জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-২০

মোগল শাসন সময়ে সৈনিকদের যাতায়াতের জন্য এ রাস্তা ব্যাবহার হত। যে কারণে এর নাম হয় পল্টুনের রাস্তা। নদীপথ ও প্রশস্ত রাস্তার জন্য মগ, ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নাওয়াড়া চৌধুরীগণ প্রায় চারশত বছর পূর্বে পাঁচথুপি থেকে সরে এসে নিরাপদ স্থান বাণীবহে বসতি স্থাপন করে। কবি কণ্ঠহার বিরচিত কুলজী গ্রন্থ থেকে যতদুর জানা যায় মোগল শাসনকালে বিশেষ করে সম্রাট শাহজাহানের শাসন কালে মাধব সেন পাঁচথুপি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তিনি প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হন। নাওয়াড়া জমিদার মাধব সেনের তহশীলদার সদাশিব এর কন্যার সাথে সংগ্রাম সাহর বিবাহ হয়। সংগ্রাম শাহ মগ পুর্তুগীজ দমনে আওরঙ্গজেব কর্তৃক প্রেরিত হন। সংগ্রাম সাহ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে।

মাধব সেন তাঁর পুত্র জগদানন্দ ও মাধবানন্দকে নিয়ে বাণীবহবাসী হন। সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাস থেকে জানা যায় তৎকালীন বাণীবহবাসী পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যালঙ্কার আচর্য ও রায়নগর হতে ভূ-বৃত্তি লাভ করে বাণীবহ বাসী হন। কুলপুঞ্জিকা কণ্ঠহারে ‘মাধবোজগদান্দ গোপীরমনতা-সুতৌ’ উল্লেখ থাকে ধারণা করা যায় প্রচুর ভূ-সম্পত্তি ও প্রতিপত্তিসহ মাধবগোত্রীয় বলভদ্র ও অন্যান্য গোত্রীয়দের বাণীবহ সমৃদ্ধ নগর প্রায় এক বাসস্থান ছিল। উত্তরে সাড়ে তিন মাইল ও পূর্ব পশ্চিমে তিন মাইল আয়তনের গ্রামটিতে বসবাসরত পরিবার সংখ্যা রাঢ়ী ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ প্রায় নয়শত ঘর, বৈদ্য প্রায় দুইশত ঘর, কায়স্থ ও অন্যান্য জাতি প্রায় আড়াই হাজার ঘর। এই গ্রাম এত ঘনবসতিপূর্ণ ছিল যে কারো ঘরের বাইরে উঠান ছিল না, নিজ নিজ বারান্দাতেই বৈঠকখানা ছিল। পাড়াগুলোর পরিচিতি ছিল বিদ্যাবাগীশ পাড়া, আচার্য পাড়া, সেনহাটী পাড়া, বসুপাড়া, বেনে পাড়া, ন্যুনে পাড়া, সরখেল পাড়া, পচাপাড়া। বাংলা ১২৩২ সালে (প্রায় ২০০ বছর পূর্বে) সেখানে ভীষণ মহামারী দেখা দেয়। এতে গ্রামটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। গ্রামটিকে রক্ষা করতে ১২৬২ সালে (প্রায় ১৫০ বছর) সেখানে মিউনিসিপ্যাল প্রবর্তন উদ্দেশ্যে সরকার থেকে এক নোটিশ জারি করা হয় (ফরিদপুরের ইতিহাস-আনন্দনাথ রায় -পৃষ্ঠা-৮০)।

সংগ্রাম সাহের সম্বন্ধ হেতু চৌধুরীগণ অনেকটা নিন্দিত হন। বলা যায় নিন্দা পুরণে যশোরের কুলীন বৈদ্যদের সাথে আদান-প্রদানে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করেন। যশোরের সেনহাটিস্থ কুলীন বৈদ্য অরবিন্দ বংশের সাথে কার্য করার সূত্রে তাদের এক শাখা বাণীবহে বসতি স্থাপন করে। সেনহাটি থেকে এসে বসতি স্থাপন করায় নাম হয় সেনহাটি পাড়া। চৌধুরীদের আদি পুরেুষের একজন যদুনাথ তালপাত্র। তাঁর বংশধরেরা বাণীবহে একটি দিঘি খনন করে। তা আজও ‘তালপাত্রের দিঘি’ নামে পরিচিত। এই নাওয়াড়া চৌধুরীগণের বাড়ি সাধারণ্যে রাজবাড়ি বলে অভিহিত হত। চৌধুরীদে আদি পুরুষ মাধব সেন ও তহশীলদার সদাশিব। বাণীবহে স্থানান্তরের পর সদাশিবের পৌত্র মাধবানন্দ রায় সম্পত্তির নয় আনা ও জগদানন্দ রায় সম্পত্তির সাত আনা অংশ ভাগ করে নেন। অংশ ভাগের বিষয় এখনো লোকমুখে শোনা যায়। নাওয়াপাড়া চৌধুরীরা সে কালেই নানারুপ সৎকাজ দ্বারা যশস্বী হয়েছিলেন। দত্তবৃত্তি, ব্রহ্মোত্তর, দানের জমি দ্বারা অনেকে প্রতিপালিত হত। তাঁদের বদান্যতা ও দয়া দাক্ষিণ্যের নানা গল্প প্রচলিত আছে। বিষয় সূত্রে একটি গল্প এমন------নাওয়াড়া চৌধুরীদের একটি নিয়ম ছিল, গ্রামের মধ্যে কেউ উপবাসী আছে কিনা তা খুঁজে বের করে তাকে খাওয়ানো। এ উদ্দেশ্যে একদিন চৌধুরীদের কোনো একজন এক ব্রাহ্মণের বাড়ি উপস্থিত হয়ে দেখতে পান ব্রাহ্মণ পান্তাভাত খেতে বসেছেন। তাকে দেখে ব্রাহ্মণ আহার ত্যাগ করে তাম্বুল চর্বণ শুরু করলেন।

Additional information