জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-২৮

রেল স্থাপনের পর এখানে বাজার বসে। রতনদিয়া গ্রামের নামকরণের সাথে জড়িয়ে আছে জেলার প্রাচীন ইতিহাস। যশোর জেলার নড়াইলের জমিদার রামরতন রায় (ডাক নাম রতনবাবু) মহিমশাহী পরগনার মালিক। তিনি ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। যেন তার জমিদারীতে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খায়। রতনদিয়া গ্রাম মহিমশাহী পরগনার অন্তর্গত। এখানে দুটি রায় বাড়ি ছিল অধিক প্রতিপত্তিশালী। পশ্চিম অংশে নন্দকুমার রায়, পূর্বদিকে বিশ্বকুমার রায়। তারা ছিলেন ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ। তাদের জনহিতকর কাজে প্রীত হয়ে রামরতন গ্রামটিকে ‘রত্ন’ উপাধি দেন। গ্রামের মানুষ প্রতিদানে রামরতনের নামে ‘রতনদিয়া’ নামে আখ্যায়িত করে। মহিমশাহী পরে পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র বাহাদুরের হাতে যায়। তিনি এ পরগনার তিনটি ডিহি কাচারি স্থাপন করেন। এরমধ্যে বালিয়াকান্দি সাব অফিস, সোনাপুরে ডিহি কাচারি এবং রতনদিয়া ডিহি কাচারি। রতনদিয়া তখন ৫০/৬০ ঘর হিন্দুর বসতি। তারা সকলেই ব্রাহ্মণ ছিল। পশ্চিমাংশে ছিল নন্দকুমার রায়ের দোতলা বাড়ি। আর পূর্বাংশে বিশ্বনাথ গোপীনাথ রায়ের বাড়ি। একতলা বাড়ি, পুকুর, চণ্ডিমণ্ডপ, নাটমন্দির, ইত্যাদি। নন্দকুমার রায় ছিলেন বালিয়াকান্দি নীলকুঠির দেওয়ান। ৮ বেহারার পালকিতে বালিয়াকান্দি থেকে রতনদিয়া যাতায়াত করতেন। মুগ্ধ নয়নে এ দৃশ্য মানুষ দেখত। তার পূর্ববংশধর রাজমোহন রায় বংশ পরস্পরায় রতনদিয়া নীলকুঠির পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি ছিলেন রতনদিয়া পাইকপাড়া জমিদারীর কাচারির নায়েব। তখনকার দিনে স্থানীয় জমিদার, বধিষ্ণু উচ্চ ধনি শিক্ষিত পরিবারকে অন্যত্র থেকে  এনে বসতি স্থাপন করাতেন। গ্রামের পূর্বাংশের রায়েরা ৩০-৪০ ঘর মাহিষ্যদাস, রজক, বাদ্যকর ও পশ্চিমাংশের রায়েরা ৮-১০ ঘর দেবনাথ, ৮-১০ ঘর সুত্রধর, কয়েক ঘর পরামানিক, ঢুলি, পালকি বাহক ও নমঃশুদ্র বসতি স্ংস্থাপন করান। ঐ দুই রায় বংশ ছাড়াও আরো দুই ঘর রায় ছিলেন। তারা ছিলেন সাণ্ডিল্য গোত্রজ।

রতনদিয়া গ্রাম ছিল তৎকালীন সময়ে সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্র। পূজা-পার্বণ ছাড়াও নিত্যদিন গানের আসর বসত; যাত্রা, পালাগান, খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। কাচারীর রাজমোহন রায় ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। জানকী চক্রবর্তী ছিলেন ভালো গায়ক। কুঞ্জলাল ছিলেন তবলা বাদক। পরবর্তীতে নদীয়া জেলা থেকে একজন ওস্তাদ গায়ক ও সানাই বাদক আসেন। তার নাম আকবর। সে আর দেশে ফেরে নাই। রতনদিয়াতেই দেহত্যাগ করেন। মাঝে মাঝে অন্যত্র থেকে বড় বড় গায়ক আসতেন। তখন অঞ্চলে সারা পড়ে যেত। ১৯১৭ সালে কবি বিহারি লাল গোস্বামী রতনদিয়ায় বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন পাবনা জেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের অধিবাসী, পোতাদিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ছিলেন আদর্শবান ঋষিপ্রতিম মানুষ। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তৎকালীন উঁচু মানের সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গদেশ, ভারতী, বঙ্গভাষা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখা ‘গীতাবিন্দুবাদ’ নামে গীতার ছন্দানুবাদ বিখ্যাত ছিল। তার লেখা শেখ সাদির ‘পন্দনামার’ কাব্যানুবাদ বের হয়। তার উচ্চ আদর্শ, পাণ্ডিত্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাকে যথেষ্ট সমাদর করতেন। ১৯৩১ সালে তার পরলোকগমনের পর রবীন্দ্রনাথ সমবেদনা জানিয়ে তার পুত্র পরিমল গোস্বামীকে একখানা পত্র দিয়েছিলেন। বিহারিলাল গোস্বামীর পুত্র পরিমল গোস্বামী (এমএ) ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। ‘স্মৃতিচিত্রণ’ ‘দ্বিতীয় স্মৃতি’ ‘আমি যাদের দেখেছি’  প্রভৃতি গ্রন্থসমূহ বৈচিত্র পূর্ণ কর্মজীবনের সন্ধান মেলে। পাংশার অদূরে কালিকাপুরে যতীন্দ্রনাথ বাগচীর কন্যাকে বিবাহ করেন। পরিমলের দুই পুত্র শতদল ও হিমানিশ দুজনেই ছিলেন গ্রন্থ লেখক । শতদল ‘আমাদের গ্রাম’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। হিমানিশের লেখা ‘লন্ডনের পাড়ায় পাড়ায়’  ‘বিলাতি বিচিত্রা’ ‘ঘটকালি’ গ্রন্থগুলি খ্যাতি অর্জন করে। তিনি পাঁচ বছর ইংল্যান্ড কাটান।

Additional information