জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-২১

চৌধুরী ব্রাহ্মণকে ভাত খাওয়া বাদ দিয়ে পান চাবানোর কারণ জিজ্ঞাসা করায় ব্রাহ্মণ উত্তর দিলেন ‘দেশের অধিকারী হয়ে কোথায় লোক সুখ স্বাচ্ছন্দে থাকবে তার ব্যবস্থা না করে উপহাস করতে আসলেন পান্তাভাত খাওয়ার সময়? চৌধুরী এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন -----‘আপনি তাম্বুল চর্বণরত অবস্থায় যতদূর অতিক্রম করবেন ততদূর পর্যন্ত জমি আপনার ভরণপোষণের জন্য উৎসর্গ করা হবে।’ কথামত ব্রাহ্মণ পানচাবন অবস্থায় যতটা ভূমি অতিক্রম করলেন ততটা ভূমি তাকে দেওয়া হল। যিনি এই ব্রতিপ্রাপ্ত হন তার উপাধি ছিল সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে একটি কথা এখনো লোকমুখে শোনা যায়-------

‘পান খাইয়া মারিল লাথি

তাইতে হইল সিদ্ধন্তের গতি’

স্থানটি ভীমনগরের নকশায় একটি বহৎ চক। নক্সাতে তা নিস্কর লিখিত ছিল। সিদ্ধান্তের বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ায় ভূমি বেদখল হয়ে যায়। তখন চন্দনা নদী ছিল প্রশস্ত ও বেগবান। চন্দনা নদীর তীরে আড়কান্দিতে নাওয়াড়া চৌধুরীর কাচারী ছিল। নবাবী আমলের জলযুদ্ধের জন্য চৌধুরীগণ যুদ্ধ জাহাজ বানানোর কারখানা স্থাপন করে। আড়কান্দির তুলসীবরাট গ্রামের মিস্ত্রিরা নৌকা বানানোর জন্য বিখ্যাত। তবে বিল, নদনদী শুকিয়ে যাওয়ায় এ ব্যবসা এখন নেই বললেই চলে। রাজা সীতারাম নাওয়াড়া চৌধুরীদের বহু সম্পত্তি ও কারখানা দখল করে নেয়। এতে চৌধুরীরা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর বৃটিশ শাসনের শুরুতে দশসনা বন্দোবস্তকালে যা সম্পত্তি ছিল তার কর ধার্য করা হয়। ইংরেজদের জলযানের প্রয়োজন না থাকায় নাওয়াড়া মহল উচ্ছেদ করা হয়। নৌকা প্রস্তুতের জন্য সূত্রধর, কর্মকারদের জন্য নির্দিষ্ট ভূমি দেওয়া ছিল তাও হস্তান্তরিত হয়ে যায়। ঐ সমস্ত স্থানকে এখনো ‘সুতারের তালুক’ বলা হয়। বেভারিজ লিখিত বাখেরগঞ্জের ইতিহাসে নাওয়াড়া চৌধুরীদের পরিচয় আছে। নাওয়াড়া বংশের বিজয়কৃষ্ণ রায় পূর্ণিয়া জেলার রায় লছমত সিং বাহাদুরের ম্যানাজার এবং তথাকার মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং কামিনী কুমার রায় ফরিদপুর জজকোর্টের উকিল, মুন্সেফকোর্টের গভর্নমেন্ট প্লিডার ও গোয়ালন্দ বিভাগের লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান। এভাবে মাধব সেন, সদাশীব বলভদ্র, মাধবানন্দ, জগদানন্দ প্রভৃতি নাওয়াড়া চৌধুরীগণ আর্থিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরমধ্যে বাণীবহে যারা অবশিষ্ট থাকেন তাদের মধ্যে অরবিন্দ বংশের মজুমদারগণ প্রবল হয়ে ওঠেন। বৈদ্যকুলীন বংশপত্রিকা (পাতরা) থেকে জানা যায় অরবিন্দু যদুনাথ তালপাত্রের বংশীয়। নন্দকিশোর দাস মাধববংশীয় রামনারায়ণ  চৌধুরী কন্যাকে বিবাহ করেন। নন্দকিশোরের পুত্র কৃষ্ণজীবন দাস বাণীবহের মনোহর রায়ের কন্যার পাণিগ্রহন করেন। অরবিন্দ সেনহাটিস্থ কুলীন বৈদ্য এবং বিবাহসূত্রে অরবিন্দের বংশের একটা শাখা ভূমিবৃত্তিপ্রাপ্ত  হয়ে সেনহাটি ত্যাগ করে বাণীবহে বসতি স্থাপন করেন। যদুনাথ তালপাত্র এ বংশের আদি পুরুষ। তাদের বসতি স্থানের নাম হয় সেনহাটি পাড়া। এখন থেকে প্রায় তিনশত বছর পূর্বে তারা এ গ্রামে স্থায়ী হয়। কৃষ্ণজীবন দাসের দুই পুত্র, বিনোদ রায় ও সদাশীব রায়। এই বংশের শিবশঙ্কর রায় লর্ড ওয়েলেসলী গভর্নর জেনারেল তখন নাটোর রাজ সরকারের সরবরাহকার নিযুক্ত হন (১৮০৩ সাল)। তখন বড় বড় জমিদার গভর্নমেন্টের তত্ত্বাবধীন হলে গভর্নর জেনারেল কাউন্সিল হতে তারা নিযুক্ত হতেন। তখন নাটোর রাজস্টেট নানা গোলযোগ পতিত হওয়ায় রাজস্ব প্রদানে শিথিলতা আসে। এসময় গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে শিব শঙ্করকে এই পদে নিযুক্ত করেন। শিবশঙ্কর ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাধর। এই উচ্চ পদে নিযুক্ত থেকে শিবশঙ্কর বহু সম্পত্তি অর্জন করেন। এ সময় তাঁর উপাধি হয় মজুমদার। রামশঙ্কর জ্যেষ্ঠ, জয়শঙ্কর কনিষ্ঠ।

Additional information