জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-২৫

১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। সময়কালটা মহাযুদ্ধ ও মহাদুর্ভিক্ষের কাল। পরীক্ষার পর পারিবারিক ব্যবসায় নিয়োজিত হন কিন্তু গভীর নৈতিকতাবোধে তিনি ব্যবসা থেকে সরে আসেন, ‘যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি, কুড়ি টাকা মনের চাউল চল্লিশ টাকায় বিক্রি করা আমার বিবেক মেনে নিতে না পারায় ব্যবসা ছেড়ে সরাসরি লঙ্গরখানায় চাকরি পেলাম। সুপারভাইজার হিসেবে সরকারি বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত খাবার বরাদ্দ করায় মহকুমা শাসক আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।’ অজিত স্যনাল-----কোড়কদি সমাবেশ-পৃষ্ঠা-১৬। অজিত সান্যালের কথায় ১৯৪৩ এর মহাদুর্ভিক্ষের কিঞ্চিত প্রমাণ মেলে। সে দুভিক্ষ অত্র অঞ্চলে কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছিল অজিত সান্যালের এ উক্তি থেকে তা বোঝা যায়। তিনি কলিকাতায় ভাই অবন্তী সান্যালের মেসে আশ্রয় নেন। এ সময় রাজবাড়ির এক কৃতি সন্তান বিজন ভট্রাচার্যের লেখা ‘নবান্ন’ নাটক তখন খুবই জনপ্রিয়। এ নাটকে তিনি লাঠিয়াল চরিত্রে অভিনয়ে দক্ষতার পরিচয় দেন। এরপর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং নাট্য আন্দোলনে অংশীদার হন। এর পরে তিনি গণনাট্য সংঘের নৃত্য শাখায় বুলবুল চৌধুরীর নিকট নাচ শেখেন। এ সময় নাচের মাধ্যমে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ বিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি করায় বিদেশী কোম্পানির স্টেনোর চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বুলবুল চৌধুরী ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করলে বুলবুল চৌধুরীর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অজিত সান্যাল বুলবুল একাডেমী অব ফাইন আর্টস এর প্রতিষ্ঠাতা নৃত্য শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা ছেড়ে কলিকাতা যান। কেড়কদি সমাবেশে তাঁর স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ রাজবাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমূল্য উপাদান এখানে কিঞ্চিত তুলে ধরা হলো------‘আমার পৈতিক বাস কোড়কদি গ্রামে। আগে রাজবাড়ি মহকুমা (গোয়ালন্দ) অধীনে বালিয়াকান্দি থানা অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুরাশী বছর বয়সে পুরানো স্মৃতি যতই ধূসর হোক তবুও কোড়কদির কথা কি ভুলতে পারি? হারখালির মাঠ, স্কুলের মাঠ, ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কুঠিবাড়ির আমবাগানে আম কুড়ানো থিয়েটার হলের পাশে নোয়াবাড়ির ভাঙ্গা মণ্ডপ থেকে রাতে পায়রা ধরা, রায়বাহাদুর দাদুর বড় দালানের সামনের বিরাট উঠোনে যাত্রা দেখা, দুর্গাপুজোর আগে কলকাতা থেকে প্রবাসীদের নৌকার সংখ্যা গোনা, গ্রামের দশ বাড়িতে দুর্গার আরতি দেখা, বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে গ্রামে আসা প্রবাসীদের থিয়েটার দেখা, চন্দনা নদীতে নৌকা বাইচ, সরস্বতী পুজোয় ছোটদের থিয়েটার, গাজনে রামধন তর্কপঞ্চাননের লাইব্রেরির সামনে শিবু মিস্ত্রির বিশাল পাট চালান, স্বদেশী আন্দোলনের সময় পুলিশের চড় থেকে কাকাদের সাবধান করা, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে ‘বন্দে মাতরম, পুলিশের মাথা গরম’ স্লোগান দিয়ে পিছন পিছন ছোট বটতলা দল বেঁধে ছোটা।’ কেবল শিল্প সাহিত্যেই নয় খেলাধুলায় কোড়কদির ঐতিহ্য সুবিদিত। তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমায় ফুটবল খেলা প্রতিযোগিতা অত্র অঞ্চলে একক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

কোড়কদি ছিল এর সূত্রাগার। এ গ্রামের শিবদাস ভাদুড়ী ও বিজয়দাস ভাদুড়ী ফুটবল জগতে স্মরণীয় নাম। শিবদাস ভাদুড়ী (১৮৮৪-১৯৩২) এ গ্রামের মানুষ, তিনি ছিলেন কলকাতা মোহনবাগান টিমের অধিনায়ক। ১৯১১ সালে তার অধিনায়কত্বে মোহনবাগান ক্লাব ইস্ট ইয়র্ক দলকে ২-৯ গোলে পরাজিত করে প্রথম ভারতীয় দল আইএসইস শিল্ড জয় করে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে। মোহনবাগানের আর এক দুধর্ষ খেলোয়াড় বিজয় দাস ভাদুড়ী। বিজয়দাস ভাদুড়ী শিবদাস ভাদুড়ীর ভ্রাতা। গণচেতনা, রাজনীতি, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কোড়কদি ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল নাম। স্বদেশী, অনুশীলন, অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনে এ গ্রামের মানুষ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তেভাগা আন্দোলন ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব অবনী লাহিড়ী ও শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্যের অবদান এ গ্রন্থের রাজনীতির অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

Additional information