জেলা গঠনের ইতিহাস - পৃষ্ঠা নং-৯

প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজ রাজাদের কেচ্ছা-কাহিনী, শাসন-শক্তি, আচার-স্বেচ্ছাচার আমাদের পাঠ্য ও পাঠের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজা বলতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী কোনো ব্যক্তিকে বোঝান হয়। ইংরেজি কিং (King) বাংলা ভাষায় রাজা। তবে ‘রাজা’ শব্দটি বুৎপত্তিগত অর্থ বহন করে। সম্ভবত ‘রাজন’ শব্দ থেকে রাজা শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীনকালে ভূপতি, স্থপতি, বিশিষ্ট ব্যক্তি রাজন বা মহাজন বলে আখ্যাত হতেন।

রাজা শব্দটি এমন অর্থ বহন করলেও মধ্যযুগে বিশেষ করে সুলতান, মোগল এবং ইংরেজ শাসনকালে ভুম্যাধিকারী, ভূপতি, সেনাপতির নামের পূর্বে ‘রাজা’  ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। দেশের বা অঞ্চলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার যিনি অধিকারী তিনিও রাজা আবার মূল রাজার অধিকার স্বীকার করে যিনি অঞ্চলের অধিপতি তিনিও রাজা। বাংলার বারভূঁইয়ারাও রাজা বলে পরিচিত হতেন। মোগল ও বৃটিশ যুগে এলাকার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যারা বিপুল পরিমাণ ভূমির অধিকারী হতেন তারাও সাধারণ্যে রাজা বলে পরিচিত হতেন। আবার অনেকে জমিদার সুকর্মের জন্য রাজা খেতাবে ভূষিত হতেন। ঐতিহ্যবাহী এ ‘রাজা’ শব্দটি দ্বারা কোনো ভূপতি বা শাসক ইতিহাসের পাতায় বিশেষ গুরুত্বে স্মরণীয়। তাদের কারুকার্যময় ও শিল্পনৈপুণ্যের প্রাসাদের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিপুল আয়োজনের কর্মপ্রবাহ সাধারণ্যে যখন বিশেষ পরিচিতি লাভ করে তখন সে বাড়ি ‘রাজবাড়ি’ হিসেবে দূর বহুদূরে পরিচিতি পায়। নাটোর রাজবংশের রামজীবনের পুত্র রাজা রামকান্ত এবং তাঁর স্ত্রী রানী ভবানীর ঐতিহ্যবাহী বাড়ি নাটোরের ‘রাজবাড়ি’ বলে সর্বমহলে পরিচিত। অনুরুপ বিক্রমপুরে ভূঁইয়া রাজ চাঁদ রায়, কেদার রায়ের ‘রাজবাড়ি’ আজও ঐতিহ্য বহন করছে।

বাংলাদেশর ৬৪টি জেলার মধ্যে কেবলমাত্র একটি জেলার এরুপ পরিশীলিত ও ঐতিহ্যবাহী নাম দেখা যায়, তাহল----রাজবাড়ি জেলা। রাজবাড়ি জেলার নামের প্রশ্নে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কোনো সময়ের বা কোনো রাজার বাড়ি থেকে স্থানটি তো বটেই জেলার নামকরণে তা দেশ থেকে দেশান্তরে পরিচিত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত কী? তার পূর্বে কিঞ্চিত আলোচনা প্রয়োজন।

সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য ইতিহাস হিসেবে স্বীকৃত। গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয়। ২য় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। দ্বিতীয় খণ্ডের ২৯পৃষ্ঠায় ৪৮ নং পাদটিকায় দেখতে পাই, ‘মোরাদ সম্ভবত খানখানাপুরে অবস্থিতি করিতেন। কেহ কেহ অনুমান করেন নিকটবর্তী রাজবাড়িতে কোনো বিদ্রোহী রাজার রাজধানী ছিল (Riza-us-Salatin P-42)। মোরাদ খাঁ সম্বন্ধে আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর - খুলনার ইতিহাস নুরুল ইসলাম (CSP) কর্তৃক ফরিদপুর গেজেটিয়ার -১৯৭৭, এল,এন মিশ্রের বাংলায় রেলভ্রমণ, তমিজউদ্দিন খান লিখিত The Test of time-my days and life', রেজউস-সালাতিন ও আকবর নামা থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে, মোরাদ খান খানখানাপুরে থেকেই ফতেহাবাদ শাসন করতেন।

উল্লেখ্য বর্তমান খানখানাপুরের পূর্ব নাম খান-ই-খানানপুর। খান-ই-খানান তৎকালীন সেনানায়কদের বিশেষ উপাধি। মোরাদ খান স্থানীয় পাঠান বিদ্রোহ দমনে খান-ই-খানান উপাধিপ্রাপ্ত হলে স্থানটির নামও হয় খান-ই-খানানপুর যা বর্তমানে খানখানাপুর। সম্রাট আকবরের শাসনকালে সেনাপতি মুনেম খাঁ (১৫৭৪) বঙ্গে আসেন। তখন মোরাদ খাঁ নামক একজন সেনানী তার সহচর ছিলেন। তিনি ফতেহবাদ সরকারের বিদ্রোহ দমন করেন। ভূষণা ছিল তখন এই সরকারের জমিদারী। জমিদার ছিলেন পাঠান দাউদ।

Additional information