জেলা গঠনের ইতিহাস

জেলা গঠনের ইতিহাস ও প্রাচীন কয়েকটি গ্রাম

প্রশাসনের শুরুটা হয়েছিল রাজার শাসন ও রাজস্ব আদায়ের মধ্য দিয়ে । ধারাটি বর্তমানেও বহাল আছে। তবে প্রশাসন ও রাজস্ব আদায়ের কর্মকৌশল ভিন্ন। বর্তমানে রাজস্ব প্রাপ্তির নানা খাত ব্যবহহৃত হলেও অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের একমাত্র খাত ছিল উৎপাদনশীল ভূমি। ভূমিনির্ভর রাজস্ব আদায়ে তাদের সামান্তশাসক বা সামন্তরাজা বলে আখ্যায়িত করা হয়। সে সময়ে গ্রামীণ জীবনে কিছু নগরও গড়ে উঠেছিল। গ্রামগুলো গ্রাম প্রধান, পঞ্চায়েত বা গ্রাম পরিষদ দ্বারা শাসিত হত। আর নগর শাসিত হত নগরপাল দ্বারা। এ ছাড়া সমগ্র রাজ্যকে আবার ভুক্তি বিষয়, বিথী, মণ্ডল, তালক ইত্যাদি ভাগ করে মূল রাজার অধীনে সামন্ত রাজা দ্বারা শাসন করা হত। ৭ম শতকের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে দ্রোণমুখ, সর্বতিবন সংগ্রহণ ইত্যাদি বিভক্তির নাম পাওয়া যায়।

ত্রয়োদশ শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত সুলতান মোগল, পাঠান, নবাব শাসনকালে ইকলিম, আরসা, চাকলা, সুবা, পরগনা, মৌজা ইত্যাদি প্রশাসনিক ইউনিটের বিভক্তি ছিল। মৌজা ছিল ইউনিটের ষেশ স্তর। তখন সমগ্র সম্রাজ্য কয়েকটি সুবায় (প্রদেশ) বিভক্ত হত। সুবা-চাকলায় এবং চাকলা বিভক্ত হত পরগনায়। অনেকগুলো মৌজা বা গ্রাম নিয়ে গঠন করা হত পরগনা। রাজস্ব আদায় হত পরগনাভিত্তিক। চাকলা ছিল রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র। জমিদার ও স্থানীয় রাজাদের সাহয্যে রাজস্ব আদায় হত। রাজস্ব আদায়, ভূমি জরিপ ও প্রশাসন সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত থাকতেন একজন কানুনগো। শাসন কার্য ও বিচারকার্য পরিচালিত হত ফৌজদার, মুন্সেফ ও কাজির দ্বারা। বেশির ভাগ পরগনার প্রধান থাকতেন মুন্সেফ। পরগনার প্রধান হিসেবে রাজস্ব নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। গ্রামের প্রশাসন গড়ে উঠেছিল গ্রাম রক্ষক, হিসেবে রক্ষক ও পাটোয়ারী দ্বারা। পাঠান সুলতান শের শাহ প্রথম ভারতের ভূমি জরিপ করেন যার মধ্যে বাংলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি কবলিয়ত ও পাট্রার মাধ্যমে প্রজার ভূমিস্বত্ব প্রদান করেন। সম্রাট আকবরের সময়ে রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল রাজস্ব ও প্রমাসন ব্যাবস্থাপনার পুনর্গঠন করে ৩৩টি সরকার বা রাজস্ব আদায় বিভাগে বিভক্ত করেন। রাজস্ব আদায় বিভাগ বিভক্ত হয় পরগানায়। রাজবাড়ি এ সময় মাহমুদাবাদ সরকারে অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং রাজবাড়ি জেলার বিভিন্ন অংশ নসিবশাহী, মহিমশাহী, নশরৎশাহী, কাসিম নগর, বিরাহিমপুর পরগনার অন্তর্ভুক্ত হয় (বৃটিশ শাসনকালে বেলগাছি ও বাণীবহ আরো দুটি পরগনার সৃষ্টি হয়)। সম্রাট আকবরের সময়ে বঙ্গে বার ভূঁইয়াদের উত্থানকালে ভূষণা চাকলার মকুন্দ রায় প্রবল হয়ে ওঠেন। মুকুন্দ রায়ের অধীনে রাজবাড়ি শাসিত হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে সংগ্রাম সাহকে মগ, পর্তুগীজ জলদস্যু দমনের জন্য পাঠানো হয়। জলদুস্যু দমনের কৃতিত্বের জন্য সংগ্রাম সাহকে নাওয়াড়া মহল (রাজবাড়ির কিয়দংশ) ও ভূষণা প্রদান করা হয়। সংগ্রাম সাহ দীর্ঘ সময় অত্র অঞ্চল শাসন করেন (সংগ্রাম সাহ আলোচিত)। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শীদকুলি খাঁ সরকারগুলোকে ১৩টি চাকলায় বিভক্ত করেন। ঢাকা চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল সোনারগাঁ, বাকলা (বাকেরগঞ্জ), বাজুহা (নোয়াখালি) ফতেহবাদ, ভূষণা (বর্তমান মধুখালি উপজেলা)। মুর্শীদকুলি খাঁর সময়ে মুহম্মদপুরে রাজা সীতারামের উত্থান ঘটে। রাজা সীতারামের শাসনভুক্ত ভূষণা চাকলার অন্তর্গত রাজবাড়ি সীতারামের দ্বারা শাসিত হয়। আকবর বাদশাহের রাজত্বকালে মহাত্মা টেডরমল কর্তৃক বঙ্গদেশকে ৩৩টি সরকারে বিভক্ত হইয়া রাজস্ব আদায়ের কার্য চালিতে থাকে। উহার আওরঙ্গজেব বাদশাহের সময়ে মুর্শীদকুলি খাঁ যখন বাংলার শাসনকার্য আরম্ভ করেন তৎকালে ঐ চাকলার পরিবর্তে বঙ্গদেশকে ২৭টি সরকারে বিভক্ত করিয়া রাজস্ব আদায়ের সুবিধা করিয়া লন। তৎমধ্যে চাকলে জাহাঙ্গীনগর ও চাকলে ভূষণার কতকাংশ লইয়া ফরিদপুর জেলার সংগঠন হইয়াছে। এই চাকলা বিভাগ ভূষণার সীতারাম একজন প্রবল প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন।


ভূষণা চাকলা কয়েকটি স্থাননাম :

কোষাখালি, হোগলাডাঙ্গী, হাবাসপুর, মদাপুর, গুলিশপুর, বেলগাছি, কালিকাপুর, বালিয়াকান্দি, নাড়ুয়া, গোব্রাখালি, সোনাপুর, বহরপুর, কৃষ্ণপুর, বাণীবহ, রাজধরপুর, বসন্তপুর, রাজাপুর। (আনন্দনাথ রায়, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৮৬) সীতারামের পরাজয়ের পর মুর্শীদাবাদ নবাবের অধীনে অত্র অঞ্চলটি নলদী বিভাগে ভূষণা চাকলার নশরতশাহী ও কাশিমনগর পরগনা নাটোর রাজ রামজীবনের মালিকানায় রাজস্ব আদায় হতে থাকে। এ সূত্রে অঞ্চলটি রাজা রামকান্ত ও তার স্ত্রী রানী ভবানীর জমিদারীভুক্ত ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ শাসনভুক্ত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসে। কিন্তু চতুর ইংরেজরা কৌশলে শাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তারা রাজ্যের ভূমির কর্তৃত্বভার গ্রহণ করে ১৭৬৫ সালে। এ সময় থেকে শাসন ও রাজস্ব উভয়বিধ কর্তার মালিক হন বৃটিশ।

এ সময় ঢাকায় নায়েবে নাজিম সৈয়দ মোহামম্মদ রেজা খান বেতনভোগী হন এবং ঢাকার শেষ নবাব গাজীউদ্দিন বাহাদুরের জন্য মাসোহারা নির্দিষ্ট হয়। ১৭৬৯ সালে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য কোম্পানির পক্ষে একজন সুপারভাইজার নিযুক্ত করা হয়। ১৭৭২ সালে সুপারভাইজারের পরিবর্তে ‘কালেক্টর’ নামকরণ করা হয়। এ সময় রাজস্ব প্রশাসন এবং বিচার কাজের জন্য ‘হুজুরী’ ও ‘নজামত’ এই দুইভাগে ভাগ করা হয়। হুজুরী মুর্শীদাবাদের দেওয়ানের অধীনে ছিল। ঢাকায় নিযুক্ত একজন প্রতিনিধি দ্বারা দেওয়ানের কাজ করা হত। এই ব্যাক্তির হাতে রাজস্ব এবং তৎসম্পর্কীয় মোকদ্দমার ভার ছিল। নেজামত বিভাগে দেওয়ানী ও ফৌজদারী নিস্পন্ন হত। এই বছর রেজা খাঁর পরিবর্তে দেওয়ানী অফিস কোম্পানি কর্তৃক গৃহীত হয় এবং দেওয়ানী আদালত নামে একটি কোর্ট স্থাপিত হয়। কালেক্টর তার অধীনে কাজ করতে থাকেন। ১৭৭৪ সালে প্রভিন্সিয়াল কাউন্সিল স্থাপিত হলে তার অধীন কর্মচারী কর্মচারী দ্বারা রাজস্ব আদায় করা হতো। ১৭৮১ সালে কাউন্সিল উঠে যায়। এ বছরই মি. ডে সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর নিযুক্ত হন। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে কালেক্টরগণ ম্যাজিস্টেট পদপ্রাপ্ত হন। ১৭৯৩ সালে জজ ও ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যভার একজনের উপর ন্যাস্ত করা হয়। ১৭৮১ সাল থেকে শাসন ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক ডেপুটি কালেক্টর নিযুক্ত হতে থাকে। কালেক্টরের জন্য স্থানীয় ভাবে অফিস, আদালত স্থাপন করা হয়। কালেক্টরেটরের এলাকা ১৭৮৬ সাল থেকে ডিস্টিক বা জেলা হিসেবে নামকরণ হতে থাকে। ডিস্ট্রিক্ট এর কার্যভার ডেপুটি কালেক্টরেটরের উপর ন্যাস্ত থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা-জালালপুর, যশোহর, চট্রগাম, নদীয়া, পুর্ণিয়া, বর্ধমান জেলা গঠিত হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য জেলা সৃষ্টির ফলে পূর্ববাংলায় জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭টি। এসব জেলাকে আবার মহকুমায় (Sub-division) উপবিভক্ত করে মহকুমা প্রশাসক (Sub-divisional officer--SDO) নিযুক্ত করা হয়। তবে মহকুমা সৃষ্টির পূর্বে ও পরে থানা (Police Station) ও ফাঁড়ি স্থাপন হতে থাকে। ১৭৯০খ্রিস্টাব্দে কালেক্টরগণ ম্যাজিস্ট্রেট পদ লাভ করেন।

অতঃপর ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকালে রাজবাড়ি জেলার তৎকালীন নসিবশাহী (বর্তমান রাজবাড়ি ও গোয়ালন্দ উপজেলার অংশত) নশরতশাহী (পাংশা উপজেলার অংশত) মহিমশাহী (বালিয়াকান্দি ও পাংশা উপজেলার অংশত), বেলগাছি (পাংশা ও রাজবাড়ি জেলার অংশত) যশোহর কালেক্টরেটর অধীনে নেওয়া হয়। ফরিদপুর যুক্ত হয় ঢাকা জালালপুরের সঙ্গে।

পরগনাসমূহের ভূমি ও ধার্য রাজস্বের পরিমাণ-----


জমিদারী

পরগনা               ভূমির পরিমান          রাজস্বের পরিমাণ

মহিমশাহী            ৩৫৮৮৯ একর         ১৩৪৬৯ টাকা

নশরতশাহী           ৩৫০৮৭ একর          ৮০৭৮ টাকা

নসিবশাহী            ৪৩০৩৯ একর           ১৫৮২১ টাকা

বেলগাছি              ১৯৮৩২ একর          ৭৫৭১ টাকা

খারিজা তালুক

পরগনা                ভূমির পরিমাণ             রাজস্বের পরিমাণ

মহিমশাহী             ১১৫৪২ একর              ৩০৬৫ টাকা

নশরতশাহী            ৪৭৭৫ একর               ১১৯৩ টাকা

নসিবশাহী             ২০৩০০ একর             ৬৯০০ টাকা

বেলগাছি               ১১৮১ একর               ৩৫৭ টাকা

(সূত্র : বাংলাদেশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার ফরিদপুর নুরুল ইসলাম খান সিএসপি-১৯৭৭, পৃষ্ঠা-২৭০)

নলদীর জমিদারী যশোর কালেক্টর কর্তৃক নিলামে বিক্রি করা হয়। এ সময় ভৈরবনাথ রায় নসিবশাহী ও নলদীর জমিদারী যথাক্রমে ১৬৯৩৭ ও ৩৬৭৬০ টাকার রাজস্ব মূল্যে ক্রয় করেন (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-১১১)।

ফরিদপুর জেলা স্থাপিত হওয়ার পূর্বে ফরিদপুর ছিল ঢাকা জালালপুরের অধীন। ১৮১১ ঢাকা জালালপুরের ম্যাজিস্ট্রেট অফিস ঢাকা থেকে ফরিদপুরে স্থাপিত হয়। এ সূ্ত্রে ১৮১১ সাল ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত যুক্তিযুক্ত বলে অনেকেই মনে করেন। ঐ সালেই চন্দনা নদীর পূর্বতীরবর্তী স্থান যশোর হতে খারিজ হয়ে ঢাকা জালালপুরের সাথে যুক্ত হয়। চন্দনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী স্থান বলতে বর্তমান গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি উপজেলার সমগ্র এবং বালিয়াকান্দি ও পাংশা থানার অংশ বোঝায়। চন্দনা নদীর পশ্চিমাংশ অর্থাৎ বালিয়াকান্দি ও পাংশা উপজেলার অংশ বিশেষ নদীয়া জেলার সাথে সংযুক্ত হয়। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত রেভিনিউ ও ম্যাজিসট্রীয়ালের আওতায় পার্থক্য ছিল না। তবে এ সময় রাজবাড়ি জেলার চন্দনা নদীর পূর্বাংশে ফরিদপুর ম্যাজিস্ট্রীয়ালের অন্তর্ভুক্ত হয়। চন্দনা নদীর পশ্চিমাংশ বিশেষ বর্তমান পাংশা উপজেলা পাবনা ম্যাজিস্ট্রীয়াল ও রেভিনিউ জুড়িডিকশনের অধীন থাকে। গোয়ালন্দ নদী ভাঙ্গনে চর জেগে উঠলে দিয়ারা জরীপের মাধ্যমে পদ্মা সংলগ্ন এলাকা পাবনা এবং জেলার দক্ষিণের গড়াই সংলগ্ন এলাকা যশোহরের রাজস্বভুক্ত করা হয়। ১৯০৪ ও ১৯১৪ সালে আরো একটি জরীপ হয়। ১৯২৮, ১৯৩৮, ১৯৪০ সালে প্রজাদের স্বত্ব আরোপে ভূমি জরীপ অনুষ্ঠিত হয়। এর পূর্বে ১৮৮০ সালে  জরীপ অনুষ্ঠিত হয় যা CS রেকর্ড বলে পরিচিত। ইংরেজ শাসনের পর ১৯৫০ সালে ইস্ট বেঙ্গল স্টেট এ্যাকুইজিশন এ্যাক্ট পাশ হয় যা ‘১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইন’ বলে পরিচিত। এ আইনের বলে জমিদারী প্রথা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। রায়ত বা প্রজার স্বত্ব কার্যকর হয়। ১৯৬২ সালে ভূমি জরীপ রেন্ট রোল বা RS বলে পরিচিত ভূমি জরীপ।


সাধারণ প্রশাসনে তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় ৪ মহকুমায় বিভক্ত থাকে যথা----ফরিদপুর সদর, গোয়ালন্দ, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ। গোয়ালন্দ মহকুমার হেডকোয়ার্টার থাকে রাজবাড়িতে। ১৯৪৭ এর পূর্বে সাধারণ জেলা প্রশাসন ডেপুটি কমিশনারের হাতে ন্যাস্ত থাকে। তিনি জেলার প্রশাসন ও রাজস্ব উভয়ের প্রধান থাকেন। ডিপুটি কমিশনার জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার সাহায্যকারী হিসেবে নিয়োজিত থাকতেন দুইজন অতিরিক্ত ডিপুটি কমিশনার। প্রতিটি মহকুমায় থাকতেন একজন মহকুমা প্রশাসকের উপর সাধারণ ও রাজস্বভার ন্যাস্ত থাকত। মহকুমায় ছিলেন আরো একজন সাবডিভিশনাল ম্যানেজার (SDM) যিনি রাজস্ব প্রশাসনে মহকুমা প্রশাসককে সাহায্য করতেন। প্রশাসনিক ইউনিটে গোয়ালন্দ মহকুমায় গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি বালিয়াকান্দি, পাংশা থানা ছিল। প্রতিটি থানায় ছিলেন দুইজন সার্কেল অফিসার (CO Rev ও CO Dev)। পুলিশ প্রশাসনের প্রধান থাকতেন একজন পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট (SP)এবং মহকুমায় থাকতেন মহকুমা পুলিশ অফিসার (SDPO)।

রাজবাড়ি জেলা গঠনের ইতিহাস পর্যালোচনায় ফরিদপুর জেলা সংস্থাপন তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সাবেক ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার সমগ্র এলাকা (বর্তমান মধুখালি ব্যতিরেকে) নিয়েই রাজবাড়ি জেলা। ফরিদপুর জেলা গঠন বিষয়ে দীনবন্ধু রায় চৌধুরী ‘পরিচয়’ গ্রন্থে জেলার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘১৮১১ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর কাচারীগৃহ নির্মিত হয়। তখন পর্যন্ত ঐ জেলাকে ঢাকা জালালপুর বলিত এবং তাহার সদর স্টেশন ঢাকা নগরীতে ছিল। ১৮৩৩ হইতে ১৮৩৮ খ্রি. অব্দের মধ্যে ঐ জেলার নাম ফরিদপুর হয়।’ এ বিষয়ে আনন্দনাথের কথায় ‘১৮৩৫ এরমধ্যে কোনো এক সময় ঢাকা জালালপুর ‘ফরিদপুর’ নামে পরিচিত হয়। ফরিদপুর জেলা সংস্থাপনের পর থেকে ১৮৭১ এ ফরিদপুর জেলা পুনর্গঠনের পূর্ব পর্যন্ত চন্দনা নদীর পূর্ববর্তী অঞ্চল নসিবশাহী, বাণীবহ, বেলগাছি, রামদিয়া, কাসিমনগর পরগনা ফরিদপুর কালেক্টরেটের অধীন হয়। মহিমশাহী, নশরতশাহী পরগনার অংশ বিশেষকুষ্টিয়া, পাবনা ও যশোহর কালেক্টরেটের অধীনে থাকে। ১৮৫৪ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ফরিদপুরের বিবরণ এবং ১৮৬৭ সালে ই-ই লুইস কর্তৃক প্রদত্ত বিবরণে পরগনাসমূহের নিম্নরুপ জমিদারী মালিকানা দেখা যায়।

পরগনা            :        মালিকানা (জমিদারী)

নসিবশাহী         :         বাবু নিমাইচাঁদ সান্যাল

বেলগাছি          :         রামরত্ন রায় (রামরত্নের নামে রতনদিয়ার নামকরণ)

                              করিম বক্স চৌধুরী (ইউসুফ হোসেন চৌধুরীর পিতা)

মহিমশাহী         :          রবাট সাহেব

বাণীবহ           :           শ্যামশংকর মজুমদার

                               গিরীজাশংকর মজুমদার

                               প্রাণশংকর মজুমদার

হমদমপুর        :             গঙ্গানারায়ণ পণ্ডিত


রামদিয়া         :              রামকুমার কুণ্ডু

পাঁচুরিয়া         :              মি. রেমি

১৮৭১ সালে ফরিদপুর সীমানা পুনর্গঠিত হয়। এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঐ বছর গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর জগতি-গোয়ালন্দ রেললাইন বসে। এ সময় ফরিদপুর জেলার সীমা নিম্নরুপ দাঁড়ায়। ‘উত্তর ও ঈষৎ পূর্বদিকে পদ্মা, পূর্বদিকে মেঘনা, দক্ষিণভাগে গৌরনদী থানা ও নয়াভাঙ্গানী নদী, পশ্চিমে মধুমতি (গড়াই) ও বায়াশিয়া নদী ও কুষ্টিয়া সাবডিভিশন।’ (আনন্দনাথ রায় পৃষ্ঠা-১১৮)।

ফরিদপুর জেলা পুনর্গঠনকালে গোয়ালন্দ মহকুমার সীমানা নির্ধারিত হয়। পশ্চিমে ‍কুষ্টিয়া জেলা, দক্ষিণে গড়াই নদী, পূর্বে ফরিদপুর সদর, উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে পদ্মা সীমানা চিহ্নিত এলাকা নিয়ে গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৭১ সালে হান্টারের ফরিদপুর জেলার থানার তালিকায় গোয়ালন্দ মহকুমার থানা ছিল গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা। (ফরিদপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, জালাল আহম্মেদ, পৃষ্ঠা-৩০)।

বালিয়াকান্দি থানা স্থাপন ১৮৮৪ (আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-১১৯)। তবে ঈশ্বচন্দ্র গুপ্তের বর্ণনা মতে ফরিদপুর জেলায় ১৮৫৪ সালে ৭টি পুলিশী থানা ও দুটি ফাঁড়ি ছিল। ৭টি থানার একটি ছিল বেলগাছি। আর দুটি ফাঁড়ির মধ্যে একটি ছিল ধাওয়াপাড়া। ১৮৬৭ সালে ই-ই-লুইসের বর্ণনাতেও বেলগাছি থানা এবং ধাওয়াপাড়া ফাঁড়ির উল্লেখ আছে। ১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ মহাকুমা এবং সদর গোয়ালন্দ, বেলগাছি ও পাংশা থানা স্থাপন হয়। ঐ সালেই বর্তমান উড়াকান্দা হাটের প্রায় ১০ কিমি উত্তর পূর্বে (কথিত গোয়ালিশ ল্যান্ড) গোয়ালন্দ মহকুমার অফিস, কাচারি এবং রেল স্টেশন স্থাপন হয়। এ সময় থেকে মহকুমার কাজ শুরু হয়। এ সময় রাজবাড়ি কোনো থানাও নয়। লক্ষীকোল, বিনোদপুর, কাজীকান্দা, সজ্জনকান্দা, চককেষ্টপুর, বলুয়ার চর, কুমোরপাড়া, গ্রাম সমষ্টি মাত্র। তবে লক্ষীকোল রাজা সূর্যকুমার এবং বাণীবহ জমিদার গিরীজাশংকর মজুমদার অত্র এলাকায় নানা স্থাপনা গড়ে তোলেন। লক্ষীকোল সূর্যকুমারের সুরম্য প্রাসাদ, তৎসংলগ্ন পোস্ট অফিস, হাসপাতাল স্থাপন (বর্তমান সিভিল সার্জনের বাসা যেখানে) এবং বাণীবহের জমিদার কর্তৃক কাচারী স্থাপন, খ্রিস্টান পাদ্রীদের দ্বারা গীর্জা এবং পাদ্রীদের বাসস্থানের জন্য দোতলা দালান (বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি কলেজের দোতলা অফিস বিল্ডিং) নির্মাণে এলাকাটিকে উন্নত জনপদে পরিণত করে। বিনোদপুর সংলগ্ন বাজার গড়ে ওঠে। সকলে একে বিনোদপুর বাজার বলত। তবে পূর্ব থেকেই এলাকাটি রাজবাড়ি নামে পরিচিত থাকায় একে রাজবাড়ি বাজারও বলা হত। ১৮৭১ গোয়ালন্দ মহকুমা স্থাপনের পরই পদ্মার ভাঙ্গন শুরু হয়। অফিস কাচারি কয়েকবার সরানো হলেও ঘাটের ভাঙ্গনে মহকুমার স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব হল না। শেষে ১৮৭৫ থেকে ১৮৮০ সালের কোনো এক সময়ে গোয়ালন্দ মহকুমার অফিস স্থাপনা রাজবাড়িতে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয়।

এ সকল স্থাপনার বেশির ভাগ জমির মালিক ছিলেন নারায়ণচন্দ্র চক্রবর্তীর পিতা ও মোহর মোল্লা অফিস আদালত রাজবাড়ি গড়ে উঠলেও কালেক্টরেটর সকল কাজ গোয়ালন্দ নামেই করা হত। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের পূর্বের নাম গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল। ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ নামই বহাল থাকে। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে কালেক্টরেট ভবন, কোর্ট বিল্ডিং, সাবডিভিশন পুলিশ কার্যালয়, হাজত খানা নির্মিত হয়।


এসব অফিসের নামকরণও হয় গোয়ালন্দ মহকুমার নামে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা হওয়ার পূর্বে গোয়ালন্দ মহকুমার নামের পরিবর্তন হয় না। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সালের ভূমি জরিপের পর যে নক্সা প্রণয়ন করা হয় তাতে রাজবাড়িকে ‘গোয়ান্দ নাথা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উক্ত নক্সায় চককেষ্টপুর সজ্জনকান্দা বিনোদপুর, লক্ষীকোল, ধুঞ্চি মৌজাসমূহে গোয়ালন্দ থানা অধীনে জরিপ করা হয় (১৯৪০-১৯৪২ এর নক্সা দ্রষ্টব্য)। ১৮৯০ সালে রেলস্টেশন ও রেলের অফিস এবং কার্যাদি রাজবাড়ি নামে শুরু হয়। (১৮৭১ সালে যখন গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেল স্থাপন করা হয় তখন রাজবাড়ি স্টেশন স্থাপিত হয়নি (রেল অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। মহকুমা প্রশাসক কার্যালয় ও রেল স্থাপনসহ অন্যান্য অফিস বিদ্যালয় স্থাপনার ফলে রাজবাড়ি শহরে রুপলাভ করতে থাকে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার শ্রেণি চিরস্থায়ী মালিকানা লাভ করায় এ সব জমিদার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদারদের নিকট জমি পত্তন দিয়ে রাজধানী শহর কলিকাতায় আরাম আয়েশে কালযাপন করতে থাকে। ফলে পত্তনিদার, দরপত্তনিদার তেপত্তনিদার এমন কি ছেপত্তনিদার মধ্যস্বত্বভোগী পরগাছা জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। আবার অনেক জমিদারের খাজনা পরিশোধের অপারগতায় জমিদারী নিলাম হয়ে যায়। ফলে নব্য জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এ সময় বাণীবহ ও লক্ষীকোল দুটি নব্য জমিদার পরিবার বিশেষ করে গিরীজাশংকর মজুমদার এবং রাজা সূর্যকুমার শহর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। রাজা সূর্যকুমার কর্তৃক ১৮৮৮ সালে আরএসকে এবং গীরিজাশংকর মজুমদার কর্তৃক ১৮৯২ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে রাজবাড়ি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থায়ী রেল ব্যবস্থাপনায় রাজবাড়ি কলিকাতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। গড়ে ওঠে হোটেল, রেস্ট হাউস, ক্লাব। রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের নানা স্থান থেকে আগত ও প্রত্যাগত নানা মানুষের ভিড়, পণ্য চলাচল, রাজবাড়ির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। গোয়ালন্দের ঐতিহ্যবাহী রুপালি ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই মাছ রেলযোগে দূর ভারতে রপ্তানি হতে থাকে। শুরু হয় বরফকল স্থাপন।

১৯১৩ সালে স্থানীয় সরকার আইনের অধীনে রাজবাড়ি ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। ১৯১৯ সালে আংশিক মিউনিসিপ্যাল কাজ শুরু হয় এবং ১৯২৩ সালে মিউনিসিপ্যালিটি পূর্ণরুপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৬ জন মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের দ্বারা তা পরিচালিত হত। ৫টি ওয়ার্ডে তা বিভক্ত ছিল। ১৯১৯ সালে মিউনিসিপ্যালিটি বিশুদ্ধ পানি (Filtered Water) সরবরাহ শুরু করে। ১৯৩৭ সালে উপমহাদেশের একমাত্র ড্রাই আইস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয় (রাজবাড়ি সরকারি কলেজের পশ্চিমে)।১৯৫১ সালে বিনোদপুরে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রাজবাড়ি সরকারি কলেজ। এভাবে রেল, সড়ক যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে ওঠায় রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে রাজবাড়ি পূর্বের ন্যায় গোয়ালন্দ মহকুমা নামে শাসনকাজ চলতে থাকে। ১৯৮২ সাল থেকে থানাসমূহ উপজেলা ব্যবস্থার অধীনে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা হতে থাকে। গোয়ালন্দ উপজেলা, রাজবাড়ি উপজেলা, পাংশা উপজেলা, বালিয়াকান্দি উপজেলা পর্যায়ক্রমে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা ও উদ্বোধন করা হয়। সকল থানা, উপজেলায় রুপান্তরের পর ১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে সাবেক ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমাকে রাজবাড়ি জেলা-ঘোষণা করা হয়। রাজবাড়ি জেলা ঘোষণাকালে মহকুমার নাম গোয়ালন্দ থাকায় গোয়ালন্দ জেলা ঘোষণার দাবি বিভিন্ন মহল থেকে তোলা হয়। বাদ প্রতিবাদ, আলোচনা মীমাংশায় শেষে গোয়ালন্দ মহকুমা রাজবাড়ি জেলায় রুপান্তর লাভ করে। গোয়ালন্দ মহকুমার শেষ মহকুমা প্রশাসক নুরুল মোমেন এবং প্রথম জেলা প্রশাসক সহিদউদ্দিন আহমেদ।


 মহকুমা ও জেলা প্রশাসকগণের তালিকা

মহকুমা প্রশাসক

ক্রনং     মহকুমা প্রশাসকগণ            হইতে          পর্যন্ত

১।   জনাব একিউএম মহিউদ্দিন                      ক্রমিক নং ০১ হতে

২।   মোঃ আব্দুস সালাম                                ১০পর্যন্ত মহকুমা

৩।   নাজমুল হক চৌধুরী                              প্রশাসকগণের তালিকা

৪।    কাজী আজাহার আলী                             মৌখিক তথ্যে

৫।    কাজী আজিজুল ইসলাম                           ভিত্তিতে সংগৃহীত।

৬।    মোঃ নাজিরুল হক                                         

৭।    এনএম আল মাসুদ

৮।    এনামুল হক

৯।   আফজাল কাহুত

১০।   জীবন খাঁ

১১। শাহ মোহাম্মদ ফরিদ         ২৬/০৩/১৯৭১       ২৮/০৪/১৯৭১

১২। মোঃ ফজলুল ওয়াহেদ        ১৭/১২/১৯৭১         ১৫/০২/১৯৭২

১৩। মোঃ আব্দুল মান্নান          ১৫/০২/১৯৭২         ০৬/০৬/১৯৭২

১৪। বদিউর রহমান             ০৬/০৬/১৯৭২          ২১/১০/১৯৭২

১৫। আব্দুল হাই সরকার         ২১/১০/১৯৭২           ১১/০৩/১৯৭৪

১৬। মোঃ ওমর ফারুক        ২৫/০৩/১৯৭৪            ২৩/১১/১৯৭৪

১৭। আব্দুর রউফ                ১৭/১২/১৯৭৪            ১৭/১০/১৯৭৫

১৮। মোঃ রুহুল হোসেন চৌধুরী ০১/১২/১৯৭৫           ২৪/০৭/১৯৭৬

১৯। মোঃ কেরামত আলী        ২৪/০৭/১৯৭৬           ১৩/১২/১৯৭৬

২০। মোঃ বদিউল আলম খান   ১৩/১২/১৯৭৬            ১২/০৬/১৯৭৯

২১। এম এ কাদের মিয়া         ১২/০৬/১৯৭৯           ০৯/০৬/১৯৮০

২২। আব্দুল জলিল                ১০/০৬/১৯৮০           ১৪/০১/১৯৮২


২৩। দেওয়ান আফছার উদ্দিন  ১৪/০১/১৯৮২             ১৪/০১/১৯৮৩

২৪। ম আঃ খায়ের               ১২/০৪/১৯৮৩            ১২/০৪/১৯৮৩

২৫। নুরুল মোমেন              ১২/০৪/১৯৮৩             ০১/০৩/১৯৮৪

জেলা প্রশাসক

ক্র নং জেলা প্রশাসক                 হইতে                          পর্যন্ত

০১। সহিদ উদ্দিন আহমেদ     ২৬/০২/১৯৮৪              ০৫/১০/১৯৮৬

০২। মোঃ নাজমুল আহসান    ০৫/০২/১৯৮৬              ২৫/০২/১৯৮৯

০৩। জিল্লুর রশীদ চৌধুরী      ২৫/০২/১৯৮৯             ০৮/০১/১৯৯১

০৪। মোঃ মমতাজ উদ্দিন      ০৮/০১/১৯৯১             ১৯/০৮/১৯৯২

০৫। চৌধুরী গোলাম মওলা    ১৯/০৮/১৯৯২             ০১/০৮/১৯৯৫

০৬। মোঃ ওয়াহিদুর রহমান (ভারপ্রাপ্ত) ০২/০৮/১৯৯৫   ২১/০৮/১৯৯৫

০৭। এএফএম মতিউর রহমান   ২২/০৮/১৯৯৫           ২৭/০৪/১৯৯৬

০৮। আমিরুল করিম            ২৭/০৪/১৯৯৬            ১৪/০৭/১৯৯৯

০৯। এএসএম হানিফ উদ্দিন সরকার। ১৫/০৭/১৯৯৯     ২৮/০৩/২০০১

১০। বেগম রাজিয়া বেগম        ২৮/০৩/২০০১            ২৫/০৪/২০০২

১১। বিজন কান্তি সরকার        ২৫/০৪/২০০২              ০১/০৯/২০০৪

১২। মুহাম্মদ নুরুল আলম       ০১/০৯/২০০৪              ০৩/০৯/২০০৬

১৩। মোঃ জামাল হোসেন মজুমদার ০৩/০৯/২০০৬        ১৯/১১/২০০৬

১৪। বেগম তৌহিদা বুলবুল     ১৯/১১/২০০৬              ২৬/০১/২০০৮

১৫। মহম্মদ মাহফুজুর রহমান ২৬/০১/২০০৮               ৮/০৪/২০০৯

১৬। ফয়েজ আহম্মেদ          ২৮/০৪/২০০৯                ০৭/০৪/২০১০

১৭। সৈয়দা সাহানা বারী       ২৭/০৪/২০১০                     বর্তমান

জেলার নামকরণ

কোনো রাজার ঐতিহ্যবাহী বাড়ির নাম যখন সর্বমহলে পরিচিত হতে হতে কাল-কালান্তরে ইতিহাসের উপাদানে পরিণত হয় তখন সে রাজা ও তার বাড়ি গবেষণার উৎস হয়ে ওঠে।


প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজ রাজাদের কেচ্ছা-কাহিনী, শাসন-শক্তি, আচার-স্বেচ্ছাচার আমাদের পাঠ্য ও পাঠের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজা বলতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী কোনো ব্যক্তিকে বোঝান হয়। ইংরেজি কিং (King) বাংলা ভাষায় রাজা। তবে ‘রাজা’ শব্দটি বুৎপত্তিগত অর্থ বহন করে। সম্ভবত ‘রাজন’ শব্দ থেকে রাজা শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীনকালে ভূপতি, স্থপতি, বিশিষ্ট ব্যক্তি রাজন বা মহাজন বলে আখ্যাত হতেন।

রাজা শব্দটি এমন অর্থ বহন করলেও মধ্যযুগে বিশেষ করে সুলতান, মোগল এবং ইংরেজ শাসনকালে ভুম্যাধিকারী, ভূপতি, সেনাপতির নামের পূর্বে ‘রাজা’  ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। দেশের বা অঞ্চলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার যিনি অধিকারী তিনিও রাজা আবার মূল রাজার অধিকার স্বীকার করে যিনি অঞ্চলের অধিপতি তিনিও রাজা। বাংলার বারভূঁইয়ারাও রাজা বলে পরিচিত হতেন। মোগল ও বৃটিশ যুগে এলাকার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যারা বিপুল পরিমাণ ভূমির অধিকারী হতেন তারাও সাধারণ্যে রাজা বলে পরিচিত হতেন। আবার অনেকে জমিদার সুকর্মের জন্য রাজা খেতাবে ভূষিত হতেন। ঐতিহ্যবাহী এ ‘রাজা’ শব্দটি দ্বারা কোনো ভূপতি বা শাসক ইতিহাসের পাতায় বিশেষ গুরুত্বে স্মরণীয়। তাদের কারুকার্যময় ও শিল্পনৈপুণ্যের প্রাসাদের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিপুল আয়োজনের কর্মপ্রবাহ সাধারণ্যে যখন বিশেষ পরিচিতি লাভ করে তখন সে বাড়ি ‘রাজবাড়ি’ হিসেবে দূর বহুদূরে পরিচিতি পায়। নাটোর রাজবংশের রামজীবনের পুত্র রাজা রামকান্ত এবং তাঁর স্ত্রী রানী ভবানীর ঐতিহ্যবাহী বাড়ি নাটোরের ‘রাজবাড়ি’ বলে সর্বমহলে পরিচিত। অনুরুপ বিক্রমপুরে ভূঁইয়া রাজ চাঁদ রায়, কেদার রায়ের ‘রাজবাড়ি’ আজও ঐতিহ্য বহন করছে।

বাংলাদেশর ৬৪টি জেলার মধ্যে কেবলমাত্র একটি জেলার এরুপ পরিশীলিত ও ঐতিহ্যবাহী নাম দেখা যায়, তাহল----রাজবাড়ি জেলা। রাজবাড়ি জেলার নামের প্রশ্নে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে কোনো সময়ের বা কোনো রাজার বাড়ি থেকে স্থানটি তো বটেই জেলার নামকরণে তা দেশ থেকে দেশান্তরে পরিচিত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত কী? তার পূর্বে কিঞ্চিত আলোচনা প্রয়োজন।

সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য ইতিহাস হিসেবে স্বীকৃত। গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয়। ২য় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। দ্বিতীয় খণ্ডের ২৯পৃষ্ঠায় ৪৮ নং পাদটিকায় দেখতে পাই, ‘মোরাদ সম্ভবত খানখানাপুরে অবস্থিতি করিতেন। কেহ কেহ অনুমান করেন নিকটবর্তী রাজবাড়িতে কোনো বিদ্রোহী রাজার রাজধানী ছিল (Riza-us-Salatin P-42)। মোরাদ খাঁ সম্বন্ধে আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর - খুলনার ইতিহাস নুরুল ইসলাম (CSP) কর্তৃক ফরিদপুর গেজেটিয়ার -১৯৭৭, এল,এন মিশ্রের বাংলায় রেলভ্রমণ, তমিজউদ্দিন খান লিখিত The Test of time-my days and life', রেজউস-সালাতিন ও আকবর নামা থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে, মোরাদ খান খানখানাপুরে থেকেই ফতেহাবাদ শাসন করতেন।

উল্লেখ্য বর্তমান খানখানাপুরের পূর্ব নাম খান-ই-খানানপুর। খান-ই-খানান তৎকালীন সেনানায়কদের বিশেষ উপাধি। মোরাদ খান স্থানীয় পাঠান বিদ্রোহ দমনে খান-ই-খানান উপাধিপ্রাপ্ত হলে স্থানটির নামও হয় খান-ই-খানানপুর যা বর্তমানে খানখানাপুর। সম্রাট আকবরের শাসনকালে সেনাপতি মুনেম খাঁ (১৫৭৪) বঙ্গে আসেন। তখন মোরাদ খাঁ নামক একজন সেনানী তার সহচর ছিলেন। তিনি ফতেহবাদ সরকারের বিদ্রোহ দমন করেন। ভূষণা ছিল তখন এই সরকারের জমিদারী। জমিদার ছিলেন পাঠান দাউদ।


দাউদের সাথে মুনমের সন্ধি হলে মোরাদ জলেশ্বরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। মুনেমের মৃত্যুর পর দাউদ পুনরায় বিদ্রোহী হলে মোরাদ পুনরায় ফতেহাবাদে প্রেরিত হন এবং দাউদকে দমন করেন। তিনি খানখানাপুরে রাজ্য স্থাপন করে ফতেহাবাদ শাসন করেতন। সম্ভাবত এই দাউদই সেই বিদ্রোহী রাজা। রাজবাড়ি বা নিকটবর্তী কোনো স্থানে তার ভূষণা রাজ্যের আঞ্চলিক রাজধানী  ছিল। এল,এন মিশ্র ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ের ম্যানেজার এবং ইতিহাস প্রিয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক লোক ছিলেন। তাঁর সংগ্রহের বিবরণ তিনি বাংলায় রেলভ্রমণ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন যা ১৯২৫ সালে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের একটি কপি বেড়াডাঙ্গা ৩নং রোড বসবাসকারী আমার স্নেহের ছাত্র নাসিমের (ঠিকাদার) সংগ্রহে আছে। উক্ত পুস্তকের ১০৯ পৃষ্ঠায় দেখতে পাই-----‘সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনকালে অত্র অঞ্চলে মগ পর্তুগীজ জলদস্যু দমনের জন্য রাজা সংগ্রাম সাহ অত্র অঞ্চলের নাওয়াড়া প্রধান হয়ে আসেন। তিনি বর্তমান বাণীবহ থেকে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। রাজবাড়ির অদূরে উত্তরে অবস্থিত পদ্মা তীরবতী লালগোলা নামক স্থানে তার দুর্গ ছিল। যা থেকে নামকরণ হয়েছে লালগোলা। লোকে বাণীবহসহ অঞ্চলটিকে রাজারবাড়ি বলত।’ সাহিত্য শেখর আনন্দনাথ রায় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার জপলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা ফরিদপুরের ইতিহাস প্রথম খণ্ড ও দ্বিতীয় খণ্ড গুরুত্বপূর্ণ দলিল। গ্রন্থ দুটি প্রায় শত বছর পূর্বে প্রকাশিত হয়।

সম্ভবত এটি ফরিদপুরের ওপর প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ। প্রাচীন ও ইতিহাসের প্রথম খণ্ডের আংশিক শরীয়তপুর সরকারী কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ সাহেবের নিকট থেকে সংগ্রহ করি। কিন্তু লেখাগুলি পুস্তকারে ছিল না, ছিল বিচ্ছিন্ন খাতার পাতার মতো। অক্টোবর ২০০৫ এ আনোয়ার ফরিদী বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো ছিটানো অংশটুকু সংগ্রহ করে তা গ্রন্থ হিসেবে  পুনঃমুদ্রণ করেন। গ্রন্থটি আমি ম্যাগনাম ওপাস,১২/আজিজ সুপার মার্কেট থেকে সংগ্রহ করি যা রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পুস্তক। (উক্ত গ্রন্থের ভূমিকায় বলা হয়েছে ‘সেন্টার ফর আর্কিওলোজিক্যাল স্টাডিজ এ্যান্ড ট্রেনিং ইস্টার ইন্ডিয়া ২০০১ এ প্রকাশিত)। বাংলা সাময়িক পত্র ‘প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চর্চা পথিৃকৎ প্রবন্ধপঞ্জী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, ফরিদপুরের ইতিহাসের ২য় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর (RSK) ইনস্টিটিটউশনের প্রধান ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের নাতি অধির কুমার চক্রবর্তী বন্ধুবর প্রফেসর নিত্যরঞ্জন ভট্রাচার্যের (প্রাক্তন অধ্যাক্ষ, বাগেরহাট সরকারি মহিলা কলেজ) মাধ্যমে আমাকে পাঠান। বর্তমানে ড. তপন বাগচী সম্পাদিত উভয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে।

আনন্দনাথের ফরিদপুরের ইতিহাস থেকে উদ্ধৃত, ‘রাধাগঞ্জের ভরাট স্থান এখন রাধাগঞ্জের বা পেঁয়াজঘাটার বিল নামে প্রসিদ্ধ। যাহা হউক নাওয়াড়া চৌধুরীগণ নানা উপদ্রবের আশংকায় পাঁচথুবি পরিত্যাগ করিয়া প্রায় দুই শতক বছর পূর্বে (বর্তমানে তা প্রায় ৩৫০ বছর) বাণীবহে আগমন করেন। বাণীবহ গ্রাম উত্তর দক্ষিণে সাড়ে তিনি মাইল, পূর্ব পশ্চিমে তিন মাইল হইবে। এই গ্রামে রাঢ়ী ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ প্রায় সাত আটশত ঘর। বৈদ্য প্রায় দইশত ঘর। কায়স্থ ও অন্যান্য জাতি প্রায় আড়াইশত ঘর বলে জানা যায়। এই গ্রাম এরুপ জনতাপূর্ণ ছিল যে, কাহারও বহিরাঙ্গন ছিল না। স্ব-স্ব গৃহের বারান্দাতেই বৈঠকখানা ছিল। এরুপ জনতা নিবন্ধন বাংলা ১২৩৩ মারাত্মক মহামারী উপস্থিত হয় এবং উহাতে বহু লোক মারা যায় এবং বহু লোক অন্যত্র চলে যায়। বিদ্যাবাগীশ পাড়া, সরখেল পাড়া, ভট্রাচার্য পাড়া, সেনহাটি পাড়া, নুনে পাড়া, পচাপাড়া প্রভৃতি জনহীন পাড়া আজও বিদ্যমান রয়েছে।


সংগ্রাম সাহের বংশধর যদুনাথ তলাপাত্র এই বংশের আদি পুরুষ তাহার বংশধর দ্বারা এই গ্রামে যে পুষ্করিণী খনন করা হয় তা তালপাত্র দিঘি নামে পরিচিত। নাওয়াড়া চৌধুরীগণের বাড়ি স্বদেশীয়দের নিকট ‘রাজবাড়ি’ নামে অভিহিত হত। পূর্বোক্ত ঘটনাসমূহ বিশেষ করে সম্রাট আকবরের শাসনকালে বিদ্রোহী পাঠান দাউদের বিদ্রোহ দমনে খানখানাপুরে সেনাপতি মোরাদ খানের বসবাস ও মৃত্যু, সংগ্রাম সাহের নাওয়াড়া মহল এবং আনন্দনাথ রায়ের বর্ণনায় সংগ্রাম সাহর বংশধরদের বাণীবহে বসবাস এবং বাণীবহকে সাধারণ্যে রাজবাড়ি বলে আখ্যায়িত করা থেকে প্রমাণিত হয় রাজবাড়ি নামটি বহুপূর্ব থেকেই লোকমুখে প্রচলিত ছিল যা বাণীবহ বা বর্তমান রাজবাড়ির পার্শ্বস্থ কোনো এলাকাকে নির্দেশ করত।

 রাজা সূর্যকুমারের লক্ষীকোলের প্রাসাদোপম বাড়ি সাধারণ্যে রাজার বাড়ি বলে পরিচিতি ছিল। রাজবাড়ির সাধারণ লোকসহ সকল স্তরের মানুষ মনে করেন রাজা সূর্যকুমারের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি থেকেই রাজবাড়ির নামকরণ হয়েছে। উল্লেখ্য রাজা সূর্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম গুহ পলাশী যুদ্ধের পর (১৭৫৭) পলায়নপূর্বক তৎকালীন জঙ্গলঘেরা লক্ষীকোল গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ছোট জমিদারীর মালিক হন। তদ্বীয়পুত্র গৌরীপ্রসাদ গুহরায় ও তার পুত্র দিগেন্দ্র প্রসাদ গুহরায় জমিদারীর আকার বৃদ্ধি করে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে আনন্দনাথ রায়----‘নবাব আলীবর্দী খাঁ’র অধীনে কোনো কার্য করিয়া, কায়স্থ গুহ বংশীয় প্রভুরাম রায় প্রভুর সম্পত্তি অর্জন করেন। রাজ সরকার হইতে কোনোরুপ উপাধী না পাইলেও , স্বদেশীয়রা ইহাদিগকে রাজা বলিয়াই সম্বোধন করিয়া থাকে। প্রভুরামের পুত্র গৌরীপ্রসাদ ও তৎপুত্র বিশ্বদিগীন্দ্র প্রসাদ তৎপুত্র সূর্যকুমার।’ (ড. তপন বাগচী সম্পাদিত আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃ-২০৬)। রাজা সূর্যকুমার প্রভাব প্রতিপত্তিতে ১৮৮৫ সালে ইংরেজ সরকার কর্তৃক ‘রাজা’ উপাধি প্রাপ্ত হন। রাজা সূর্যকুমারের রাজা উপাধি প্রাপ্তির পর (১৮৮৫) থেকেই রাজার বাড়ি তথা রাজবাড়ি নামকরণ হল কিনা?।

এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৭৯৩ সালে ‘গোয়ালন্দ ঘাট’ গোয়ালন্দ হিসেবে যশোহরের সাথে সংযুক্ত হয়। গোয়ালন্দ উত্থানের সাথে রাজবাড়ির পরিচিতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গোয়ালন্দ মোগল শাসনকালে একটি মৌজা ছিল। পদ্মা নদীর নাব্যতা এবং সুবিধামত ঘাট বিবেচনায় পাবনার কাজীর হাট থেকে ১০ মাইল পূর্বে আরিচা থেকে ৫ মাইল দক্ষিণে এবং বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে ৮ মাইল উত্তর-পশ্চিমে গোয়ালন্দ ঘাটের স্থাপন হয়েছিল।

কাজীর হাট তখন প্রসিদ্ধ এবং দক্ষিণাঞ্চলের সাথে কাজীরহাটের যোগাযোগ গোয়ালন্দ ঘাটের মাধ্যমে সংগঠিত হত। ঘাটের দক্ষিণে হামুরীয়া এবং উত্তরে লতিপুর। এই হামুরিয়াতেই বৃটিশ শাসনকার্য পরিচালনায় গোয়ালন্দ নামে নানা অফিস গড়ে ওঠে। নদী ভাঙ্গনের কারণে ঘাট জামালপুর, তেনাপচা, দুর্গাপুর স্থানে সরে আসে। ১৮৭১ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠা লাভ করলে নদীভাঙ্গনের কারণে গোয়ালন্দ নামের সকল অফিস আদালত দুর্গাপুর, তেনাপচা থেকে রাজবাড়িতে স্থানান্তর হতে থাকে। এরপর পোড়াবাজার নামক স্থানে সরে আসে। বাজারটি আগুনে পুড়ে যায় সে কারণে নাম হয় পোড়া বাজার। পোড়াবাজার ঘাট রক্ষার জন্য নদীর তলা থেকে সিমেন্ট করে তোলা হয়। যার নিদর্শন এখনো আছে। গোয়ালন্দ মহকুমার সকল স্থাপনা গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়িতে স্থাপিত হয়। রেকর্ড, পরচা, দলিল দস্তাবেজ অফিস কার্যাদি গোয়ালন্দ নামে সম্পাদিত হতে থাকে। রাজবাড়ি সাধারণ মানুষের মুখে মুখেই থেকে যায়। এমন কি ১৮৯২ সালে বাণীবহের জমিদার গীরিজাশংকর মজুমদার প্রতিষ্ঠিত বর্তমান জেলা স্কুল এর নাম ছিল-----গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল।


নামটি এখনো জেলা স্কুলের পুরাতন ভবনের পশ্চিম দিকে লেখা আছে। অর্থাৎ রাজবাড়ি মুখে মুখে প্রচলিত থাকলেও লিখিত ছিল গোয়ালন্দ। প্রশ্নটি ছিল রাজা সূর্যকুমারের বাড়ির নামকরণে রাজবাড়ি কি না? প্রসঙ্গত বর্তমান রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনের (RSK রাজা সূর্যকুমার প্রতিষ্ঠিত )বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রাজা সূর্যকুমারের আশ্রয়ে তাঁর বাড়িতে থেকে উক্ত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। ত্রৈলোক্যনাথ লিখিত ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থের ৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘বড় রানীর পরামর্শেই রাজা দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন লক্ষীকোলের সন্নিকট ভবদিয়া গ্রামের কোচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎসুন্দরীকে। তাহার গর্ভেও কোনো সন্তান জন্মে না। যাহা হউক তখন তাহার বয়স অল্প (১৮-১৯ হইবে)। তিনি আমার সহিত কথা বলিতেন না লজ্জায়। একদিন রাজা তাহা জানিতে পারিয়া ছোটকে বকেন ‘তুমিত আচ্ছা প্রকৃতির! ও ছেলের মতো। উহার সহিত কথা বলিতে লজ্জা? ছি! তখন হইতে তাহার মুখ খুলিল কথাত নয় একেবারে কথার ঝড়। ‘বাবা তুমিত রাজবাড়ি যাও, আমাকে অমুক অমুক জিনিস আনিয়া দিবে।’

সোয়াশত বছর পূর্বে রানীর মুখে রাজবাড়ি, প্রমাণ করে সে সময় রাজবাড়ি পণ্য বিপণন কেন্দ্র বা বাজর ছিল। এ থেকে আরো স্পষ্ট হয় রাজারবাড়ি (রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি) এবং রাজবাড়ি ভিন্ন ‍দুটি স্থান। অর্থাৎ স্থান হিসেবে রাজবাড়ি পূর্ব প্রচলিত।

রাজবাড়ি নামকরণের বিষেয়ে একটি শ্রুতি আছে এবং তা স্পষ্টত রাজবাড়ি নামের স্থায়িত্বদানে এবং আজকের রাজবাড়ি জেলার সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি ছিল বিশেষ একটি ঘটনা। পূর্বদেশ রেল ১৮৭১ সালে জগতি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কালে ‘সূর্যনগর’ এবং ‘রাজবাড়ি’ রেলস্টেশন ছিল না। রেললাইন বর্তমান কালুখালির প্রায় ৩ কিমি উত্তর এবং বর্তমান রাজবাড়ি শহরের ১/২ কিমি উত্তর দিয়ে উড়াকান্দা হাট তথা তেনাপচা জামালপুর বিস্তৃত ছিল। কিছুকাল পূর্বেও এর চিহ্ন দেখা যেত। ১৮৯০ সালে পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাট বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন স্থানে স্থানান্তর করা হলে রেললাইন কালুখালি, বেলগাছি, রাজবাড়ি (বর্তমান স্টেশন) পাঁচুরিয়া হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। এ সময় রাজবাড়ি স্টেশন প্রতিষ্ঠা পায়। রাজবাড়ি স্টেশন প্রতিষ্ঠাকালে স্টেশনের নামকরণ বিষয়ে বাণীবহের জমিদার এবং রাজা সূর্যকুমারের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয় বলে শ্রুতি আছে।

যেহেতু স্টেশনটি বাণীবহের জমিদারীর মধ্যে, ফলে নামকরণ বিষয়ে গীরিজাশংকর তার নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখেন। অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজা সূর্যকুমারও অনুরুপ দাবি উত্থাপন করেন। সর্বশেষ ঐতিহ্যবাহী রাজ রাজাদের ‘রাজবাড়ি’ এবং সূর্যকুমারের ঐতিহ্যবাহী রাজার বাড়ির বিবেচনায় স্টেশনের নামকরণ হয়, রাজবাড়ি। রাজার দাবি ও সম্মানে পরবর্তী স্টেশনের নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়, সূর্যনগর স্টেশন। স্টেশন হিসেবে রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতদ্বাঞ্চলের রেল প্রশাসন, মেরামত ইত্যাদির কারণে পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য পাকা ও সুদৃশ্য বাসভবন, অফিস, রেস্ট হাউস, কোয়ার্টার, লোকোশেড স্থাপিত হতে থাকে। পদ্মার বিপুল পরিমাণ ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের ব্যবসা ও রপ্তানির কারণে গড়ে ওঠে আড়ত এবং বেশ কয়েকটি আইসফ্যাক্টরি। মূলত রাজবাড়ি রেল শহর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।


  উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একক কোনো রাজা নয় বরং রাজবাড়ি এলাকাভিত্তিক বিদ্রোহী রাজন, সেনাপ্রতি, সমসাময়িককালের বর্ধিষ্ণু ও অভিজাত এলাকা এবং খেতাবপ্র্রাপ্ত রাজা থেকে এলাকাটি সাধারণ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে রজাবাড়ি রেলশহর হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি কালে রাজা সূর্যকুমারের লক্ষীকোলে রাজার ঐতিহ্যবাহী সুদৃশ্য বাড়ি দেশমহলে বিশেষ সাড়া জাগায়। ১৯৮০’র দশকের প্রথমে বাড়িটির স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাজা সূর্যকুমারের রহস্যঘেরা বাড়ি দেখতে ও ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করতে দেশ দেশান্তর থেকে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটত। রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি, রেললাইন, রেলস্টেশন এবং রহস্যঘেরা কুঠি নিয়ে ‘রাজবিাড়ি’ নামে সত্তর দশকে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তাই ‘রাজবাড়ি’ অনেক রাজার ভিরের রাজবাড়ি রাজা সূর্যকুমার ও তাঁর বাড়ির পরিচয়ে দেশ দেশান্তরে পরিচিত রাজবাড়ি।

বাংলার দ্বারপথ গোয়ালন্দ

বাংলাদেশের প্রারম্ভিক (১৯৭১-১৯৮৪) শাসনকালের সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমাই বর্তমান রাজবাড়ি জেলা। ইতিহাস ঐতিহ্য গোয়ালন্দ বাংলাদেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। মোগল ও বৃটিশ শাসন কালে ঢাকা, দিল্লী, কলিকাতা তথা পূর্ববাংলা ও সমগ্র ভারতবর্ষের যাতায়াত পথ ছিল গোয়ালন্দ। এ কারণে বৃটিশ শাসন কালে গোয়ালন্দ কেবল বৃহৎ গঞ্জই নয় বাংলার দ্বারপথ (Get way of Bengal) বলে খ্যাতি লাভ করে। স্থল পথে কলিকাতা ও গোয়ালন্দের সংযোগ থাকায় প্রমত্তা পদ্মা পাড় হয়ে বাংলার পূর্ব সীমান্তের যাতায়াতে গোয়ালন্দই ছিল প্রবেশ পথ। ১৮৭১ সালে রেলপথ স্থাপন করা হলে গোয়ালন্দের গুরুত্ব অধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। সারা ভারতবর্ষে গোয়ালন্দ একক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। গোয়ালন্দ-দৌলতদিয়া ঘাট এখনো স্থলপথে বাংলাদেশের দক্ষিণের পথ। ঢাকা থেকে ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং স্থলপথে কলিকাতা যেতে দৌলতদিয়া ঘাট পাড় হয়ে যেতে হয়।

প্রাচীনতার দিক থেকে পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল গোয়ালন্দ ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ার সাথে এর নানারুপ উত্থান ও পতন। কখনো গোয়ালন্দ রেল, স্টিমার, লঞ্চ, নৌকার হাজার মানুষের ভিড়ে রুপনগরী আবার কখনো প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে, প্লাবনে পরিত্যক্ত ভূমি। এ পথেই সম্রাট বাহাদুর শাহকে পাঠান হয় রেঙ্গুনে। এ পথেই গমনাগমন করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম। এখানেই আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন অমর গ্রন্থ ‘মরু তীর্থ হিংলাজে’র লেখক অবধুত। আট হাজারী দ্বীপ বলে ইতিহাস খ্যাত গোয়ালন্দের পটভূমিতেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন বহুল আলোচিত উপন্যাস, পদ্মা নদীর মাঝি।

‘একদিন গোয়ালন্দ অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হয়ে গেল। অধর বলিল, কয়েকদিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে কিছুদিন থাকিবে।’ পদ্মা নদীর মাঝি পৃষ্ঠা-১৬৫। উপন্যাসটি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য। গোয়ালন্দের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণে কলম ধরেছেন ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায়, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার। সরকারিভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ঘুরে ফিরে এসেছে গোয়ালন্দের নাম।

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালীশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নসীবশাহী পরগনা এবং গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোর কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হয়। নসীবশাহীর পরগনার আয়তন ছিল ৪৩০৯ একর এবং রাজস্ব নির্ধারিত ছিল ১৫৮২১ টাক (Faridpur District Gazetteer-Page 270)।


মোগল শাসনকালে প্রাচীন ‘রাজগঞ্জ’ কখনো পর্তুগীজদের মুখে ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’, কখনো জামালপুরে ইংরেজদের মুখে গ্যাংঞ্জেজ বন্দর। অবশ্য নদী ভাঙ্গনের কারণে গোদার বাজার, লক্ষীকোল, লালগোলা, তেনাপচা, দুর্গাপুর, উড়াকান্দা, পুরশাহাট ঘাট পরিবর্তন হলেও গোয়ালন্দ নামেই এসব ঘাট পরিচয় বহন করে। ভাঙ্গনের বর্ণনায় ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘বর্তমান শতাব্দীর (বিংশ) আরম্ভ হইতে প্রথমে ছাত্র ও পরে শিক্ষকরুপে বহুবার স্টিমারে পদ্মা নদী দিয়া ঢাকা গিয়াছি। প্রথম প্রথম রাজবাড়ির মঠ একটি দর্শনীয় উচ্চ চুড়া সৌধ দৃষ্টিগোচর হইত। একবার ইহার ধার দিয়া আসিলাম কিন্তু ফিরিবার সময় তাহার দর্শন মিলিল না। বহু নগরী গ্রাম মন্দির প্রভৃতির ন্যায় এই মঠটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হইয়াছে।’ (রমেশ চন্দ্র মজুমদার প্রথম খণ্ড- পৃষ্ঠা-৩)।

১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ থানা হিসেবে যশোরের সাথে যুক্ত হলেও গোয়ালন্দ স্থান হিসেবে এর পূর্ব পরিচিতি ছিল। গোয়ালন্দ নামের পিছনে লোক মুখে নানা কথা প্রচলিত আছে। এক সময় এ অঞ্চল পর্তুগীজ, মগ, ফিরিঙ্গী জলদুস্যু কবলিত ছিল। পর্তুগীজ জলদস্যু নেতা সেবাসটিয়ান গঞ্জালেশের একটি আস্তানা ছিল নদী তীরবর্তী গোয়ালন্দের কোনো স্থানে। লোকমুখে প্রচলিত গঞ্জালেশের নাম অনুসারে অপভ্রংশে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। এক সময় গোয়ালন্দের দুগ্ধ ও মিষ্টান্ন উৎপাদনে খ্যাতি ছিল। পদ্মা পাড়ের গো-খাদ্যের প্রাচুর্য এবং বিস্তীর্ণ অনাবাদী চরাঞ্চলে গোয়ালারা দুগ্ধ উৎপাদনে নিয়োজিত থাকত। অনেকে মনে করেন গোয়ালা থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাচীন রাজগঞ্জ ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকদের মুখে ব্যবহৃত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ থেকে গোয়ালন্দ নামের উৎপত্তি। বার ভূঁইয়া জমিদার চাঁদ রায় ও তৎপুত্র কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর, ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের অংশবিশেষে বিস্তৃতি লাভ করে। এ রাজ্য মকিমাবাদ, বিক্রমপুর ও রাজনগর পরগনায় বিভক্ত ছিল। (আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ডঃ তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১০০)। রাজনগর পরগনা পদ্মা ও কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত ছিল। (বিক্রমপুরের ইতিহাস, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, পৃষ্ঠা-২০)। ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী উত্তর পূর্ব অংশ রাজনগর পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কীর্তিনাশার (পদ্মার অপর নাম) দক্ষিণ তীরস্থ স্থানগুলি ফরিদপুরের অন্তর্গত হওয়া উহা দক্ষিণ বিশেষণে বিশিষ্ট হইয়া দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে অভিহিত (আনন্দনাথ রায়, পৃষ্ঠা-১০২)।

মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে চাঁদ রায় দক্ষিণ বিক্রমপুরের শ্রীপুর নগরে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনা করেন। Thun Rajnagar, the dominant pargana in the south east, in the eighteen century, was curved out of the Haveli Dacca. Bikrampur and Solimabad and it continuasly got accession of territory until the end of the century. (Faridpur Gazetteer-Page 209). এ সময় রাজনগর পরগনার রাজকার্য পরিচালনার অন্তর্ভুক্ত পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের তহশীল অফিস ছিল বর্তমান রাজবাড়ির উড়াকান্দা বরাবর উত্তরে অবস্থিত ----রাজগঞ্জে। পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে। (আনন্দনাথ রায় লিখিত ফরিদপুরের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত, ১২৪ পৃষ্ঠায় রাজবাড়ি থানার গ্রামসমূহের তালিকায় ‘রাজগঞ্জ’ গ্রামের নাম উল্লেখ আছে) এখানেই ছিল বিক্রমপুর/রাজনগর পরগনার তহশীল অফিস ও তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু (রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধ ড. মোঃ আব্দুস সাত্তার, পৃষ্ঠা-১৯)। সে সময় পর্তুগীজ ইংরেজ বণিকদের এদেশে আগমন ঘটেছে। রাজগঞ্জ তখন ঢাকা, বিক্রমপুরের সংযোগ নদীপথ হিসেবে বিবেচিত হত। রাজগঞ্জ অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।


এ পথে বৃহৎ নৌযানে পন্য আনা নেওয়া হত। পূর্ববাংলার ব্যবসা বাণিজ্যের মনোরম বন্দর রাজগঞ্জের প্রতি পর্তুগীজ ও ইংরেজ বণিকরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে যাতায়াত করতে থাকে। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রাজগঞ্জ হয়ে ঢাকা কলিকাতা তারা যাতায়াত করে। পদ্মাতীরের রাজগঞ্জ ছিল খাওয়া ও থাকার সুলভ স্থান। বিশেষ করে পদ্মার পলল মাটিতে উৎপন্ন ধান, শাকসবজি ও পদ্মার ইলিশসহ নানা জাতের মাছ ছিল সুলভ ও সুস্বাদু খাবারের উৎস। হোটেলগুলো খাবারের একটা বিশেষ রীতি মেনে চলত আর তা হল, পেটচুক্তি খাবার। খদ্দের তার পছন্দ মতো ভাত, মাছ, মাংস, সবজি যত পরিমাণই খাবে না কেন, একটা ন্যুনতম দাম দিলেই চলবে।

এ ব্যবস্থা চল্লিশ বছর পূর্বেও রাজবাড়ির হোটেলগুলোতে চালু ছিল। আমি ছাত্র থাকাকালীন বর্তমান রেলগেট সংলগ্ন ইসলামিয়া হোটেল থেকে এরকম পেটচুক্তি খেয়েছি। এ বিষয়ে রাজবাড়িতে নানা গল্প প্রচলিত আছে। যেমন খদ্দেরকে পেটচুক্তি খাবার পরিবেশন করে খদ্দেরের খাওয়া অর্ধেক সমাপ্ত হলে বয় বেয়ারা বলত, ‘আরে ভাই ঐ যে ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে এখনই ছেড়ে যাবে।’ খদ্দের আর কি করবে, এ কথা শুনেই অর্ধেক পেট খেয়ে দে দৌড়।

সস্তায় সুস্বাদু খাবার, স্থানীয় মানুষের বিনয়ী ব্যবহার, পদ্মার মনোরম দৃশ্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্তুগীজ বণিকেরা রাজগঞ্জকে বলত ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ বা মজার খাবারের দেশ। গোয়ালীশ পর্তুগীজ জাত শব্দ যার অর্থ অল্পজালের সিদ্ধ মাংস বা মাছের ফালি (Goulash----a Stew of steak and vegetables-oxford learner's Dictionary oxford press 1999)। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন, মশলায় পদ্মার স্বাদের ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতলের কর্তিত ফালির মাছ মৃদু জ্বালে রান্নায় তা অপূর্ব স্বাদের খাবারে পরিণত হত।

ফলে রাজগঞ্জ বন্দরসহ এর পার্শ্ববর্তী এলাকা গোয়ালীশ ল্যান্ড বা স্বাদের খাবারের অঞ্চল হিসেবে তাদের নিকট পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী প্রায় চারশত বছর ধরে যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের রাজগঞ্জ বন্দরটি পদ্মার ভাঙ্গনে বারবার ঘাটের স্থান পরিবর্তন হলেও ‘গোয়ালীশ ল্যান্ড’ নামটির পরিবর্তন হয় না। ভাষা পরিবর্তনের সাধারণ নিয়মানুযায়ী গোয়ালীশ ল্যান্ড এক সময় গোয়াল্যাণ্ডু বা গোয়ালন্দ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজিতে গোয়ালন্দ বানানটি প্রাচীন নথিপত্রে ‘goalandu' দেখা যায় `goalanda' নয়। ১৭৯৩ সালে গোয়ালন্দ মহকুমা হয়নি। এ সময়েই বর্তমান রাজবাড়ি জেলার নসিবশাহী, বেলগাছি, কাশিমনগর, নশরতশাহী ইত্যাদি পরগনা নাটোর রাজ, তেওতা রাজ, রানী হর্ষমুখীর জমিদারী হিসেবে যশোর কালেক্টরেভুক্ত হয়। পাংশা এলাকার মহিমশাহী পরগনা নদীয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৭৯৯ সালে যশোরের কালেক্টর কর্তৃক নাটোরের রাজার পরগনারগুলো নিলামে বিক্রি হয় (আনন্দনাথ, পৃষ্ঠা-১১১)। এ সময় গোয়ালন্দ গোয়াল্যন্ড হিসেবেই সরকারি নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশ রেল জগতি থেকে রাজগঞ্জ (রাজগঞ্জ এখন নদীগর্ভে) অভিমুখে রেল স্থাপন হয় এবং ঐ বছরই গোয়ালন্দ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরগনাভিত্তিক ঢাকা জালালপুর গঠন করা হয় ১৮০৭ সালে। ১৮১২ সালে ঢাকা জালালপুরের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা হয় চন্দনা ও গড়াই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত। ফলে পদ্মার পাড়াপাড় ঘাট গোয়ালন্দ-ঢাকা-জালালপুর আওতাভুক্ত থাকে। ১৮৩৩ সালে ফরিদপুর জেলা গঠনকারে এ সীমানা অক্ষুন্ন থাকে। এ সময় পদ্মার উভয় তীরবর্তী গোয়ালন্দ ও মানিকগঞ্জ প্রায় ৩৭ বছর ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থেকে ১৮৫৬ সালে মানিকগঞ্জ ঢাকার অধীন হয়


(আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস, ড. তপন বাগচী সম্পাদিত, পৃষ্ঠা-১১৭)  ১৮৭১ সালে ফরিদপুর জেলাকে ৪টি প্রশাসনিক ইউনিটে চারটি সাবডিভিশন বা মহকুমায় বিভক্ত করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয় এবং ঐ বছরই পূর্বদেশ রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয় (গৌড়ি সেতু- মীর মশাররফ হোসেন)। তবে মহকুমা প্রতিষ্ঠাকালে স্থান হিসেবে বর্তমান গোয়ালন্দ সেভাবে গেজেট ভুক্ত হয়নি। গোয়ালন্দ ঘাট পরিচয়ে নসিবশাহী, কাশিমনগর, নশরতশাহী, পরগনা গোয়ালন্দ মহকুমায় পরিণত হয়। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ১৯২৫ (ওমিলি প্রণীত) দেখা যায় বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তর পশ্চিমে এবং উড়াকান্দা বাজার থেকে প্রায় ৮ কিমি উত্তর পূর্বে পদ্মা যমুনার মিলনস্থলে নিকটবর্তী কোনো স্থানে মহকুমা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এ সময় পূর্বদেশগামী রেলপথ পাংশা থেকে কালুখালির তিন কিলোমিটার উত্তর (বহর কালুখালি) এবং বর্তমান রাজবাড়ি ‘গোদার বাজারের নিকটবর্তী স্থান দিয়ে রাজগঞ্জের বিপরীত ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন থেকে ‘গোদার বাজা’ বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পূর্ববঙ্গের শাসনকার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে সহজ যাতায়াত এবং অত্র অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যে রেলপথ স্থাপন করে। মহকুমার অফিস প্রতিষ্ঠানসহ রেলস্থাপনা গড়ে ওঠায় স্থানটি শহরের মর্যদা পায়। ডব্লিউ ডাব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় দেখা যায় ১৮৭৫ সালের জানুয়ারি  মাস পর্যন্ত ইস্টার্ন রেলওয়ে মাছপাড়া থেকে পাংশা কালুখালি হয়ে বেলগাছি থেকে উত্তর পূর্ব দিকে রাজবাড়ির উত্তর দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের নিকটবর্তী স্থানে পৌছায়।

তৎকালীন সময়ে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ইংরেজ প্রকৌশলীগণ ঘাটের পরিকল্পনা, রেল স্টেশন, মহকুমা অফিসারের কার্যালয়, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করে। বন্যা প্রতিরোধসহ নদী শাসনে ব্যবহৃত হয় রেলের রড় রেলিং ও পাথর। (উড়াকান্দার নিকটবর্তী নদীর মধ্যে এসব বৃহৎ স্থাপনার কিছু কিছু নিদর্শণ বর্তমান আছে)। রাজগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। গড়ে ওঠে আড়ৎ, দোকান, হোটেল, আবাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস ইত্যাদি। স্থানটি পূর্ববঙ্গের অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বৃটিশ শাসনকর্তা বন্দরের উন্নতি ও এর বিস্তার ঘটাতে অধিক তৎপর হয়। কিন্তু রাজগঞ্জ বন্দর অধিক সময় স্থায়ী হল না। সর্বনাশা বন্যা ও নদী ভাঙ্গনে রাজগঞ্জের সকল স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদী ভাঙ্গন ও ঘাট বারবার স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গোয়ালন্দে অবস্থিত মহকুমার অফিস আদালত বিদ্যালয়সহ সকল স্থাপনা ১৮৭৫ থেকে ১৮৯০ এরমধ্যে রাজবাড়িতে সরিয়ে আনা হয়। ‘গোয়ালন্দ মহকুমা যেখানে অবস্থিত ছিল, পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় গভর্ণমেন্ট সাহায্যকৃত হাইস্কুলটি রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয় এবং তৎকালীন ডিপিআই সিএ মার্টিন সাহেবের অনুরোধে লক্ষীকোল রাজবাড়ির জমিদার রাজা সূর্যকুমার গুহরায় উহার পরিচালনার সম্পূর্ণ ভার নেন।’ (আমার স্মৃতিকথা - ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য-পৃষ্ঠা-৪)। রেল সস্প্রসারণ ও প্রশানিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বর্তমান স্টেশন বরাবর পূর্বে ও দক্ষিণে প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার জায়গা হুকুম দখল করে রেল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ১৮৭৫ থেকে ১৮৯৫ এই বিশ বছরে পদ্মার তীর প্রবল ভাঙ্গনের কবলে পতিত হওয়ায় গোয়ালন্দ ঘাট বারবার স্থানান্তর করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ভাঙ্গনের প্রকোপ এত বেশি ছিল যে কয়েক মাস পর পর স্থান পরিবর্তন করতে হত। এভাবেই গোয়ালন্দ ঘাট লক্ষীকোল থেকে লালগোলা, লালগোলা থেকে উড়াকান্দা, উড়াকান্দা থেকে পুরশাহাটে স্থানান্তর করা হয়। পুরশাহাট এলাকায় চর জেগে ওঠায় ঘাট জামালপুরে যায়, জামালপুরে চর জেগে উঠলে আরও পূর্বে বেথুলীতে সরে আসে। এরপর কোষাহাটা। কোষাহাটা ভেঙ্গে গেলে কাটাখালি, কাটাখালি ভেঙ্গে গেলে দুর্গাপুর, এরপর ঘিওর বাজার এবং সর্বশেষ ১৯১৪ সালে গাট উজানচরের ফকীরাবাদ স্থায়ী হয়।


উজানচরের ফকীরাবাদে থেকে উত্তর দিকে এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ঘাটের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মৌসুম ভেদে পানির গভীরতা অনুযায়ী স্টিমার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে নোঙর করত। কোনো ঘাটে সারা বছর জাহাজ নোঙর করতে পারতো না। বর্ষামৌসুমে কখনো উড়াকান্দায় ঘাট পিছিয়ে গেছে আবার শীত মৌসুমে ঘাট ছয় নম্বরে সরে এসেছে। তবে ঘাট ৪/৫ মাইলের মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ করলেও মূল প্রশাসনিক কাজ ফকীরাবাদ থেকেই পরিচালিত হত। ফকীরাবাদ ঘাট দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এখানে গোয়ালন্দ ঘাট থানার প্রশাসনিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের নৌ পরিবহনের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় গোয়ালন্দে। ঢাকা-কলিকাতা, যাতায়াতে রেল ও স্টিমারসংযোগ পথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নৌপথে মাদারীপুর, বরিশাল, চাঁদপুর, নারায়নগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে যাতায়াতে স্টিমার, লঞ্চ, বড় বড় নৌকা ইত্যাদি নৌযান ব্যবহার হতে থাকে। এদিকে কলিকাতা গোয়ালন্দ স্থলপথে রেল যোগাযোগে ট্রেন সার্ভিস বৃদ্ধি পায়।

ঢাকা মেল, আসাম মেল, ওয়ান আপ, টু ডাউন প্রভৃতি নামের ট্রেন গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করতে থাকে। স্থলপথে ট্রেন এবং নৌপথে স্টিমারের সাথে যাতায়াত সংযোগ স্থাপন করা হয়। বাঙালি, বিহারী, মারওয়ারী এবং কিছু বিদেশী নানা ব্যবসা জাঁকিয়ে তোলে। পদ্মার ইলিশের স্বাদ ভারত খ্যাত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই ইত্যাদি মাছের চালান কলিকাতা দিল্লী পৌঁছে যেত। দেশী-বিদেশী অনেক পণ্যের বাজার বসে গোয়ালন্দে। গোয়ালন্দের চড়ে এক/দেড়মনি তরমুজ জন্মাত। দূর ভারতে এর ব্যাপক কদর ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে রপ্তানি হত। এ সময় স্টিমারও ট্রেন থেকে পণ্য বহনকারী প্রায় পাঁচ হাজার কুলি কাজে নিয়োজিত থাকত। তারা ঘাট কুলী বলে পরিচিত ছিল। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘাট অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বদেশী, কংগ্রেসী, কমিউনিস্ট, মুসলিমলীগ সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যিক শিল্পী লেখকদের ভিড় জমে। গোয়ালন্দ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নয়, ভারতবাসীর কাছে তা হয়ে ওঠে বাংলার দ্বারপথ। ইংরেজরা গোয়ালীশ ল্যান্ড না বলে, বলত Gate Way of Bengal. গোয়ালন্দ মহকুমার কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পুলিশ স্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়। থানা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গেজেটিয়ার, ইতিহাস সেনসাসে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি ও পাংশার নাম পাওয়া যায়। রাজবাড়ি থানার কার্যক্রম শুরু হয় পড়ে। তবে নদী ভাঙনের কারণে মহকুমা ও থানার স্থাপনা রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক কার্য গোয়ালন্দ নামে রাজবাড়ি থেকে সম্পাদন করা হত। গোয়ালন্দে ‘ঘাট থানা’ হিসেবে থানার কাজ করা হত।

১৯২০ সালের একটি পরিসংখ্যান

মহকুমা        থানা         পুলিশ স্টেশন    এরিয়া বর্গমাইল     জনসংখ্যা

গোয়ালন্দ       গোয়ালন্দ     গোয়ালন্দ        ১১৫                ৭৪৩৪৬

                                 গোয়ালন্দ ঘাট   ৫০                ৪২২৯৬

                বালিয়াকান্দি   বালিয়াকান্দি    ১২৪                ৮৭৬৮৭

                  পাংশা             পাংশা       ১৬১               ১,২০,১৯১

সূত্র : ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৫


পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ১১৫ বর্গমাইলের গোয়ালন্দ থানা বর্তমান রাজবাড়ি থানার এরিয়া নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। গোয়ালন্দ মহকুমা ও থানার প্রশাসনিক কাজ রাজবাড়ি থেকে সম্পাদিত হলেও ইতিমধ্যে গোয়ালন্দ থানার প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা অফিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রাজবাড়ি জেলা গঠনকালে গোয়ালন্দবাসী গোয়ালন্দকে জেলা ঘোষণার দাবি রাখে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।

গোয়ালন্দ নামে মহকুমা হলেও কোর্ট কাচারী, অফিস আদালত, রেল স্থাপনাসহ রাজবাড়ি বৃহৎ শহর বিধায় রাজবাড়িবাসীর দাবিতে শেষ পর্যন্ত ঐক্যমতের ভিত্তিতে ‘রাজবাড়ি’ নামে জেলা ঘোষণা করা হয়। গোয়ালন্দর সামনে চর জেগে ওঠায় বিগত শতাব্দীর ৭০ দশকের মাঝামাঝি ঘাট দৌলতদিয়া স্থানান্তর করা হয়। দৌলতদিয়া এখন বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বারপথ।

শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এর রেঙ্গুনের পথ গোয়ালন্দ

 ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সাল ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বলে পরিচিত হলেও প্রকৃত পক্ষে এ বিদ্রোহ ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভারতবর্ষের তখন ইংরেজ শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের বংশধর বাহাদুর শাহ জাফর ইংরেজদের মাসহারা প্রাপ্ত হলেও ভারতবাসীর নিকট সমান মর্যাদায় সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত। ১৭৭৫ সালে জন্ম নেওয়া বাহাদুর শাহ আজীবন ইংরেজদের ঘৃণা করে এসেছেন, ভালোবেসেছেন মাতৃভূমিকে এবং স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীকে নানাভাবে সাহায্য করছেন। ১৮৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহকালে সিপাহীরা সম্রাট শাহের অধীনে নিয়োজিত বলে ঘোষণা করে। বিদ্রোহ বিফলতায় পর্যবশিত হলে ১৮৫৭ সালে ২০ সেপ্টেম্বর ইংরেজ সেনা হডসন সম্রাটকে পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ থেকে ধরে আনে। তাঁর বিরুদ্ধে চারটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। প্রহসন বিচারে লর্ড ক্যানিং তাঁকে সপরিবারে রেঙ্গুনে নির্বাসনের আদেশ দেন।

১৮৫৮ সালে ৭ অক্টোবর ইউরোপীয়ান হর্স আর্টিলারী পুলিশ ব্যাটিলিয়ান নবম ল্যান্সারবাহিনী সম্রাট ও তাঁর পরিবারকে ঘেরাও করে টানাগাড়িতে যাত্রা করে। ৩৭ দিনে ৬০০ মাইল পাড়ি দিয়ে এলাহাবাদ পৌছে। এরপর বাংলার নদনদী পেরিয়ে রেঙ্গুনের শেষ যাত্রাস্থল গোয়ালন্দ এসে উপস্থিত হন। তৎকালীন ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আমির উদ্দিন সাহেব রামপুর বোয়ালিয়া (বর্তমান রাজশাহী) থেকে গোয়ালন্দ নিয়ে আসেন। গোয়ালন্দে সপ্তাহখানেক অবস্থান করে পদ্মা, যমুনার পথে রেঙ্গুনে শেষ যাত্রা করেন। রেঙ্গুনে তার শেষজীবন নানা দুঃখ কষ্টে কাটে। ১৮৬২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করে। অযত্ন; অবহেলায় সাধারণভাবে তাঁকে কবরস্থ করা হয়। দাফনের সময় তাকে কোনো উপাধি বা পদবী ঘোষণা করা হয়নি। রেঙ্গুনে স্মৃতিসৌধ কেবল উৎকীর্ণ হয়ে আছে------

কিতনে বদ নসিব জাফর-----

দাফন কে লিয়ে

দো-গজ জমিন না মিলে

The last Mughal--- Willium--DALYMPLE


প্রাচীন গ্রাম বাণীবহ

রাজবাড়ি জেলায় বাণীবহ অতি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ গ্রাম। এ গ্রামকে নিয়ে এখনো নানা কথা নানা কাহিনী লোক মুখে প্রচলিত আছে। কোলকাতা শহরের পত্তন নাকি এখানেই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অতি ঘনবসতি গ্রামে ধান ভাঙ্গানো এবং চিড়া কোটার জন্য এত বেশি ঢেঁকি ব্যবহার হত যে,  ইংরেজ সাহেব তা দেখে ভীত হয়ে পড়েন।

না-জানি হড়াই নদীর তীরে অবস্থিত শহরসম এ গ্রামটি ঢেঁকির পাড়ের চাপে ভেঙ্গে পড়ে। লোকমুখে জানা যায় এক রাতে কোনো অজ্ঞাত রোগে এ গ্রামটির সকল মানুষ মারা যায় এবং গ্রামটি বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়। সত্যিকার অর্থেই বাণীবহ স্বাধীনতার কয়েক বছর পূর্ব থেকে দ্বিতীয় ধাপের বসতি গড়ে ওঠে। এর পূর্বে প্রায় ৫০/৬০ বছর বাণীবহ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা পরিত্যক্ত ও বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন ছিল। পরিত্যক্ত চিহ্নিত এলকায় ভাঙ্গা মন্দির, দালান, ইটের স্তুপ, কূপ, পুকুর, দেখা যেত। বস্তুত অতি ঘনবসতিপূর্ণ এ গ্রামে এখন থেকে প্রায় দুইশত বছর পূর্বে পুস্কর লেগে গ্রামটি উজার হয়ে যায়। (পুস্কর এক ধরণের বায়ু দূষণজনিত মহামারী)। গ্রামটির প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায় কবি কণ্ঠহার বিরচিত সম্ভ্রান্ত বৈদ্যগণের পরিচয় পরিচিতি ‘কুলজী’ গ্রন্থ থেকে। এ অঞ্চলে বিশেষ করে ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ি, গোপালগঞ্জ অঞ্চলের সেনদিয়া, কাজুলিয়া, খান্দারপাড়, রুপসা, রাজনগর, সোনারং, মূলঘর, ফতেজঙ্গপুর, বাণীবহ, সেকাড়া, গ্রামে কুলীন বৈদ্য সমাজপতিদের বসবাস শত বছর পূর্বে খ্যাতিলাভ করেছিল। ‘কুলজী’ গ্রন্থে তৎকালীন খ্যাতিসম্পন্ন বৈদ্যগণের মধ্যে বাণীবহের নাম পাওয়া যায়। ১৫৭৫ এ বিরচিত এ কুলজী গ্রন্থ থেকে জানা যায় বৈদ্য শক্তির আবির্ভাব। বৈদ্যশক্তির গোত্রজ  মাধব সেন এবং ধনন্ত রী গোত্রের বলভদ্র বাণীবহের আদি নিবাসী। মাধব সেন ও বলভ্রদ্র সেনের দুটি বংশধারা কালক্রমে বিস্তার লাভ করে। বংশ দুটির মধ্যে মাধব বংশীয় জগাদানন্দ ও মাধবানন্দ রায়ের বংশধরগণই প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

মাধব সেন প্রথমে বাণীবহের অদূরে পাঁথুবী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ‘গণয়েস্তে নায়িস্তে ধর্ষ্যাং পরোগায়ঞ্চ হিন্দুকা মাধব পঞ্চথুপঞ্চে বসতিং তেহি জঞ্জিরে’---কণ্ঠহার। পাঁচথুবীর পূর্ব নাম পঞ্চথুপ। বৌদ্ধদের স্থাপিত পঞ্চস্তুপ হতে পঞ্চথুবী এবং পরে পাঁচথুবী হবে। উল্লেখ্য এ অঞ্চলে বৌদ্ধ বসতি ছিল। বৌদ্ধ নির্বাসন ও ধর্মান্তরিত হওয়ার অনেক পর আনুমানিক পাঁচশথ বছর পূর্ব থেকে মরা পদ্মা তীরের উর্বর ভূমির এ গ্রামটিতে তারা বসবাস শুরু করে। মোগল শাসনকালে এলাকাটি ছিল নাওয়াড়া পরগনা। নাওয়াড়া মহলটি মাধব সেনের অধীন ছিল। এভাবে পাঁচথুবীতে প্রথম মাধব সেনের বংশের পত্তন ঘটে। এ বংশীয় লোকেরা নাওয়াড়া চৌধুরী বলে পরিচিত হতেন।

বর্তমানে মাটিপাড়া হাটের উত্তরে অবস্থিত ব্রিজ থেকে পূর্বদিকে বিস্তৃত ভরাট বিল দেখা যায়। বিশ বছর পূর্বেও পিঁয়াজ ঘাটারবিল বা পিঁয়াজঘাটা বলে এর পরিচিতি ছিল। পিঁজেঘাটায় পানির গভীরতা ছিল অনেক বেশি। সেকালে পদ্মার প্রবল স্রোতধারা শাখানদী হিসেবে পূর্বদিকে পাঁচথুবী, বারবাকপুর, হমদমপুর হয়ে পূর্বদিকে প্রবাহিত হত। পরে পদ্মা আরো উত্তরে সরে গেলে তা মরা পদ্মায় পরিণত হয়। মরা পদ্মার স্থান বিশেষ বিলে পরিণত হয় যা বর্তমানে পিঁয়েজঘাটার বিল। পাঁচথুপির উত্তরে রাধাগঞ্জ নামে এক বড় বন্দরও ছিল। পদ্মাতীরে স্থাপিত বন্দরের পাশ দিয়ে পূর্বদিকে রাজাপুর পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ রাস্তা বিদ্যামান ছিল যাকে লোকে পল্টুনের রাস্তা বলত।


মোগল শাসন সময়ে সৈনিকদের যাতায়াতের জন্য এ রাস্তা ব্যাবহার হত। যে কারণে এর নাম হয় পল্টুনের রাস্তা। নদীপথ ও প্রশস্ত রাস্তার জন্য মগ, ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নাওয়াড়া চৌধুরীগণ প্রায় চারশত বছর পূর্বে পাঁচথুপি থেকে সরে এসে নিরাপদ স্থান বাণীবহে বসতি স্থাপন করে। কবি কণ্ঠহার বিরচিত কুলজী গ্রন্থ থেকে যতদুর জানা যায় মোগল শাসনকালে বিশেষ করে সম্রাট শাহজাহানের শাসন কালে মাধব সেন পাঁচথুপি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তিনি প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হন। নাওয়াড়া জমিদার মাধব সেনের তহশীলদার সদাশিব এর কন্যার সাথে সংগ্রাম সাহর বিবাহ হয়। সংগ্রাম শাহ মগ পুর্তুগীজ দমনে আওরঙ্গজেব কর্তৃক প্রেরিত হন। সংগ্রাম সাহ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে।

মাধব সেন তাঁর পুত্র জগদানন্দ ও মাধবানন্দকে নিয়ে বাণীবহবাসী হন। সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর-খুলনার ইতিহাস থেকে জানা যায় তৎকালীন বাণীবহবাসী পণ্ডিত রামচন্দ্র বিদ্যালঙ্কার আচর্য ও রায়নগর হতে ভূ-বৃত্তি লাভ করে বাণীবহ বাসী হন। কুলপুঞ্জিকা কণ্ঠহারে ‘মাধবোজগদান্দ গোপীরমনতা-সুতৌ’ উল্লেখ থাকে ধারণা করা যায় প্রচুর ভূ-সম্পত্তি ও প্রতিপত্তিসহ মাধবগোত্রীয় বলভদ্র ও অন্যান্য গোত্রীয়দের বাণীবহ সমৃদ্ধ নগর প্রায় এক বাসস্থান ছিল। উত্তরে সাড়ে তিন মাইল ও পূর্ব পশ্চিমে তিন মাইল আয়তনের গ্রামটিতে বসবাসরত পরিবার সংখ্যা রাঢ়ী ও বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ প্রায় নয়শত ঘর, বৈদ্য প্রায় দুইশত ঘর, কায়স্থ ও অন্যান্য জাতি প্রায় আড়াই হাজার ঘর। এই গ্রাম এত ঘনবসতিপূর্ণ ছিল যে কারো ঘরের বাইরে উঠান ছিল না, নিজ নিজ বারান্দাতেই বৈঠকখানা ছিল। পাড়াগুলোর পরিচিতি ছিল বিদ্যাবাগীশ পাড়া, আচার্য পাড়া, সেনহাটী পাড়া, বসুপাড়া, বেনে পাড়া, ন্যুনে পাড়া, সরখেল পাড়া, পচাপাড়া। বাংলা ১২৩২ সালে (প্রায় ২০০ বছর পূর্বে) সেখানে ভীষণ মহামারী দেখা দেয়। এতে গ্রামটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। গ্রামটিকে রক্ষা করতে ১২৬২ সালে (প্রায় ১৫০ বছর) সেখানে মিউনিসিপ্যাল প্রবর্তন উদ্দেশ্যে সরকার থেকে এক নোটিশ জারি করা হয় (ফরিদপুরের ইতিহাস-আনন্দনাথ রায় -পৃষ্ঠা-৮০)।

সংগ্রাম সাহের সম্বন্ধ হেতু চৌধুরীগণ অনেকটা নিন্দিত হন। বলা যায় নিন্দা পুরণে যশোরের কুলীন বৈদ্যদের সাথে আদান-প্রদানে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করেন। যশোরের সেনহাটিস্থ কুলীন বৈদ্য অরবিন্দ বংশের সাথে কার্য করার সূত্রে তাদের এক শাখা বাণীবহে বসতি স্থাপন করে। সেনহাটি থেকে এসে বসতি স্থাপন করায় নাম হয় সেনহাটি পাড়া। চৌধুরীদের আদি পুরেুষের একজন যদুনাথ তালপাত্র। তাঁর বংশধরেরা বাণীবহে একটি দিঘি খনন করে। তা আজও ‘তালপাত্রের দিঘি’ নামে পরিচিত। এই নাওয়াড়া চৌধুরীগণের বাড়ি সাধারণ্যে রাজবাড়ি বলে অভিহিত হত। চৌধুরীদে আদি পুরুষ মাধব সেন ও তহশীলদার সদাশিব। বাণীবহে স্থানান্তরের পর সদাশিবের পৌত্র মাধবানন্দ রায় সম্পত্তির নয় আনা ও জগদানন্দ রায় সম্পত্তির সাত আনা অংশ ভাগ করে নেন। অংশ ভাগের বিষয় এখনো লোকমুখে শোনা যায়। নাওয়াপাড়া চৌধুরীরা সে কালেই নানারুপ সৎকাজ দ্বারা যশস্বী হয়েছিলেন। দত্তবৃত্তি, ব্রহ্মোত্তর, দানের জমি দ্বারা অনেকে প্রতিপালিত হত। তাঁদের বদান্যতা ও দয়া দাক্ষিণ্যের নানা গল্প প্রচলিত আছে। বিষয় সূত্রে একটি গল্প এমন------নাওয়াড়া চৌধুরীদের একটি নিয়ম ছিল, গ্রামের মধ্যে কেউ উপবাসী আছে কিনা তা খুঁজে বের করে তাকে খাওয়ানো। এ উদ্দেশ্যে একদিন চৌধুরীদের কোনো একজন এক ব্রাহ্মণের বাড়ি উপস্থিত হয়ে দেখতে পান ব্রাহ্মণ পান্তাভাত খেতে বসেছেন। তাকে দেখে ব্রাহ্মণ আহার ত্যাগ করে তাম্বুল চর্বণ শুরু করলেন।


চৌধুরী ব্রাহ্মণকে ভাত খাওয়া বাদ দিয়ে পান চাবানোর কারণ জিজ্ঞাসা করায় ব্রাহ্মণ উত্তর দিলেন ‘দেশের অধিকারী হয়ে কোথায় লোক সুখ স্বাচ্ছন্দে থাকবে তার ব্যবস্থা না করে উপহাস করতে আসলেন পান্তাভাত খাওয়ার সময়? চৌধুরী এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন -----‘আপনি তাম্বুল চর্বণরত অবস্থায় যতদূর অতিক্রম করবেন ততদূর পর্যন্ত জমি আপনার ভরণপোষণের জন্য উৎসর্গ করা হবে।’ কথামত ব্রাহ্মণ পানচাবন অবস্থায় যতটা ভূমি অতিক্রম করলেন ততটা ভূমি তাকে দেওয়া হল। যিনি এই ব্রতিপ্রাপ্ত হন তার উপাধি ছিল সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে একটি কথা এখনো লোকমুখে শোনা যায়-------

‘পান খাইয়া মারিল লাথি

তাইতে হইল সিদ্ধন্তের গতি’

স্থানটি ভীমনগরের নকশায় একটি বহৎ চক। নক্সাতে তা নিস্কর লিখিত ছিল। সিদ্ধান্তের বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ায় ভূমি বেদখল হয়ে যায়। তখন চন্দনা নদী ছিল প্রশস্ত ও বেগবান। চন্দনা নদীর তীরে আড়কান্দিতে নাওয়াড়া চৌধুরীর কাচারী ছিল। নবাবী আমলের জলযুদ্ধের জন্য চৌধুরীগণ যুদ্ধ জাহাজ বানানোর কারখানা স্থাপন করে। আড়কান্দির তুলসীবরাট গ্রামের মিস্ত্রিরা নৌকা বানানোর জন্য বিখ্যাত। তবে বিল, নদনদী শুকিয়ে যাওয়ায় এ ব্যবসা এখন নেই বললেই চলে। রাজা সীতারাম নাওয়াড়া চৌধুরীদের বহু সম্পত্তি ও কারখানা দখল করে নেয়। এতে চৌধুরীরা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর বৃটিশ শাসনের শুরুতে দশসনা বন্দোবস্তকালে যা সম্পত্তি ছিল তার কর ধার্য করা হয়। ইংরেজদের জলযানের প্রয়োজন না থাকায় নাওয়াড়া মহল উচ্ছেদ করা হয়। নৌকা প্রস্তুতের জন্য সূত্রধর, কর্মকারদের জন্য নির্দিষ্ট ভূমি দেওয়া ছিল তাও হস্তান্তরিত হয়ে যায়। ঐ সমস্ত স্থানকে এখনো ‘সুতারের তালুক’ বলা হয়। বেভারিজ লিখিত বাখেরগঞ্জের ইতিহাসে নাওয়াড়া চৌধুরীদের পরিচয় আছে। নাওয়াড়া বংশের বিজয়কৃষ্ণ রায় পূর্ণিয়া জেলার রায় লছমত সিং বাহাদুরের ম্যানাজার এবং তথাকার মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং কামিনী কুমার রায় ফরিদপুর জজকোর্টের উকিল, মুন্সেফকোর্টের গভর্নমেন্ট প্লিডার ও গোয়ালন্দ বিভাগের লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান। এভাবে মাধব সেন, সদাশীব বলভদ্র, মাধবানন্দ, জগদানন্দ প্রভৃতি নাওয়াড়া চৌধুরীগণ আর্থিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি হারিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরমধ্যে বাণীবহে যারা অবশিষ্ট থাকেন তাদের মধ্যে অরবিন্দ বংশের মজুমদারগণ প্রবল হয়ে ওঠেন। বৈদ্যকুলীন বংশপত্রিকা (পাতরা) থেকে জানা যায় অরবিন্দু যদুনাথ তালপাত্রের বংশীয়। নন্দকিশোর দাস মাধববংশীয় রামনারায়ণ  চৌধুরী কন্যাকে বিবাহ করেন। নন্দকিশোরের পুত্র কৃষ্ণজীবন দাস বাণীবহের মনোহর রায়ের কন্যার পাণিগ্রহন করেন। অরবিন্দ সেনহাটিস্থ কুলীন বৈদ্য এবং বিবাহসূত্রে অরবিন্দের বংশের একটা শাখা ভূমিবৃত্তিপ্রাপ্ত  হয়ে সেনহাটি ত্যাগ করে বাণীবহে বসতি স্থাপন করেন। যদুনাথ তালপাত্র এ বংশের আদি পুরুষ। তাদের বসতি স্থানের নাম হয় সেনহাটি পাড়া। এখন থেকে প্রায় তিনশত বছর পূর্বে তারা এ গ্রামে স্থায়ী হয়। কৃষ্ণজীবন দাসের দুই পুত্র, বিনোদ রায় ও সদাশীব রায়। এই বংশের শিবশঙ্কর রায় লর্ড ওয়েলেসলী গভর্নর জেনারেল তখন নাটোর রাজ সরকারের সরবরাহকার নিযুক্ত হন (১৮০৩ সাল)। তখন বড় বড় জমিদার গভর্নমেন্টের তত্ত্বাবধীন হলে গভর্নর জেনারেল কাউন্সিল হতে তারা নিযুক্ত হতেন। তখন নাটোর রাজস্টেট নানা গোলযোগ পতিত হওয়ায় রাজস্ব প্রদানে শিথিলতা আসে। এসময় গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে শিব শঙ্করকে এই পদে নিযুক্ত করেন। শিবশঙ্কর ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাধর। এই উচ্চ পদে নিযুক্ত থেকে শিবশঙ্কর বহু সম্পত্তি অর্জন করেন। এ সময় তাঁর উপাধি হয় মজুমদার। রামশঙ্কর জ্যেষ্ঠ, জয়শঙ্কর কনিষ্ঠ।


জয়শঙ্কর মজুমদার মুর্শিদাবাদের প্রভিন্সিয়াল কোর্টের মিরমুন্সি ছিলেন। এ সকল পদে থেকে মুজমদারগণ বিপুল সম্পত্তির মালিক হন এবং বানীবহের জমিদার বলে খ্যাতি অর্জন করেন। জয়শঙ্করের পুত্র গিরিজাশঙ্কর মজুমদার জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য রাজবাড়িতে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে আছেন। তিনি কলিকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত উকিল ছিলেন। তিনি ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে রাজবাড়িতে একটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিদ্যালয়টি বর্তমানে রাজবাড়ি সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়। সাধারণ্যে জেলা স্কুল বলে পরিচিত। বিদ্যালয়টি তিনি স্ব-নামে প্রতিষ্ঠিত করেননি যা তার উদার মনের প্রকাশ বিবেচিত হয়। বিদ্যালয়টির পূর্ব নাম ছিল, গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল। মজুমদার জমিদারদের সম্পত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির সম্পত্তি তারা দান করেন। ১৮৯০ সালে বিদ্যালয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যায়ে সুরম্য দালান তৈরি করেন।

বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য ছাত্রনিবাস নির্মিত হয়। বহুকক্ষ বিশিষ্ট দালানটি এখন ভগ্ন এবং ঐতিহ্য হিসেবে সাক্ষ্য বহন করছে। ছাত্র নিবাসটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েল প্রধান শিক্ষকের কোয়ার্টার। উল্লেখ্য বালিকা বিদ্যালয়টিও বাণীবহের মজুমদার পরিবারের দানের সম্পত্তিতে গড়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত বাণীবহের নাওয়াড়া চৌধুরী ও মজুমদার বংশের পরিচয় পাওয়া গেল।

এ গ্রামের মুন্সি পরিবারও এক সময় প্রসিদ্ধ ছিল। তারাও মাধব বংশীয়। মুন্সি বংশের রাধাকান্ত মজুমদার লর্ড কর্নওয়ালিশের সময়ে একাউন্টেন্ট জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাণীবহ গ্রামে একটি প্রকাণ্ড অট্রালিকা নির্মাণ করেন। কয়েকবছর পূর্বেও ধবংসস্তুপের চিহ্ন ছিল। এ গ্রামে বারেশ্বর সেন সুদক্ষ লেখক ছিলেন। এ বংশের গোবিন্দ প্রসাদ সেন মুন্সি সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তৎকালীন হায়দ্রাবাদের বেনিডেন্ট স্যার রিচার্ড টেম্পল ও নাগপুরের চীফ কমিশানর প্লাটডোনের অধীনে কাজ করে খ্যাতি অর্জন করেন। তার পুত্র কবিরাজ প্রভাতচন্দ্র সেন কবিরঞ্জন কলিকাতায় চিকিৎসা কার্যে বিখ্যাত ছিলেন।

রাজবাড়ি জেলার সংস্কৃতি বিকাশের পাদপীঠ বাণীবহ স্মৃতির অতলে ডুবে যায়নি। সে বিরাণ ও পরিত্যক্ত ভূমিতে আবার কোলাহলে ভরে উঠেছে। এসেছে নতুন মানুষ, নবসংস্কার, আধুনিক দালান, নতুন হাটবাজার, বিদ্যালয়, পণ্য, পোশাক। ইতিহাসের পাতা এমনিভাবে বদলায়, বদলে যায়। বাণীবহ বর্তমানে একটি ইউনিয়ন।

প্রসিদ্ধ গ্রাম কোড়কদি

কোড়কদি তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত বালিয়াকান্দি থানার মেঘচামী ইউনিয়নের একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম। সম্প্রতি মেঘচামী ইউনিয়নটি ফরিদপুরের মধুখালি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাজবাড়ি জেলার তৎকালীন পাংশা ও বালিয়াকান্দি নির্বাচনী এলাকায় মেঘচামী অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই স্থানটি বালিয়াকান্দি থানার অন্তর্গত ঠাকুর রামচন্দ্র ভট্রাচার্য মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত সাইকুল গ্রাম হইতে আসিয়া এই গ্রামে গৃহ প্রতিষ্ঠা করেন। ভট্রাচার্য সিদ্ধ পুরুষ বলিয়া খ্যাত থাকায় প্রসিদ্ধ সংগ্রাম সাহ তাহার শিষ্যত্ব স্বীকার করেন এবং গুরুদেবকে কোড়কদি ও আরো অনেক স্থান ব্রহ্মোত্তর জমি প্রদান করেন। এই বংশে বহু পণ্ডিত জন্মগ্রহণ করিয়া গিয়াছেন। পূর্ববঙ্গের প্রধান নৈয়ায়িক পণ্ডিত রামধন তর্কপঞ্চাণন এই বংশের লোক ছিলেন। ভট্রাচার্যদের স্থাপিত কুলীন, সান্যাল, ভাদুড়ী লাহিড়ী মধ্যে মধুসুদন সান্যাল বিখ্যাত ছিলেন।


নীলকুঠির আয়ের দ্বারা এই সান্যাল মহাশয় কয়েকটি পরগনার মালিক হন (আনন্দনাথ রায়, ফরিদপুরের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, নগর ও গ্রামের বিবরণ অধ্যায়)।

`Korakdi is a Village in goalunda subdivision under Baliakandi thana and Meghchanmi Union. It had an area of 1147.09 and a population 1,777 according to censun 1961' (Faridpur District gazetteer-page-338).  প্রায় ৩০০ শত বছর পূর্বে জনবসতিহীন দ্বীপ হিসেবে এর পরিচিতি ছিল ‘কনকদ্বীপ’ যা থেকে কোড়কাদি। জানা যায় মোগল শাসনকালে একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ কনকদ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেন। গোয়ালন্দ মহকুমার তৃতীয় আরবি হাই স্কুল (প্রথম রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন ১৮৮৮, দ্বিতীয় গোয়ালন্দ  মডেল হাই ১৮৯২) ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সময় দালান প্রসাদের ভগ্নাংবশেষ প্রমাণ করে অল্প সময়ের মধ্যে কোড়কদি বাংলায় অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রামে পরিণত হয় এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এ গ্রামের রায় বাহাদুর রাধিকামোহন লাহিড়ী আসাম বেঙ্গলের প্রথম পোস্ট জেনারেল। তিনি এবং বিনোদবিহারী লাহিড়ী হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রাধা তারকা পঞ্চানন ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিত। তাঁর নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি থিয়েটার হল। কোড়কদির ফুটবল মাঠে এক সময় কলিকাতা থেকে নামী ফুটবল খেলোয়াড়দের আগমন ঘটত। কোড়কদির শিবদাস এবং বিজয় দাস ছিলেন প্রখ্যাত ফুটবলার। শিবদাস এবং বিজয়দাস কলিকাতায় মোহনবাগান ফুটবল টিমের কিংবদন্তি ফুটবল তারকা। কোড়কদি একসময় রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ‘স্বদেশী’, অনুশীলন, কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দান কোড়কদির সত্যমিত্র, শ্যামেন ভট্রাচার্য।

ইতিহাসখ্যাত তেভাগা আন্দোলনের নেতা অবনি লাহিড়ী এই গ্রামের বিদগ্ধ পুরুষ। বাংলাদেশ ও পশ্চিম-বাংলার ফরাসী ভাষাবিষয়ক পণ্ডিতদের অন্যতম অবন্তীকুমার সান্যালের জন্ম এই গ্রামে। সঙ্গীত ও নৃত্য বিষয়ক সংস্থা বাফা’র প্রতিষ্ঠা লগ্নে কিংবদন্তি নাম বুলবুল চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী অজিত সান্যাল কোড়কদির মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন আলোড়ন সৃষ্টিকারী আকাশবাণী দিল্লীর সেই সংবাদ পাঠিকা নীলিমা সান্যাল কোড়কদিতে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। কোড়কদির নিকটবর্তী মেঘচামীর মানুষ কল্লেল যুগের খ্যাতনাম সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত। নরকোনায় জন্মগ্রহণ করেন উত্তোরাধিুনিক সাহিত্যসেবী রবিশংকর মৈত্রী। গ্রামসমূহের ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রাচীন প্রসিদ্ধ গ্রামসমূহের মধ্যে তৎকালীন বাংলায় কোড়কদি ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি চর্চার সূতিকাগার। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের ধারক এ গ্রাম কৃষি জীবন বিকাশে যেমন ভূমিকা রেখেছে তেমনি সামন্ত অর্থনীতির লালসা অতিক্রামণে নিজেরাই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। ঐতিহ্য এবং লোকসংস্কার কখনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলে। হঠাৎ সেখান থেকে সরে আসলে সমাজ ও পরিবার বিপন্ন হতে পারে। এ যুক্তিতেই এ গ্রামের রামধন ভাদুড়ী হারিয়ে দিয়েছিলেন বিধবা বিবাহ প্রচলনে জনমত সৃষ্টিতে কলকাতা থেকে আসা গুণীজনসহ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। সাধারণ্যে তাঁর নাম ছড়িয়ে যায়। রামধন ভাদুড়ী হয়ে যান রামধন তর্কপঞ্চাণন। কালে সে নাম ছড়িয়ে যায় দূর বহুদূরে। সে সাক্ষ্য বহন করছে কোড়কদির রামধন তর্কপঞ্চানন লাইব্রেরি। তাঁর বিচারমূলক গ্রন্থ ‘বিধবাবেদন নিষেধ’ ১২৭৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। এ গ্রামের বঙ্কিমচন্দ্র লাহিড়ী অতীত ধ্যান ধারণায় সংযুক্ত করেন চলমান জীবনের উপাদান। পৌরাণিক মহাভারতকে আশ্রয় করে রচনা করেন------মহাভারত মঞ্চুরী।


গ্রন্থটি ১৯২৪ প্রথম ও এর তের বছর পর দ্বিতীয় প্রকাশ বের হয়। এটি ভারতীয় ইতিহাসে অনবদ্য কাজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। রচনার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, ‘মূল মহাভারত হইতে উপাদান সংগ্রহ করিয়া বর্তমান সময়ের উপযোগী করিয়া এই গ্রন্থ লিখিয়াছি। যাহা দেশহীত গঠনের প্রতিকূল  তাহা ত্যাগ করিয়াছি যাহা মহাভারতে সুন্দর ও শিখিবার আছে তাহা চয়ন করিয়াছি। মহাভারতের নানা স্থান হইতে তুলিয়া আনিয়া সাজাইয়াছি।’ মহাভারত মঞ্জুরী’র পূর্বে তিনি বীর ফেবারী নেপোলিন বোনাপার্ট (১৮৯৮) এবং সম্রাট আকবর রচনা করেন। তার গ্রন্থসমূহ গুজরাট ও হিন্দি ভাষাতে অনূদিত হয়। ‘মহাভারত মঞ্জুরী’র দ্বিতীয় সংস্ককরণে লেখক আত্মকথন শিরোনামে নিবন্ধ লেখেন যা থেকে এ অঞ্চলের অতীত নিদর্শন পাওয়া যায়। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কোড়কদিতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে বাড়ির পাঠশালায় ইংরেজি স্কুলে, ঝিনেদা ইংরেজি স্কুল, রাজশাহী কলেজে লেখাপড়া করেন। তিনি BA ও BL ডিগ্রিধারী ছিলেন।

সাহিত্য জগতের খ্যাতিমান পুরুষ অবন্তীকুমার সান্যাল ১৯২৩ সালে ১ সেপ্টেম্বর কোড়কদিতে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, চট্রগ্রাম কলেজ থেকে আইন পাস করে কলিকাতায় স্কটিশচার্চ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে বাংলায় (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম হন। অতপর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। কলেজে অধ্যাপনায় কর্মজীবন শুরু। পরে অধ্যাক্ষ এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক অবন্তীকুমার বাংলা ভাষার উচ্চমানের গবেষক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক। ফরাসি সাহিত্যিক রঁম্যা রোলার ওপরে বাংলাভাষায় গভীর গবেষণা সম্ভবত তিনিই করেছেন। তিনি রঁম্যা রোলার ‘ভারতবর্ষ’, ‘মস্কোর দিনলিপি’ও অনুবাদ করেন। এছাড়া তিনি কৃষান চন্দের অন্নদাতা, হাওয়ার্ড ফাস্টের ‘শেষ সীমান্ত’ মিখাইল মলোকভের ‘ধীর প্রবাহিনী ডন’ এর অনুবাদ করেন।

এছাড়া মাও সেতুং এর ‘শরতের রেশমগুটি’, ‘ভিয়েতনামের স্পন্দন’, হোচিমিনের ‘ ‘জেলখানার কড়চা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদ। প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি যষস্বী। রবীন্দ্রনাথের গদ্যরীতি (১৯৭০), প্রাচীন নাট্য প্রসঙ্গ (১৯৭২), বাংলা নাটকের প্রথম পর্ব (১৯৮৬), ফরাসি বিপ্লব (১৯৮৯), ভারতীয় কাব্যতত্ত্ব (১৯৯৫), জবির অভিনয় ১৯৯৬, বাংলার আদি মধ্যযুগ (১৯৯৯) তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। এছাড়া তিনি চৈতন্যদেব নিয়ে চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্য ভাগবত সম্পাদনা করেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় রচিত হাজার বছরের কবিতা সঙ্কলন। সাধকপ্রবর এ গবেষক ২০০৭ সালে পরলোকগমন করেন।

এ গ্রামের আরেক কীর্তিমান লেখিকা সুলেখা সান্যাল। রাজবাড়ির ভররামাদিয়ার রাস সুন্দরী দেবী বাংলা সাহিত্যে প্রথম আত্মজীবনীকার। আর তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার কোড়কদির সুলেখা স্যানালের কোনো নারীর বেড়ে ওঠার প্রথম আত্মজৈবনীক উপন্যাস গ্রন্থ। Women's Writing in India 600 BC to the present'  সুলেখা সান্যালের আংশিক অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নারী সাহিত্যিকদের ক্ষুদ্রতম তালিকায় সুলেখা সান্যাল বর্তমান একটি উজ্জ্বল নাম। পূর্ণ উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ The seedling's tale প্রকাশিত হয় ২০০১ সালের (কোড়কদি সমাবেশ, পৃষ্ঠা-২৬)।

কোড়কদির কীর্তিমান মানুষ অজিত সান্যাল। জীবনের নানা সংঘাত উপেক্ষা করে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতি বিকাশে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। বাবা অপূর্ব দাস সান্যাল ছিলেন কোড়কদি রাসবিহারী ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক।


১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। সময়কালটা মহাযুদ্ধ ও মহাদুর্ভিক্ষের কাল। পরীক্ষার পর পারিবারিক ব্যবসায় নিয়োজিত হন কিন্তু গভীর নৈতিকতাবোধে তিনি ব্যবসা থেকে সরে আসেন, ‘যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি, কুড়ি টাকা মনের চাউল চল্লিশ টাকায় বিক্রি করা আমার বিবেক মেনে নিতে না পারায় ব্যবসা ছেড়ে সরাসরি লঙ্গরখানায় চাকরি পেলাম। সুপারভাইজার হিসেবে সরকারি বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত খাবার বরাদ্দ করায় মহকুমা শাসক আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।’ অজিত স্যনাল-----কোড়কদি সমাবেশ-পৃষ্ঠা-১৬। অজিত সান্যালের কথায় ১৯৪৩ এর মহাদুর্ভিক্ষের কিঞ্চিত প্রমাণ মেলে। সে দুভিক্ষ অত্র অঞ্চলে কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছিল অজিত সান্যালের এ উক্তি থেকে তা বোঝা যায়। তিনি কলিকাতায় ভাই অবন্তী সান্যালের মেসে আশ্রয় নেন। এ সময় রাজবাড়ির এক কৃতি সন্তান বিজন ভট্রাচার্যের লেখা ‘নবান্ন’ নাটক তখন খুবই জনপ্রিয়। এ নাটকে তিনি লাঠিয়াল চরিত্রে অভিনয়ে দক্ষতার পরিচয় দেন। এরপর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং নাট্য আন্দোলনে অংশীদার হন। এর পরে তিনি গণনাট্য সংঘের নৃত্য শাখায় বুলবুল চৌধুরীর নিকট নাচ শেখেন। এ সময় নাচের মাধ্যমে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ বিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি করায় বিদেশী কোম্পানির স্টেনোর চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বুলবুল চৌধুরী ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করলে বুলবুল চৌধুরীর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অজিত সান্যাল বুলবুল একাডেমী অব ফাইন আর্টস এর প্রতিষ্ঠাতা নৃত্য শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা ছেড়ে কলিকাতা যান। কেড়কদি সমাবেশে তাঁর স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ রাজবাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অমূল্য উপাদান এখানে কিঞ্চিত তুলে ধরা হলো------‘আমার পৈতিক বাস কোড়কদি গ্রামে। আগে রাজবাড়ি মহকুমা (গোয়ালন্দ) অধীনে বালিয়াকান্দি থানা অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুরাশী বছর বয়সে পুরানো স্মৃতি যতই ধূসর হোক তবুও কোড়কদির কথা কি ভুলতে পারি? হারখালির মাঠ, স্কুলের মাঠ, ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কুঠিবাড়ির আমবাগানে আম কুড়ানো থিয়েটার হলের পাশে নোয়াবাড়ির ভাঙ্গা মণ্ডপ থেকে রাতে পায়রা ধরা, রায়বাহাদুর দাদুর বড় দালানের সামনের বিরাট উঠোনে যাত্রা দেখা, দুর্গাপুজোর আগে কলকাতা থেকে প্রবাসীদের নৌকার সংখ্যা গোনা, গ্রামের দশ বাড়িতে দুর্গার আরতি দেখা, বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষে গ্রামে আসা প্রবাসীদের থিয়েটার দেখা, চন্দনা নদীতে নৌকা বাইচ, সরস্বতী পুজোয় ছোটদের থিয়েটার, গাজনে রামধন তর্কপঞ্চাননের লাইব্রেরির সামনে শিবু মিস্ত্রির বিশাল পাট চালান, স্বদেশী আন্দোলনের সময় পুলিশের চড় থেকে কাকাদের সাবধান করা, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে ‘বন্দে মাতরম, পুলিশের মাথা গরম’ স্লোগান দিয়ে পিছন পিছন ছোট বটতলা দল বেঁধে ছোটা।’ কেবল শিল্প সাহিত্যেই নয় খেলাধুলায় কোড়কদির ঐতিহ্য সুবিদিত। তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমায় ফুটবল খেলা প্রতিযোগিতা অত্র অঞ্চলে একক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

কোড়কদি ছিল এর সূত্রাগার। এ গ্রামের শিবদাস ভাদুড়ী ও বিজয়দাস ভাদুড়ী ফুটবল জগতে স্মরণীয় নাম। শিবদাস ভাদুড়ী (১৮৮৪-১৯৩২) এ গ্রামের মানুষ, তিনি ছিলেন কলকাতা মোহনবাগান টিমের অধিনায়ক। ১৯১১ সালে তার অধিনায়কত্বে মোহনবাগান ক্লাব ইস্ট ইয়র্ক দলকে ২-৯ গোলে পরাজিত করে প্রথম ভারতীয় দল আইএসইস শিল্ড জয় করে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে। মোহনবাগানের আর এক দুধর্ষ খেলোয়াড় বিজয় দাস ভাদুড়ী। বিজয়দাস ভাদুড়ী শিবদাস ভাদুড়ীর ভ্রাতা। গণচেতনা, রাজনীতি, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কোড়কদি ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল নাম। স্বদেশী, অনুশীলন, অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনে এ গ্রামের মানুষ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তেভাগা আন্দোলন ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব অবনী লাহিড়ী ও শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্যের অবদান এ গ্রন্থের রাজনীতির অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।


কোড়কদি গ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য স্মরণে বাংলাদেশ লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) জিগাতলা, ঢাকা এর নির্বাহী পরিচালক সুব্রত কুমার দাস এর উদ্যোগে ৩০ জানুয়ারি ২০১০, কোড়কদি রাসবিহারী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন মাঠে ‘কোড়কদি সমাবেশ’ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমানুষ ও অত্র অঞ্চলের সুধীমহলের অংশগ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সমাবেশটি সফলভাবে পালিত হয়। ঐতিহ্য ধারণে এ এক অনুপম দৃষ্টান্ত। প্রধান অতিথি ছিলেন ফরিদপুর-১ এর মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য মোঃ আব্দুর রহমান। বিশেষ অতিথিবৃন্দ ছিলেন ড. মনিরুজ্জামান, ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারী, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, আবু সহিদ খান, ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন, ড. মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর  হোসেন, ড. তপন বাগচী, রবিশংকর মৈত্রী, জান্নাত-এ-ফেরদৌসী, এসএম মোস্তফা কামাল, আবু সাঈদ মিয়া, সুরাইয়া সালাম প্রমুখ। সমাবেশকে লক্ষ্য করে প্রকাশিত ‘কোড়কদি সমাবেশ’ স্যুভেনীর কোড়কদি তথা অত্র অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের দলিল।

মূলঘর ও পালঙ্ক কাহিনী

‘শখের পালঙ্ক’ শিরোনামে দৈনিক পত্রিকার পাতায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পালঙ্কটি অনেক বছর পূর্বে জাতীয় জাদুঘরকর্তৃক রাজবাড়ি জেলা থেকে সংগৃহীত হয়। বর্ণনানুসারে কাঠ, লোহা, কাচ ও কাপড় দিয়ে তৈরি গোটা খাটটি চারটি বাঘের থাবার উপর দাঁড়িয়ে আছে। থাবার উপরিভাগে টুলের অনুরুপ প্রায় বৃত্তাকার পাটাতনের উপর একটি হস্তি শাবক। তার পিঠের উপর একটি সিংহ শাবক আক্রমণোদ্যত ভঙ্গিতে দুই পা দিয়ে হস্তির শূঁর আঁকড়ে ধরে আছে। সিংহ শাবকটিকে আবার ঠোকরাচ্ছে একটি উড়ন্ত গরুড় পাখি। জোড়াবিহীন কাঠের বাঘের থাবার উপর পর পর তিনটি জীব জানোয়ারের ফিগার অনুপম সৌন্দর্য দান করেছে। গোটা পালঙ্কটি চারপায়াসদৃশ্য চার খুঁটির উপর ন্যাস্ত। বিশাল পাটাতন, পাটাতনটির বেদ আনুমানিক দেড়ফুট। ভেলভেট কাপড়ে আচ্ছাদিত নরম বিছানা। চার পায়ার উপর নৃত্যরত ভঙিমায় দাঁড়ানো কম বয়সী চার নগ্ন রমণী। নগ্নিকা রমণীর ডানহাত স্পর্শ করে আছে মশারীর স্ট্যন্ড। শয্যায় উঠার জন্য তিন ধাপ বিশিষ্ট আলাদা ছোট সিঁড়ি। বিছানার প্রবেশপথে অতন্ত্র প্রহরীর মতো বসে আছে দুটি সিংহ। পাটাতনের কাঠামোতে লোকজ চিত্রকর্ম, ফুল লতাপাতার অলঙ্করণ। হস্তিশাবকের কাছেই দু’জন তরুণী।

পালঙ্কটির শিরোভাগে প্রসাধনী সামগ্রী রাখার জন্য আছে একটি কাঠের বাক্স। এ খাটের মালিক কোনো সুরুচিবোধের জমিদার সে খোঁজ করতে করতে পাওয়া গেল মূলঘর জমিদার বংশের ইতিহাস। খাটটির মালিক ছিলেন মূলঘরের কোনো এক ভূমিপতি। নবাব, মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে বঙ্গে আচার্য, বৈদ্য, কাশ্যপ, মজুমদার, রায়, রায়বাহাদুর, মুন্সি, রায়চৌধুরী, সেন ইত্যাদি জমিদার বংশের বিকাশ ঘটে। এরা বিত্তে, শিক্ষায়, শাস্ত্রে উচ্চবংশীয় হিন্দু। তাদের মধ্যে সুরুযপারী গ্রহবিপ্রগণ বেদ-বেদান্ত, জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চাকারী শাস্ত্রীয় সুপণ্ডিত। ভক্তি, শোধন, সাধনে সদা সর্বদা নিয়োজিত। তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহাকুমার (রাজবাড়ি জেলা) মূলঘর, দ্বাদশী, পাঁচথুপী, খালকুলায় তাদের বসতি গড়ে ওঠে।

প্রায় চারশত বছর পূর্বে কাশ্যপ গোত্রীয় মধুসূদন উপাধ্যায় নামক এক জ্যোর্তিবিদ পণ্ডিত এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পঞ্চকোটের রাজার সভাপণ্ডিত ছিলেন। সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন শেষে পঞ্চকোটে প্রত্যাগমণকালে ভূষণার মুকুন্দরাম রায়ের সভায় উপস্থিত হন। সঙ্গে ছিলেন পুত্র বিশ্বরুপ।


মধুসূদনের মতই যুবক পুত্র সুপণ্ডিত ছিলেন।  জ্যোতিষশাস্ত্রে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। মুকুন্দরাম তাঁকে সভায় থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। মধুসূদন তাতে রাজী হন না তবে পুত্র বিশ্বরুপকে প্রেরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। মধুসূদন পঞ্চকোর্ট ফিরে পুত্রকে স্বীয় আরাধ্য বাসুদেবসহ ভূষণায় প্রেরণ করেন। মুকুন্দরাম চন্দনা নদীর তীরে পাঁচশত বিঘা ব্রহ্মত্রা ভূমিসহ বিশ্বরুপকে বাসস্থান প্রদান করেন। বাসুদেব বিগ্রহের নামানুসারে স্থানটির নাম হয় বাসুদেবপুর। এ স্থানটি এখন ব্যাসপুর নামে খ্যাত। বিশ্বরুপের অধস্তন একাদশ পুরুষ মহাদেব আচার্য। তিনি মহাদেব ঠাকুর নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সাধক। অতঃপর ব্যাবপুরের কিছু অংশ চন্দনাগর্ভে বিলীন হলে তিনি বর্তমান মূলঘর গ্রামে কিছুদিনের জন্য বসতি স্থাপন করেন। পরে মহাদেব আচার্য সীতারাম কর্তৃক শিবত্রা ও ব্রহ্মত্রা পাঁচশত বিঘাপ্রাপ্ত জমি দান সূত্রে পাওয়ায় এবং সীতারামের অনুরোধে চন্দনা নদীর তীরে বাগাট গ্রামে বসবাস করেন। তবে মূলঘরের সরুজপারী গ্রহবিপ্রকূলের রামকান্ত আচার্যের পূর্ব পুরুষেরা মূলঘরে থেকে যায়। এই রাজকান্ত আচার্যের পূর্ববংশীয় সুরুজপারীসকল, ষ্ফটিক পাথরের একটি সূর্যমূর্তি ও দামোদর নামক এক নারায়ণমূর্তির সেবা করতেন। সূর্যমূর্তিটি ছিল গোলাকার। প্রতিদিন পূজার পূর্বে চন্দন দিয়ে ধৌত করার পর অপূর্ব রশ্মি নির্গত হত। কোনো যুগে বা কোথা থেকে এমন উজ্জ্বল ষ্ফটিক পাথরের মূর্তি আনা হয়েছিল তা জানা যায় না। অন্য আর একটি মূর্তি দামোদরমূর্তি। দামোদর প্রকাণ্ড নারায়ণমূর্তি। এই মূর্তিটি ছিল বেশ ভারি। বিগ্রহ দুটির জন্য তৎকালীন রাজারা প্রচুর সম্পত্তি দেবত্রা ও ব্রহ্মত্রা হিসেবে দান করেন। রাজা সীতারামের রাজ্যের অধীন এ অঞ্চলটি সীতারামের মৃত্যুর পর নাটোর রাজ রামজীবন এর জমিদারীপ্রাপ্ত হন। তিনিও ২৫ বিঘা দেবত্র সম্পত্তি তাম্রপাত্রে লিখে রামকান্ত আচার্যকে দান করেন। রামকান্তের বংশের অধস্তন পুরুষ পুত্রহীন হওয়ায় দ্বাদশীর ভরদ্বাজ গোষ্ঠীর হরিপ্রসাদ ঐ বংশের একমাত্র কন্যাকে বিবাহ করে মূলঘরবাসী হন। তাঁর বংশধরেরা উক্ত বিপুল পরিমাণ ব্রহ্মত্র, দেবত্র সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছিলেন। তখন ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। ঐ সকল জমি যশোর জেলার অধীন ছিল। কিছু জমি বেদখল হয়। ঐ বংশের গোলকচন্দ্র সে সব জমি উদ্ধার করেন।

প্রাচীন এই গ্রামের প্রাচীন নির্দশন হিসেবে বড় বড় দিঘিকা (দিঘি) দেখা যায়। আচার্য মহাশয়দের বিস্তৃত ভূমি ছিল অরণ্যকার। নিবিড় অরণ্যসম স্থানে বৃক্ষরাজি, গভীর জলাশয়, দামদল ফসলের মাঠ এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভূমি। এ সব জলাশয়ে কুম্ভীর ও বনে ব্যাঘ্র বাস করত। আম, কাঁঠাল, শুপারি, ফলবান বৃক্ষের আস্বাদনের ছায়ায় শিল্প চর্চায় নিবৃত্ত কোনো সুরুচিবান আচার্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাঘ্র, হাতি এবং নান জীব জানোয়ারের প্রতিক নিয়ে ঐ অনুপম সৌন্দর্যের কাট নির্মাণ করেন। ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহে খানখানাপুরের জমিদার মাখন বাবু খাটটির মালিক হন। এরপর মাখন বাবুর নিকট থেকে খাটটি আসে গোয়ালন্দ নিবাসী মোস্তফা সাহেবের ঘরে। মোস্তফা সাহেবের নিকট থেকে ঢাকা জাদুঘর খাটটি অধিগ্রহণ করে।

রতনদিয়া গ্রাম

কালুখালি রেলস্টেশন সন্নিকট রতনদিয়া গ্রাম। ১৮৭১ সালে রেল স্থাপন কালে স্টেশনটি বর্তমান অবস্থান থেকে ৪ কিমি উত্তরে ছিল। ১৯২১ সালে ভাটিয়াপাড়া রেল স্থাপন কালে নদী ভাঙ্গনের কারণে বর্তমান স্টেশনটি পুনঃস্থাপিত হয় এবং জংশন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। রতনদিয়াই এক অর্থে কালুখালি জংশন। এ গ্রামের উত্তর ভাগে রেললাইন, দক্ষিণে চন্দনা নদী, পূর্বদিকে কাশিনাথপুর গ্রাম।


রেল স্থাপনের পর এখানে বাজার বসে। রতনদিয়া গ্রামের নামকরণের সাথে জড়িয়ে আছে জেলার প্রাচীন ইতিহাস। যশোর জেলার নড়াইলের জমিদার রামরতন রায় (ডাক নাম রতনবাবু) মহিমশাহী পরগনার মালিক। তিনি ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার। যেন তার জমিদারীতে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খায়। রতনদিয়া গ্রাম মহিমশাহী পরগনার অন্তর্গত। এখানে দুটি রায় বাড়ি ছিল অধিক প্রতিপত্তিশালী। পশ্চিম অংশে নন্দকুমার রায়, পূর্বদিকে বিশ্বকুমার রায়। তারা ছিলেন ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ। তাদের জনহিতকর কাজে প্রীত হয়ে রামরতন গ্রামটিকে ‘রত্ন’ উপাধি দেন। গ্রামের মানুষ প্রতিদানে রামরতনের নামে ‘রতনদিয়া’ নামে আখ্যায়িত করে। মহিমশাহী পরে পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রচন্দ্র বাহাদুরের হাতে যায়। তিনি এ পরগনার তিনটি ডিহি কাচারি স্থাপন করেন। এরমধ্যে বালিয়াকান্দি সাব অফিস, সোনাপুরে ডিহি কাচারি এবং রতনদিয়া ডিহি কাচারি। রতনদিয়া তখন ৫০/৬০ ঘর হিন্দুর বসতি। তারা সকলেই ব্রাহ্মণ ছিল। পশ্চিমাংশে ছিল নন্দকুমার রায়ের দোতলা বাড়ি। আর পূর্বাংশে বিশ্বনাথ গোপীনাথ রায়ের বাড়ি। একতলা বাড়ি, পুকুর, চণ্ডিমণ্ডপ, নাটমন্দির, ইত্যাদি। নন্দকুমার রায় ছিলেন বালিয়াকান্দি নীলকুঠির দেওয়ান। ৮ বেহারার পালকিতে বালিয়াকান্দি থেকে রতনদিয়া যাতায়াত করতেন। মুগ্ধ নয়নে এ দৃশ্য মানুষ দেখত। তার পূর্ববংশধর রাজমোহন রায় বংশ পরস্পরায় রতনদিয়া নীলকুঠির পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি ছিলেন রতনদিয়া পাইকপাড়া জমিদারীর কাচারির নায়েব। তখনকার দিনে স্থানীয় জমিদার, বধিষ্ণু উচ্চ ধনি শিক্ষিত পরিবারকে অন্যত্র থেকে  এনে বসতি স্থাপন করাতেন। গ্রামের পূর্বাংশের রায়েরা ৩০-৪০ ঘর মাহিষ্যদাস, রজক, বাদ্যকর ও পশ্চিমাংশের রায়েরা ৮-১০ ঘর দেবনাথ, ৮-১০ ঘর সুত্রধর, কয়েক ঘর পরামানিক, ঢুলি, পালকি বাহক ও নমঃশুদ্র বসতি স্ংস্থাপন করান। ঐ দুই রায় বংশ ছাড়াও আরো দুই ঘর রায় ছিলেন। তারা ছিলেন সাণ্ডিল্য গোত্রজ।

রতনদিয়া গ্রাম ছিল তৎকালীন সময়ে সংস্কৃতি বিকাশের কেন্দ্র। পূজা-পার্বণ ছাড়াও নিত্যদিন গানের আসর বসত; যাত্রা, পালাগান, খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। কাচারীর রাজমোহন রায় ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ। জানকী চক্রবর্তী ছিলেন ভালো গায়ক। কুঞ্জলাল ছিলেন তবলা বাদক। পরবর্তীতে নদীয়া জেলা থেকে একজন ওস্তাদ গায়ক ও সানাই বাদক আসেন। তার নাম আকবর। সে আর দেশে ফেরে নাই। রতনদিয়াতেই দেহত্যাগ করেন। মাঝে মাঝে অন্যত্র থেকে বড় বড় গায়ক আসতেন। তখন অঞ্চলে সারা পড়ে যেত। ১৯১৭ সালে কবি বিহারি লাল গোস্বামী রতনদিয়ায় বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন পাবনা জেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের অধিবাসী, পোতাদিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ছিলেন আদর্শবান ঋষিপ্রতিম মানুষ। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তৎকালীন উঁচু মানের সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গদেশ, ভারতী, বঙ্গভাষা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখা ‘গীতাবিন্দুবাদ’ নামে গীতার ছন্দানুবাদ বিখ্যাত ছিল। তার লেখা শেখ সাদির ‘পন্দনামার’ কাব্যানুবাদ বের হয়। তার উচ্চ আদর্শ, পাণ্ডিত্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাকে যথেষ্ট সমাদর করতেন। ১৯৩১ সালে তার পরলোকগমনের পর রবীন্দ্রনাথ সমবেদনা জানিয়ে তার পুত্র পরিমল গোস্বামীকে একখানা পত্র দিয়েছিলেন। বিহারিলাল গোস্বামীর পুত্র পরিমল গোস্বামী (এমএ) ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। ‘স্মৃতিচিত্রণ’ ‘দ্বিতীয় স্মৃতি’ ‘আমি যাদের দেখেছি’  প্রভৃতি গ্রন্থসমূহ বৈচিত্র পূর্ণ কর্মজীবনের সন্ধান মেলে। পাংশার অদূরে কালিকাপুরে যতীন্দ্রনাথ বাগচীর কন্যাকে বিবাহ করেন। পরিমলের দুই পুত্র শতদল ও হিমানিশ দুজনেই ছিলেন গ্রন্থ লেখক । শতদল ‘আমাদের গ্রাম’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। হিমানিশের লেখা ‘লন্ডনের পাড়ায় পাড়ায়’  ‘বিলাতি বিচিত্রা’ ‘ঘটকালি’ গ্রন্থগুলি খ্যাতি অর্জন করে। তিনি পাঁচ বছর ইংল্যান্ড কাটান।


তিনি কার্টুনিস্ট হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩২ সালে পরিমল গোস্বামী শনিবারের চিঠির সম্পাদক নিযুক্ত হন। রবীন্দ্রনাথ মৈত্র (বি এ) ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘দধিকর্দম’ ফিচার লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি দিবাকর বার্মা ছদ্মনামে শনিবারের চিঠিতেও নিয়মিত লিখতেন। তার লেখা ‘মানময়ী গালর্স স্কুল’ তৎকালীন সময়ে সাড়া জাগানো উপন্যাস। এ গ্রন্থটি লেখার পর তার নাম ছড়িয়ে পরে। মানময়ী গালর্স স্কুল সে সময়ে ছোট বড় সকল অনুষ্ঠানে অভিনীত হত। গ্রন্থটি চলচ্চিত্রে রুপায়ণ হয়। উত্তম কুমার অভিনয় করেন। ‘মানময়ী গালর্স স্কুল’ যে কত নাট্যগোষ্ঠী দ্বারা কতবার কতস্থানে অভিনীত হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। সকলের মুখে মুখে ছিল, মানময়ী গালর্স স্কুল। এ ছাড়া তিনি ‘থার্ড ক্লাস’ ‘উদাসীন মাঠে’ ‘দিবাকরী’  ‘বাস্তরিকা’ ‘ত্রিলোচন কবিরাজ’ গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৩২ সালে তিনি অকাল মৃত্যুবরণ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় তার প্রতিকৃতিসহ সংক্ষিপ্ত জীবনী বের হয়। পরিমল গোস্বামী সম্পাদিত শনিবারের চিঠি (১৩৩৯) রবীন্দ্রমৈত্র সংখ্যারুপে প্রকাশিত হয়। শ্রীমান ননীগোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ১৯১২ সালে প্রাথমিক পরীক্ষায় ৫ টাকা, ম্যাটিকুলেশন পরীক্ষায় (প্রথম বিভাগ) ১৫টাকা, আইএসসি পরীক্ষায় (প্রথম বিভাগ) ২০ টাকা, বৃত্তিপ্রাপ্ত হন।

গণিতশাস্ত্রে বিএসসি অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি লাভ করেন। এমএসসি অধ্যায়নকালে Astronomical observatory student  হিসেবে প্রতিমাসে ২০ টাকা সাহায্যপ্রাপ্ত হন। ১৯২৬ সালে সাব-ডিপুটি কালেক্টর নিযুক্ত হন। রতনদিয়ায় হাসপাতল স্থাপনকালে তিনি ৫০০ টাকা দেন।

ডা. অতুলকৃষ্ণ চক্রবর্তী (এলএমএফ) ছিলেন  রতনদিয়ার নিবেদিত চিকিৎসক। তিনি মিটফোর্ড থেকে পাস করে রতনদিয়া প্র্যাকটিস শুরু করেন। তিনি ছিলেন সুচিকিৎসক, সু-অভিনেতা ও সমাজসেবী। তখন ১৫ মাইলের মধ্যে কোনো পাস করা ডাক্তার ছিল না। তিনি এ পেশায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। সে অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করতেন। এরপর আর একজন ডাক্তার আসেন। তার নাম মনীন্দ্রনাথ সান্যাল। তিনি একেবারেই অর্থলোভী ছিলেন না। যে যা দিতেন তাই নিয়েই সন্তষ্ট থাকতেন। রোগী বার্লি খেতে না চাইলে নিজের ডিসপেন্সারীতে স্টোভ, প্যান, পেয়ালা, চামচ এনে বার্লি তৈরি করে দিতেন এবং রোগীর অভিভাবককে বার্লি বানানোর কৌশল শিখিয়ে দিতেন।

রতনদিয়া গ্রামে মুসলমান জমিদার ছিলেন খান বাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরী। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত উকিল ও রাজনীতিবিদ বঙ্গীয় ব্যাবস্থাপক সভার সদস্য। বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী রশিদ চৌধুরী তার পুত্র। (ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ও রশীদ চৌধুরী পরবর্তী অধ্যায়ের আলোচিত)।

ধুঞ্চি গ্রামের ঐতিহ্য

রাজবাড়ি জেলায় ১০৫৬টি গ্রাম। এরমধ্যে  কাজীকান্দা, পদমদি, বেলগাছি, খানখানাপুর, বাণীবহ, মুলঘর, রাজাপুর, নলিয়া জামালপুর, বহরপুর, খালকুলা, সোনাপুর, রতনদিয়া, মাজবাড়ি, মাগুরা ডাঙ্গি, হাবাসপুর, কসবা মাঝাইল, সমাধিনগর, যশাই ঐতিহ্যবাহী এমন গ্রাম রয়েছে। এরমধ্যে ধুঞ্চি গ্রামটি একটু আলাদা। এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের সাথে যেমন জড়িয়ে আছে এর ইতিহাস তেমনি এ গ্রামটি প্রাচীন পদ্মার প্রবাহমানতার স্বাক্ষী। এ গ্রামটি একদিকে যেমন এ অঞ্চলে কাপড় উৎপাদনের ক্ষেত্র তেমনি গ্রামটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক খ্যাতিমান পুরুষ।


এ গ্রামের পূর্ব পুরুষেরা প্রায় ৩০০ বৎসর পূর্বে পাবনা জেলার রাজরামবাড়ি থেকে বর্তমান ধুঞ্চি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তাদের পূর্ব পুরুষেরা হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর বংশ। হযরত আবু আইয়ুব আনসারী ছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর হিজরতের সঙ্গী। পরবর্তীকালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আবু আইয়ুব আনসারীর ধর্ম প্রচারক দলের কেহ পাবনার রাজরামবাড়ি বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষ  বলে তারা দাবি করেন। পদ্মা প্রবাহের আলোচনায় দেখা যায় প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে পদ্মার প্রবাহ বর্তমান রাজবাড়ির অতি নিকটবর্তী ছিল। রাজরামবাড়ি তখন পদ্মার ওপারের গ্রাম। পদ্মা ভেঙ্গে উত্তরে সরে গেলে ভাঙ্গনের মুখে রাজরামবাড়ি থেকে তারা পদ্মার এপারে ধুঞ্চি চরে স্থান নেয়। যে কারণে পরবর্তীতে তা ধুঞ্চি গ্রাম নামে পরিচিতি পায়। তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে তাঁতশিল্পীদের আধিক্য ছিল। উল্লেখ্য যারা রাজবাড়ি থেকে ধুঞ্চি চরে আসেন তার সবাই পেশায় ছিলেন তাঁত শিল্পী। এসব তাঁতশিল্পীরা পেশাদক্ষতায় ছিল উন্নত। অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতি অল্প সময়ে তার প্রাধান্য অর্জন করে এবং ধুঞ্চি হয় এ অঞ্চলে কাপড় উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। ধুঞ্চি গ্রামে জন্ম নিয়েছেন অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক প্রতিভাবান ব্যক্তি, খেলোয়াড়। রাজবাড়ির বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজবেসক কাজী হেদায়েত হোসেনের জন্মস্থান রাজবাড়ির ধুঞ্চি গ্রামে। উক্ত গ্রামের ছাবের মোল্লা পরিবারের কৃতি সন্তান আযহার উদ্দিন ১৯২৫ সালে অত্র অঞ্চলের তাঁতী সম্প্রদায়ের মধ্যে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি কোরআনের আলো, হাদীসের আলো ও আরবের আলো প্রভৃতি পুস্তক প্রণেতা।

তাঁর পুত্র কামাল উদ্দিন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের ভূমি, খাদ্য, পরিকল্পনা ও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব ছিলেন। তিনি বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন সরকারি চাকরি হতে অবসর নেন। এই পরিবারের আরেক কৃতি সন্তান ডা. তালেবুর রহমান প্রেমের কবিতা ‘মনের হেনা’ নামক পুস্তকের রচয়িতা। এই গ্রামের ইখলাস উদ্দিনের ‘ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব’ বইটি ধর্মীয় চিন্তাবিদদের কাছে একটি প্রিয় বই। এ গ্রামের প্রতিভাবান ছেলে নেহাল উদ্দিন। তিনি ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যটমিক এনার্জির ওপর ডক্টরেট করেন। বর্তমানে তিনি কানাডায় মন্ট্রিল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। এ গ্রামের আর এক সন্তান প্রতিভাবান সন্তান মিরাজ উদ্দিন মিয়া। তিনি বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। অনর্গল ইংরেজি ও বাংলায় বক্তৃতা এবং ইসলাম ধর্মের উপর পাণ্ডিত্য এলাকার মানুষকে মুগ্ধ করত। অত্র গ্রামের মাহবুবুল আলম দুলাল প্রথম চার্টার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট। তিনি বর্তমানে কর্ণফুলি ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। এই গ্রামে বসবাসকারী অসংখ্য সংসারী মানুষের পাশাপাশি সংসার ত্যাগী, খোদার ধ্যানে আত্মমগ্ন মানুষ সর্বজন শ্রদ্ধেয় হযরত কাসেম আলী ফকির ও হযরত শাহ সাহেব এর মাজার বিদ্যামান আছে। এ গ্রামের বিশিষ্ট ফুটবলার এনায়েত করিম খোকা (মৃত), এনায়েত করিম খোকা (মৃত), এনায়েতুর রহমান মনা। এ গ্রামের আর এক কৃতি সন্তান আরজু, বুকডনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। ধুঞ্চি গ্রামের এ ঐতিহ্য গ্রাস করতে চলেছে পদ্মার ভাঙ্গন। দীর্ঘকালের মরা পদ্মা বলে পরিচিত পদ্মার কোল সাবেক নদীর রুপ নিয়েছে। ভাঙ্গন ধুঞ্চি গ্রামের কাছাকাছি। এ ভাঙ্গন না ঠেকালে শুধু গ্রামই নয়, শহর রক্ষাও দুস্কর হবে। এ ব্যাপারে রাজবাড়িবাসীকে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

রাজবাড়ি শহর ও যোগাযোগ

ঐতিহ্যগতভাবে রাজবাড়ি রেলশহর হিসেবে পরিচিত। ১৮৭১ সালে গড়াই ব্রিজ সমাপ্ত হলে পূর্বদেশগামী রেলপথ জগতি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়।


গোয়ালন্দ তখন বর্তমান গোয়ালন্দ থেকে পশ্চিমের উজানে আরিচা ঘাট সোজা প্রায়। দুর্গাপুর, তেনাপচা, জামালপুরকে ঘিরেই ছিল তখন গোয়ালন্দ ঘাট। গোয়ালন্দ ঘাট গ্যাঞ্জেস বন্দর বলে পরিচিত ছিল। একে বলা হত বাংলার দ্বারপথ। অর্থাৎ গোয়ালন্দ ছিল Gate way of Bengal । প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গনে গোয়ালন্দ ঘাট ৫/৬ মাইল ভাটিতে স্থাপন করা হয়। ১৮৭১ সালে রেল সম্প্রসারণকালে তা বর্তমান রাজবাড়ি শহরের আরো উত্তর দিক দিয়ে স্থাপিত হয়। এখনো রেলের একটি পথ লোকোসেড থেকে ভবদিয়ামুখি সে চিহ্ন বহন করছে। ১৮৯০ সালে রেলপথটি কালুখালি, বেলগাছি, রাজবাড়ি হয়ে নতুন ঘাট পর্যন্ত পুনস্থাপন করা হয়। এ সময় রাজবাড়ি রেল স্টেশনটি স্থাপিত হয়। গোয়ালন্দ ঘাট ভাঙ্গনের মুখে থাকায় তখন থেকেই রেলের অফিস, কোয়ার্টার ও অন্যান্য অফিস আদালত বর্তমান রাজবাড়ি শহরে স্থানান্তর হতে থাকে। এভাবে রাজবাড়ি শহরের গোড়াপত্তন হয়। প্রায় তিনশত বছরের ঐতিহ্যবাহী লক্ষীকোল রাজা সূর্যকুমারের পূর্বদেশের মনোমগ্ধকর সৌন্দর্যময় ঐতিহ্যবাহী রাজপ্রাসাদ, পাইক, পেয়াদার ঘরবাড়ি, জমিদার কাচারী, পোস্ট অফিস, সবমিলে দেশব্যাপী রাজা সূর্যকুমারের নাম বিখ্যাত ছিল।

রাজা সূর্যকুমারের প্রতিষ্ঠিত (১৮৮৮) রাজবাড়ি সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন, রাস্তা ঘাট, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়। বাণীবহের জমিদার গিরিজাশংকরের নির্মিত গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (স্থাপিত ১৮৯২), সরকারের অফিস আদালত, রেলের অফিস, কোয়ার্টার, লোকোসেড, দোকান পাট, লোক সমাগম রাজবাড়িকে শহর পরিচিতি দান করতে থাকে। রাজবাড়ি শহরের ভিত্তি গড়ে ওঠায় ১৯১৩ সালে ইউনিয়ন বোর্ড এবং ১৯২৩ সালে তা মিউনিসিপ্যালিটিতে পরিণত হয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ বৃটিশ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমের একমাত্র যাতায়াত পথ হওয়ায় শিক্ষা, রাজনীতি, ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে। হোটের, বিশ্রামাগার প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। মাছের ব্যবসার জন্য গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি বরফ কল। ১৯৩৭ সালে স্থাপিত হয় ড্রাই আইস ফ্যাক্টরি। এভাবেই শহরের ভিত্তি গড়ে উঠতে থাকে। ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি বিনোদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট। বিদ্যুতের আলোয় শহরজীবন মুখরিত হয়। কেবল রাজবাড়ি নয় বিনোদপুর পাওয়ার প্লান্ট থেকে ফরিদপুর শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ অতঃপর আধুনিক হাসপাতাল, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। তৎকালীন চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধি মরহুম ফখর উদ্দিন আহম্মেদ, মরহুম এ্যাডভোকেট মাজেদ আলী খান, মরহুম আহম্মদ আলী মৃধা, প্রয়াত নবকৃষ্ণ চক্রবর্তী, মরহুম এ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল মিয়া, মরহুম হাবিবুর রহমান, মরহুম কাজী হেদায়েত হোসেন, মরহুম আক্কাছ আলী মিয়া, মিউনিসিপ্যাল ও পৌর প্রধানের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রাজবাড়ি শহরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। প্রকৃত অর্থে শহরটি আধুনিক শহরে রুপ নেয় আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সময়কালে। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম পর পর তিনি বার পৌরসভা চেয়ারম্যান থাকাকালীন পরিকল্পনামাফিক শহরটি গড়ে ওঠে। প্রতি ওয়ার্ডে পাকা রাস্তাসহ দোকান পাট আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কাপড় বাজার, মাছের বাজার, তরকারি বাজারে পাকা ছাউনী গড়ে ওঠে। প্রশস্ত রাস্তার দু ধারে গড়ে ওঠে আলো ঝলমল দোকান, পৌর বিপনী।

যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানেই তিনি নির্মাণ করেন পাকা রাস্তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি রাজবাড়ি শহরে প্রবেশ মুখের পুরাতন সড়কটি ভেঙ্গে অতি প্রশস্ত ‍দ্বিমুখী রাস্তা নির্মান করেন। মাঝের আইল্যান্ড বরাবর অলঙ্কারিক দেবদারু (বিদেশী) বৃক্ষ শোভিত রাস্তা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে মনে হবে সজ্জিত কোনো বৃহৎ শহরে প্রবেশ করছি। এদিকে মানুষের আর্থিক অবস্থার অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে। ২০ বছর পূর্বেও রাজবাড়ি তেমন দালানকোঠা দেখা যেত না। এখন প্রায় সকলেরই পাকা বাড়ি।


অসংখ্যা দোতলা তিনতলা এমনকি পাঁচতলা ছয়তলা গড়ে উঠেছে। পৌরসভার পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। ক্রমাগত শহরটি আধুনিক ছিমছাম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠছে। সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী চৌধুরী ও সে ধারাটি অব্যাহত রেখেছিলেন। বর্তমান চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেন মিয়াও ধারাটি অব্যাহত রেখেছেন। ইতিমধ্যে ট্রিটমেন্ট ওয়াটার সাপ্লাই থেকে বিশুদ্ধ পানি সরবারহ শুরু হয়েছে। পয়োপ্রণালীসহ জলাবদ্ধতা দূরীকরণে পানি নিষ্কাশনে তিনি ড্রেনেজ নির্মাণ করেছেন। পৌরসভার পুরাতন ভবন ভেঙ্গে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। শহরটি ছোট হলেও যে কোনো আগন্তককে তা আকৃষ্ট করে।

বাংলাদেশের মানচিত্রে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে রাজবাড়ি জেলা তথা শহরটি দেশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। রাজধানী ঢাকা থেকে আরিচা রোড ধরে ফেরি পারাপার হয় একই বাসে সরাসরি মাত্র আড়াই ঘন্টায় রাজবাড়ি পৌঁছে যাওযা যায়। সাউদিয়া, সুবর্ণ এমএম সৌহার্দ নামের বাস সরাসরি চলাচল করে। বাসে সরাসরি ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা যশোর, মাগুরা ঝিনাইদহ, বেনাপোল, পাবনা, দিনাজপুর যাওয়া যায়। ট্রেনে চেপে কুষ্টিয়া, খুলনা রাজশাহী, দিনাজপুর যাতায়াত সুলভ ও আরামদায়ক। দৌলতদিয়ায় লঞ্চ ও নৌকা বিহার আকৃষ্ট করবে।

বাংলার প্রথম মুসলিম উপন্যাসিক ও বিষাদ সিন্ধুর লেখক মীর মোশারফ হোসেনের মাজার ও মনোমুগ্ধকর স্মৃতিকেন্দ্র পদমদি রাজবাড়ি থেকে মাত্র এক ঘন্টারও কম সময়ের পথ। পাকা রাস্তা এবং পথের দু’ধারে শস্যক্ষেত আকৃষ্ট করে। রাজবাড়ি শহর থেকে এক ঘন্টার পথ অতিক্রম করে কবিগুরুর কুঠিবাড়ি শিলাইদহ যাওয়া যায়।

ঐতিহ্যগত দিক থেকে শহরটি নানা সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের মিলন কেন্দ্র। বর্তমানে সে ধারাটি অব্যাহত আছে। অনেক গুণী শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকর্মী, সাংবাদিকের বসবাস রাজবাড়ি শহরে। সামাজিক বন্ধন হৃদ্যতাপূর্ণ। সবুজ গাছপালায় আচ্ছাদিত শহরটি মনোরম সৌন্দর্যমণ্ডিত। শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার উত্তরে ঐতিহ্যবাহী প্রমত্ত পদ্মা প্রবহমান। পদ্মার সেই ইলিশের প্রাচুর্য নাই। তবে রাজবাড়ির চমচমের স্বাদ কেউ ভুলতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মানের রাজবাড়ি সরকারি কলেজ, সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ, ডা. আবুল হোসেন কলেজ, অঙ্কুর স্কুল এন্ড কলেজ, আহম্মদ আলী মৃধা কলেজসহ রয়েছে সাতটি সরকারি ও বেসরকারি  মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী টাউন মক্তবসহ আছে চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইংলিশ মিডিয়াম কোয়ালিটি স্কুল, রাজবাড়ি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ বিশ/পঁচিশটি কিন্ডার গার্টেন বিদ্যালয় রয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশে বাড়ন্ত শহরে নানা রং আর কারুকার্যময় অট্রালিকার শোভা। নির্মল হাওয়া  বাতাসে বাড়ন্ত মানুষ। সহনীয় মূল্যে দৈনন্দিন খাদ্য খাওয়ার ব্যাবস্থা। সব মিলে এক আনন্দঘন পরিবেশ এই শহর।

একজন পদস্থ কর্মকর্তার বিদায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-----রাজবাড়ি শহর আপনার কেমন লেগেছিল? তাঁর উত্তরটি ছিল এমন-----‘কাশ্মীরকে যদি পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ বলা যায় তাহলে বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গ রাজবাড়ি।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখানে দৈন্য আছে, অভাব আছে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ আর সদাচরণের অভাব নেই। আমরা রাজবাড়ি শহরের মানুষ এমনি আছি -এমনি থাকব।রাজবাড়ি শহরটি ছোট। এক সময় জেলার প্রধান যাতায়াত বাহন ছিল নৌকা, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি। রাস্তাঘাট বলতে ছিল কাঁচা কর্দমাক্ত পথ ঘাট। রেলপথই ছিল একমাত্র উন্নত যাতায়াতের উপায়।


অবশ্য গোয়ালন্দ থেকে জাহাজ, স্টিমার, নৌকায় দেশের অন্য স্থানে যাতায়াত করা যেত। ষাটের দশক থেকে পাকা সড়ক নির্মিত হতে থাকে। এ সময় রাজবাড়ি ফরিদপুর পাকাসড়ক নির্মিত হয়। রাজবাড়ি জেলার পাকা রাস্তাঘাট ব্যাপক নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয় আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। বর্তমান জেলার প্রতিটি থানা বৃহৎ হাটবাজারসহ প্রায় হাজার গ্রামের মধ্যে ৭৫% গ্রাম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকা সড়কের সুবিধা ভোগ করছে। জেলার ৪০% গ্রাম বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। জেলায় গড়ে উঠেছে ২২টি কলেজ অসংখ্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা বিপুল কর্মোদ্যমে চাকরি, ব্যবসা বাণিজ্যের ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় পদ্মা ব্রিজ নির্মাণের দাবি তীব্র হয়ে উঠেছে। পাটুরিয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সরকার ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি হয়েছে বলে জানা যায়। দৌলতদিয়া পাটুরিয়া সেতু নির্মিত হলে রেলপথ ঢাকা পর্যন্ত স্থাপন করা সহজ হবে। অবস্থানগত দিক থেকে রাজবাড়ি ঢাকার নিকটবর্তী। রাজবাড়ির ভূমি তুলনামুলক উঁচু। বাসভূমি ছাড়াও শিল্প কারখানা স্থাপনের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে রাজবাড়ি থেকে মাত্র এক বা দেড় ঘন্টায় এ এলাকার মানুষ ঢাকায় অফিস করতে পারবে। পাটুরিয়ায় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে রাজবাড়ি সিটি শহরে পরিণত হবে।

আমি তাকে ভালোবাসি নামের আড়ালে

ভালোবাসি উর্বর সমতলের সবল বৃক্ষের শাখা

যখন এলোমেলো দোল খায় ঝড়ো বাতাসে।

রাজার প্রশস্ত রাজপথে হেঁটে যায় প্রজা

হাঁটে শিশু, কিশোর, যুবা বৃদ্ধ

সকাল, দুপুর সন্ধ্যা গড়ায়----

কেবল দৃশ্যের অন্তরালে দৃশ্য হারায়।

লগ্ন সন্ধ্যায় অমর্তলোকে-আহবান

কেউ গৃহকোণে, কেউ মসজিদে, মাথা নোয়ায়।

শারদীয় উৎসবের মন্দির রাতের আবেশ ঢেকে দেয়

উর্ধ্বলোকে জ্যোতি আঁধার বদলে দেয়।

কতকাল আছি রাজবাড়ি?

তা পঞ্চাশ বছর প্রায় !

দৃষ্টির সীমানা থেকে দৃষ্টি ফিরে আসে।

কখনো দেখেছি বিনিময় মূল্য তেমন নেই

এমন শাপলার আঁট ডান হাতে


বাম হাতে শূন্য বোতল

বৃদ্ধ হেঁটে যায় শীর্ণ দেহ, দীন বসনে

জিজ্ঞাসি তারে, কী এমন দাম এর?

উত্তর-এ আমার তেল আর লবণের সহায়।

দিন কেটে দিন হাঁটে

আমি হাঁটি পায় পায়

পঞ্চাশ বছর হাঁটি রাজাদের পথে

হাঁটা দিন হাঁটতে হাঁটতে বদলে যায়।

এখন দেখি বিভোর মুগ্ধতায়

সহস্র শিশু, যুবা, যুবতী, বৃদ্ধ

রাজাদের রাজপথে হেঁটে যায়

হেঁটে যায়, হেঁটে যায়.......

Additional information