জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-৩১

গোয়ালন্দ তখন বর্তমান গোয়ালন্দ থেকে পশ্চিমের উজানে আরিচা ঘাট সোজা প্রায়। দুর্গাপুর, তেনাপচা, জামালপুরকে ঘিরেই ছিল তখন গোয়ালন্দ ঘাট। গোয়ালন্দ ঘাট গ্যাঞ্জেস বন্দর বলে পরিচিত ছিল। একে বলা হত বাংলার দ্বারপথ। অর্থাৎ গোয়ালন্দ ছিল Gate way of Bengal । প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে গোয়ালন্দ ঘাট ৫/৬ মাইল ভাটিতে স্থাপন করা হয়। ১৮৭১ সালে রেল সম্প্রসারণকালে তা বর্তমান রাজবাড়ি শহরের আরো উত্তর দিক দিয়ে স্থাপিত হয়। এখনো রেলের একটি পথ লোকোসেড থেকে ভবদিয়ামুখি সে চিহ্ন বহন করছে। ১৮৯০ সালে রেলপথটি কালুখালি, বেলগাছি, রাজবাড়ি হয়ে নতুন ঘাট পর্যন্ত পুনস্থাপন করা হয়। এ সময় রাজবাড়ি রেল স্টেশনটি স্থাপিত হয়। গোয়ালন্দ ঘাট ভাঙ্গনের মুখে থাকায় তখন থেকেই রেলের অফিস, কোয়ার্টার ও অন্যান্য অফিস আদালত বর্তমান রাজবাড়ি শহরে স্থানান্তর হতে থাকে। এভাবে রাজবাড়ি শহরের গোড়াপত্তন হয়। প্রায় তিনশত বছরের ঐতিহ্যবাহী লক্ষীকোল রাজা সূর্যকুমারের পূর্বদেশের মনোমগ্ধকর সৌন্দর্যময় ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদ, পাইক, পেয়াদার ঘরবাড়ি, জমিদার কাচারী, পোস্ট অফিস, সবমিলে দেশব্যাপী রাজা সূর্যকুমারের নাম বিখ্যাত ছিল।

রাজা সূর্যকুমারের প্রতিষ্ঠিত (১৮৮৮) রাজবাড়ি সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন, রাস্তা ঘাট, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়। বাণীবহের জমিদার গিরিজাশংকরের নির্মিত গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (স্থাপিত ১৮৯২), সরকারের অফিস আদালত, রেলের অফিস, কোয়ার্টার, লোকোসেড, দোকান পাট, লোক সমাগম রাজবাড়িকে শহর পরিচিতি দান করতে থাকে। রাজবাড়ি শহরের ভিত্তি গড়ে ওঠায় ১৯১৩ সালে ইউনিয়ন বোর্ড এবং ১৯২৩ সালে তা মিউনিসিপ্যালিটিতে পরিণত হয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ বৃটিশ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের একমাত্র যাতায়াত পথ হওয়ায় শিক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে। হোটের, বিশ্রামাগার প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। মাছের ব্যবসার জন্য গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি বরফ কল। ১৯৩৭ সালে স্থাপিত হয় ড্রাই আইস ফ্যাক্টরি। এভাবেই শহরের ভিত্তি গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি বিনোদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট। বিদ্যুতের আলোয় শহরজীবন মুখরিত হয়। কেবল রাজবাড়ি নয় বিনোদপুর পাওয়ার প্লান্ট থেকে ফরিদপুর শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ অতঃপর আধুনিক হাসপাতাল, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। তৎকালীন চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধি মরহুম ফখর উদ্দিন আহম্মেদ, মরহুম এ্যাডভোকেট মাজেদ আলী খান, মরহুম আহম্মদ আলী মৃধা, প্রয়াত নবকৃষ্ণ চক্রবর্তী, মরহুম এ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল মিয়া, মরহুম হাবিবুর রহমান, মরহুম কাজী হেদায়েত হোসেন, মরহুম আক্কাছ আলী মিয়া, মিউনিসিপ্যাল ও পৌর প্রধানের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রাজবাড়ি শহরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। প্রকৃত অর্থে শহরটি আধুনিক শহরে রুপ নেয় আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সময়কালে। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম পর পর তিনি বার পৌরসভা চেয়ারম্যান থাকাকালীন পরিকল্পনামাফিক শহরটি গড়ে ওঠে। প্রতি ওয়ার্ডে পাকা রাস্তাসহ দোকান পাট আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কাপড় বাজার, মাছের বাজার, তরকারি বাজারে পাকা ছাউনী গড়ে ওঠে। প্রশস্ত রাস্তার দু ধারে গড়ে ওঠে আলো ঝলমল দোকান, পৌর বিপনী।

যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানেই তিনি নির্মাণ করেন পাকা রাস্তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি রাজবাড়ি শহরে প্রবেশ মুখের পুরাতন সড়কটি ভেঙ্গে অতি প্রশস্ত ‍দ্বিমুখী রাস্তা নির্মান করেন। মাঝের আইল্যান্ড বরাবর অলঙ্কারিক দেবদারু (বিদেশী) বৃক্ষ শোভিত রাস্তা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে মনে হবে সজ্জিত কোনো বৃহৎ শহরে প্রবেশ করছি। এদিকে মানুষের আর্থিক অবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ২০ বছর পূর্বেও রাজবাড়ি তেমন দালানকোঠা দেখা যেত না। এখন প্রায় সকলেরই পাকা বাড়ি।

Additional information