হিন্দুকা মাধব পঞ্চথুপঞ্চে বসতিং তেহি জঞ্জিরে’---কণ্ঠহার। পাঁচথুবীর পূর্ব নাম পঞ্চথুপ। বৌদ্ধদের স্থাপিত পঞ্চস্তুপ হতে পঞ্চথুবী এবং পরে পাঁচথুবী হবে। উল্লেখ্য এ অঞ্চলে বৌদ্ধ বসতি ছিল। বৌদ্ধ নির্বাসন ও ধর্মান্তরিত হওয়ার অনেক পর আনুমানিক পাঁচশথ বছর পূর্ব থেকে মরা পদ্মা তীরের উর্বর ভূমির এ গ্রামটিতে তারা বসবাস শুরু করে। মোগল শাসনকালে এলাকাটি ছিল নাওয়াড়া পরগনা। নাওয়াড়া মহলটি মাধব সেনের অধীন ছিল। এভাবে পাঁচথুবীতে প্রথম মাধব সেনের বংশের পত্তন ঘটে। এ বংশীয় লোকেরা নাওয়াড়া চৌধুরী বলে পরিচিত হতেন।

বর্তমানে মাটিপাড়া হাটের উত্তরে অবস্থিত ব্রিজ থেকে পূর্বদিকে বিস্তৃত ভরাট বিল দেখা যায়। বিশ বছর পূর্বেও পিঁয়াজ ঘাটারবিল বা পিঁয়াজঘাটা বলে এর পরিচিতি ছিল। পিঁজেঘাটায় পানির গভীরতা ছিল অনেক বেশি। সেকালে পদ্মার প্রবল স্রোতধারা শাখানদী হিসেবে পূর্বদিকে পাঁচথুবী, বারবাকপুর, হমদমপুর হয়ে পূর্বদিকে প্রবাহিত হত। পরে পদ্মা আরো উত্তরে সরে গেলে তা মরা পদ্মায় পরিণত হয়। মরা পদ্মার স্থান বিশেষ বিলে পরিণত হয় যা বর্তমানে পিঁয়েজঘাটার বিল। পাঁচথুপির উত্তরে রাধাগঞ্জ নামে এক বড় বন্দরও ছিল। পদ্মাতীরে স্থাপিত বন্দরের পাশ দিয়ে পূর্বদিকে রাজাপুর পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ রাস্তা বিদ্যামান ছিল যাকে লোকে পল্টুনের রাস্তা বলত।

Additional information