জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-৬

এসব অফিসের নামকরণও হয় গোয়ালন্দ মহকুমার নামে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা হওয়ার পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমার নামের পরিবর্তন হয় না। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সালের ভূমি জরিপের পর যে নক্সা প্রণয়ন করা হয় তাতে রাজবাড়িকে ‘গোয়ান্দ নাথা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উক্ত নক্সায় চককেষ্টপুর সজ্জনকান্দা বিনোদপুর, লক্ষীকোল, ধুঞ্চি মৌজাসমূহে গোয়ালন্দ থানা অধীনে জরিপ করা হয় (১৯৪০-১৯৪২ এর নক্সা দ্রষ্টব্য)। ১৮৯০ সালে রেলস্টেশন ও রেলের অফিস এবং কার্যাদি রাজবাড়ি নামে শুরু হয়। (১৮৭১ সালে যখন গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেল স্থাপন করা হয় তখন রাজবাড়ি স্টেশন স্থাপিত হয়নি (রেল অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। মহকুমা প্রশাসক কার্যালয় ও রেল স্থাপনসহ অন্যান্য অফিস বিদ্যালয় স্থাপনার ফলে রাজবাড়ি শহরে রুপলাভ করতে থাকে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার শ্রেণি চিরস্থায়ী মালিকানা লাভ করায় এ সব জমিদার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদারদের নিকট জমি পত্তন দিয়ে রাজধানী শহর কলিকাতায় আরাম আয়েশে কালযাপন করতে থাকে। ফলে পত্তনিদার, দরপত্তনিদার তেপত্তনিদার এমন কি ছেপত্তনিদার মধ্যস্বত্বভোগী পরগাছা জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। আবার অনেক জমিদারের খাজনা পরিশোধের অপারগতায় জমিদারী নিলাম হয়ে যায়। ফলে নব্য জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এ সময় বাণীবহ ও লক্ষীকোল দুটি নব্য জমিদার পরিবার বিশেষ করে গিরীজাশংকর মজুমদার এবং রাজা সূর্যকুমার শহর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। রাজা সূর্যকুমার কর্তৃক ১৮৮৮ সালে আরএসকে এবং গীরিজাশংকর মজুমদার কর্তৃক ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে রাজবাড়ি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থায়ী রেল ব্যবস্থাপনায় রাজবাড়ি কলিকাতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। গড়ে ওঠে হোটেল, রেস্ট হাউস, ক্লাব। রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের নানা স্থান থেকে আগত ও প্রত্যাগত নানা মানুষের ভিড়, পণ্য চলাচল, রাজবাড়ির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। গোয়ালন্দের ঐতিহ্যবাহী রুপালি ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই মাছ রেলযোগে দূর ভারতে রপ্তানি হতে থাকে। শুরু হয় বরফকল স্থাপন।

১৯১৩ সালে স্থানীয় সরকার আইনের অধীনে রাজবাড়ি ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। ১৯১৯ সালে আংশিক মিউনিসিপ্যাল কাজ শুরু হয় এবং ১৯২৩ সালে মিউনিসিপ্যালিটি পূর্ণরুপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৬ জন মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের দ্বারা তা পরিচালিত হত। ৫টি ওয়ার্ডে তা বিভক্ত ছিল। ১৯১৯ সালে মিউনিসিপ্যালিটি বিশুদ্ধ পানি (Filtered Water) সরবরাহ শুরু করে। ১৯৩৭ সালে উপমহাদেশের একমাত্র ড্রাই আইস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয় (রাজবাড়ি সরকারি কলেজের পশ্চিমে)।১৯৫১ সালে বিনোদপুরে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রাজবাড়ি সরকারি কলেজ। এভাবে রেল, সড়ক যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে ওঠায় রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে রাজবাড়ি পূর্বের ন্যায় গোয়ালন্দ মহকুমা নামে শাসনকাজ চলতে থাকে। ১৯৮২ সাল থেকে থানাসমূহ উপজেলা ব্যবস্থার অধীনে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা হতে থাকে। গোয়ালন্দ উপজেলা, রাজবাড়ি উপজেলা, পাংশা উপজেলা, বালিয়াকান্দি উপজেলা পর্যায়ক্রমে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা ও উদ্বোধন করা হয়। সকল থানা, উপজেলায় রুপান্তরের পর ১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে সাবেক ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমাকে রাজবাড়ি জেলা-ঘোষণা করা হয়। রাজবাড়ি জেলা ঘোষণাকালে মহকুমার নাম গোয়ালন্দ থাকায় গোয়ালন্দ জেলা ঘোষণার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে তোলা হয়। বাদ প্রতিবাদ, আলোচনা মীমাংশায় শেষে গোয়ালন্দ মহকুমা রাজবাড়ি জেলায় রুপান্তর লাভ করে। গোয়ালন্দ মহকুমার শেষ মহকুমা প্রশাসক নুরুল মোমেন এবং প্রথম জেলা প্রশাসক সহিদউদ্দিন আহমেদ।

Additional information